শিল্পবিপ্লবের পর দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীর অর্থনীতি, শিল্প ও প্রযুক্তি দ্রুত এগিয়েছে। কিন্তু এই অগ্রগতির সবচেয়ে বড় মূল্য কে দিচ্ছে—এই প্রশ্ন এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী দেশগুলোর সঙ্গে জলবায়ু বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকা এক নয়। এখানেই তৈরি হয়েছে জলবায়ু অবিচারের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা।
বার্ষিক কার্বন নিঃসরণে চীন বিশ্বের শীর্ষে, এরপর যুক্তরাষ্ট্র। ভারত, রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও বড় নির্গমনকারী। কিন্তু শিল্পবিপ্লবের সময় থেকে মোট নিঃসরণের হিসাব করলে শিল্পোন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অথচ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে এমন অনেক দেশ, যাদের বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে অবদান তুলনামূলকভাবে সামান্য।
নেপাল সেই বৈপরীত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। হিমালয়ের দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা বন্যা, হিমবাহ গলন, হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক প্লাবন এবং ভূমির নানা বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর দেশটি যখন পুনর্গঠনের কঠিন পথ পাড়ি দিচ্ছিল, তখন জলবায়ুজনিত দুর্যোগের নতুন চাপ তার অর্থনীতি ও অবকাঠামোর ওপর আরও বোঝা তৈরি করেছে।
হিমালয়ের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই
২০১৪ সালেই কোরিয়ার শিক্ষামূলক সম্প্রচারমাধ্যমসহ কয়েকটি তথ্যচিত্রে নেপাল ও হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক বিস্ফোরণজনিত বন্যা এবং বরফধসের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগকে এককভাবে কোনো পূর্বাভাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে বৈজ্ঞানিকভাবে সতর্কতা প্রয়োজন। কিন্তু সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহধস সেই সতর্কতাগুলোর গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি উদ্বেগ। শিল্প ও প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর অর্থনীতি ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লব নতুন মাত্রায় শক্তি ব্যবহারের চাহিদা তৈরি করছে। ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সীমা অতিক্রমের আশঙ্কা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্র এমন কিছু সীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে, যেখান থেকে ক্ষতি সামাল দেওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে নেপালের মতো দেশগুলোর বাস্তবতা শুধু উন্নয়ন-ঘাটতির প্রশ্ন নয়। এটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ন্যায়বিচারের প্রশ্নও।
এলডিসি থেকে উত্তরণ: সাফল্য নাকি নতুন ঝুঁকি?
জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে নেপালকে উত্তরণের উদ্যোগ নতুন নয়। ২০১৫ সালে উত্তরণের প্রক্রিয়া এগোলেও ভয়াবহ ভূমিকম্পের কারণে তা পিছিয়ে যায়। ২০২১ সালের মূল্যায়নের পর ২০২৬ সালকে উত্তরণের লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে নির্ধারণ করা হয় এবং মসৃণ রূপান্তরের জন্য পাঁচ বছরের সময়সীমার কথাও বলা হয়।
কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জলবায়ুজনিত ভয়াবহ বন্যা নেপালের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ফলে উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
এখানে মূল প্রশ্নটি হওয়া উচিত—একটি দেশ নির্দিষ্ট কিছু অর্থনৈতিক সূচকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করলেই কি তাকে আন্তর্জাতিক সহায়তার বিশেষ সুবিধা থেকে বের করে দেওয়া যথেষ্ট? নেপালের ক্ষেত্রে উত্তরটি এত সরল হতে পারে না।
এলডিসি মর্যাদা হারানোর সঙ্গে বাণিজ্যিক অগ্রাধিকার, স্বল্পসুদে অর্থায়ন এবং উন্নয়ন সহায়তার কিছু সুবিধা কমে যেতে পারে। অন্যদিকে জলবায়ু দুর্যোগের কারণে অবকাঠামো বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে উন্নয়ন অর্জনের বড় অংশ পুনরায় পুনর্গঠনে ব্যয় করতে হয়। অর্থাৎ একদিকে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চাপ, অন্যদিকে জলবায়ু ঝুঁকির কারণে বাড়তে থাকা ব্যয়—এই দ্বৈত চাপ নেপালের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

শুধু সহায়তা নয়, প্রয়োজন স্বচ্ছ পুনর্গঠন
তবে সংকটের মধ্যেও একটি ইতিবাচক সম্ভাবনা রয়েছে। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর ত্রাণ ও পুনর্বাসন ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং অনিয়মের ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় সমন্বয় এবং জনগণের কাছে ত্রাণ কার্যক্রমের তথ্য দ্রুত প্রকাশের উদ্যোগ তুলনামূলকভাবে বেশি স্বচ্ছতার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
এই পরিবর্তনকে কেবল প্রশাসনিক উন্নতি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন সহায়তা যদি স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বাজারে অর্থপ্রবাহ বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন সক্ষমতা তৈরিতে ব্যবহার করা যায়, তাহলে দুর্যোগকে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সুযোগে পরিণত করা সম্ভব।
এখানেই নেপালের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার প্রকৃত পরীক্ষা। বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমানো মানে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রত্যাখ্যান করা নয়। বরং সেই সহায়তাকে এমনভাবে কাজে লাগানো, যাতে ভবিষ্যতে দেশটি আরও বেশি নিজস্ব সক্ষমতার ওপর দাঁড়াতে পারে।
জলবায়ু ন্যায়ের ভিত্তিতে নতুন নীতি দরকার
নেপালের এলডিসি উত্তরণ ও পুনর্গঠন পরিকল্পনাকে তাই প্রচলিত উন্নয়ন সহায়তার কাঠামোর বাইরে নিয়ে যেতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতিকে বিবেচনায় না নিয়ে কেবল মাথাপিছু আয় বা অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকের ভিত্তিতে কোনো দেশের উন্নয়ন সক্ষমতা বিচার করলে বাস্তব চিত্র অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
প্রথমত, এলডিসি উত্তরণের মানদণ্ডে জলবায়ু ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’-এর মতো ব্যবস্থার সঙ্গে এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ তৈরি করা যেতে পারে। এতে জলবায়ু বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর বাস্তব ক্ষতি উন্নয়ন মূল্যায়নের অংশ হয়ে উঠবে।
দ্বিতীয়ত, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ঋণ পুনর্বিন্যাস এবং ‘ডেট-ফর-ক্লাইমেট সোয়াপ’-এর মতো ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ঋণ পরিশোধে ব্যয় হওয়ার পরিবর্তে সেই অর্থ জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো এবং হিমালয়ের হিমবাহ পর্যবেক্ষণে বিনিয়োগ করা গেলে তা দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি কার্যকর হবে।
তৃতীয়ত, পুনর্গঠন ব্যয়কে কেবল জরুরি ত্রাণে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। জলবায়ু সহনশীল সড়ক, আধুনিক সেচব্যবস্থা এবং টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করতে হবে। ত্রাণের অর্থ যদি বারবার ক্ষতিগ্রস্ত একই অবকাঠামো পুনর্নির্মাণেই শেষ হয়ে যায়, তাহলে একটি দেশ দুর্যোগের চক্র থেকে বের হতে পারবে না।
নেপালের সংকট আসলে বৈশ্বিক দায়ের পরীক্ষা
নেপালের বর্তমান সংকটকে শুধু একটি দরিদ্র দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখলে সমস্যাটির গভীরতা বোঝা যাবে না। এটি এমন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থার ফল, যেখানে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সুফল একদিকে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, অথচ পরিবেশগত ক্ষতির বোঝা অনেকাংশে পড়েছে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলোর ওপর।
তাই নেপালের প্রকৃত অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার পথ শুরু হতে পারে আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার নতুন সংজ্ঞা দিয়ে। দ্রুত এলডিসি উত্তরণের মাধ্যমে একটি দেশকে সহায়তার কাঠামো থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং তার জলবায়ু ঝুঁকি, ক্ষয়ক্ষতি ও পুনর্গঠনের প্রয়োজনকে বিবেচনায় নিয়ে ন্যায্য রূপান্তরের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনের দায় যাদের ঐতিহাসিকভাবে বেশি, তাদের দায়িত্বও কেবল ভবিষ্যৎ নির্গমন কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পুনর্গঠন ও অভিযোজনের জন্য ন্যায্য অর্থায়ন নিশ্চিত করাও সেই দায়িত্বের অংশ। নেপালের জন্য আজকের এই দুর্যোগ তাই শুধু পুনর্গঠনের পরীক্ষা নয়; এটি আন্তর্জাতিক জলবায়ু ন্যায়বিচার কতটা বাস্তব, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
ড. ইয়াং ই. ওয়াই 








