গত বুধবার ভোতেকোশি নদী ব্যবস্থায় ভয়াবহ বন্যার পর নেপালের রসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলায় টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানিতে মোবাইল টাওয়ার ও অপটিক্যাল ফাইবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্যোগকবলিত বিস্তীর্ণ এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
নেপাল টেলিকম জানিয়েছে, বন্যায় তাদের ৮৩টি মোবাইল টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেসরকারি অপারেটর এনসেলের ২৭টি সাইটও ক্ষতির মুখে পড়ে। দুই প্রতিষ্ঠানই জানিয়েছে, অধিকাংশ সেবা এখন পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মোবাইলে সংকেত পাওয়া গেলেও অনেক ক্ষেত্রে কল ঠিকমতো সংযুক্ত হচ্ছে না, মাঝপথে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে কিংবা শব্দ এতটাই বিকৃত হচ্ছে যে অপর প্রান্তের কথা বোঝা কঠিন।
পুনরুদ্ধারে বিকল্প প্রযুক্তির ব্যবহার
নেপাল টেলিকম জানিয়েছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত তাদের সব সাইট সচল করা হয়েছে। টিমুরে, চিলিমে খোলা ও ত্রিশূলী থ্রি-এ এলাকার মতো যেসব স্থানের টাওয়ার পুরোপুরি ভেসে গেছে, সেখানে কাছাকাছি বিকল্প সাইট ব্যবহার করে সাময়িকভাবে নেটওয়ার্ক চালু রাখা হয়েছে। সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়া টাওয়ারগুলো পুনর্নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র কমল লামিছানে।
এনসেল জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ২৭টি সাইটের মধ্যে ২৪টি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। রসুয়ার তিরু ও টিমুরে এবং নুওয়াকোটের ত্রিশূলীর তিনটি সাইট পুরোপুরি ধ্বংস হওয়ায় সেগুলো পুনর্নির্মাণে জটিলতা রয়েছে। তিরুতে সড়ক যোগাযোগ না থাকায় হেলিকপ্টারে সরঞ্জাম নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আর ত্রিশূলীতে নদীর ওপর রোপওয়ে ব্যবহার করে সরঞ্জাম সরিয়ে পুনর্গঠনকাজ চলছে।
ক্ষতির পরিমাণও বড়
বন্যায় টিমুরেতে এনসেলের একটি মোবাইল টাওয়ারের পাশাপাশি ৬০ কিলোমিটারের বেশি অপটিক্যাল ফাইবার পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে প্রতিষ্ঠানটির সরাসরি অবকাঠামোগত ক্ষতি ৯ কোটি নেপালি রুপির বেশি। নেপাল টেলিকমেরও তিনটি সাইট সম্পূর্ণভাবে হারিয়েছে, যদিও আর্থিক ক্ষতির পূর্ণ হিসাব এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বুধবার ফেডারেল পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, দুর্যোগকবলিত এলাকায় টেলিযোগাযোগ সেবার ৯৫ শতাংশ পুনরুদ্ধার হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ রয়ে গেছে।
জরুরি যোগাযোগে নতুন পরিকল্পনার দাবি
নেপাল টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষ বলছে, বিকল্প টাওয়ারের মাধ্যমে সেবা দেওয়ার কারণে কিছু এলাকায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়ে কলের মান কমতে পারে। ত্রিশূলী ও টিমুরের মতো এলাকায় স্বাভাবিক নেটওয়ার্ক ফিরিয়ে আনা কঠিন হওয়ায় জরুরি ব্যবহারের জন্য জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে ৩০টি স্যাটেলাইট ফোন দেওয়া হয়েছে।
অপটিক্যাল ফাইবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সাময়িকভাবে বেতার মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে অতিরিক্ত ব্যবহার ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এতে সেবার মান কিছুটা কমেছে। এ অবস্থায় অপ্রয়োজনীয় ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার কমিয়ে সংক্ষিপ্ত ভয়েস কল বা খুদে বার্তা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগপ্রবণ নেপালে শুধু অপটিক্যাল ফাইবারনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। মাইক্রোওয়েভ ও স্যাটেলাইটভিত্তিক বিকল্প ব্যবস্থা আগেই প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার সময় নেটওয়ার্ক সচল রাখতে মোবাইল জেনারেটর ও সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা প্রয়োজন।
২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর নেপাল টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষ একটি ‘সমন্বিত দুর্যোগ যোগাযোগ পরিকল্পনা’ তৈরি করেছিল। কিন্তু সেটি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ভোতেকোশির বন্যায় সড়ক ও টেলিযোগাযোগ একই সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকি আবারও স্পষ্ট হওয়ায় কর্তৃপক্ষ পরিকল্পনাটি পর্যালোচনা করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
বিপর্যয়ের সময় উদ্ধারকারী দল, সরকারি সংস্থা ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে এমন সমন্বিত জরুরি যোগাযোগ পরিকল্পনাকে এখন অত্যাবশ্যক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
নেপালের বন্যায় টেলিযোগাযোগ বিপর্যয় ও জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা নতুন করে সামনে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















