৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এরশাদের জারি করা কারফিউ ভেঙে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শামসুন্নাহার ও রোকেয়া হলের ছাত্রীদের সামনে রেখে বিশাল মিছিল বের হয়ে আসার পরে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা ছাত্রনেতারা স্যালাইনের সূচ খুলে এসে দৌঁড়ে যোগ দেন ওই মিছিলে। যার পরে এরশাদের পদত্যাগ ছিল শুধু সময়ের বিষয়।
ওই ছাত্রমিছিল বের হওয়ার আগে রিপোর্টার হিসেবে খবর পেয়েছিলাম, খুব ভোরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে যাওয়া খুব প্রয়োজন। গিয়েছিলামও। সেখানে পৌঁছে দেখি তৎকালীন আওয়ামী লীগের জয়েন্ট সেক্রেটারি, পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি আব্দুল জলিল অত্যন্ত ব্যস্ত। এবং ৩২ নম্বরে শেখ হাসিনা হাউস অ্যারেস্ট থাকলেও পুলিশের নজরদারি শিথিল হয়ে গেছে।
![]()
যাহোক, আব্দুল জলিল কয়েকজনকে নির্দেশ দিলেন। তারা রিকশা ও মোটরসাইকেল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ছুটে গেলেন। পরবর্তীতে আব্দুল জলিলের কাছে শুনেছি, ওই দিন সকালেই সেনাপ্রধান জেনারেল নুরুদ্দিন শেখ হাসিনাকে ফোন করেন। এর আগে শেখ হাসিনার সঙ্গে তার ফোনালাপ হয়েছিল কি না, সেটা তিনি জানতেন না। ওই সময়ে আব্দুল জলিল শেখ হাসিনার পাশে ছিলেন এবং ফোন বাজতেই তিনি ফোন রিসিভ করে দেখেন, ওই প্রান্তে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল নুরুদ্দিন। তিনি ফোনের রিসিভার শেখ হাসিনার কাছে দেন। এবং তার সঙ্গে কথা বলেই শেখ হাসিনা আব্দুল জলিলকে নির্দেশ দেন তৎক্ষণাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংবাদ পাঠাতে যেন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এখনই কারফিউ ভেঙে মিছিল বের করে। সেনাবাহিনী কোনো বাধা দেবে না। নুরুদ্দিন সে ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এবং নুরুদ্দিনকে এরপর থেকে আর ওই ফোনে পাওয়া যাবে না।
এরপরের অংশ শুনেছি জেনারেল এরশাদের কাছে ২০১০-এর দিকে একটি পার্টিতে বসে গল্প করতে করতে। আমি তাঁকে জেনারেল নুরুদ্দিনের এই অংশ বলতেই তাঁর চোয়ালের মাংসপেশিতে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করি। এবং তিনি প্রথমে যে শব্দটি বলেন, তা ছিল, “ও একটা ট্রেইটর।” তারপরে ধীরে ধীরে তাকে শান্ত করে অনেক রাত অবধি নানান কথার ভেতর দিয়ে তার কাছ থেকে জানতে পারি—ওই দিন যখন কারফিউ ভেঙে মিছিল বের হয়েছে, সেনাবাহিনী কোনো বাধা দিচ্ছে না, সে সময়ে বারবার ফোন করেও নুরুদ্দিনের সবগুলো লাইন বা সেনাপ্রধানকে কনট্যাক্ট করার যতগুলো উপায় থাকে, কোনোটাতেই তিনি তাকে পাননি। এভাবে ডিটেইলস তিনি বলেন।
![]()
তারপরে তাকে জিজ্ঞেস করি, ৯৬-তে জেনারেল নুরুদ্দিন যখন আওয়ামী লীগের বিদ্যুৎমন্ত্রী, সে সময়ে মনে হয় প্রথমের দিকে একদিন সংসদে জেনারেল নুরুদ্দিন আপনার দিকে হাত এগিয়ে দিলে আপনি হাত মেলাননি। এবং কী যেন বলে দূরে সরে গিয়েছিলেন। তখন তিনি হেসে বলেন, আমি তার সঙ্গে হাত মেলাইনি। এবং তাকে বলেছিলাম, “তুমি ট্রেইটর”। তবে দেখ, বেঈমানি করে তুমি আজ ল্যাংড়া (একটি সড়ক দুর্ঘটনায় জেনারেল নুরুদ্দিনের পা ভেঙে যায়) আর আমি সুস্থ-সবল আছি। তাছাড়া তোমাকে বলে রাখি, তুমি আওয়ামী লীগেও বেশি দিন থাকতে পারবে না। জেনারেল নুরুদ্দিন অবশ্য পরে দেলোয়ার হোসেন সাঈদির খুব অনুরক্ত হয়ে যান এবং সাঈদির রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করেন।
প্রেসিডেন্ট এরশাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে দীর্ঘদিন মেশার সুযোগ হয়েছে। ব্যক্তিজীবনে তিনি অনেক বেশি আধুনিক ছিলেন। পারলৌকিকতায় তার খুব একটা বিশ্বাস ছিল বলে মনে হয় না। তার পড়াশোনার গভীরতাও ছিল। তারপরেও তিনি নুরুদ্দিনের ক্ষেত্রে কেন পারলৌকিকতায় বিশ্বাস করতেন, তা বলা সত্যিই কঠিন। যাহোক, সেটা তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। তিনি জেনারেল নুরুদ্দিনের ওই অবস্থাকে পাপের শাস্তি মনে করতেন।

আব্দুল জলিল ও জেনারেল এরশাদ ছাড়াও পরবর্তীতে এরশাদের পক্ষ ও বিরোধী—এ দুই পক্ষের প্রথম সারির মানুষদের কাছ থেকে নেপথ্যের পুরো চিত্রটাই খুঁজে পাই। যা নিয়ে হয়তো বই লেখা যায়। কিন্তু লিখে কী হবে? রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে হাজার হাজার বছর ধরেই এগুলো আছে।
যাহোক, এরশাদের পতনের পরে বছর দুয়েক এরশাদ পতনের দিন পালিত হয়েছিল। তারপরে ১৫-দলীয় জোট, ৭-দলীয় জোট, জামায়াতে ইসলামী—কেউই আর ওই দিন পালন করে না। বরং এরশাদ আওয়ামী লীগ জোটের সঙ্গেও রাজনীতি করেছেন, আবার জামায়াত-বিএনপি জোটের সঙ্গেও রাজনীতি করেছেন।
আজ ৫ আগস্ট জামায়াত-বিএনপি, এনসিপি, সিপিবি ও উদীচীসহ অনেকেই শেখ হাসিনার সরকারের পতনের দিন পালন করবে।
কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, এরশাদের পতনের দিন ৫ ডিসেম্বর ছিল না ৬ ডিসেম্বর ছিল, তা কি আজ আর এদেশের কোনো তরুণ জানে? এসব আন্দোলনের দিবসগুলোর এই পরিণতিই হয়।
তারপরেও এই ৫ আগস্ট ইতিহাসে থাকবে। আর সেটা থাকবে বাঙালি জাতির হৃদয়ের রক্তক্ষরণ ও মাথা নত হওয়ার ভেতর দিয়ে। কারণ, এ দিন বিকেল থেকেই এদেশের মানুষ দেখেছে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য কীভাবে ভাঙা হয়েছে। কীভাবে জাতির জনকের ভাস্কর্যের মাথার ওপর মূত্রত্যাগ করেছে মানুষের মতো আকৃতির কিছু জীব। এমনকি রাষ্ট্রীয় পোশাক পরেও দেশস্রষ্টার ভাস্কর্য ভেঙেছে। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়িতে আগুন দিয়ে সেখানে জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে মারা হয়। মুছে ফেলা হয় তার সকল স্মৃতিচিহ্ন। সব মিলিয়ে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এ তাকে হত্যা করলেও এভাবে কেউ অপমান করেনি।

যে মানুষটি একটি নদীপাড়ের কৃষিজীবী এই জনগোষ্ঠীকে প্রথম একটি আধুনিক রাষ্ট্র দেন, যাদের এর আগে কখনও কোনো রাষ্ট্র ছিল না। তাকে একবার সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে এই আগস্ট মাসে। আবার ২০২৪-এর আগস্টে তাকে করা হলো অনেক নিম্নবর্গীয় রুচির আচরণ দিয়ে অপমান।
অবশ্য এই অপমান করায় তাঁর কোনো ক্ষতি নেই। কারণ, ইতিহাস কখনই তাৎক্ষণিকভাবে লেখা হয় না। ইতিহাস লিখতে বালুকে জমে জমে পাথর হতে হয়। ওই পাথরের গায়ে সিজারকে যারা হত্যা করেছিল, তাদের নাম থাকে ষড়যন্ত্রকারী, হত্যাকারী হিসেবে, আর সিজারের অবস্থান থাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বীরদের সারিতে। তেমনি আলেকজান্ডারের যে সহযোগীরা তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, তাদের নামও মানুষ জানে না। অথচ ইতিহাসের পাথরে লেখা আছে—আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট।
তেমনি
“যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান
ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান”।

আর সে কীর্তি বাংলাদেশ নামক এই দেশটি। তাই তাঁকে অপমান করার অর্থই নিজের জন্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।
তারপরেও একজন বাঙালি হিসেবে, একজন পিতৃপরিচয়-সম্বলিত মানুষ হিসেবে, যে কারোরই জাতির জনকের, রাষ্ট্রস্রষ্টার স্মৃতি ধ্বংস ও অপমানের মুহূর্ত মনে এলেই এ প্রশ্ন মনে জাগবেই—কীভাবে জাতি এ পাপ থেকে মুক্ত হবে। এ পাপের পরেও হয়তো রাত্রির তপস্যায় দিন আসে—তবে বাঙালি জাতির কপালে চিরকালের জন্য ৫ আগস্ট ২০২৪ দিয়ে গেল এই অকৃতজ্ঞতার কলঙ্কের বোঝা।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ ও The Present World.
স্বদেশ রায় 



















