ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের ছয় মাসের সামরিক সংঘাত আবারও তীব্র হয়েছে। কিন্তু সামরিক শক্তিতে আধিপত্যের দাবি করলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন এমন এক যুদ্ধে আটকে পড়েছেন, যার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তাঁর হাতে নেই এবং যার দ্রুত সমাপ্তিরও কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন সংঘাত
মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার পর ট্রাম্প আবারও ইরানের জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে চলমান কিন্তু স্থবির আলোচনাকেও তিনি কার্যত গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ইরানের অর্থনীতি ধসে পড়ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ইরানের জনগণ কবে সরকারের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াবে।

এর কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে নতুন দফা হামলা চালায় এবং ইরানও পাল্টা আঘাত হানে। বুধবার সকালে ট্রাম্প আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হরমুজ প্রণালির নাম বদলে ‘ট্রাম্প প্রণালি’ করার প্রস্তাব দেন।
পুরোনো কৌশলের পুনরাবৃত্তি
নতুন করে সংঘাত শুরুর আগের ২৪ ঘণ্টায় ট্রাম্পের বক্তব্যে তাঁর পরিচিত কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। একদিকে তিনি দাবি করেছেন, ইরান সামরিকভাবে পরাজিত এবং অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ও অবস্থানের বিরোধিতা করলে ইরানের ওপর আরও ভয়াবহ হামলার হুমকি দিয়েছেন।
বিদেশনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাবাহিকতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরান সংকট মোকাবিলায় ওয়াশিংটনের হাতে কার্যকর নতুন বিকল্প ক্রমেই কমে আসছে। সাবেক ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা ও রিপাবলিকান কৌশলবিদ ম্যাথিউ বার্টলেট বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকৌশলে একই ধরনের সামরিক ও বক্তব্যনির্ভর পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। তাঁর মতে, যুদ্ধ জেতা কিংবা সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সুস্পষ্ট পরিকল্পনার ঘাটতিও স্পষ্ট।
ইরানের পাল্টা চাপ
তবে সামরিকভাবে দুর্বল অবস্থানে থেকেও ইরান দেখিয়ে দিয়েছে, তার হাতে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজে হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের তেল ও গ্যাস রপ্তানি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ইরান বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করার সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের প্রেসিডেন্ট মাইকেল ফ্রোম্যানের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় ইরান নিঃসন্দেহে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তার যুদ্ধের অনেক লক্ষ্য অর্জন করেছে। মার্কিন অভিযানের প্রথম কয়েক সপ্তাহে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যা এবং দেশটির নৌবাহিনীকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়।
কিন্তু সীমিত সামরিক সক্ষমতা নিয়েও হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারছে। এ ধরনের অসম যুদ্ধই ওয়াশিংটনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক চাপেও মিলছে না দ্রুত ফল
সামরিক অভিযানের পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসন এখন অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ, নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং দেশটির অর্থনীতির অবশিষ্ট সহায়তার পথ বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে চীন ও রাশিয়া ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তার উৎস হয়ে রয়েছে। চীন ইরানের তেল কিনছে এবং অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। অন্যদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চলতি সপ্তাহেই ইরানকে সমর্থন অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছেন।
দেশের ভেতরেও চাপ বাড়ছে
ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ তৈরি করছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন অর্থনীতিতে যুদ্ধের ব্যয় ও প্রভাব ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ফলে সর্বাত্মক বোমাবর্ষণে যাওয়ার ব্যাপারে ট্রাম্প সতর্ক থাকলেও তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্যে নিয়মিতই কঠোর হুমকি দেখা যাচ্ছে।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের গবেষক খালেদ এলগিন্ডির মতে, ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক বক্তব্যের একটি অংশ তাঁর রাজনৈতিক সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বার্তা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কঠোর বক্তব্যের বাইরে সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সুস্পষ্ট কৌশল কতটা আছে, তা নিয়েই প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















