যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন দেশটির ছোট তেল শোধনাগারগুলোর জন্য জৈবজ্বালানি মেশানোর বাধ্যবাধকতা থেকে বড় পরিসরে ছাড় দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত দুই ব্যক্তির বরাত দিয়ে জানা গেছে, সোমবারই এ বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে। ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে দেশটিতে পেট্রলের দাম বাড়তে থাকায় তা নিয়ন্ত্রণে আনার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা ছোট শোধনাগারগুলোর জন্য সর্বশেষ বছরের ক্ষেত্রে ১৮০ কোটিরও বেশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ঋণ বা সনদ থেকে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই ছাড়ের আবেদনকারীদের মধ্যে মারাথন পেট্রোলিয়াম ও শেভরনের মালিকানাধীন শোধনাগারও রয়েছে।
আগের পরিকল্পনার প্রায় দ্বিগুণ ছাড়
নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ছাড়ের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১৮০ কোটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি সনদে। বছরের শুরুতে পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা যে পরিমাণ ছাড় দেওয়ার কথা জানিয়েছিল, নতুন পরিমাণটি তার প্রায় দ্বিগুণ।
তেল শোধনাগারগুলোর জন্য এ ধরনের ছাড়ের অর্থ হলো জৈবজ্বালানি মেশানোর বাধ্যবাধকতা পূরণে তাদের তুলনামূলক কম খরচ করতে হবে। শোধনাগার মালিকেরা দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তি দিয়ে আসছেন, জৈবজ্বালানি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা পালন করতে গিয়ে তাদের অতিরিক্ত ব্যয় হয়, বিশেষ করে যখন প্রয়োজনীয় সনদের দাম বেড়ে যায়।
অন্যদিকে কৃষক ও কৃষিপ্রধান অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনপ্রণেতারা এই ছাড়ের বিরোধিতা করছেন। তাদের আশঙ্কা, শোধনাগারগুলোকে বেশি ছাড় দিলে ভুট্টাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের চাহিদা কমে যেতে পারে। এতে কৃষকের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের জৈবজ্বালানি শিল্পও চাপের মুখে পড়তে পারে।
কৃষকদের ক্ষতি পোষাতে নতুন পরিকল্পনা
তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা কৃষকদের সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে বিকল্প ব্যবস্থাও বিবেচনা করছে। এর আওতায় ২০২৭ সালের জৈবজ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নতুন করে পর্যালোচনা করে আরও প্রায় ৫০ কোটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি সনদ যোগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনে এই পরিমাণ আরও বাড়ানো হতে পারে।
এর ফলে একদিকে শোধনাগারগুলোকে বাড়তি ছাড় দেওয়া হবে, অন্যদিকে কৃষকদের কাছ থেকে জৈবজ্বালানির জন্য প্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের চাহিদা ধরে রাখার চেষ্টা করা হবে।

পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা চলতি মাসের শুরুতে জানিয়েছিল, শোধনাগারগুলোর মওকুফের আবেদন নিয়ে আগস্টের শেষ নাগাদ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সিদ্ধান্ত মঙ্গলবার পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে পারে।
পেট্রলের দাম কমানোর রাজনৈতিক চাপ
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের সময় জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় দেশটিতে পেট্রলের দাম বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প প্রশাসন পাম্প পর্যায়ে জ্বালানির দামের ওপর চাপ কমানোর বিভিন্ন উপায় খুঁজছে।
তবে একই সঙ্গে নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচন সামনে রেখে কৃষকদের অসন্তুষ্ট করতেও চাইছে না প্রশাসন। কারণ কৃষিপ্রধান অঙ্গরাজ্যগুলোর ভোট রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তেল শোধনাগার ও কৃষক—দুই পক্ষের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখন প্রশাসনের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দীর্ঘদিনের বিরোধে নতুন উত্তেজনা
এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের তেল শোধনাগার ও জৈবজ্বালানি শিল্পের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
দেশটির নবায়নযোগ্য জ্বালানি মানদণ্ড অনুযায়ী, তেল শোধনাগার ও জ্বালানি আমদানিকারকদের পরিবহন খাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ নবায়নযোগ্য জ্বালানি মেশাতে হয়। নির্ধারিত পরিমাণ পূরণ করতে না পারলে তাদের বিশেষ ধরনের সনদ কিনতে হয়।
তবে ছোট শোধনাগারগুলো যদি প্রমাণ করতে পারে যে এই বাধ্যবাধকতা পালন করলে তাদের ওপর অস্বাভাবিক অর্থনৈতিক চাপ পড়বে, তাহলে তারা ছাড়ের আবেদন করতে পারে। পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থাই এসব আবেদন পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত দেয়।
এই ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তেল শিল্প ও কৃষি খাতের মধ্যে মতবিরোধ চলছে। তেল শোধনাগারগুলো বলছে, জৈবজ্বালানির বাধ্যবাধকতা তাদের উৎপাদন ব্যয় বাড়ায়। বিপরীতে কৃষক ও জৈবজ্বালানি শিল্পের পক্ষের লোকজন মনে করেন, ব্যাপক ছাড় দেওয়া হলে কৃষিপণ্যের চাহিদা কমবে এবং পুরো জৈবজ্বালানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এখন ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে মূল প্রশ্ন হলো—জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে শোধনাগারগুলোকে কতটা ছাড় দেওয়া হবে, আর সেই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কৃষকদের জন্য কীভাবে সামাল দেওয়া হবে।
জৈবজ্বালানি নীতিতে এই পরিবর্তন শুধু তেল শিল্প নয়, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বাজার ও জ্বালানি দামের ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
জ্বালানি মূল্য কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উদ্যোগে ছোট তেল শোধনাগারগুলো বড় ধরনের ছাড় পেতে যাচ্ছে। তবে কৃষক ও জৈবজ্বালানি শিল্পের উদ্বেগের কারণে সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিকভাবে বেশ স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















