যুক্তরাষ্ট্র থেকে পানামায় নির্বাসিত হওয়ার পর ইরানি খ্রিষ্টান তরুণ আরসালান সালেহ ফার্দের জীবন আটকে গেছে অনিশ্চয়তার মধ্যে। বৈধভাবে কাজের সুযোগ নেই, স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতিও নেই। ভাষা না জানায় দৈনন্দিন জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অভিবাসন নীতির আওতায় নিজ দেশের বদলে তৃতীয় দেশে পাঠানো শত শত অভিবাসীর পরিস্থিতির একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে তার জীবন।
পানামায় ঠাঁই, কিন্তু ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
২৫ বছর বয়সী সালেহ ফার্দ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পানামায় পাঠানো ২৯৯ অভিবাসীর একজন। তাদের কারও সঙ্গেই এর আগে পানামার কোনো সম্পর্ক ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নীতির আওতায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে করা চুক্তির মাধ্যমে নিজ দেশে ফেরত না পাঠিয়ে অভিবাসীদের তৃতীয় দেশে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সালেহ ফার্দকে পানামা সাময়িক মানবিক অনুমতি দিলেও এতে বৈধভাবে কাজ করার সুযোগ বা স্থায়ীভাবে থাকার কোনো পথ ছিল না। ফলে তিনি ভাড়া ও ইনসুলিনের খরচ জোগাতে একটি নাপিতের দোকানে অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেন। মাসে প্রায় ২০০ ডলার আয় করতেন। সরকারি পরিদর্শক এলে কখনো কখনো তাকে ক্রেতা সেজে থাকতে হতো।
ভাষার বাধাও তার দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। পানামায় আসার সময় তিনি স্প্যানিশ জানতেন না। ফোনের অনুবাদ অ্যাপ ব্যবহার করেই অধিকাংশ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়েছে।
ইরানে ফেরার পথও বন্ধ
ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কাজভিন প্রদেশে বেড়ে ওঠা সালেহ ফার্দ ২০২২ সালের বিক্ষোভের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের স্লোগান ও প্রতিরোধের গল্প ছড়িয়ে দেন। একই সময়ে তিনি গোপনে খ্রিষ্টানদের প্রার্থনাসভায় অংশ নিতে শুরু করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরে তিনি সরকারি নজরদারির মধ্যে পড়েন এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখোমুখি হন। ইসলাম থেকে খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরের কারণে ইরানে ফিরে গেলে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে বলেও তিনি জানান। এ কারণে পানামা থেকে নিজ দেশে ফেরাও তার জন্য নিরাপদ বিকল্প ছিল না।
তৃতীয় দেশে পাঠানোর নতুন নীতি
২০২৫ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও পানামার মধ্যে হওয়া চুক্তির আওতায় অভিবাসীদের পানামায় পাঠানো শুরু হয়। এর আগে করা ১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের একটি চুক্তি ছিল পানামা হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে অভিবাসন ঠেকানোর জন্য। পরে সেটিই যুক্তরাষ্ট্র থেকে তৃতীয় দেশে নির্বাসনের বড় একটি কাঠামোতে পরিণত হয়।
পানামায় পাঠানো ২৯৯ জনের কেউ অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন না বলে দেশটির কর্মকর্তারা জানান। তাদের অনেকে হোটেল, পরে দারিয়েন গ্যাপের একটি শিবিরে স্থানান্তরিত হন। অভিবাসীদের অভিযোগ ছিল, তারা চিকিৎসক ও আইনজীবীদের কাছে সহজে পৌঁছাতে পারেননি এবং কখনো তাদের ফোনও জব্দ করা হয়েছিল।
তাদের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জাতিসংঘের সহায়তায় নিজ দেশে ফিরে যেতে সম্মত হন। তবে ১১২ জনকে আন্তর্জাতিক আইনের কারণে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি, কারণ তারা নিজ দেশে নির্যাতন, নির্যাতনের আশঙ্কা বা মৃত্যুর ঝুঁকির কথা জানিয়েছিলেন।
সাময়িক অনুমতিতে স্থায়ী অনিশ্চয়তা
পানামা পরে অবশিষ্ট অভিবাসীদের জন্য সাময়িক মানবিক অনুমতি দেয়। কিন্তু সেই অনুমতিতে কাজের অধিকার বা স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ ছিল না। কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানো হলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো স্থায়ী সমাধান তৈরি হয়নি।
মানবাধিকার আইনজীবীদের মতে, স্প্যানিশ না জানা এবং পানামার সীমিত আশ্রয়ব্যবস্থার কারণে অনেকেই প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। পানামায় আশ্রয়ের আবেদন করার সুযোগ থাকলেও তা স্প্যানিশ ভাষায় করতে হয় এবং নির্বাসিতদের অনেককে এ বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।
শেষ পর্যন্ত সালেহ ফার্দও সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। পানামায় থেকে গেলে বৈধ অবস্থান হারানোর ঝুঁকি, আর চলে গেলে নতুন করে অনিশ্চিত যাত্রা। নিজের সঞ্চয়, পরিবারের সহায়তা ও এক বন্ধুর দেওয়া অর্থ নিয়ে ২০২৬ সালের জুনের শেষ দিকে তিনি আবার যাত্রা শুরু করেন। এবার তার গন্তব্য মেক্সিকো।
এই ঘটনা দেখাচ্ছে, নিজ দেশে ফেরত না পাঠিয়ে তৃতীয় দেশে সরিয়ে দেওয়ার নীতি অভিবাসীদের জন্য নতুন এক অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। সালেহ ফার্দের মতো অনেকের জন্য তৃতীয় দেশ হয়ে উঠছে নিরাপদ আশ্রয় নয়, বরং দীর্ঘ অপেক্ষা, কাজের অধিকারহীনতা এবং ভবিষ্যৎহীন জীবনের আরেক অধ্যায়।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে তৃতীয় দেশে নির্বাসনের নীতিতে পানামায় পাঠানো এক ইরানি খ্রিষ্টান তরুণের অনিশ্চিত জীবন, কাজের অধিকারহীনতা ও ভবিষ্যৎহীনতার গল্প উঠে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















