আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা দখল করার পরে সেখানে নারীদের শিক্ষা থেকে শুরু করে মোবাইল ব্যবহার, একা চলাচল সবই নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
যার ফলে আফগানিস্তান নামক রাষ্ট্রটিতে- রাষ্ট্রে ও সমাজে নারীরা মূলত অনুপস্থিত। রাষ্ট্র নিয়ে মতামত প্রকাশ ও স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার যেখানে একটি বিশেষ শ্রেণির, লিঙ্গের, বর্ণের বা মতাদর্শের থাকে না সেখানে তাদেরকে রাষ্ট্র বা সমাজ থেকে এক ধরনের অদৃশ্যই বলা চলে।
আফগানিস্তানে নারীদের পাশাপাশি আরও একটি শ্রেণি এ মুহূর্তে অদৃশ্য। তারা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, আধুনিক ও আফগানিস্তানের ঐতিহ্যগত কালচারে বিশ্বাসী আভিজাত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি।
আফগান আধুনিক বাদশাহ আমানুল্লাহকে হটিয়ে বাচ্চা সাকাওর নেতৃত্বে একটি দুর্বৃত্ত অস্ত্রধারী গোষ্ঠী ক্ষমতা নেওয়া, তার পরে সোভিয়েত আগ্রাসন, আমেরিকান আগ্রাসন ও তার সঙ্গে সঙ্গে তালেবানদের উত্থানের ফলে আফগানিস্তানের এই আভিজাত ও কালচারাল শ্রেণি বর্তমান পৃথিবীর অনেকের কাছেই অজানা। এই শ্রেণির অনেকেই প্রতিটি বিপর্যয়ে দেশ ছেড়েছেন, তারপরেও তাদের একটি বড় অংশ সেখানে আছেন। কিন্তু বাস্তবে তারা এ মুহূর্তে রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে অদৃশ্য।
আফগানিস্তানের এই বাস্তবতায়, বাণিজ্যের কারণে হোক, সম্পদের কারণে হোক, আর চলাচল সহ নানান স্ট্রাটেজিক কারণে পৃথিবীর অনেক দেশই আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রেখে চলছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও সেখানে যতদূর পারে কাজ করার চেষ্টা করছে।
কিন্তু বেশিরভাগই কাজ করছে এই অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠীকে অস্বীকার করে। এমনকি ইউরোপীয় মানবাধিকার গোষ্ঠীর কণ্ঠেও কিন্তু আফগানিস্তানের এই অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীকে যে রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে এক ধরনের অদৃশ্য করা হয়েছে তা নিয়ে খুব বেশি কিছু বলতে শোনা যায় না।

এক সময়ে ইউরোপীয় দেশগুলো ছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও– একটি রাষ্ট্রে এভাবে সমগ্র নারী সমাজসহ দেশের ঐতিহ্যে বিশ্বাসী কালচারাল শ্রেণির ওপর এ ধরনের রাষ্ট্রীয় আচরণ নেমে এলে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে বা নিজ নিজ আইনসভা বা পার্লামেন্টে কথা বলতে শোনা যেতো। এমনকি আশির দশক অবধি আফগানিস্তানের প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক ভারতেও রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং সেখানকার সারস্বত সমাজকে বিশ্বের এ ধরনের অন্যায় নিয়ে প্রতিবাদ করতে দেখা যেতো। আজকের পৃথিবীর বাস্তবতা ভিন্ন।
রবীন্দ্রনাথ ভারতে ব্রিটিশ বেনিয়াদের রাষ্ট্র দখল করা নিয়ে বলেছিলেন, “বণিকের মানদণ্ড দেখা দিল রাজদণ্ড রূপে”। অর্থাত্ রাজা তার রাজন্যের চরিত্র হারালেন, গ্রহণ করলেন বৈশ্যের চরিত্র। এখন সমগ্র পৃথিবীতেই রাজন্য জনগণের নামে বৈশ্যের চরিত্র গ্রহণ করেছে। যেমন যুদ্ধ করছে আমেরিকা ও ইরান। অথচ আরামকো, বিপি, শেল, ইকুইনর, শেভরণ, টোটাল এনার্জি, ইনি, এক্সনমোবিল এই আটটি তেল ও গ্যাস কোম্পানি এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে তাদের গত বছরের লাভের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ লাভ করেছে। এই আটটি কোম্পানির লাভের পরিমাণ প্রায় ৯৩ বিলিয়ন ডলার।
তাই এই যুদ্ধ মূলত কোন দেশের বিরুদ্ধে কোন দেশের নয়। বাস্তবে তেল কোম্পানির লাভ হবে কোন পথে তারই একটি পথ মাত্র। যাকে আরও সহজে বলা যেতে পারে, ব্যবসার একটি কৌশল বা বণিকের সম্পদ দখল বা শোষণের পথ।
তাই পৃথিবী যখন এ পথে চলছে এই বাস্তবতায় পিপল টু পিপল কূটনীতি বা জনগণের সঙ্গে কোন দেশের সম্পর্ক এই ধারণার বাস্তবতা চিন্তা করা ভুল।

এ কারণে বাংলাদেশেও এ মুহূর্তে প্রত্যেকটি দেশের সঙ্গে যে সম্পর্ক হবে বা চলমান থাকবে তাকেও সরকারের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক ধরতে হবে।
কারণ, বাংলাদেশে যে নির্বাচনের ভেতর দিয়ে সরকার গঠিত হয়েছে ওই নির্বাচনে প্রকৃত অর্থে ১০ থেকে ১২ ভাগের বেশি মানুষ ভোট দেয়নি। সাবেক বিরোধী দলীয় নেতা জি এম কাদের ভোট কেন্দ্র ও সময়ের বিশ্লেষণের মাধ্যমে সে তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করেছেন। তাই ২০২৪ এর নির্বাচনের থেকে বাংলাদেশের ২০২৬ এর নির্বাচনকে ভালো বা জনপ্রতিনিধিত্বশীল বলার কোন সুযোগ নেই। তার ওপরে ২০২৪ কোন রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ছিলো না। এবার প্রায় অর্ধেক মানুষ পছন্দ করে এমন রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন থেকে নির্বাহী আদেশে দূরে রাখা হয়েছিলো। এখনও তাদের কোন রাজনৈতিক অধিকার নেই। এর অর্থ এই রাজনৈতিক মতে বিশ্বাসী মানুষগুলো রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে আফগানিস্তানের নারীদের মতই অদৃশ্য।
এর বাইরেও একটি কালচারাল জনগোষ্ঠী আছে, যারা আবহমান বাংলা ও বাঙালি ও তার আধুনিক রূপের স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথের চিন্তা চেতনাকে ধারণ করে, তাদের অনেকের পিতা– কবি, সাহিত্যিক বা বুদ্ধিজীবী হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে বিবৃতিও দেয়নি ও আন্দোলনও করেনি। আর রবীন্দ্রনাথকে ধারণ না করলে প্রকৃত নজরুলকে ধারণ করা যায় না। তাই রবীন্দ্র-নজরুল বিরোধীর বাইরে এদেশের একটি বড় কালচারাল সমাজ আছে- তারা আজকের বাস্তবতায় আফগানিস্তানের ওই কালচারাল শ্রেণির মতোই অনেকটা অদৃশ্য। আর তারা কতখানি অদৃশ্য তা বোঝা যায় এই বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার জন্য যার হিমালয়তুল্য নেতৃত্বে এই দেশ সৃষ্টি হয়েছিলো সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিহত হবার দিনে, তাঁর স্মৃতি বিজড়িত “ভাঙ্গা” বাড়িতে ফুল দিতে গিয়ে দুজন তরুণী গ্রেফতার হয়েছেন। আর বাদবাকি যারা শ্রদ্ধা জানাতে চায় তারা ওই আফগান নারীদের মতোই সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে অদৃশ্য।

বর্তমান পৃথিবীতে বৈশ্য স্বার্থে এ কোন নতুন ঘটনা নয়। তবে এ বাস্তবতা মানতে হবে অর্ধেকের বেশি মানুষ যেখানে অদৃশ্য সেখানে “পিপল টু পিপল” কূটনীতি এক ধরনের পরিহাস মাত্র। আফগানিস্তানে পাহাড়ের গায়ে একটি পাহাড়ি ছাগল ও একটি কিশোরীর মধ্যে বাস্তবে কোন পার্থক্য নেই।
তারপরও আফগানিস্তানের কিশোরী থেকে বাংলাদেশের ৩২ নম্বরের সামনে গ্রেফতার হওয়া কিশোরী আর ইরানে, ফিলিস্তিনের রক্তাক্ত কিশোরীসহ সকল অদৃশ্য মানুষের জন্যেই উচ্চারণ করে গেছেন রবীন্দ্রনাথ-
“শুধু এইটুকু জানি, তারি লাগি রাত্রি- অন্ধকারে
চলেছে মানবযাত্রী যুগ হতে যুগান্তর পানে
ঝড়ঝঞ্ঝা- বজ্রপাতে জ্বালায়ে ধরিয়া সাবধানে
অন্তর প্রদীপখানি”।
মানবযাত্রীর এই মুক্তির পথে চলা যুগ-যুগান্তর ধরেই। এখানে অন্তরের প্রদীপের আলো কেউ কখনো নেভাতে পারেনি।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।
স্বদেশ রায় 



















