নেপাল ও তিব্বতের হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহে যানবাহন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানা থেকে নির্গত কালো কার্বন ও অন্যান্য দূষণ জমে বরফের গলন ত্বরান্বিত করছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে এই দূষণ যুক্ত হয়ে হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নেপালের লাংটাংয়ের মতো উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে। সম্প্রতি সেখানে একটি হিমবাহ ধসে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটে। ওই দুর্যোগের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। তবে গবেষকেরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার অত্যন্ত দূষিত অঞ্চলগুলোর বাতাসের প্রভাব হিমালয়ের উচ্চভূমিতেও পৌঁছাচ্ছে।
দূষিত বরফে বাড়ছে সূর্যের তাপ শোষণ
স্বাভাবিক অবস্থায় উজ্জ্বল সাদা তুষার সূর্যের আলোয়ের বড় অংশ প্রতিফলিত করে। কিন্তু কালো কার্বন বা ধুলিকণা বরফ ও তুষারের ওপর জমলে সেই প্রতিফলন ক্ষমতা কমে যায়। ফলে বরফ বেশি সৌরশক্তি শোষণ করে এবং দ্রুত গলতে শুরু করে।
বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে আলবেডো প্রভাবের দুর্বলতা হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। পরিষ্কার উচ্চভূমির তুষার সূর্যের প্রায় ৯০ শতাংশ আলো প্রতিফলিত করতে পারে। কিন্তু দূষণের কালো আস্তরণ সেই ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।

চীনা একাডেমি অব সায়েন্সেসের গবেষকদের একটি মডেলিং সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০০৭ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে হিমালয়ে মোট হিমবাহের ভর কমার এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার কালো কার্বনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
পাকিস্তান থেকেও পৌঁছাচ্ছে দূষণ
স্যাটেলাইট তথ্যের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে পাকিস্তানের শিল্পাঞ্চল ও নিম্নভূমি থেকে কালো কার্বন এবং খনিজ ধুলিকণা কীভাবে হিমালয়ের উচ্চভূমির হিমবাহে পৌঁছায়, তার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে। ছয় বছরের তথ্য বিশ্লেষণে গবেষকেরা দেখেছেন, এসব দূষণ বরফের পৃষ্ঠ অন্ধকার করে গলন বাড়াতে পারে।
দূষণের প্রভাব শুধু বরফের ওপরের অংশেই সীমাবদ্ধ নয়। বরফ গলার পানি নিচে প্রবেশ করে হিমবাহের ভেতরে সুড়ঙ্গ তৈরি করতে পারে। এতে হিমবাহ দুর্বল হয়ে ধসের আশঙ্কা বাড়ে।
এ ছাড়া বাতাসে থাকা কালো কার্বন পাহাড়ের ওপরের বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রাখে, মেঘ তৈরির ধরন বদলায় এবং আঞ্চলিক তুষারপাত কমাতে পারে। এতে হিমবাহ নতুন তুষারের যে সরবরাহ প্রয়োজন, সেটিও ব্যাহত হয়।
দূষণ কমালে দ্রুত সুফল পাওয়ার সুযোগ
দক্ষিণ এশিয়ায় এই দূষণের উৎসের মধ্যে রয়েছে পেট্রলচালিত যানবাহন, গৃহস্থালির রান্নার চুলা, ঐতিহ্যবাহী ইটভাটা এবং মৌসুমি ফসল ও বনভূমিতে আগুন।
নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আশুতোষ পাউডেলের মতে, বরফের ওপরের কালো স্তর তাপ শোষণ করে গলতে শুরু করলে নিচে আটকে থাকা পুরোনো ধুলা ও আবর্জনার স্তরও উন্মুক্ত হয়। এতে গলন আরও বাড়ে এবং একটি ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।
তবে বিজ্ঞানীদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগও রয়েছে। কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে শত শত বছর থাকতে পারে, কিন্তু কালো কার্বনের স্থায়িত্ব তুলনামূলকভাবে মাত্র কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ। তাই বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিচ্ছন্ন রান্নার প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে কালো কার্বন নিঃসরণ কমানো গেলে দ্রুত সুফল মিলতে পারে।
২০২০ সালের কোভিড-১৯ লকডাউন এ ক্ষেত্রে একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়েছে। ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, ওই সময় দূষণ সাময়িকভাবে কমে যাওয়ায় হিমালয়ের তুষারস্তর উজ্জ্বল হয়েছিল এবং তুষার গলন সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছিল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















