ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের প্রস্তাবিত ‘ডিসএনগেজমেন্ট ৭১০’ পরিকল্পনা গাজা সংকটকে সামরিক সংঘাতের গণ্ডি ছাড়িয়ে জনসংখ্যা ও ভূখণ্ডের প্রশ্নে নিয়ে এসেছে। পরিকল্পনাটির ঘোষিত লক্ষ্য হলো সাত বছরের মধ্যে গাজা থেকে প্রায় ১৮ লাখ ৬০ হাজার ফিলিস্তিনিকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া। প্রথম বছরেই প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে স্থানান্তর এবং তিন বছরের মধ্যে সেই সংখ্যা ১১ লাখ ১০ হাজারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রস্তাবে রয়েছে বিপুল অর্থের সংস্থান। প্রাথমিক বিনিয়োগ হিসেবে ৩১০ কোটি ডলার এবং পুরো প্রকল্পের জন্য ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থের কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। বেন-গভির এটিকে ‘স্বেচ্ছামূলক অভিবাসন’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। এর আওতায় গাজা ছাড়তে আগ্রহীদের আর্থিক সহায়তা এবং তাদের গ্রহণকারী দেশ বা প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। এ প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য আলাদা ‘স্বেচ্ছামূলক অভিবাসন মন্ত্রণালয়’ গঠনের কথাও তিনি বলেছেন।
কিন্তু পরিকল্পনাটির ঘোষিত লক্ষ্য এবং বাস্তব রাজনৈতিক সম্ভাবনার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।
গাজা প্রশ্নে ডানপন্থী প্রতিযোগিতা
‘৭১০’ পরিকল্পনাকে শুধু গাজা নিয়ে একটি নীতিগত প্রস্তাব হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্যের বড় অংশই বাদ পড়ে যায়। এটি ইসরায়েলের ডানপন্থী রাজনীতির অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
বেন-গভির নেতানিয়াহু ও লিকুদের তুলনায় আরও কঠোর জাতীয়তাবাদী অবস্থান তুলে ধরে নিজেকে ডানপন্থী রাজনীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। গাজায় ইসরায়েলি বসতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে থাকা এবং ২০০৫ সালের বিচ্ছিন্নতা নীতির পরিণতি বদলে দিতে চাওয়া গোষ্ঠীগুলোর কাছেও এ পরিকল্পনা রাজনৈতিক আবেদন তৈরি করতে পারে।
এ কারণে ‘৭১০’ ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের আলোচনায় একটি দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। বেন-গভিরের দল যদি এটিকে জোটে অংশগ্রহণের মৌলিক শর্ত হিসেবে সামনে রাখে, তাহলে অন্য ডানপন্থী দলগুলোর ওপরও গাজা প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত না হলেও এর রাজনৈতিক ব্যবহার সম্ভব।
‘স্বেচ্ছামূলক’ অভিবাসনের জটিলতা
পরিকল্পনার সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো ‘স্বেচ্ছামূলক’ শব্দটির ব্যবহার। কোনো জনগোষ্ঠী যখন যুদ্ধ, অবরোধ, ব্যাপক ধ্বংস এবং জীবনযাপনের ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে, তখন তাদের দেশত্যাগকে কতটা স্বাধীন সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যায়—সেটিই বড় প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে দখলকৃত ভূখণ্ডের বেসামরিক জনগণকে জোরপূর্বক স্থানান্তর বা বহিষ্কারের বিরুদ্ধে স্পষ্ট বিধান রয়েছে। ১৯৪৯ সালের চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ৪৯ নম্বর অনুচ্ছেদ এ ধরনের স্থানান্তর নিষিদ্ধ করে। পরিস্থিতি ও অপরাধের নির্দিষ্ট উপাদানের ওপর নির্ভর করে ব্যাপক জোরপূর্বক স্থানান্তর যুদ্ধাপরাধ কিংবা মানবতাবিরোধী অপরাধের আইনি প্রশ্নও তৈরি করতে পারে।
তাই কোনো প্রস্থানকে কাগজে ‘স্বেচ্ছামূলক’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলেই তার প্রকৃতি নির্ধারিত হয়ে যায় না। মানুষ কোন পরিস্থিতির মধ্যে সেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
![]()
আঞ্চলিক বাস্তবতা বড় বাধা
পরিকল্পনাটির বাস্তবায়নে মিসর ও জর্ডানের অবস্থান বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মিসর গাজা থেকে ব্যাপকসংখ্যক ফিলিস্তিনিকে তার ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়ার যেকোনো উদ্যোগকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখে আসছে। এমন উদ্যোগ আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো এবং মিসর-ইসরায়েল সম্পর্কের ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
আরব ও মুসলিম বিশ্বের বিস্তৃত পরিসরেও ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আপত্তি রয়েছে। একই সঙ্গে কয়েক লাখ মানুষকে গ্রহণ করার মতো রাষ্ট্র খুঁজে পাওয়াও সহজ নয়। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক ব্যয়ের পাশাপাশি নিরাপত্তা, রাজনৈতিক দায় এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নের ভবিষ্যৎ কাঠামো পরিবর্তনের ঝুঁকিও জড়িয়ে আছে।
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। গাজার বিপুলসংখ্যক মানুষকে অন্য দেশে স্থানান্তরের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমন্বয় ও রাজনৈতিক সমর্থন প্রয়োজন হবে। সেই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।
অর্থ ও বাস্তবায়নের প্রশ্ন
পরিকল্পনাটির আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক ব্যয়। কয়েক হাজার কোটি ডলারের একটি প্রকল্প পরিচালনার জন্য শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই হবে না। কোথায় মানুষগুলো যাবে, কোন দেশ তাদের গ্রহণ করবে, কীভাবে তাদের পুনর্বাসন হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় কে বহন করবে—প্রতিটি প্রশ্নের বাস্তব উত্তর প্রয়োজন।
ইসরায়েল নিজেও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ব্যয় ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে একটি বিতর্কিত জনসংখ্যা স্থানান্তর কর্মসূচি পরিচালনা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
এর বাইরে রয়েছে সবচেয়ে মৌলিক বাধা—গাজার জনগণের নিজেদের ভূমিতে থাকার আকাঙ্ক্ষা। কোনো পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নের জন্য শুধু প্রস্তাবদাতা পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়; যাদের স্থানান্তরের কথা বলা হচ্ছে, তাদের অবস্থানও নির্ধারক।
বেন-গভিরের নির্বাচনী হিসাব
‘৭১০’ পরিকল্পনার রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয় ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে। সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে বেন-গভিরের ইহুদি শক্তি দলকে প্রায় সাত থেকে আটটি নেসেট আসনের সম্ভাবনায় দেখা হয়েছে। তবে নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ডানপন্থী দলগুলোর সমীকরণ, জোট এবং ভোটারদের পছন্দ বদলাতে পারে।
বেন-গভিরের কৌশল হলো প্রচলিত ডানপন্থী রাজনীতির চেয়েও কঠোর অবস্থান নিয়ে নিজের দলের জন্য আলাদা রাজনৈতিক জায়গা তৈরি করা। গাজা নিয়ে ‘৭১০’ পরিকল্পনা সেই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে একটি দলের আসনসংখ্যা বাড়ানো এবং সেই শক্তিকে সরকার গঠনের সক্ষমতায় রূপান্তর করা এক বিষয় নয়। সাম্প্রতিক জরিপে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী ও অতি-ধর্মীয় দলগুলোর সম্মিলিত শক্তি ৬১ আসনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার মতো অবস্থানে নেই বলে দেখা যাচ্ছে। একই সময়ে মধ্যপন্থী ও মধ্য-ডান রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতিও জোট গঠনের সমীকরণকে জটিল করে তুলছে।
ফলে বেন-গভির তার সংসদীয় অবস্থান শক্তিশালী করতে পারলেও শুধু সেই শক্তির ভিত্তিতে একটি কট্টর ডানপন্থী সরকার গঠন সম্ভব হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
‘৭১০’-এর সম্ভাব্য বাস্তব প্রভাব
সবকিছু মিলিয়ে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী গাজা থেকে ১৮ লাখ ৬০ হাজার ফিলিস্তিনিকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার সামনে বড় ধরনের রাজনৈতিক, আইনি, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাধা রয়েছে। পরিকল্পনাটির ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন তাই সহজ হবে না।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে পরিকল্পনাটির কোনো রাজনৈতিক কার্যকারিতা নেই। বরং বাস্তবায়ন অসম্পূর্ণ হলেও জনসংখ্যা স্থানান্তরের ধারণাকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা এবং গাজা নিয়ে ইসরায়েলের ডানপন্থী রাজনীতির অবস্থানকে আরও কঠোর করার ক্ষেত্রে এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ‘৭১০’ পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল হয়তো গাজা থেকে নির্ধারিত সংখ্যক মানুষকে সরিয়ে নেওয়া নয়। বরং বাস্তুচ্যুতিকে রাজনৈতিক চাপ তৈরির উপায় এবং নির্বাচনী রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা—এটাই এর তুলনামূলকভাবে বেশি বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হতে পারে।
লেখক: অধ্যাপক হাতেম সাদেক, হেলওয়ান বিশ্ববিদ্যালয়
অধ্যাপক হাতেম সাদেক 



















