০৪:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিশুদের মুখে নতুন হাসি, মিশিগানে ম্যাগির উইগস ৪ কিডস-এর ২৩তম বার্ষিক গালা নাসার রোমান টেলিস্কোপের নতুন ঠিকানার পথে তিন মাসের মহাকাশযাত্রা মাত্র ১০ সেন্টিমিটার উচ্চতার ‘কিউটি পাই’ গোলাপ, ছোট বাগান সাজাতে দারুণ প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে স্বনির্ভর করতে অভিভাবকের যে ৬টি পদক্ষেপ জরুরি বাড়িতে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান থাকলে সম্পর্ক ভালো রাখার উপায় জলবায়ু পরিবর্তনে আরও শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো, হাজার বছরের প্রবাল রেকর্ডে মিলল প্রমাণ স্কুলের নকশাই গড়ে তুলতে পারে সংস্কৃতি, পরিচয় ও আপন হওয়ার অনুভূতি বাড়ির আঙিনায় পাখিকে খাবার দেওয়া কি সত্যিই ভালো, নাকি ডেকে আনছে বিপদ? যুক্তরাষ্ট্রের  রোবট ও ড্রোন গবেষণায় নতুন যুগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হচ্ছে অত্যাধুনিক পরীক্ষাগার ভারতের খাদ্যপণ্যে সতর্কবার্তার প্রস্তাব ঘিরে দুই দিক থেকেই তীব্র আপত্তি

বেলুচিস্তানে সার্বভৌমত্ব বনাম মানবিক সুরক্ষা: আন্তর্জাতিক আইনের সীমা কোথায়?

বেলুচিস্তান পাকিস্তানের অংশ—এ অবস্থান থেকে ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনগত অধিকার পাকিস্তানের রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক আইন রাষ্ট্রের এই ক্ষমতাকে সীমাহীন বলে স্বীকৃতি দেয় না। একইভাবে স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র সংগ্রাম করা গোষ্ঠীগুলোর ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য।

দীর্ঘদিনের সংঘাত

বেলুচিস্তান বহু বছর ধরে পাকিস্তানের সবচেয়ে জটিল রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংকটগুলোর একটি। বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, সশস্ত্র হামলা, রাজনৈতিক অসন্তোষ এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ—সব মিলিয়ে অঞ্চলটির পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়েছে। এই সংঘাতের প্রভাব পড়েছে নিরাপত্তা বাহিনী, অবকাঠামো, সাধারণ মানুষ এবং বিদেশি নাগরিকদের ওপরও।

বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি বা বিএলএকে বেশ কয়েকটি বড় হামলার জন্য দায়ী করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে জাফর এক্সপ্রেস ছিনতাইয়ের ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এরপরও সহিংসতা থামেনি। ২০২৬ সালের আগস্টে বেলুচিস্তানের একটি নিরাপত্তা অভিযানে ১০ জন সশস্ত্র যোদ্ধা নিহত হওয়ার খবর আসে। একই মাসে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী দাবি করে, তারা প্রদেশটিতে ৩৭ জন সশস্ত্র যোদ্ধাকে হত্যা করেছে।

Why brute force will not end Pakistan's Balochistan insurgency | Chatham  House – International Affairs Think Tank

এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—নিজের ভূখণ্ডের ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে একটি রাষ্ট্র কত দূর যেতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই আসতে হয় সার্বভৌমত্বের ধারণায়।

সার্বভৌমত্বের অধিকার

সার্বভৌমত্ব শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক নীতি। জাতিসংঘ সনদের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের প্রথম ধারায় সব রাষ্ট্রের সার্বভৌম সমতার কথা বলা হয়েছে। একই অনুচ্ছেদের চতুর্থ ধারায় রাষ্ট্রের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে, দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের সপ্তম ধারা কোনো বিষয় সত্যিকার অর্থে একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ এখতিয়ারের মধ্যে পড়লে সেখানে বাইরের হস্তক্ষেপের সীমা নির্ধারণ করে।

এসব বিধান একসঙ্গে বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয় যে বেলুচিস্তান পাকিস্তানের ভূখণ্ড এবং সেখানে শাসন পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা ও দেশের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষার অধিকার পাকিস্তানের রয়েছে। কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর রাজনৈতিক অভিযোগ বা দাবি যুক্তিসংগত হলেও আন্তর্জাতিক আইন তাকে শক্তি প্রয়োগ করে ভূখণ্ড দখল, রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তন কিংবা পৃথক প্রশাসন প্রতিষ্ঠার অধিকার দেয় না।

তবে সার্বভৌমত্বের অর্থ সীমাহীন ক্ষমতা নয়।

রাষ্ট্রের ক্ষমতারও সীমা আছে

Balochistan Province of Pakistan: Facts on its Geography and Economy

কোনো রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হবে, তার ওপর আন্তর্জাতিক আইনের কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে।

সংঘাত যখন রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সংগঠিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে যথেষ্ট মাত্রায় তীব্র ও সংগঠিত হয়ে ওঠে, তখন সেটি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আওতায় একটি অ-আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সংঘাত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে জেনেভা কনভেনশনের সাধারণ তৃতীয় অনুচ্ছেদ এবং প্রচলিত আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বিভিন্ন বিধান কার্যকর হয়। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে অতিরিক্ত দ্বিতীয় প্রটোকলের বিধানও প্রযোজ্য হতে পারে।

এর অর্থ এই নয় যে পাকিস্তান সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে পারবে না। বরং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বলে দেয়, রাষ্ট্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠী—উভয় পক্ষকে কীভাবে সংঘাতে অংশ নিতে হবে।

বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা

এ ক্ষেত্রে তিনটি নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—লক্ষ্য নির্ধারণে পার্থক্য করা, সামঞ্জস্য বজায় রাখা এবং সতর্কতা অবলম্বন করা।

পার্থক্য করার নীতির অর্থ হলো, যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করলেই কোনো সাধারণ মানুষ বৈধ সামরিক লক্ষ্য হয়ে যায় না। যোদ্ধাদের অবশ্যই বেসামরিক মানুষের থেকে নিজেদের সামরিক কর্মকাণ্ড ও লক্ষ্য নির্ধারণে পার্থক্য করতে হবে।

সামঞ্জস্যের নীতি অনুযায়ী, বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালালেও সম্ভাব্য বেসামরিক ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। প্রত্যাশিত বেসামরিক ক্ষতি যদি ওই হামলা থেকে অর্জিত প্রত্যক্ষ ও নির্দিষ্ট সামরিক সুবিধার তুলনায় অতিরিক্ত হয়, তাহলে সেই হামলা চালানো আইনসঙ্গত হবে না।

অন্যদিকে, সতর্কতার নীতির দাবি হলো—হামলার আগে ও হামলার সময় সম্ভাব্য বেসামরিক ক্ষতি কমানোর জন্য বাস্তবসম্মত সব ব্যবস্থা নিতে হবে।

একই আইন সবার জন্য

আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এর বাধ্যবাধকতা দুই পক্ষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

বিচ্ছিন্নতাবাদী যোদ্ধারা যেমন বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে না, তেমনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাউকে জিম্মি করাও বৈধ নয়। স্বাধীনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ কিংবা রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের দাবি থাকলেও বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত হামলার কোনো আইনি ছাড় নেই।

একই নিয়ম রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর দেশের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বৈধ দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু বিপুলসংখ্যক মানুষের হত্যাকাণ্ড, জোরপূর্বক গুম কিংবা নিখোঁজ হওয়ার মতো অভিযোগকে শুধু সার্বভৌমত্বের যুক্তি দেখিয়ে উপেক্ষা করা যায় না।

সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রকে কর্তৃত্ব দেয়, কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন সেই কর্তৃত্ব কীভাবে প্রয়োগ করা হবে তার সীমাও নির্ধারণ করে।

শুধু সামরিক সমাধান যথেষ্ট নয়

Why peace remains elusive in Pakistan's troubled Balochistan | Conflict  News | Al Jazeera

এ কারণে বেলুচিস্তানের সংকট কেবল নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি একই সঙ্গে একটি আইনগত ও রাজনৈতিক সংকট।

বিদ্রোহ দমনে নিরাপত্তা অভিযান প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু তা সীমাহীন যুদ্ধের রূপ নিতে পারে না। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও সাধারণ মানুষের সুরক্ষা—একটিকে রক্ষা করতে গিয়ে অন্যটিকে বিসর্জন দেওয়ার বিষয় নয়।

বেলুচিস্তানের ভূখণ্ড পাকিস্তানের অংশ—এ অবস্থান আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে পাকিস্তানের জন্য শক্তিশালী আইনগত ভিত্তি তৈরি করে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণকারী গোষ্ঠীগুলোও আইনের বাইরে চলে যেতে পারে না। কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য তাদের আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত করে না।

স্থায়ী সমাধানের পথ

বেলুচিস্তানের সংকট শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও জনগণের অধিকারের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরির প্রশ্নও বটে।

পাকিস্তানের নিজের ভূখণ্ড রক্ষা এবং সশস্ত্র বিদ্রোহের জবাব দেওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই অধিকারের সঙ্গে দায়িত্বও যুক্ত। প্রকৃত নিরাপত্তা হুমকির মুখে সামরিক শক্তি প্রয়োজন হতে পারে, তবে সেটিই একমাত্র সমাধান হতে পারে না।

বেলুচিস্তানের রাজনৈতিক অভিযোগ নিয়ে অর্থবহ সংলাপ, জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং বৈধ প্রশাসন—দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য এসবকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সার্বভৌমত্ব একটি রাষ্ট্রের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা নিশ্চিত করে। কিন্তু সংঘাত শুরু হলে সেই ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখে। বেলুচিস্তানের ক্ষেত্রে এই দুটি নীতির কোনো একটিকে অন্যটির জন্য বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়।

কারণ সার্বভৌমত্ব শুধু ভূখণ্ড রক্ষার জন্য নয়—সেই ভূখণ্ডের মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার জন্যও।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

শিশুদের মুখে নতুন হাসি, মিশিগানে ম্যাগির উইগস ৪ কিডস-এর ২৩তম বার্ষিক গালা

বেলুচিস্তানে সার্বভৌমত্ব বনাম মানবিক সুরক্ষা: আন্তর্জাতিক আইনের সীমা কোথায়?

০৩:০৬:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বেলুচিস্তান পাকিস্তানের অংশ—এ অবস্থান থেকে ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনগত অধিকার পাকিস্তানের রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক আইন রাষ্ট্রের এই ক্ষমতাকে সীমাহীন বলে স্বীকৃতি দেয় না। একইভাবে স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র সংগ্রাম করা গোষ্ঠীগুলোর ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য।

দীর্ঘদিনের সংঘাত

বেলুচিস্তান বহু বছর ধরে পাকিস্তানের সবচেয়ে জটিল রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংকটগুলোর একটি। বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, সশস্ত্র হামলা, রাজনৈতিক অসন্তোষ এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ—সব মিলিয়ে অঞ্চলটির পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়েছে। এই সংঘাতের প্রভাব পড়েছে নিরাপত্তা বাহিনী, অবকাঠামো, সাধারণ মানুষ এবং বিদেশি নাগরিকদের ওপরও।

বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি বা বিএলএকে বেশ কয়েকটি বড় হামলার জন্য দায়ী করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে জাফর এক্সপ্রেস ছিনতাইয়ের ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এরপরও সহিংসতা থামেনি। ২০২৬ সালের আগস্টে বেলুচিস্তানের একটি নিরাপত্তা অভিযানে ১০ জন সশস্ত্র যোদ্ধা নিহত হওয়ার খবর আসে। একই মাসে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী দাবি করে, তারা প্রদেশটিতে ৩৭ জন সশস্ত্র যোদ্ধাকে হত্যা করেছে।

Why brute force will not end Pakistan's Balochistan insurgency | Chatham  House – International Affairs Think Tank

এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—নিজের ভূখণ্ডের ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে একটি রাষ্ট্র কত দূর যেতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই আসতে হয় সার্বভৌমত্বের ধারণায়।

সার্বভৌমত্বের অধিকার

সার্বভৌমত্ব শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক নীতি। জাতিসংঘ সনদের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের প্রথম ধারায় সব রাষ্ট্রের সার্বভৌম সমতার কথা বলা হয়েছে। একই অনুচ্ছেদের চতুর্থ ধারায় রাষ্ট্রের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে, দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের সপ্তম ধারা কোনো বিষয় সত্যিকার অর্থে একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ এখতিয়ারের মধ্যে পড়লে সেখানে বাইরের হস্তক্ষেপের সীমা নির্ধারণ করে।

এসব বিধান একসঙ্গে বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয় যে বেলুচিস্তান পাকিস্তানের ভূখণ্ড এবং সেখানে শাসন পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা ও দেশের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষার অধিকার পাকিস্তানের রয়েছে। কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর রাজনৈতিক অভিযোগ বা দাবি যুক্তিসংগত হলেও আন্তর্জাতিক আইন তাকে শক্তি প্রয়োগ করে ভূখণ্ড দখল, রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তন কিংবা পৃথক প্রশাসন প্রতিষ্ঠার অধিকার দেয় না।

তবে সার্বভৌমত্বের অর্থ সীমাহীন ক্ষমতা নয়।

রাষ্ট্রের ক্ষমতারও সীমা আছে

Balochistan Province of Pakistan: Facts on its Geography and Economy

কোনো রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হবে, তার ওপর আন্তর্জাতিক আইনের কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে।

সংঘাত যখন রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সংগঠিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে যথেষ্ট মাত্রায় তীব্র ও সংগঠিত হয়ে ওঠে, তখন সেটি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আওতায় একটি অ-আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সংঘাত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে জেনেভা কনভেনশনের সাধারণ তৃতীয় অনুচ্ছেদ এবং প্রচলিত আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বিভিন্ন বিধান কার্যকর হয়। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে অতিরিক্ত দ্বিতীয় প্রটোকলের বিধানও প্রযোজ্য হতে পারে।

এর অর্থ এই নয় যে পাকিস্তান সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে পারবে না। বরং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বলে দেয়, রাষ্ট্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠী—উভয় পক্ষকে কীভাবে সংঘাতে অংশ নিতে হবে।

বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা

এ ক্ষেত্রে তিনটি নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—লক্ষ্য নির্ধারণে পার্থক্য করা, সামঞ্জস্য বজায় রাখা এবং সতর্কতা অবলম্বন করা।

পার্থক্য করার নীতির অর্থ হলো, যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করলেই কোনো সাধারণ মানুষ বৈধ সামরিক লক্ষ্য হয়ে যায় না। যোদ্ধাদের অবশ্যই বেসামরিক মানুষের থেকে নিজেদের সামরিক কর্মকাণ্ড ও লক্ষ্য নির্ধারণে পার্থক্য করতে হবে।

সামঞ্জস্যের নীতি অনুযায়ী, বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালালেও সম্ভাব্য বেসামরিক ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। প্রত্যাশিত বেসামরিক ক্ষতি যদি ওই হামলা থেকে অর্জিত প্রত্যক্ষ ও নির্দিষ্ট সামরিক সুবিধার তুলনায় অতিরিক্ত হয়, তাহলে সেই হামলা চালানো আইনসঙ্গত হবে না।

অন্যদিকে, সতর্কতার নীতির দাবি হলো—হামলার আগে ও হামলার সময় সম্ভাব্য বেসামরিক ক্ষতি কমানোর জন্য বাস্তবসম্মত সব ব্যবস্থা নিতে হবে।

একই আইন সবার জন্য

আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এর বাধ্যবাধকতা দুই পক্ষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

বিচ্ছিন্নতাবাদী যোদ্ধারা যেমন বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে না, তেমনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাউকে জিম্মি করাও বৈধ নয়। স্বাধীনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ কিংবা রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের দাবি থাকলেও বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত হামলার কোনো আইনি ছাড় নেই।

একই নিয়ম রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর দেশের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বৈধ দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু বিপুলসংখ্যক মানুষের হত্যাকাণ্ড, জোরপূর্বক গুম কিংবা নিখোঁজ হওয়ার মতো অভিযোগকে শুধু সার্বভৌমত্বের যুক্তি দেখিয়ে উপেক্ষা করা যায় না।

সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রকে কর্তৃত্ব দেয়, কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন সেই কর্তৃত্ব কীভাবে প্রয়োগ করা হবে তার সীমাও নির্ধারণ করে।

শুধু সামরিক সমাধান যথেষ্ট নয়

Why peace remains elusive in Pakistan's troubled Balochistan | Conflict  News | Al Jazeera

এ কারণে বেলুচিস্তানের সংকট কেবল নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি একই সঙ্গে একটি আইনগত ও রাজনৈতিক সংকট।

বিদ্রোহ দমনে নিরাপত্তা অভিযান প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু তা সীমাহীন যুদ্ধের রূপ নিতে পারে না। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও সাধারণ মানুষের সুরক্ষা—একটিকে রক্ষা করতে গিয়ে অন্যটিকে বিসর্জন দেওয়ার বিষয় নয়।

বেলুচিস্তানের ভূখণ্ড পাকিস্তানের অংশ—এ অবস্থান আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে পাকিস্তানের জন্য শক্তিশালী আইনগত ভিত্তি তৈরি করে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণকারী গোষ্ঠীগুলোও আইনের বাইরে চলে যেতে পারে না। কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য তাদের আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত করে না।

স্থায়ী সমাধানের পথ

বেলুচিস্তানের সংকট শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও জনগণের অধিকারের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরির প্রশ্নও বটে।

পাকিস্তানের নিজের ভূখণ্ড রক্ষা এবং সশস্ত্র বিদ্রোহের জবাব দেওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই অধিকারের সঙ্গে দায়িত্বও যুক্ত। প্রকৃত নিরাপত্তা হুমকির মুখে সামরিক শক্তি প্রয়োজন হতে পারে, তবে সেটিই একমাত্র সমাধান হতে পারে না।

বেলুচিস্তানের রাজনৈতিক অভিযোগ নিয়ে অর্থবহ সংলাপ, জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং বৈধ প্রশাসন—দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য এসবকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সার্বভৌমত্ব একটি রাষ্ট্রের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা নিশ্চিত করে। কিন্তু সংঘাত শুরু হলে সেই ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখে। বেলুচিস্তানের ক্ষেত্রে এই দুটি নীতির কোনো একটিকে অন্যটির জন্য বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়।

কারণ সার্বভৌমত্ব শুধু ভূখণ্ড রক্ষার জন্য নয়—সেই ভূখণ্ডের মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার জন্যও।