ভারতের শুল্কনীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি ধারণা বেশ জোরালো—দেশটি নাকি অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ শুল্ক আরোপ করে এবং বিদেশি পণ্যের জন্য তার বাজার প্রায় বন্ধ করে রাখে। কিন্তু শুল্ক এমন একটি বিষয়, যা ধারণা বা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে নয়, পরিসংখ্যান দিয়ে যাচাই করা যায়। তাই ভারতের অবস্থান বুঝতে হলে আবেগের বদলে তথ্যের দিকে তাকানো জরুরি।
উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে শুল্কের আলাদা ভূমিকা
ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে শুল্কের উদ্দেশ্যকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো উচ্চ আয়ের উন্নত দেশের সঙ্গে একইভাবে দেখা ঠিক নয়। ঐতিহাসিকভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলো শুল্ক ব্যবহার করেছে মূলত দুটি কারণে—দেশীয় শিল্পকে বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা দিতে এবং সরকারের রাজস্ব বাড়াতে।
কোনো শিল্প যখন প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে, তখন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সামনে তাকে সরাসরি ছেড়ে দিলে সেই শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে নবীন শিল্পকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সুরক্ষা দেওয়ার যুক্তি অর্থনীতিতে স্বীকৃত। একইভাবে বিলাসপণ্য বা নির্দিষ্ট ভোগ্যপণ্যে শুল্ক আরোপ রাজস্ব সংগ্রহের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে।
ভারতও একসময় এ ধরনের নীতির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল ছিল। ১৯৮০-এর দশকে দেশটির শুল্কহার তুলনামূলকভাবে উঁচু ছিল। কিন্তু ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক সংস্কারের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করা উরুগুয়ে রাউন্ডের আলোচনার সময়ও ভারত শুল্ক কমানোর দিকে এগিয়ে যায়। পরবর্তী সময়েও সামগ্রিক প্রবণতা ছিল ধীরে ধীরে শুল্ক কমিয়ে আনা।
![]()
শুল্কের হিসাবেই লুকিয়ে আছে বড় পার্থক্য
ভারতকে উচ্চ শুল্কের দেশ হিসেবে চিহ্নিত করার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় প্রায়ই বাদ পড়ে যায়। শুল্ক পরিমাপের অন্তত দুটি প্রচলিত পদ্ধতি রয়েছে।
একটি হলো সরল গড় শুল্কহার। এতে প্রতিটি পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ককে সমান গুরুত্ব দিয়ে গড় করা হয়। অন্যটি হলো বাণিজ্য-ওজনযুক্ত শুল্কহার। এতে বাস্তবে যে পণ্য যত বেশি আমদানি হয়, তার বাণিজ্যিক গুরুত্ব অনুযায়ী শুল্কের প্রভাব হিসাব করা হয়।
সরল গড় হিসাবে ভারতের শুল্কহার প্রায় ১৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। সংখ্যাটি নিঃসন্দেহে বেশি বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ভারতের প্রকৃত আমদানি প্রবাহের ওপর কার্যকর শুল্কের চিত্র অনেক আলাদা। বাণিজ্য-ওজনযুক্ত হিসাবে ভারতের শুল্কহার প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
এখানেই ‘ট্যারিফ কিং’ ধারণাটির বড় দুর্বলতা। সব পণ্যকে সমান ওজন দিয়ে হিসাব করলে এমন পণ্যের উচ্চ শুল্কও সামগ্রিক গড় বাড়িয়ে দেয়, যেগুলোর আমদানি খুবই কম। অথচ বাস্তবে বড় পরিমাণে আমদানি হওয়া পণ্যের ক্ষেত্রে কার্যকর শুল্কের হার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষি খাতকে আলাদা করে দেখতে হবে
ভারতের শুল্ক কাঠামোতে কিছু খাত অবশ্যই ব্যতিক্রম। কৃষি ও গাড়ি শিল্পে দেশটি তুলনামূলকভাবে বেশি শুল্ক বজায় রাখে। কিন্তু এর পেছনে শুধু বাণিজ্যিক হিসাব নেই; রয়েছে বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও কর্মসংস্থানের প্রশ্ন।
ভারতের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। দেশটির কৃষি এখনো অনেকাংশে ছোট জমি, সীমিত যান্ত্রিকীকরণ এবং জীবিকানির্ভর উৎপাদনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ফলে কৃষিপণ্যের বাজার দ্রুত ও সম্পূর্ণভাবে আমদানির জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া কেবল বাণিজ্যনীতির সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে গ্রামীণ জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত।
এই কারণেই ভারত মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য, ফল ও শস্যের মতো কৃষিপণ্যে গড়ে প্রায় ৩৩ শতাংশ শুল্ক বজায় রাখে। কিন্তু আন্তর্জাতিক তুলনায় এই হারকে এককভাবে অস্বাভাবিক বলা কঠিন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে দুগ্ধজাত পণ্যে গড় শুল্ক প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং কিছু ক্ষেত্রে তা ২০৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে। ফল ও সবজির ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ হার ২৬১ শতাংশ পর্যন্ত যেতে পারে। জাপানে দুগ্ধজাত পণ্যে গড় হার প্রায় ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং কিছু পণ্যে তা ২৯৮ শতাংশ পর্যন্ত। দক্ষিণ কোরিয়ায় কৃষিপণ্যে গড় শুল্ক প্রায় ৫৪ শতাংশ; নির্দিষ্ট সবজি ও ফলে হার আরও অনেক বেশি।
অর্থাৎ কৃষিতে সুরক্ষামূলক শুল্ক শুধু ভারতের নীতি নয়। উন্নত ও উন্নয়নশীল—উভয় ধরনের অর্থনীতিই নিজস্ব কৃষি খাতকে নানা মাত্রায় সুরক্ষা দেয়।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনাও গুরুত্বপূর্ণ
ভারতের সরল গড় শুল্কহার ১৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ হলেও উন্নয়নশীল অর্থনীতির তুলনায় এটিকে বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা যায় না। বাংলাদেশে এই হার প্রায় ১৪ দশমিক ১ শতাংশ, আর্জেন্টিনায় ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং তুরস্কে ১৬ দশমিক ২ শতাংশ।
অর্থাৎ শুধু সরল গড় শুল্কহারের ভিত্তিতে ভারতের বাণিজ্যনীতিকে অসাধারণভাবে সুরক্ষাবাদী বলে চিহ্নিত করলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হয় না।
প্রযুক্তি খাতের চিত্র আরও ভিন্ন
যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানিকারকদের জন্য ভারতের বাজারে উচ্চ শুল্ক একটি বাধা—এমন অভিযোগও রয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক পণ্যের ক্ষেত্রে তথ্যটি আরও সূক্ষ্ম।
ভারতে অধিকাংশ তথ্যপ্রযুক্তি হার্ডওয়্যার, সেমিকন্ডাক্টর, কম্পিউটার এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশে শুল্ক শূন্য। ইলেকট্রনিক পণ্যে গড় শুল্ক প্রায় ১০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং কম্পিউটিং যন্ত্রপাতিতে প্রায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।
আঞ্চলিক কয়েকটি দেশের সঙ্গে তুলনা করলে ভারতের অবস্থান আরও পরিষ্কার হয়। ভিয়েতনামে ইলেকট্রনিক সরঞ্জামে শুল্ক প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে নির্দিষ্ট পণ্যে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত যেতে পারে। চীনে ইলেকট্রনিক পণ্যে হার প্রায় ৫ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ এবং কম্পিউটিং যন্ত্রপাতিতে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত। ইন্দোনেশিয়ায় ইলেকট্রনিক সরঞ্জামে হার প্রায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ এবং কম্পিউটিং যন্ত্রপাতিতে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
অতএব ভারতের কিছু খাতে উচ্চ শুল্ক আছে—এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। কৃষি, দুগ্ধ ও গাড়ি শিল্পে দেশীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান রক্ষার নীতিগত লক্ষ্যও স্পষ্ট। কিন্তু এসব খাতের উচ্চ শুল্ককে পুরো ভারতীয় বাণিজ্যব্যবস্থার প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে দেখলে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
মূল বিষয় হলো, শুল্কের হার শুধু কত বেশি তা দিয়ে একটি দেশের বাণিজ্যনীতি বিচার করা যায় না। কোন পণ্যে শুল্ক বেশি, সেই পণ্যের আমদানির পরিমাণ কত, বাস্তবে আমদানিতে কার্যকর শুল্ক কত এবং একই ধরনের দেশগুলো কী করছে—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
ভারতের ক্ষেত্রে বাণিজ্য-ওজনযুক্ত শুল্কহার প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে ১৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ সরল গড়কে সামনে রেখে ভারতকে ‘ট্যারিফ কিং’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলে দেশটির প্রকৃত আমদানি কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ আড়ালে থেকে যায়।
ভারতের শুল্কনীতি নিয়ে বিতর্ক তাই একটি সরল প্রশ্নে সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত নয়—শুল্ক বেশি না কম। বরং দেখতে হবে, কোথায় এবং কেন ভারত সুরক্ষা দিচ্ছে, সেই সুরক্ষার অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্য কী এবং বাস্তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তার সামগ্রিক প্রভাব কতটা।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতের শুল্কনীতিকে বিচার করলে ‘ট্যারিফ কিং’ তকমাটি অন্তত পুরো বাস্তবতাকে ধারণ করে না।
মূল লেখক: ড. মোহন কুমার, সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত এবং ওপি জিন্দাল গ্লোবাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদেজা মোতওয়ানি ইনস্টিটিউট ফর আমেরিকান স্টাডিজের মহাপরিচালক।
ড. মোহন কুমার 


















