মিশরের কায়রোয় সর্দি-গলা ব্যথার চিকিৎসায় দেওয়া পুষ্টি-সহায়ক ওষুধের বদলে ভুল করে মৃগী ও স্নায়বিক রোগের ওষুধ খাওয়ানোয় সাত বছর বয়সী এক শিশু গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ঘটনাটি সামনে আসার পর প্রেসক্রিপশনে ব্র্যান্ড নামের পরিবর্তে ওষুধের জেনেরিক বা সক্রিয় উপাদানের নাম ব্যবহারের দাবি জোরালো হয়েছে।
ভুল ওষুধে চার দিন নড়াচড়া করতে পারেনি শিশু
মিশরের জাহরা আল-মাদি এলাকার একটি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাত বছর বয়সী মেক্কার পরিবার একটি ফার্মেসিতে প্রেসক্রিপশনের ছবি পাঠিয়ে বাড়িতে ওষুধ পাঠাতে বলে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ওষুধ পৌঁছানোর পর ৬ মিলিলিটার মাত্রা খাওয়ানো হয় তাকে।
এরপরই শিশুটি এমন অবস্থায় চলে যায়, যা তার মা সামিয়া ‘প্যারালাইসিসের মতো’ বলে বর্ণনা করেছেন। চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধের নামের শেষের দুটি অক্ষর নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে ফার্মেসি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ওষুধ দেওয়া হয়েছিল বলে পরিবারের অভিযোগ।

মেক্কাকে প্রথমে বিষ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে নেওয়া হলেও সেখানে ভর্তি করা হয়নি। পরে কয়েকটি হাসপাতালেও তাকে নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত তাকে ডেমেরদাশ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রায় দেড় দিন সে অসুস্থ থাকার পাশাপাশি হাত, পা ও চোখ নড়াতে পারেনি। চার দিন পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে।
ঘটনার পর ফার্মেসির বিরুদ্ধে মামলা করার পাশাপাশি মিশরের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ফার্মাসিস্ট সিন্ডিকেট এবং সরকারি কৌঁসুলির কাছে অভিযোগ করেছে পরিবার। তবে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা বলছেন, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়।
ব্র্যান্ড নামের মিলেই বাড়ছে ভুলের ঝুঁকি
ফার্মাসিস্টদের মতে, প্রেসক্রিপশনে বাণিজ্যিক বা ব্র্যান্ড নাম ব্যবহারের কারণে একই রকম দেখতে বা শুনতে নামের ওষুধ গুলিয়ে ফেলার ঝুঁকি বাড়ে। মেক্কার ক্ষেত্রে প্রেসক্রাইব করা ওষুধের ব্র্যান্ড নাম ছিল Respidep, আর ভুল করে দেওয়া হয়েছিল Risperdal—দুটি নামের মধ্যে মিল থাকায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
প্রেসক্রাইব করা ওষুধটির সক্রিয় উপাদান Acetylcysteine, অন্যদিকে দেওয়া ওষুধটির সক্রিয় উপাদান Risperidone। Risperidone কিছু মানসিক ও স্নায়বিক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
ফার্মেসি-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, সক্রিয় উপাদানের নামের মধ্যে এ ধরনের মিল সাধারণত দেখা যায় না। কিন্তু ব্র্যান্ড নামের ক্ষেত্রে কয়েকটি অক্ষরের পার্থক্যেই এক ওষুধের সঙ্গে আরেকটি ওষুধ গুলিয়ে যেতে পারে। চিকিৎসকদের হাতের লেখা অস্পষ্ট হলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।
জেনেরিক নামে প্রেসক্রিপশনের দাবি
মেক্কার ঘটনার পর কায়রো ফার্মাসিস্ট সিন্ডিকেট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে সব চিকিৎসাসেবা প্রদানকারীকে ব্র্যান্ডের পরিবর্তে জেনেরিক নামে ওষুধ প্রেসক্রাইব করা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছে। ২০২৪ সালের প্রধানমন্ত্রীর একটি নির্দেশনাতেও এ ধরনের সুপারিশ ছিল বলে সিন্ডিকেট জানিয়েছে।
প্রথম ধাপে অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে এই নিয়ম কার্যকর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও প্রতিরোধক্ষমতা তৈরির ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি চিকিৎসার কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ সহজ হবে বলে মনে করছে সিন্ডিকেট।
জেনেরিক নামে প্রেসক্রিপশন চালু হলে একই সক্রিয় উপাদানের বিভিন্ন বাণিজ্যিক বিকল্প থেকে রোগী পছন্দ করতে পারবেন। ওষুধের সংকটের সময় বিকল্প ব্র্যান্ড পাওয়া এবং চিকিৎসক-ফার্মেসির মধ্যে বারবার যোগাযোগের প্রয়োজন কমানোও সম্ভব হবে বলে তাদের দাবি।
ডিজিটাল প্রেসক্রিপশনের দাবিও উঠেছে
ফার্মাসিস্ট সিন্ডিকেট সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন চালুর দাবিও জানিয়েছে। তাদের মতে, এতে অস্পষ্ট হাতের লেখা, ওষুধের নাম এবং মাত্রা নিয়ে ভুলের ঝুঁকি কমবে।
তবে চিকিৎসক সংগঠনের কর্মকর্তারা এ উদ্যোগ নিয়ে উৎসাহী নন। তাদের বক্তব্য, চিকিৎসক রোগীর জন্য উপযুক্ত মনে করা নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডও প্রেসক্রাইব করতে পারেন। জেনেরিক নামের সংখ্যা অনেক হওয়ায় সব নাম মনে রাখাও কঠিন বলে তারা মনে করেন। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন ব্যবস্থা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনো প্রস্তুত নয় বলেও তারা উল্লেখ করেছেন।
ফার্মেসি পর্যায়েও তদারকি জোরদারের দাবি
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু প্রেসক্রিপশন পদ্ধতি পরিবর্তন করলেই সমস্যার পুরো সমাধান হবে না। অনেক ফার্মেসিতে সবসময় যোগ্য ফার্মাসিস্ট উপস্থিত থাকেন না। ফলে জেনেরিক নামে প্রেসক্রিপশন হলেও ভুল ওষুধ দেওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
ফার্মাসিস্টদের মতে, ওষুধ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রেও কঠোর শর্ত প্রয়োজন। তবে শুধু সংশ্লিষ্ট ফার্মেসিকে দায়ী করলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা বন্ধ হবে না। রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রেসক্রিপশন থেকে ওষুধ সরবরাহ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার প্রয়োজন রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















