মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপছন্দের বক্তব্য দেওয়ার কারণে সাংবাদিকদের শাস্তির হুমকি দেওয়াকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য ‘বিপজ্জনক’ বলে সতর্ক করেছেন দেশটির ফেডারেল যোগাযোগ কমিশনের কমিশনার আনা গোমেজ। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের হুমকি গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।
ট্রাম্পের সঙ্গে গণমাধ্যমের বিরোধ অবশ্য নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে তিনি সাংবাদিকদের ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এবার তাঁর ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছেন এনবিসির সাংবাদিক ও অনুষ্ঠান সঞ্চালক ক্রিস্টেন ওয়েলকার।
ট্রাম্পের সমালোচনার মুখে ওয়েলকার
রোববারের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে ওয়েলকার মন্তব্য করেন, আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের প্রতি ট্রাম্পের সমর্থনের ফলাফল এখন পর্যন্ত কিছুটা মিশ্র।
এই মন্তব্যেই ক্ষুব্ধ হন ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে তিনি ওয়েলকারকে একসময়কার জনপ্রিয় অনুষ্ঠানটির ‘অজনপ্রিয় সঞ্চালক’ বলে কটাক্ষ করেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, সিনেট নির্বাচনে তাঁর সমর্থিত প্রার্থীরা শতভাগ এবং প্রতিনিধি পরিষদ নির্বাচনে ৯৮ শতাংশ সাফল্য পেয়েছেন।

ট্রাম্প প্রশ্ন তোলেন, সরকারি সম্প্রচার তরঙ্গ ব্যবহার করে কাজ করা কোনো সাংবাদিক কীভাবে তাঁর রাজনৈতিক সাফল্য সম্পর্কে এমন বক্তব্য দিতে পারেন। এরপরই তিনি ঘোষণা করেন, ওয়েলকারকে নিন্দা বা শাস্তির জন্য ফেডারেল যোগাযোগ কমিশনে অভিযোগ করা হবে।
‘সাংবাদিকদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা এফসিসির নেই’
ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে কমিশনার আনা গোমেজ স্পষ্ট করে বলেন, প্রেসিডেন্টের অপছন্দের সাংবাদিকদের শাস্তি দেওয়ার কোনো ক্ষমতা ফেডারেল যোগাযোগ কমিশনের নেই।
গোমেজ বলেন, সাংবাদিকরা সরকারের পছন্দ অনুযায়ী কথা না বললেই তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য গুরুতর বিপদ তৈরি করে। তাঁর মতে, এ ধরনের চাপ গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তিকে দুর্বল করে।
গোমেজ এর আগেও ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। এর মধ্যে ট্রাম্পের আহ্বানে গভীর রাতের টেলিভিশন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক জিমি কিমেলের বক্তব্যের কারণে একটি সম্প্রচারমাধ্যমের বিরুদ্ধে কমিশনকে ব্যবহার করার প্রচেষ্টার বিরোধিতাও রয়েছে।
এফসিসিকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করার আশঙ্কা
গোমেজ মনে করেন, ফেডারেল যোগাযোগ কমিশনকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। তিনি কমিশনে তাঁর মেয়াদ আরও বাড়ানোর প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেছেন।
তাঁর মতে, কমিশনে এমন একজন সদস্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ, যিনি প্রশাসনের ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি চান, কমিশনটি যেন দ্বিদলীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবেই কার্যকর থাকে, প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত কোনো প্রতিষ্ঠানে পরিণত না হয়।
ট্রাম্পের সমর্থিত প্রার্থীদের সাফল্যের হিসাব কতটা?
ওয়েলকারের ‘মিশ্র ফলাফল’ মন্তব্যটি পুরোপুরি অমূলক কি না, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। নির্বাচনী তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ট্রাম্প ৩৩২ জন প্রার্থীকে সমর্থন করেছেন এবং প্রাথমিক নির্বাচনে তাঁদের সাফল্যের হার প্রায় ৯৬ শতাংশ।
তবে এসব নির্বাচনের অনেকগুলোই তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নির্বাচনে ট্রাম্পের পছন্দের প্রার্থীরা পরাজিতও হয়েছেন।
জর্জিয়ার গভর্নর পদে বার্ট জোন্স এবং আইওয়ার গভর্নর পদে র্যান্ডি ফিনস্ট্রার মতো প্রার্থীরা ট্রাম্পের সমর্থন পেয়েও দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে হেরে যান।
এর আগের বছরের হিসাব ধরলে ট্রাম্পের সমর্থিত প্রার্থীদের সাফল্যের হার আরও কমে প্রায় ৪৩ শতাংশে দাঁড়ায়। নিউ জার্সির গভর্নর নির্বাচন এবং নিউইয়র্ক সিটি মেয়র নির্বাচনে তাঁর সমর্থনও প্রত্যাশিত ফল আনতে পারেনি। নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে ট্রাম্প-সমর্থিত অ্যান্ড্রু কুওমো জোহরান মামদানির কাছে পরাজিত হন।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্ক
ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসের স্বাধীনতা এবং সরকারের ক্ষমতা ব্যবহারের সীমা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, কোনো প্রেসিডেন্ট যদি অপছন্দের সংবাদ বা মন্তব্যের জন্য সাংবাদিকদের সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে শাস্তির হুমকি দেন, তাহলে তা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর ভীতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
আনা গোমেজের বক্তব্যের মূল বার্তাও সেটিই—সরকারের সমালোচনা করলেই কোনো সাংবাদিককে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে, এমন পরিবেশ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য স্বাস্থ্যকর নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















