কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্মক্ষেত্রে কাজের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। যে কাজ শেষ করতে আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত, এখন অনেক ক্ষেত্রেই তা কয়েক মিনিটে করা সম্ভব। কিন্তু কাজ দ্রুত শেষ হওয়ার পর তরুণ কর্মীদের অবসর মিলছে না; বরং তাদের কাছ থেকে আরও বেশি কাজ, দ্রুত ফলাফল এবং উন্নত মানের কাজের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এশিয়ার সাতটি দেশের তরুণ কর্মীদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে এমনই চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, চীন ও ভারতের ২১ থেকে ২৯ বছর বয়সী ৩ হাজার ৬২৮ জন নাগরিক ও স্থায়ী বাসিন্দা অংশ নেন। তাঁদের কেউ চাকরি করছেন, আবার কেউ চাকরি খুঁজছেন।
সময় বাঁচলেও কাজ কমছে না
ভারতের গুরগাঁওয়ের ডিজিটাল বিপণনকর্মী ২৬ বছর বয়সী আয়ুশি রাঘুবংশী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তথ্য বিশ্লেষণ, বিজ্ঞাপনের উপকরণ তৈরি এবং উপস্থাপনার কাজ আগের তুলনায় অনেক দ্রুত শেষ করা যায়।
কিন্তু এতে তাঁর কর্মঘণ্টা কমেনি। বরং আগে যেখানে দিনে তিন থেকে পাঁচটি কাজ করতেন, এখন একই সময়ে আটটি পর্যন্ত কাজ নিতে হচ্ছে।
তাঁর ভাষায়, কোনো কাজ ঘণ্টার বদলে কয়েক মিনিটে শেষ হয়ে গেলে বাকি সময়টুকুতেও নিজেকে ব্যস্ত প্রমাণ করার চাপ তৈরি হয়। অর্থাৎ প্রযুক্তি কাজের সময় কমালেও কর্মীর ওপর প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছে।
:max_bytes(150000):strip_icc()/GettyImages-2193275251-e00127dc2bc4401bb1418b150f11ac05.jpg)
চীনের সাংহাইয়ে নিয়োগ পরামর্শক হিসেবে কাজ করা ২৪ বছর বয়সী এক তরুণীও একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান নিজেদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর নিয়োগ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলছে। আগে প্রার্থী বাছাইয়ের তালিকা তৈরি করতে যেখানে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগত, এখন তা ২২ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ডিজিটাল ব্যাংকিং পণ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ২৮ বছর বয়সী পিচায়া লিউচানপাতানা বলেন, আগে তিনি দুটি পণ্য দেখভাল করতেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় এখন তিনটি পণ্য সামলাচ্ছেন।
কখনো একই সময়ে দুটি বৈঠক থাকলেও তাঁকে একটি বৈঠকে অংশ নিয়ে অন্যটির সারাংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
চীন ও ভারতে প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি
জরিপে দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারকারী তরুণদের বড় একটি অংশ মনে করেন, একই সময়ে আরও বেশি কাজ করার প্রত্যাশা বেড়েছে।
চীনে ৮৫ শতাংশ কর্মী এমন প্রত্যাশা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন। ভারতে এই হার ৮২ শতাংশ। সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ায় হার ৬৯ শতাংশ করে।
তবে এর মধ্যেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে তরুণদের আশাবাদ রয়েছে। চীন ও ভারতে কর্মক্ষেত্রে এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হওয়ার পাশাপাশি এই দুই দেশেই সবচেয়ে বেশি মানুষ মনে করেন, প্রযুক্তিটি তাঁদের ক্যারিয়ারের জন্য উপকারী। দুই দেশেই এমন মত দিয়েছেন ৮৮ শতাংশ করে তরুণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন ও ভারত উৎপাদননির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞান ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতির দিকে দ্রুত এগোচ্ছে। ফলে তরুণ ও উচ্চশিক্ষিত কর্মীদের কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংস্পর্শও বেশি।
এ ছাড়া দুই দেশের চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা থাকায় কর্মীদের শুধু দ্রুত কাজ করলেই হচ্ছে না; আরও ভালো মানের কাজ, জটিল সমস্যা সমাধান এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য বেশি মূল্য তৈরি করার চাপও বাড়ছে।
উৎপাদনশীলতা বাড়ছে, চাপও বাড়ছে
ভারতের গুরগাঁওয়ের ২৪ বছর বয়সী লেখিকা ঋদ্ধি আনন্দ বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে তিনি দিনে সাধারণত ৫০০ থেকে ২ হাজার শব্দ লিখতেন। এখন একই সময়ে প্রায় ৬ হাজার শব্দ তৈরির প্রত্যাশা করা হয়।
প্রাথমিক খসড়া তৈরিতে প্রযুক্তি সাহায্য করলেও পরে তাঁকে সেই লেখা আবার সম্পাদনা করে মানুষের স্বাভাবিক লেখার মতো করে তুলতে হয়। ফলে কাজ দ্রুত হলেও একঘেয়েমি ও মানসিক চাপ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি কর্মীদের ব্যস্ত করে তুলেছে—বিষয়টি শুধু এমন নয়। বরং এটি ভালো কর্মদক্ষতার সংজ্ঞাই বদলে দিচ্ছে।
আগে কোনো কাজের প্রথম খসড়া তৈরি করতে যত সময় লাগত, এখন তা দ্রুত করা সম্ভব। তাই নিয়োগদাতারা আরও পরিপাটি কাজ, দ্রুত সাড়া এবং বেশি দায়িত্ব প্রত্যাশা করছেন। ফলে কাঁচা কাজের পরিমাণের চেয়ে কর্মদক্ষতার মানদণ্ডই উঁচু হয়ে যাচ্ছে।
তরুণ কর্মীদের জন্য বিষয়টি আরও কঠিন। কারণ নতুন কর্মীদের কাছ থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান আশা করা যেতে পারে, কিন্তু শুরুতেই বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রত্যাশা করা উচিত নয়। তাঁদের প্রযুক্তির তৈরি তথ্য যাচাই করা, ভুল ধরতে শেখা এবং নিজের পেশাগত বিচারবোধ প্রয়োগের জন্য সময় ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
সাশ্রয় হওয়া সময়ও চলে যাচ্ছে নতুন কাজে
মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের একটি আন্তর্জাতিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ২৮ বছর বয়সী শে জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে প্রতিবেদন লেখা, পাঠ পরিকল্পনা তৈরি এবং অভিভাবকদের ই-মেইলের উত্তর দেওয়ার মতো নিয়মিত কাজ অনেক দ্রুত করা যায়।
কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষকদের কাজের লক্ষ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের নতুন শর্ত যুক্ত করেছে। প্রযুক্তির সহায়তায় প্রতিবেদন যাচাই এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাপ্রযুক্তির ব্যবহারও এখন দায়িত্বের অংশ।
শিক্ষকদের হাতে কিছুটা সময় বেশি থাকছে দেখে তাঁদের ওপর অতিরিক্ত কার্যক্রম, পাঠ্যক্রমসংক্রান্ত কাজ এবং অন্যান্য দায়িত্বও দেওয়া হচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ সেপ্টিয়ানি রাহায়ু বলেন, তিনি প্রায় প্রতিদিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেন। নতুন ধারণা বের করা, বিষয় নির্ধারণ এবং ভিডিওর বক্তব্য ও প্রচারলেখার প্রাথমিক খসড়া তৈরিতে এটি সহায়তা করে।
তবে চূড়ান্ত কাজ তিনি নিজেই সম্পাদনা করেন। তাঁর কাছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পুরো কাজ করে দেওয়ার যন্ত্র নয়, বরং একজন সহকর্মীর মতো।
বেশি কাজের সঙ্গে কি বাড়ছে বেতন?
কর্মীদের উৎপাদনশীলতা যদি বাড়ে এবং তাঁদের কাছ থেকে বেশি কাজ প্রত্যাশা করা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—বেতনও কি বাড়ছে?
জরিপে অংশ নেওয়া তরুণ কর্মীদের অভিজ্ঞতা বলছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উত্তরটি এখনো না।
ভারতের আয়ুশি মনে করেন, কর্মী হিসেবে একই বেতনে বেশি কাজের প্রত্যাশা বিরক্তিকর হতে পারে। কিন্তু ব্যবসার মালিক হলে তিনিও কর্মীদের কাছ থেকে বেশি কাজ চাইতেন, যদি প্রযুক্তির সহায়তায় তাঁদের কাজের সক্ষমতা বাড়ে।
ইন্দোনেশিয়ার সুরাবায়ার ২৪ বছর বয়সী আর্থিক ঋণ পরামর্শক দিন্দা আমালিয়া জুলাইয়ান্দ্রি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তিনি গ্রাহকদের নথিপত্র দ্রুত যাচাই করতে এবং বেশি আবেদন সামলাতে পারছেন। এতে মাসিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং কর্মদক্ষতার মূল্যায়নে ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে।
ফিলিপাইনের ২৬ বছর বয়সী প্রযুক্তি বিক্রয়কর্মী জুলিয়ান অ্যাং নিজে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শিখেছেন। তাঁর ব্যবস্থাপক তাঁকে দলের এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে উঠতে উৎসাহ দিচ্ছেন। তবে এর বিনিময়ে বেতন বাড়বে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
জরিপে দেখা গেছে, চীনে কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারকারীদের ৪২ শতাংশ বলেছেন, এর ফলে তাঁদের বেতন বেড়েছে। ভারতে ও ইন্দোনেশিয়ায় এই হার ৩৪ শতাংশ।
অন্যদিকে সিঙ্গাপুরে মাত্র ১২ শতাংশ কর্মী বলেছেন, এর ফলে তাঁদের বেতন বেড়েছে। বরং ২৭ শতাংশ বলেছেন, বেতন কমেছে। থাইল্যান্ডে ৩৫ শতাংশ কর্মী বেতন কমার কথা জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়োগদাতারা ধীরে ধীরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের দক্ষতাকে বাড়তি যোগ্যতা হিসেবে নয়, বরং কর্মক্ষেত্রের মৌলিক দক্ষতা হিসেবে দেখতে শুরু করছেন। ফলে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারে পারদর্শী হলেই বাড়তি বেতন পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকছে না।
চাকরি হারানোর ভয়ও বাড়ছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুবিধার পাশাপাশি চাকরি হারানো এবং নিজের দক্ষতা অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
জরিপে অংশ নেওয়া সাত দেশের প্রতিটিতেই ৮০ শতাংশের বেশি তরুণ কর্মী কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ফিলিপাইনের ২৮ বছর বয়সী বহুমাধ্যম নকশাবিদ কলিন বার্সেলোনা বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানে চিত্রকর হিসেবে কাজ করার সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে অতিরিক্ত চিত্র তৈরির প্রয়োজন না থাকায় তিনি চাকরি হারান।
এর পর থেকেই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর ভয় বেড়েছে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিপণন, অনুসন্ধানভিত্তিক লেখালেখি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং ওয়েব নকশার মতো নতুন দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করছেন তিনি।
মালয়েশিয়ার ২৭ বছর বয়সী জেফরি ট্যাংও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কায় আগের চাকরি ছেড়েছেন। তাঁর আগের প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হলেও কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না।
পরে তিনি এমন প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন যেখানে প্রতি সপ্তাহে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং কাজের পদ্ধতি উন্নত করতে আলাদা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিও রয়েছেন।
ভবিষ্যতের চাকরিতে সবচেয়ে দরকার কোন দক্ষতা?
জরিপে তরুণদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ভবিষ্যতের চাকরির জন্য কোন দক্ষতাগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সিঙ্গাপুরে ৪৮ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৪৯ শতাংশ এবং ফিলিপাইনে ৫৪ শতাংশ তরুণ চিন্তাশক্তি ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন।
ভারতে ৬৪ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডে ৪১ শতাংশ তরুণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয়করণ-সংক্রান্ত দক্ষতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
অন্যদিকে চীনে ৫৪ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ৫৭ শতাংশ সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা ভবিষ্যতের জন্য যথেষ্ট হবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দেওয়া তথ্য যাচাই করা, সঠিক প্রশ্ন করা, সমস্যাকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করা এবং কোনো সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নেওয়ার মতো মানবিক দক্ষতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সিঙ্গাপুরে মানবিক দক্ষতার ওপর বেশি আস্থা
ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যুক্ত চাকরি করতে আগ্রহী তরুণদের হার সিঙ্গাপুরে সবচেয়ে কম। দেশটির মাত্র ৫৪ শতাংশ তরুণ এমন চাকরি চান।
ভারতে এই হার ৭৫ শতাংশ, চীনে ৬৯ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডে ৬৮ শতাংশ।
সিঙ্গাপুরের ২৭ বছর বয়সী মানবসম্পদ কর্মকর্তা তান মিং চুয়ান মনে করেন, কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপস্থিতি এখন অনিবার্য। তাই তিনি এটিকে নিয়ে অতিরিক্ত উৎসাহী বা আতঙ্কিত—কোনোটিই নন।
তাঁর মতে, প্রযুক্তি এমন কাজের সময় বাঁচাতে পারে যেখানে মানুষের সিদ্ধান্তের প্রয়োজন কম। কিন্তু ব্যতিক্রমী, জটিল এবং মানুষকেন্দ্রিক পরিস্থিতিতে মানবিক বিচারবোধের বিকল্প নেই।
সিঙ্গাপুরের সাবেক গবেষণা সমন্বয়কারী ২৫ বছর বয়সী ওং সি এনও একই মত পোষণ করেন। প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে তাঁর আপত্তি নেই। তবে রোগীদের সঙ্গে কথা বলা, তাঁদের কোনো গবেষণা সম্পর্কে বোঝানো বা সরাসরি প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার মতো মানবিক কাজ প্রযুক্তির হাতে তুলে দিতে চান না তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিঙ্গাপুরের তরুণদের এই অবস্থান প্রযুক্তিবিরোধিতা নয়। বরং তাঁরা বুঝতে পারছেন, ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের দক্ষতার সমন্বয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন আয়ের পথও খুলছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শুধু চাকরির সহায়ক হিসেবে নয়, অতিরিক্ত আয়ের উৎস হিসেবেও দেখছেন অনেক তরুণ।
ইন্দোনেশিয়ায় ৪৪ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন, তাঁরা অতিরিক্ত ব্যবসা বা নতুন আয়ের পথ তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেছেন অথবা করার কথা ভাবছেন।
থাইল্যান্ডে এই হার ৩৫ শতাংশ, ভারতে ৩১ শতাংশ, ফিলিপাইনে ২৪ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ১২ শতাংশ, চীনে ৯ শতাংশ এবং সিঙ্গাপুরে মাত্র ৩ শতাংশ।
ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তার ২৭ বছর বয়সী ভেলিসিয়া সেরেনাদা রমজান মাসে ছোট পরিসরে উপহারের ঝুড়ির ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ব্যবসার ধারণাটি তাঁর নিজের হলেও মূল্য নির্ধারণ, পণ্যের বিবরণ লেখা, প্রচারের ধারণা এবং বাজার যাচাইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়েছেন।
তাঁর কাছে প্রযুক্তিটি কম খরচে নতুন ধারণা যাচাই করার একজন সহকারীর মতো কাজ করেছে।
প্রযুক্তি নয়, মানুষের সঙ্গে প্রযুক্তির সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে দূরে থাকা যেমন ঠিক হবে না, তেমনি এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করাও ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রাথমিক নির্দেশনা দেওয়া বা সাধারণ কাজ করানোর দক্ষতা খুব শিগগিরই প্রায় সব পেশাজীবীর মৌলিক প্রত্যাশায় পরিণত হতে পারে। তখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে প্রযুক্তির দেওয়া ফলাফল যাচাই করার ক্ষমতা, সঠিক সমস্যা চিহ্নিত করা এবং যেখানে একাধিক সম্ভাব্য উত্তর রয়েছে সেখানে নিজের বিচারবোধ কাজে লাগানো।
অর্থাৎ ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে সফল হওয়ার জন্য শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জানা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে চিন্তাশক্তি, যোগাযোগ, দলগত কাজ, সৃজনশীলতা, দায়িত্ববোধ এবং মানবিক বিচারবোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো দ্রুত উত্তর দিতে পারবে। কিন্তু কোন প্রশ্ন করা উচিত এবং পাওয়া উত্তরের কোনটি বিশ্বাসযোগ্য—শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে মানুষকেই।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তাই আসল প্রতিযোগিতা শুধু কে প্রযুক্তি বেশি ব্যবহার করতে পারে, তা নয়; বরং কে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজের মানবিক দক্ষতাকে আরও মূল্যবান করে তুলতে পারে, সেটিই হয়ে উঠতে পারে কর্মজীবনের বড় প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















