০৩:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বৈদ্যুতিক রূপে রেঞ্জ রোভার, এক চার্জে চলবে ৫৯৮ কিলোমিটার সমুদ্র ও উপকূলের ক্যানভাসে আমেরিকার ইতিহাস, যুদ্ধ ও জীবন কুকুর-বিড়ালের মনের ভাষা বুঝবেন যেভাবে, আচরণেই মিলবে আবেগের সংকেত বেলুচিস্তানে সার্বভৌমত্ব বনাম মানবিক সুরক্ষা: আন্তর্জাতিক আইনের সীমা কোথায়? আফগানিস্তানে দমন-পীড়ন ও প্রতিরোধের ক্রমবর্ধমান সংঘাত ২০২৬ সালে পানি নিয়ে সংঘাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে যেসব অঞ্চল হাসপাতালে সাড়ে ৫ ঘণ্টা লোডশেডিং, জেনারেটরও বছরের পর বছর বিকল চট্টগ্রামের বাজারে নিত্যপণ্যের চড়া দাম, বেতন বাড়লেও স্বস্তি নেই কারাগারে অসুস্থ সাংবাদিক ফারজানা রুপা, বিএমইউতে ভর্তি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৬: তারকাদের নজরকাড়া পোশাকে রেড কার্পেটে ফ্যাশনের ঝলক

স্কটল্যান্ডের নিউ ল্যানার্ক: যে কারখানা-শহরে শিশুশ্রমিকরা ফিরে পেয়েছিল শৈশব

শিল্পবিপ্লবের কঠিন বাস্তবতা

আঠারো শতকের শেষভাগ। দ্রুতগতির ক্লাইড নদীর তীরে গড়ে উঠছিল ব্রিটেনের বড় বড় সুতা কারখানা। শিল্পবিপ্লবের নতুন প্রযুক্তি তখন মানুষের শ্রমের জায়গা দখল করতে শুরু করেছে। জলচালিত চাকা একসঙ্গে বহু যন্ত্র চালাতে পারত। আর সেই কারখানায় কাজ করত শত শত শিশু।

স্কটল্যান্ডের নিউ ল্যানার্ক ছিল এমনই একটি শিল্পনগরী। উদ্যোক্তা ডেভিড ডেল ও ইংরেজ উদ্ভাবক রিচার্ড আর্করাইটের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই কারখানায় একসময় প্রায় এক হাজার ২০০ শ্রমিক কাজ করতেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৮০০ জনই ছিল শিশু। অর্ধেকের বেশি শিশুর বয়স ছিল ১৩ বছরের নিচে, আর সবচেয়ে ছোটদের বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর।

সে সময় শিশুশ্রম অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। কিন্তু নিউ ল্যানার্ককে আলাদা করে তুলেছিল শিশু ও শ্রমিকদের প্রতি তুলনামূলক মানবিক আচরণ।

রবার্ট ওয়েনের আগমন

নিউ ল্যানার্কের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম রবার্ট ওয়েন। ডেভিড ডেলের মেয়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় ১৭৯৯ সালে। এর আগে থেকেই ওয়েন শ্রমিকদের জীবনযাত্রা উন্নত করার একটি সামাজিক পরীক্ষার কথা ভাবছিলেন।

প্রথমদিকে অবশ্য তাঁর কাজ খুব একটা মানবিক সংস্কার দিয়ে শুরু হয়নি। বরং উৎপাদন বাড়াতে তিনি দৈনিক কাজের সময় ১৩ ঘণ্টা থেকে ১৪ ঘণ্টা করেছিলেন এবং শ্রমিকদের কাজের হিসাব কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন।

Scottish boys clothes -- industrial revolution in Scotland New Lanark

তবে সময়ের সঙ্গে ওয়েনের চিন্তাভাবনায় বড় পরিবর্তন আসে। তিনি বুঝতে পারেন, শ্রমিকদের ভালোভাবে দেখভাল করলে তাঁদের উৎপাদনশীলতাও বাড়তে পারে।

শ্রমিকদের জন্য নতুন ব্যবস্থা

ওয়েন নিউ ল্যানার্কে একটি বিশেষ দোকান চালু করেন। সেখানে শ্রমিকরা তুলনামূলক ভালো মানের খাবার ও প্রয়োজনীয় পণ্য কম লাভে কিনতে পারতেন। আগে শ্রমিকদের নিম্নমানের মাংসও বেশি দামে কিনতে হতো, ফলে অনেকেই ঋণের বোঝায় পড়তেন।

শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গড়ে তোলা হয় অসুস্থতা তহবিল। প্রত্যেক শ্রমিকের বেতন থেকে সামান্য অংশ সেখানে জমা হতো। পাশাপাশি সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে চালু করা হয় সঞ্চয়ব্যাংক।

মদ্যপানের সমস্যাও কমানোর চেষ্টা করা হয়। কারখানার দোকানের মাধ্যমে মদ বিক্রির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

অস্বাভাবিক এক কর্মপরিবেশ

শ্রমিকদের কাজের মান বোঝাতে ওয়েন চালু করেছিলেন কাঠের ছোট একটি সংকেত ব্যবস্থা। চার রঙের এই কাঠের চিহ্ন শ্রমিকের আগের দিনের কাজের মান প্রকাশ করত।

কালো মানে ছিল খারাপ কাজ, নীল মানে মোটামুটি, হলুদ মানে ভালো এবং সাদা মানে ছিল চমৎকার কাজ। ফলে কারখানার ভেতর দিয়ে হাঁটার সময়ই ওয়েন বুঝতে পারতেন কে কেমন কাজ করছেন।

তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল শাস্তির ধারণায়। তিনি শ্রমিকদের মারধর বা কঠোর মৌখিক অপমানের মাধ্যমে কাজ করানোর পক্ষে ছিলেন না। বরং ভালো পরিবেশ তৈরি করেই উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।

New Lanark Facts for Kids

দরিদ্র হলেও তুলনামূলক উন্নত জীবন

নিউ ল্যানার্কের শ্রমিকদের জীবন আজকের মানদণ্ডে আরামদায়ক ছিল না। কিন্তু সেই সময়ের অন্য কারখানা এলাকার তুলনায় তাঁদের জীবনযাত্রা ছিল অনেক ভালো।

শ্রমিকদের ঘরে পানির ব্যবস্থা ছিল। পরে বিদ্যুতের ব্যবস্থাও করা হয়। প্রতিটি পরিবারকে একটি বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিছু শ্রমিক পরে সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করে বেতারযন্ত্র ও বৈদ্যুতিক ইস্ত্রি চালাতেন।

বাসস্থানে জায়গা ছিল অল্প। বড়রা এক ধরনের কাঠের বাক্সের মতো বিছানায় ঘুমাতেন। শিশুদের জন্য চাকার ওপর তৈরি বিছানা রাতে বের করে দেওয়া হতো। কখনো একটি বিছানায় চারটি শিশুকেও ঘুমাতে হতো।

তবু সে সময়ের দরিদ্র মানুষের সাধারণ জীবনযাত্রার তুলনায় নিউ ল্যানার্কের ব্যবস্থা ছিল যথেষ্ট অগ্রসর।

শিশুদের জন্য স্কুল

নিউ ল্যানার্কের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার সম্ভবত শিক্ষাব্যবস্থা।

১৮১৬ সালে ওয়েন একটি বিদ্যালয় ও চরিত্র গঠনের জন্য বিশেষ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে ২৭৪ জন শিক্ষার্থীকে ১৪ জন শিক্ষক পড়াতেন।

শিশুদের বয়স ছিল মাত্র ১৮ মাস থেকেও শুরু হতে পারত। তারা সাধারণত ১০ থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত বিদ্যালয়ে পড়ত। প্রকৃতি, ভূগোল ও ইতিহাসের পাশাপাশি গান ও নাচও শেখানো হতো।

গ্রীষ্মে দীর্ঘ সময় এবং শীতকালে তুলনামূলক কম সময় বিদ্যালয়ে পাঠ চলত। এর ফলে ছোট শিশুদের মায়েরা কারখানায় কাজ করার সুযোগ পেতেন।

The stolen childhood of the factory children - SWI swissinfo.ch

১০ থেকে ২০ বছর বয়সী বড় শিশুরা দিনে কাজ করলেও সন্ধ্যায় তাদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল।

এই উদ্যোগ পরবর্তীকালে ব্রিটেনের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়িয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার নানা জায়গায় অনুসরণ করা হয়।

এক শিল্পনগরীর বিশ্বব্যাপী উত্তরাধিকার

রবার্ট ওয়েন ১৮২৫ সালে নিউ ল্যানার্ক ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেখানে তিনি একই ধরনের একটি সামাজিক প্রকল্প গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। সেটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলেও তাঁর বহু ধারণা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহৃত হয়।

ওয়েন চলে যাওয়ার পরও নিউ ল্যানার্ক শ্রমিককল্যাণের একটি মডেল হিসেবে টিকে ছিল। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৮ সালে কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যায়।

কিন্তু নিউ ল্যানার্কের গল্প সেখানেই শেষ হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের উদ্যোগে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ করা হয়। আজও সেখানে গেলে উনিশ শতকের বিদ্যালয়কক্ষ দেখা যায়, পুরোনো সুতা কাটার যন্ত্রের কার্যক্রম সম্পর্কে জানা যায় এবং সেই সময়ের শ্রমিক ও মালিকদের সম্পূর্ণ ভিন্ন জীবনযাত্রার ছবি পাওয়া যায়।

শিল্পবিপ্লবের যুগে শিশুরা যেখানে মূলত সস্তা শ্রমের উৎস হিসেবে বিবেচিত হতো, সেখানে নিউ ল্যানার্ক দেখিয়েছিল—শ্রমিকের জীবনমান, শিক্ষা ও কল্যাণকে গুরুত্ব দিয়েও একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা সম্ভব। সেই কারণেই স্কটল্যান্ডের এই ছোট শিল্পনগরীর ইতিহাস আজও শিল্পায়ন ও মানবিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে আছে।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

বৈদ্যুতিক রূপে রেঞ্জ রোভার, এক চার্জে চলবে ৫৯৮ কিলোমিটার

স্কটল্যান্ডের নিউ ল্যানার্ক: যে কারখানা-শহরে শিশুশ্রমিকরা ফিরে পেয়েছিল শৈশব

০২:১৮:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিল্পবিপ্লবের কঠিন বাস্তবতা

আঠারো শতকের শেষভাগ। দ্রুতগতির ক্লাইড নদীর তীরে গড়ে উঠছিল ব্রিটেনের বড় বড় সুতা কারখানা। শিল্পবিপ্লবের নতুন প্রযুক্তি তখন মানুষের শ্রমের জায়গা দখল করতে শুরু করেছে। জলচালিত চাকা একসঙ্গে বহু যন্ত্র চালাতে পারত। আর সেই কারখানায় কাজ করত শত শত শিশু।

স্কটল্যান্ডের নিউ ল্যানার্ক ছিল এমনই একটি শিল্পনগরী। উদ্যোক্তা ডেভিড ডেল ও ইংরেজ উদ্ভাবক রিচার্ড আর্করাইটের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই কারখানায় একসময় প্রায় এক হাজার ২০০ শ্রমিক কাজ করতেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৮০০ জনই ছিল শিশু। অর্ধেকের বেশি শিশুর বয়স ছিল ১৩ বছরের নিচে, আর সবচেয়ে ছোটদের বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর।

সে সময় শিশুশ্রম অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। কিন্তু নিউ ল্যানার্ককে আলাদা করে তুলেছিল শিশু ও শ্রমিকদের প্রতি তুলনামূলক মানবিক আচরণ।

রবার্ট ওয়েনের আগমন

নিউ ল্যানার্কের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম রবার্ট ওয়েন। ডেভিড ডেলের মেয়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় ১৭৯৯ সালে। এর আগে থেকেই ওয়েন শ্রমিকদের জীবনযাত্রা উন্নত করার একটি সামাজিক পরীক্ষার কথা ভাবছিলেন।

প্রথমদিকে অবশ্য তাঁর কাজ খুব একটা মানবিক সংস্কার দিয়ে শুরু হয়নি। বরং উৎপাদন বাড়াতে তিনি দৈনিক কাজের সময় ১৩ ঘণ্টা থেকে ১৪ ঘণ্টা করেছিলেন এবং শ্রমিকদের কাজের হিসাব কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন।

Scottish boys clothes -- industrial revolution in Scotland New Lanark

তবে সময়ের সঙ্গে ওয়েনের চিন্তাভাবনায় বড় পরিবর্তন আসে। তিনি বুঝতে পারেন, শ্রমিকদের ভালোভাবে দেখভাল করলে তাঁদের উৎপাদনশীলতাও বাড়তে পারে।

শ্রমিকদের জন্য নতুন ব্যবস্থা

ওয়েন নিউ ল্যানার্কে একটি বিশেষ দোকান চালু করেন। সেখানে শ্রমিকরা তুলনামূলক ভালো মানের খাবার ও প্রয়োজনীয় পণ্য কম লাভে কিনতে পারতেন। আগে শ্রমিকদের নিম্নমানের মাংসও বেশি দামে কিনতে হতো, ফলে অনেকেই ঋণের বোঝায় পড়তেন।

শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গড়ে তোলা হয় অসুস্থতা তহবিল। প্রত্যেক শ্রমিকের বেতন থেকে সামান্য অংশ সেখানে জমা হতো। পাশাপাশি সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে চালু করা হয় সঞ্চয়ব্যাংক।

মদ্যপানের সমস্যাও কমানোর চেষ্টা করা হয়। কারখানার দোকানের মাধ্যমে মদ বিক্রির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

অস্বাভাবিক এক কর্মপরিবেশ

শ্রমিকদের কাজের মান বোঝাতে ওয়েন চালু করেছিলেন কাঠের ছোট একটি সংকেত ব্যবস্থা। চার রঙের এই কাঠের চিহ্ন শ্রমিকের আগের দিনের কাজের মান প্রকাশ করত।

কালো মানে ছিল খারাপ কাজ, নীল মানে মোটামুটি, হলুদ মানে ভালো এবং সাদা মানে ছিল চমৎকার কাজ। ফলে কারখানার ভেতর দিয়ে হাঁটার সময়ই ওয়েন বুঝতে পারতেন কে কেমন কাজ করছেন।

তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল শাস্তির ধারণায়। তিনি শ্রমিকদের মারধর বা কঠোর মৌখিক অপমানের মাধ্যমে কাজ করানোর পক্ষে ছিলেন না। বরং ভালো পরিবেশ তৈরি করেই উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।

New Lanark Facts for Kids

দরিদ্র হলেও তুলনামূলক উন্নত জীবন

নিউ ল্যানার্কের শ্রমিকদের জীবন আজকের মানদণ্ডে আরামদায়ক ছিল না। কিন্তু সেই সময়ের অন্য কারখানা এলাকার তুলনায় তাঁদের জীবনযাত্রা ছিল অনেক ভালো।

শ্রমিকদের ঘরে পানির ব্যবস্থা ছিল। পরে বিদ্যুতের ব্যবস্থাও করা হয়। প্রতিটি পরিবারকে একটি বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিছু শ্রমিক পরে সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করে বেতারযন্ত্র ও বৈদ্যুতিক ইস্ত্রি চালাতেন।

বাসস্থানে জায়গা ছিল অল্প। বড়রা এক ধরনের কাঠের বাক্সের মতো বিছানায় ঘুমাতেন। শিশুদের জন্য চাকার ওপর তৈরি বিছানা রাতে বের করে দেওয়া হতো। কখনো একটি বিছানায় চারটি শিশুকেও ঘুমাতে হতো।

তবু সে সময়ের দরিদ্র মানুষের সাধারণ জীবনযাত্রার তুলনায় নিউ ল্যানার্কের ব্যবস্থা ছিল যথেষ্ট অগ্রসর।

শিশুদের জন্য স্কুল

নিউ ল্যানার্কের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার সম্ভবত শিক্ষাব্যবস্থা।

১৮১৬ সালে ওয়েন একটি বিদ্যালয় ও চরিত্র গঠনের জন্য বিশেষ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে ২৭৪ জন শিক্ষার্থীকে ১৪ জন শিক্ষক পড়াতেন।

শিশুদের বয়স ছিল মাত্র ১৮ মাস থেকেও শুরু হতে পারত। তারা সাধারণত ১০ থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত বিদ্যালয়ে পড়ত। প্রকৃতি, ভূগোল ও ইতিহাসের পাশাপাশি গান ও নাচও শেখানো হতো।

গ্রীষ্মে দীর্ঘ সময় এবং শীতকালে তুলনামূলক কম সময় বিদ্যালয়ে পাঠ চলত। এর ফলে ছোট শিশুদের মায়েরা কারখানায় কাজ করার সুযোগ পেতেন।

The stolen childhood of the factory children - SWI swissinfo.ch

১০ থেকে ২০ বছর বয়সী বড় শিশুরা দিনে কাজ করলেও সন্ধ্যায় তাদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল।

এই উদ্যোগ পরবর্তীকালে ব্রিটেনের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়িয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার নানা জায়গায় অনুসরণ করা হয়।

এক শিল্পনগরীর বিশ্বব্যাপী উত্তরাধিকার

রবার্ট ওয়েন ১৮২৫ সালে নিউ ল্যানার্ক ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেখানে তিনি একই ধরনের একটি সামাজিক প্রকল্প গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। সেটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলেও তাঁর বহু ধারণা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহৃত হয়।

ওয়েন চলে যাওয়ার পরও নিউ ল্যানার্ক শ্রমিককল্যাণের একটি মডেল হিসেবে টিকে ছিল। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৮ সালে কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যায়।

কিন্তু নিউ ল্যানার্কের গল্প সেখানেই শেষ হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের উদ্যোগে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ করা হয়। আজও সেখানে গেলে উনিশ শতকের বিদ্যালয়কক্ষ দেখা যায়, পুরোনো সুতা কাটার যন্ত্রের কার্যক্রম সম্পর্কে জানা যায় এবং সেই সময়ের শ্রমিক ও মালিকদের সম্পূর্ণ ভিন্ন জীবনযাত্রার ছবি পাওয়া যায়।

শিল্পবিপ্লবের যুগে শিশুরা যেখানে মূলত সস্তা শ্রমের উৎস হিসেবে বিবেচিত হতো, সেখানে নিউ ল্যানার্ক দেখিয়েছিল—শ্রমিকের জীবনমান, শিক্ষা ও কল্যাণকে গুরুত্ব দিয়েও একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা সম্ভব। সেই কারণেই স্কটল্যান্ডের এই ছোট শিল্পনগরীর ইতিহাস আজও শিল্পায়ন ও মানবিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে আছে।