পাকিস্তান সরকারের প্রস্তাবিত পেট্রোল ভর্তুকি কর্মসূচি নিয়ে অর্থের পরিমাণ, উপকারভোগী নির্বাচন, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারের জবাবদিহি—সবকিছু ঘিরেই প্রশ্ন উঠছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি লিটার পেট্রোলে ১০০ রুপি ছাড় দেওয়া হবে। মোটরসাইকেল, দুই ও তিন চাকার যানবাহনের জন্য সপ্তাহে পাঁচ লিটার এবং ৮০০ সিসি পর্যন্ত গাড়ির জন্য প্রতি ১০ দিনে ১০ লিটার বা মাসে ৩০ লিটার পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
নিবন্ধিত মোবাইল সিম, জাতীয় পরিচয়পত্র ও যানবাহনের তথ্যের ভিত্তিতে নিবন্ধন হবে। পেট্রোল কেনার আগে নির্ধারিত নম্বরে বার্তা পাঠিয়ে টোকেন নিতে হবে এবং পেট্রোল পাম্পে তা দেখিয়ে ভর্তুকি পাওয়া যাবে। অর্থনৈতিক সমন্বয় কমিটি প্রাথমিকভাবে ৭৫ বিলিয়ন রুপি অনুমোদন করেছে। তবে পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী জানিয়েছেন, মাসে এ কর্মসূচির ব্যয় হতে পারে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন রুপি।
দারিদ্র্য নির্ধারণে বড় প্রশ্ন
কর্মসূচিটির অন্যতম বড় প্রশ্ন হলো—কারা প্রকৃতপক্ষে নিম্নআয়ের মানুষ, তা নির্ধারণের পদ্ধতি কী? নিবন্ধন ব্যবস্থায় জাতীয় পরিচয়পত্র, সিম ও গাড়ির তথ্য যাচাইয়ের কথা থাকলেও আয়সীমা, দারিদ্র্য স্কোর, বেতন, কর-তথ্য, সম্পদ বা সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে কোনো সুস্পষ্ট যাচাইয়ের কথা প্রকাশ্যে নেই।
শুধু ৮০০ সিসি গাড়ির মালিক হওয়া একজন ব্যক্তির আর্থিক দুরবস্থার প্রমাণ নয়। বিপরীতে গাড়ি নেই—এমন দরিদ্র পরিবার এই সুবিধা থেকে পুরোপুরি বাদ পড়ে যেতে পারে। ফলে দারিদ্র্য নির্ধারণে ইঞ্জিনের ক্ষমতাকে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা কতটা কার্যকর, সেটিই প্রশ্নের বিষয়।

প্রযুক্তি থাকলেই কমবে না অনিয়ম
ডিজিটাল টোকেন ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত সেবা দেওয়া সম্ভব হলেও এতে অপব্যবহারের ঝুঁকিও রয়েছে। টোকেন ছবি তুলে, অন্যের কাছে পাঠিয়ে বা ভাগাভাগি করে ব্যবহার করা হলে সরকারি অর্থের অপচয় হতে পারে। পেট্রোল পাম্পে উপকারভোগী, নির্ধারিত যানবাহন এবং প্রকৃত লেনদেন তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই না হলে এই ঝুঁকি আরও বাড়বে।
ডিজিটাল রেকর্ডে ১০ লিটার পেট্রোল বিক্রির তথ্য থাকলেই বাস্তবে সেই পরিমাণ জ্বালানি গাড়িতে দেওয়া হয়েছে—এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। তাই পাম্পের মেশিনের তথ্য, বিক্রয়কেন্দ্রের হিসাব, জ্বালানি মজুত, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য এবং চালান মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন হবে।
ভর্তুকির আর্থিক বোঝা কতটা
কর্মসূচিটির আরেকটি বড় প্রশ্ন এর সম্ভাব্য ব্যয়। মাসে ২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন রুপি ব্যয় হলে ১০ মাসে তা প্রায় ৩০০ বিলিয়ন রুপিতে পৌঁছাতে পারে। এই অর্থ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কেন্দ্রীয় উন্নয়ন কর্মসূচির প্রায় ৩০ শতাংশের সমান।
প্রাথমিকভাবে অনুমোদিত ৭৫ বিলিয়ন রুপি ওই হারে ব্যয় হলে মাত্র আড়াই থেকে তিন মাসের মতো চলবে। এরপর কর্মসূচি বন্ধ হবে, নাকি আরও ২০০ থেকে ২২৫ বিলিয়ন রুপি প্রয়োজন হবে—সরকারের কাছে এর স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।
এখানে সংসদীয় নজরদারির প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত বরাদ্দের ৭৫ বিলিয়ন রুপি কোন খাত থেকে সমন্বয় করা হয়েছে, তা প্রকাশ করা প্রয়োজন। উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা অবকাঠামোর অর্থ স্থানান্তর করা হলে সে তথ্য সংসদ ও জনসাধারণের সামনে থাকা উচিত।
বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ে অস্পষ্টতা

কর্মসূচিতে মোটরসাইকেল, রিকশা ও কিউংকির মতো যানবাহনের কথা বলা হলেও একই সঙ্গে অ-বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীদের জন্য সীমাবদ্ধতার কথা রয়েছে। ফলে পেশাদার রিকশাচালক, পণ্য পরিবহনে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী দোকানি বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সুবিধা পাবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
পেট্রোলের দাম কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দেওয়ার আরেকটি প্রভাবও রয়েছে। পাকিস্তান আমদানি করা পেট্রোলের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল ও বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে পেট্রোলভিত্তিক ভর্তুকি সেই নীতিগত লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
আইন, তথ্য সুরক্ষা ও অভিযোগ নিষ্পত্তি
জাতীয় পরিচয়পত্র, সিম, যানবাহনের নিবন্ধন এবং জ্বালানি কেনার তথ্য একত্রে ব্যবহারের কারণে তথ্যের প্রবেশাধিকার, সংরক্ষণ, সংশোধন ও অপব্যবহার ঠেকাতে স্পষ্ট বিধি প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো নাগরিক ভুলভাবে সুবিধাবঞ্চিত হলে তার অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
কাউকে কালো তালিকাভুক্ত করা, পরিচয়পত্রের সুবিধা বন্ধ করা কিংবা কোনো পেট্রোল পাম্পের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত শুধু সফটওয়্যারের স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। এসব ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া এবং মানবিক পর্যালোচনার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত মূল প্রশ্নটি হলো—যদি প্রায় ৩০০ বিলিয়ন রুপি পেট্রোল ভর্তুকিতে ব্যয় করা সম্ভব হয়, তাহলে সেই অর্থ আরও লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা, স্বাস্থ্য, গণপরিবহন, উন্নয়ন ব্যয় কিংবা সরকারি ঋণ কমানোর কাজে ব্যবহার করা হবে কি না। পাকিস্তানের বিদ্যমান দারিদ্র্য নির্ধারণব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কেন গাড়ির ইঞ্জিনের ক্ষমতাকে সহায়তার প্রধান মানদণ্ড করা হচ্ছে, সেটিই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
লেখক একজন ব্যারিস্টার।
আলী তাহির 


















