জাপানের কুমামোতো শহরে শক্তিশালী ভূমিকম্পের ধাক্কা কাটিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরতে শুরু করেছে। মঙ্গলবার আঘাত হানা ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পের তিন দিন পর শুক্রবার থেকে গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ, বিমান চলাচল ও মহাসড়কের কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়েছে। তবে এখনো উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে এবং মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৩৫ জনে।
বড় পরিবহন ব্যবস্থায় ফিরছে গতি
ভূমিকম্পের পর বন্ধ হয়ে যাওয়া কিউশু শিনকানসেন দ্রুতগতির রেলসেবা শুক্রবার সকালে কুমামোতো থেকে ফুকুওকার হাকাতা পর্যন্ত আবার চালু হয়েছে। একই সঙ্গে কুমামোতো অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ ও কিছু আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
ভূমিকম্পের কারণে কুমামোতো ও ফুকুওকার মধ্যকার বেশ কিছু মহাসড়ক বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরে সেগুলোর বড় অংশ আবার খুলে দেওয়া হয়। শহরের উত্তরমুখী সড়ক ও রেল যোগাযোগ পুনরায় চালু হলেও দক্ষিণ দিকে কাগোশিমা অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ক্ষতি
কুমামোতো প্রদেশের ইয়াতসুশিরো এলাকায় তিনটি মহাসড়ক সেতু ধসে পড়েছে। এ কারণে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ পুনরুদ্ধারে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে কিউশু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
কুমামোতো ও কাগোশিমা-চুও স্টেশনের মধ্যকার শিনকানসেন সেবা পুনরায় চালু করতে উল্লেখযোগ্য সময় প্রয়োজন হবে বলে জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কিছু এলাকায় সীমিত থাকলেও অবকাঠামো পুনর্গঠনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
কারখানায় ফিরছে উৎপাদন
ভূমিকম্পের পর ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প খাতেও ধীরে ধীরে কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রেনেসাস ইলেকট্রনিকস তাদের দুটি কারখানার একটি বুধবার রাতেই চালু করেছে। অন্য কারখানাটি আগামী বুধবার পুনরায় চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি জানিয়েছে, কুমামোতো এলাকার তাদের কারখানা নিরাপদ রয়েছে। তবে উৎপাদন ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে কিছু প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের প্রয়োজন হচ্ছে।
উদ্ধার অভিযানে শেষ হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সময়
ভূমিকম্পের পর উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা শুক্রবার সন্ধ্যায় শেষ হওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যেই উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষদের খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
জাপানের মন্ত্রিপরিষদ সচিব মিনোরু কিহারা বলেন, প্রথম ৭২ ঘণ্টাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে উদ্ধার তৎপরতা চালানো হয়েছে এবং সাহায্যের আবেদন করা সব মানুষের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে কুমা শহরের একটি কারখানায় কর্মরত ভিয়েতনামের এক কারিগরি প্রশিক্ষণার্থীও রয়েছেন। তিনি একটি ধসে পড়া ক্রেনের নিচে আটকা পড়ে মারা যান বলে জানিয়েছে টোকিওর ভিয়েতনাম দূতাবাস।

বিদ্যুৎ ফিরলেও পানি ও গ্যাস সংকট রয়ে গেছে
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানি ও জরুরি পরিষেবাগুলোও ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হচ্ছে। কিউশু ইলেকট্রিক জানিয়েছে, বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় চালু করা হয়েছে।
তবে এখনো প্রায় ৯ হাজার পরিবার গ্যাস সংকটে রয়েছে এবং প্রায় ৭৯ হাজার পরিবার পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। কুমামোতো প্রাদেশিক সরকার জানিয়েছে, এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ৫০৭টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৭৯টি বাড়ি সম্পূর্ণ ধসে গেছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াচ্ছে মানুষ
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় কুমামোতো প্রাদেশিক সরকার ও বিভিন্ন সংগঠন অনুদান সংগ্রহ শুরু করেছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে।
টোকিওর গিনজা এলাকায় কুমামোতো অঞ্চলের পণ্য বিক্রির বিশেষ দোকানে মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। স্থানীয় পণ্য কিনে তারা ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশটির অর্থনীতিকে সহায়তা করার চেষ্টা করছেন।
অতীতের বড় ভূমিকম্পের তুলনায় ক্ষতি কিছুটা সীমিত
জাপানের ইতিহাসে ২০১১ সালের তোহোকু ভূমিকম্প ও সুনামি, ২০১৬ সালের কুমামোতো ভূমিকম্প এবং ২০২৪ সালের নোটো উপদ্বীপের ভূমিকম্প—সবকটিই সর্বোচ্চ মাত্রার কম্পন হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি সৃষ্টি করেছিল।
এবারের ভূমিকম্পও একই মাত্রার হলেও প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, আগের কয়েকটি বড় দুর্যোগের তুলনায় ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা সীমিত রয়েছে। তবে পুনর্গঠন ও স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনতে কুমামোতোবাসীকে এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
কুমামোতো ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও মানুষের সহায়তা, দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম এবং অবকাঠামো পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা নতুন আশার বার্তা দিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















