জাপান দ্রুত তার সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম পানির নিচের স্বয়ংক্রিয় যান এবং হাইপারসনিক অস্ত্র পরীক্ষার পরিকল্পনা ঘিরে চীনের উদ্বেগ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বেইজিংয়ের আশঙ্কা, এসব নতুন সক্ষমতা ভবিষ্যতে চীনের নৌবাহিনীর চলাচল ও আঞ্চলিক সামরিক কার্যক্রমের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
জাপানের নতুন অস্ত্র পরিকল্পনা
জাপানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সাম্প্রতিক উদ্যোগের মধ্যে দুটি বিষয় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। একটি হলো পানির নিচে চলাচলকারী স্বয়ংক্রিয় যানকে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করার পরিকল্পনা। অন্যটি হলো অস্ট্রেলিয়ায় হাইপারসনিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালানোর উদ্যোগ।
হাইপারসনিক অস্ত্র শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণের বেশি গতিতে ছুটতে পারে। অত্যন্ত দ্রুতগতির পাশাপাশি এ ধরনের অস্ত্রের গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতাও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, পানির নিচে চলাচলকারী স্বয়ংক্রিয় যানকে ক্ষেপণাস্ত্র বহনের উপযোগী করে তুললে সমুদ্রের বিস্তীর্ণ এলাকায় তুলনামূলকভাবে গোপনে আঘাত হানার সক্ষমতা তৈরি হতে পারে।
চীনের জন্য কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ

চীনের উদ্বেগের বড় কারণ হলো পূর্ব এশিয়ার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘প্রথম দ্বীপমালা’। জাপান থেকে তাইওয়ান, ফিলিপাইন হয়ে বোর্নিও পর্যন্ত বিস্তৃত এই অঞ্চলটি চীনা ও মার্কিন সামরিক কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।
বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের নতুন অস্ত্র সক্ষমতা এই অঞ্চলে চীনের সামরিক অবস্থানের ওপর চাপ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে চীনের উভচর বাহিনী এবং সমুদ্রপৃষ্ঠে চলাচলকারী যুদ্ধজাহাজগুলো সম্ভাব্যভাবে এসব অস্ত্রের হুমকির মুখে পড়তে পারে।
তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে কোনো সামরিক সংঘাত তৈরি হলে এই সক্ষমতা চীনের নৌবাহিনীর জন্য আরও জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের জাপানের সঙ্গে তুলনা
জাপানের সামরিক সম্প্রসারণ নিয়ে চীনের আপত্তি নতুন নয়। সম্প্রতি চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাং শিয়াওগাং জাপানের দুটি উদ্যোগের কথা বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, জাপান প্রকাশ্যেই তার সামরিক অস্ত্রভাণ্ডার সম্প্রসারণ করছে। তাঁর ভাষায়, এসব ‘বিপজ্জনক’ পদক্ষেপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের জাপানের সামরিকীকরণের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য বহন করে।
তবে ঠিক কীভাবে পানির নিচের স্বয়ংক্রিয় যান ও হাইপারসনিক অস্ত্রের এই কর্মসূচি চীনের সামরিক বাহিনীর জন্য নির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
পাল্টা আঘাতের সক্ষমতায় জাপানের পরিবর্তন
গত কয়েক বছরে জাপানের প্রতিরক্ষা নীতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২২ সালে দেশটি নতুন নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণের পর দীর্ঘপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়াতে শুরু করে।
এর আওতায় জাপান ‘পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা’ অর্জনের নীতি গ্রহণ করেছে। টোকিওর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো সশস্ত্র হামলার শিকার হলে আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে প্রতিপক্ষের ভূখণ্ডে থাকা সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা যেতে পারে।
তবে জাপান একই সঙ্গে বলছে, কোনো সম্ভাব্য হামলার আগেই অর্থাৎ পূর্বপ্রস্তুতিমূলক হামলা চালানো তাদের নীতির অংশ নয়।
বদলে যাচ্ছে পূর্ব এশিয়ার সামরিক ভারসাম্য
জাপানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির এই ধারা পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে। চীন ইতোমধ্যে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে, আর জাপানও দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র ও উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে।
ফলে জাপান, চীন ও তাইওয়ানকে ঘিরে সমুদ্রাঞ্চলে সামরিক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে পানির নিচের স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধযান ও দ্রুতগতির হাইপারসনিক অস্ত্রের মতো প্রযুক্তি ভবিষ্যতের সংঘাতে প্রচলিত যুদ্ধের হিসাব-নিকাশ অনেকটাই বদলে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, জাপানের নতুন অস্ত্র কর্মসূচি শুধু দেশটির নিজস্ব প্রতিরক্ষা নীতির পরিবর্তন নয়; এটি পূর্ব এশিয়ার সামরিক ভারসাম্যেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। আর সেই কারণেই টোকিওর প্রতিটি নতুন সামরিক উদ্যোগকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বেইজিং।
জাপানের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, হাইপারসনিক অস্ত্র ও পানির নিচের স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধযানের পরিকল্পনা নিয়ে পূর্ব এশিয়ায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। চীনের আশঙ্কা, এসব সক্ষমতা ভবিষ্যতে তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতে চীনা নৌবাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 














