মার্কিন সরকারের ঋণ বাড়তে থাকা এবং সরকারি বন্ডের সুদের হার নিয়ে সাম্প্রতিক উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে নারাজ দেশটির অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। তাঁর দাবি, মার্কিন অর্থনীতি এখনো শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে এবং বিশ্বের অন্যান্য বড় অর্থনীতির তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডবাজারও ভালো করছে।
উত্তর ক্যারোলিনার অ্যাশভিলে রোববার এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, মার্কিন বন্ডবাজারে যে ধরনের অস্থিরতার কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে তিনি তেমন কোনো বড় ধরনের সংকট দেখছেন না। বরং চলতি বছরে অন্যান্য প্রধান অর্থনীতির তুলনায় মার্কিন বন্ডবাজারের কার্যকারিতা সবচেয়ে ভালো বলে দাবি করেন তিনি।
অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিই বড় ভরসা
বেসেন্টের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বড় বাজেট ঘাটতি নিয়েও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারছে। এ কারণেই অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির তুলনায় দেশটি ঋণ ও রাজস্বসংক্রান্ত চাপ মোকাবিলায় তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
তিনি বলেন, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনেও এই প্রবৃদ্ধি মার্কিন সরকারের আর্থিক অবস্থার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে সহায়তা করবে বলে মনে করেন তিনি।
গত সপ্তাহে ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন সরকারি বন্ডের সুদের হার খুব বেশি পরিবর্তিত হয়নি। শুক্রবার এটি প্রায় ৪ দশমিক ৭৩ শতাংশে শেষ হয়। বিনিয়োগকারীরা একদিকে সরকারের আর্থিক অবস্থার অবনতি নিয়ে উদ্বিগ্ন, অন্যদিকে শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়ায় বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা যায়নি।
ইরান সংঘাতের প্রভাবও সাময়িক বলে মনে করছেন বেসেন্ট
মার্কিন ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় জ্বালানির দাম এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। এর প্রভাব সরকারি বন্ডের দীর্ঘমেয়াদি সুদের হারেও পড়েছে বলে মনে করেন বেসেন্ট।
তবে তাঁর ধারণা, সংঘাতের কারণে তৈরি হওয়া জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতির চাপ সময়ের সঙ্গে কমে আসবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বন্ডের সুদের হার কিছুটা বেড়ে যাওয়ার পেছনে শুধু সরকারের ঋণ নিয়ে উদ্বেগ কাজ করছে—এমনটা মনে করার কারণ নেই। এর একটি অংশ মার্কিন অর্থনীতির শক্তিশালী অবস্থার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থারও প্রতিফলন।
দীর্ঘমেয়াদি বন্ড কিনবে মার্কিন সরকার
মার্কিন বন্ডবাজারে অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে ট্রেজারি বিভাগ দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণপত্র পুনরায় কেনার কর্মসূচি আরও বড় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বেসেন্ট গত সপ্তাহে জানিয়েছিলেন, প্রতিটি দফায় দীর্ঘমেয়াদি বন্ড পুনঃক্রয়ের পরিমাণ অন্তত দ্বিগুণ করে ৪০০ কোটি ডলারে নেওয়া হবে।
এর আগে ৩০ বছর মেয়াদি মার্কিন সরকারি ঋণের সুদের হার ১৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল। বেসেন্টের মতে, ওই উত্থান অর্থনীতির মৌলিক অবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
তবে সরকারের এই পদক্ষেপ নিয়ে কয়েকজন কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিনির্ধারক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, সরকারি বন্ড পুনঃক্রয় বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে।
বেসেন্ট অবশ্য এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর যুক্তি, ইউরোপ ও জাপানে এর চেয়েও বড় মাত্রায় সরকারি বন্ড কেনার কর্মসূচি নেওয়া হলেও সেগুলো নিয়ে এতটা সমালোচনা হয়নি।
বাজার নিয়ন্ত্রণ নয়, অস্থিরতা কমানোই লক্ষ্য
বেসেন্ট স্পষ্ট করে বলেন, সরকারের বন্ড পুনঃক্রয়ের উদ্দেশ্য বাজারে কোনো নির্দিষ্ট দাম নির্ধারণ করা নয়। বরং বাজারে অতিরিক্ত ওঠানামা ঠেকিয়ে লেনদেনকে সুশৃঙ্খল রাখা।
আগস্ট মাসে সাধারণত বাজারে লেনদেনের পরিমাণ কমে যায়। ফলে তুলনামূলক কম লেনদেনের মধ্যেই বড় ধরনের মূল্য পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে বাজারকে স্থিতিশীল রাখতেই পুনঃক্রয়ের পরিমাণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

বেসেন্ট বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বাজারের ভারসাম্যপূর্ণ মূল্য পরিবর্তন করার লক্ষ্য নেই। তাঁর দায়িত্ব হলো বাজারের আকস্মিক অস্থিরতা ধীর করা এবং পরিস্থিতি যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়, তা নিশ্চিত করা।
বড় পরিসরে পুনঃক্রয় কার্যক্রম আগামী ১০ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে মার্কিন সরকারের নেওয়া এই পদক্ষেপকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ কতটা কমে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ঋণের চাপের মধ্যেও আস্থা ধরে রাখতে চাইছে ওয়াশিংটন
মার্কিন সরকারের বিপুল ঋণ, বাজেট ঘাটতি এবং দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের সুদের হার নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে আলোচনা বাড়ছে। এর মধ্যেই বেসেন্টের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য হলো বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করা যে মার্কিন অর্থনীতি এখনো প্রবৃদ্ধিশীল এবং সরকারি ঋণের চাপ সামাল দেওয়ার মতো সক্ষমতা দেশটির রয়েছে।
তবে বাজারে সুদের হার, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির দাম এবং সরকারি ঋণের পরিমাণ—এই চারটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকায় আগামী মাসগুলোতে মার্কিন বন্ডবাজারের গতিপথ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















