০৪:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিশুদের মুখে নতুন হাসি, মিশিগানে ম্যাগির উইগস ৪ কিডস-এর ২৩তম বার্ষিক গালা নাসার রোমান টেলিস্কোপের নতুন ঠিকানার পথে তিন মাসের মহাকাশযাত্রা মাত্র ১০ সেন্টিমিটার উচ্চতার ‘কিউটি পাই’ গোলাপ, ছোট বাগান সাজাতে দারুণ প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে স্বনির্ভর করতে অভিভাবকের যে ৬টি পদক্ষেপ জরুরি বাড়িতে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান থাকলে সম্পর্ক ভালো রাখার উপায় জলবায়ু পরিবর্তনে আরও শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো, হাজার বছরের প্রবাল রেকর্ডে মিলল প্রমাণ স্কুলের নকশাই গড়ে তুলতে পারে সংস্কৃতি, পরিচয় ও আপন হওয়ার অনুভূতি বাড়ির আঙিনায় পাখিকে খাবার দেওয়া কি সত্যিই ভালো, নাকি ডেকে আনছে বিপদ? যুক্তরাষ্ট্রের  রোবট ও ড্রোন গবেষণায় নতুন যুগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হচ্ছে অত্যাধুনিক পরীক্ষাগার ভারতের খাদ্যপণ্যে সতর্কবার্তার প্রস্তাব ঘিরে দুই দিক থেকেই তীব্র আপত্তি

সমুদ্র ও উপকূলের ক্যানভাসে আমেরিকার ইতিহাস, যুদ্ধ ও জীবন

আটলান্টিক মহাসাগর আমেরিকার ইতিহাসে শুধু ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্নতার প্রতীক ছিল না; একই সঙ্গে এটি ছিল মানুষ, পণ্য, ভাবনা ও সংস্কৃতির আদান-প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ পথ। ঔপনিবেশিক যুগ থেকেই সমুদ্রপথকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য ও শিল্প-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। গড়ে ওঠে বন্দরনগরী, তৈরি হয় নতুন কর্মসংস্থান ও সম্পদের সুযোগ। এর পাশাপাশি সমুদ্র আমেরিকার শিল্পকলাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

সমুদ্র থেকে শিল্পের নতুন দিগন্ত

আঠারো শতক থেকে বিশ শতকের শুরুর সময় পর্যন্ত আমেরিকার উপকূল, নদী, বন্দর, নৌযুদ্ধ ও সমুদ্রযাত্রা শিল্পীদের কাছে হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সামুদ্রিক দৃশ্যচিত্রের পাশাপাশি যুদ্ধজাহাজ, নাবিক, জেলেজীবন, পর্যটন ও উপকূলীয় প্রকৃতিও উঠে আসে তাঁদের ক্যানভাসে।

‘দ্য কোস্ট অ্যান্ড দ্য সি’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে ৫২টি চিত্রকর্ম এবং ১০টি সামুদ্রিক নিদর্শনের মাধ্যমে আমেরিকার সমুদ্রকেন্দ্রিক শিল্প ও ইতিহাসের এই দীর্ঘ যাত্রাকে তুলে ধরা হয়। এতে যেমন সমুদ্রের অপরিসীম সৌন্দর্য ও ভয়ংকর শক্তি ফুটে উঠেছে, তেমনি আমেরিকার প্রাথমিক নৌযুদ্ধ, বন্দরনগরীর জীবন এবং উপকূলীয় অবকাশযাপনের দৃশ্যও স্থান পেয়েছে।

হাডসন নদীতে যুদ্ধের স্মৃতি

উইলিয়াম জয়-এর আঁকা ‘ফোর্সিং দ্য হাডসন রিভার প্যাসেজ’ ছবিতে ১৭৭৬ সালের অক্টোবরের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌযুদ্ধের দৃশ্য দেখা যায়। ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজগুলো আমেরিকান প্রতিরক্ষা ভেদ করে হাডসন নদীর নিম্নাংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

ছবিতে ব্রিটিশ জাহাজগুলোকে আমেরিকান দুর্গের গোলাবর্ষণের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। চিত্রটি মূলত ব্রিটিশ সামুদ্রিক শিল্পী ডমিনিক সেরের আঁকা তিনটি ছবির ভিত্তিতে উইলিয়াম জয় তৈরি করেছিলেন।

সমুদ্রযুদ্ধে যুদ্ধজাহাজের বীরত্ব

থমাস বাটারসওয়ার্থ আমেরিকা ও ব্রিটেনের মধ্যকার ১৮১২ সালের যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ নৌসংঘর্ষগুলোকে তাঁর ছবিতে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর ‘এস্কেপ অব দ্য এইচএমএস বিলভিডেরা ফ্রম দ্য ইউএস ফ্রিগেট প্রেসিডেন্ট’ ছবিতে যুদ্ধরত দুটি শক্তিশালী জাহাজের নাটকীয় সংঘর্ষ ফুটে উঠেছে।

তাঁর ছবিগুলো পরবর্তীকালে মুদ্রিত প্রতিলিপির মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। তবে সমুদ্রে যুদ্ধরত জাহাজের শক্তি, উত্তেজনা ও নাটকীয়তা সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর তেলচিত্রগুলোতে।

ক্যানভাসে জাতীয় গৌরব

জেমস গাই ইভান্সের একটি চিত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর চারটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধজাহাজকে পূর্ণ পাল তুলে সমুদ্রে দেখা যায়। ‘ডেলাওয়্যার’, ‘নর্থ ক্যারোলাইনা’, ‘ব্র্যান্ডিওয়াইন’ ও ‘কনস্টিটিউশন’—এই জাহাজগুলো শুধু সামরিক শক্তির প্রতীক ছিল না, বরং নতুন রাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয় ও আত্মমর্যাদারও প্রতিচ্ছবি।

চিত্রটিতে যুদ্ধজাহাজগুলোকে যেন একটি নৌকুচকাওয়াজে সাজানো হয়েছে। শিল্পী জাহাজগুলোর নামের পাশাপাশি যুদ্ধকালীন বিখ্যাত আহ্বানও যুক্ত করেছিলেন, যা আমেরিকান নৌসাহসের প্রতীক হয়ে ওঠে।

হাডসন নদীর সৌন্দর্য ও বাণিজ্য

রবার্ট হ্যাভেলের আঁকা ট্যারিটাউন হাইটস থেকে হাডসন নদীর দৃশ্য আমেরিকার বাণিজ্যিক বিকাশের আরেকটি চিত্র তুলে ধরে। উনিশ শতকে হাডসন নদীর বিস্তৃত জলপথ নিউইয়র্ককে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করতে বড় ভূমিকা রাখে।

চিত্রটিতে নদীর বিস্তীর্ণ জলরাশি, পালতোলা নৌকা ও বাষ্পচালিত নৌযানের পাশাপাশি নদীর তীরের বাড়িঘরও দেখা যায়। বাণিজ্যিক ব্যস্ততার পাশাপাশি হাডসনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধনী নগরবাসীকে আকৃষ্ট করেছিল। ফলে নদীর তীরবর্তী অঞ্চল ধীরে ধীরে অবকাশযাপন ও বসবাসের জনপ্রিয় জায়গায় পরিণত হয়।

‘কনস্টিটিউশন’-এর দুঃসাহসিক পলায়ন

থমাস বার্চের আঁকা ‘এস্কেপ অব দ্য ইউএস ফ্রিগেট কনস্টিটিউশন’ ছবিতে ১৮১২ সালের যুদ্ধের একটি নাটকীয় ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।

ব্রিটিশ নৌবহরের তাড়া খেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ‘কনস্টিটিউশন’ কীভাবে পালিয়ে যায়, সেটিই ছবির মূল বিষয়। বাতাস থেমে যাওয়ার পর জাহাজটিকে দীর্ঘ নৌকা ব্যবহার করে টেনে এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে অনুকূল বাতাস ফিরে এলে জাহাজটি ব্রিটিশ অনুসরণকারীদের হাত থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

বার্চ ছবিতে জাহাজটিকে টেনে নেওয়ার সেই কৌশলও তুলে ধরেছেন। ফলে চিত্রটি শুধু যুদ্ধের দৃশ্য নয়, নাবিকদের দক্ষতা ও উপস্থিত বুদ্ধিরও দলিল হয়ে উঠেছে।

সমুদ্রভ্রমণে অবকাশের আনন্দ

উনিশ শতকের শেষভাগে সমুদ্র ও উপকূল শুধু যুদ্ধ বা বাণিজ্যের জায়গা ছিল না; এটি ধীরে ধীরে অবকাশযাপনের জনপ্রিয় ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

জুনিয়াস ব্রুটাস স্টিয়ার্নসের ‘গ্রেট সাউথ বে-তে ক্যাটবোটে মাছ ধরা’ ছবিতে সেই পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া যায়। একটি ছোট নৌকায় স্থানীয় নাবিকের সঙ্গে মাছ ধরতে বেরিয়েছে শহুরে পর্যটকেরা। তাঁদের পোশাকের পার্থক্য স্থানীয় মানুষ ও আগন্তুকদের আলাদা করে চেনায়।

ছবিতে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ এবং মাছ ধরার আনন্দময় পরিবেশ উনিশ শতকের সামুদ্রিক অবকাশসংস্কৃতির জনপ্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়।

সূর্যাস্তে নির্জন সমুদ্রতট

জন ফ্রেডেরিক কেনসেট উপকূলীয় দৃশ্যচিত্রকে আমেরিকান শিল্পকলায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসা শিল্পীদের অন্যতম। তাঁর ‘সানসেট অন দ্য কোস্ট’ ছবিতে জনমানবহীন একটি উপকূলকে অস্তগামী সূর্যের আলোয় দেখা যায়।

দূরে কয়েকটি পালতোলা নৌকা থাকলেও পুরো দৃশ্যে বিরাজ করছে গভীর নির্জনতা। সমুদ্রের জল, আকাশ ও সূর্যের আলো মিলিয়ে ছবিটি প্রকৃতির প্রশান্ত অথচ মহিমান্বিত রূপ প্রকাশ করে।

নীরব জলে পালতোলা নৌকা

ফ্রান্সিস অগাস্টা সিলভার ‘অফ সিটি আইল্যান্ড, নিউইয়র্ক’ ছবিতে বিস্তৃত আকাশ ও শান্ত জলরাশির এক মনোরম দৃশ্য দেখা যায়। জলের ওপর স্থির হয়ে থাকা পালতোলা নৌকা এবং আকাশের আলো ছবিটিকে এক ধরনের কাব্যিক আবহ দিয়েছে।

সিটি আইল্যান্ড তখন ছিল ঝিনুক সংগ্রহকারী ও জাহাজ নির্মাতাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরসমাজ। হাডসন ও নিউইয়র্ক বন্দরের পাশাপাশি এ ধরনের ছোট উপকূলীয় জনপদও আমেরিকার সামুদ্রিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

দূরদেশের সমুদ্রের রোমাঞ্চ

মরিটজ ফ্রেডেরিক হেনড্রিক ডি হাসের ‘ট্রপিক্যাল সানসেট অ্যাট সি’ ছবিতে সমুদ্রযাত্রার রোমান্টিক ও রোমাঞ্চকর দিক ফুটে উঠেছে। নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী সামুদ্রিক চিত্রকলায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে এসে স্থায়ী হন।

সূর্যাস্তের উজ্জ্বল আকাশের সামনে একটি বিশাল জাহাজের পালকে কালো অবয়বে তুলে ধরেছেন শিল্পী। দূরদেশের সমুদ্র, অজানা ভূখণ্ড এবং দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার কল্পনা ছবিটিকে দিয়েছে এক ধরনের অভিযাত্রিক আবহ।

সমুদ্রের সঙ্গে আমেরিকার শিল্প-ইতিহাস

এই শিল্পকর্মগুলো একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, আমেরিকার ইতিহাসে সমুদ্রের ভূমিকা কতটা গভীর। যুদ্ধজাহাজের সংঘর্ষ থেকে বাণিজ্যিক নৌযান, জেলেদের জীবন থেকে পর্যটকের অবকাশ, আবার নির্জন সমুদ্রতট থেকে দূরদেশের রোমাঞ্চ—সবকিছুই সামুদ্রিক শিল্পকলায় নিজস্ব ভাষা পেয়েছে।

সমুদ্র তাই এখানে শুধু প্রকৃতির একটি অংশ নয়। এটি জাতীয় পরিচয়, অর্থনৈতিক বিকাশ, সামরিক শক্তি, সামাজিক পরিবর্তন এবং মানুষের কল্পনারও প্রতীক।

প্রদর্শনীটি নিউইয়র্কের ঐতিহাসিক সমাজের সংগ্রহ থেকে তৈরি একটি ভ্রাম্যমাণ আয়োজন হিসেবে বিভিন্ন জাদুঘরে প্রদর্শিত হয়েছিল। এর সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল একটি সংকলন, যেখানে আমেরিকার সামুদ্রিক ও নৌ-শিল্পের এই দীর্ঘ ঐতিহ্যকে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা হয়।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

শিশুদের মুখে নতুন হাসি, মিশিগানে ম্যাগির উইগস ৪ কিডস-এর ২৩তম বার্ষিক গালা

সমুদ্র ও উপকূলের ক্যানভাসে আমেরিকার ইতিহাস, যুদ্ধ ও জীবন

০৩:১২:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আটলান্টিক মহাসাগর আমেরিকার ইতিহাসে শুধু ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্নতার প্রতীক ছিল না; একই সঙ্গে এটি ছিল মানুষ, পণ্য, ভাবনা ও সংস্কৃতির আদান-প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ পথ। ঔপনিবেশিক যুগ থেকেই সমুদ্রপথকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য ও শিল্প-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। গড়ে ওঠে বন্দরনগরী, তৈরি হয় নতুন কর্মসংস্থান ও সম্পদের সুযোগ। এর পাশাপাশি সমুদ্র আমেরিকার শিল্পকলাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

সমুদ্র থেকে শিল্পের নতুন দিগন্ত

আঠারো শতক থেকে বিশ শতকের শুরুর সময় পর্যন্ত আমেরিকার উপকূল, নদী, বন্দর, নৌযুদ্ধ ও সমুদ্রযাত্রা শিল্পীদের কাছে হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সামুদ্রিক দৃশ্যচিত্রের পাশাপাশি যুদ্ধজাহাজ, নাবিক, জেলেজীবন, পর্যটন ও উপকূলীয় প্রকৃতিও উঠে আসে তাঁদের ক্যানভাসে।

‘দ্য কোস্ট অ্যান্ড দ্য সি’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে ৫২টি চিত্রকর্ম এবং ১০টি সামুদ্রিক নিদর্শনের মাধ্যমে আমেরিকার সমুদ্রকেন্দ্রিক শিল্প ও ইতিহাসের এই দীর্ঘ যাত্রাকে তুলে ধরা হয়। এতে যেমন সমুদ্রের অপরিসীম সৌন্দর্য ও ভয়ংকর শক্তি ফুটে উঠেছে, তেমনি আমেরিকার প্রাথমিক নৌযুদ্ধ, বন্দরনগরীর জীবন এবং উপকূলীয় অবকাশযাপনের দৃশ্যও স্থান পেয়েছে।

হাডসন নদীতে যুদ্ধের স্মৃতি

উইলিয়াম জয়-এর আঁকা ‘ফোর্সিং দ্য হাডসন রিভার প্যাসেজ’ ছবিতে ১৭৭৬ সালের অক্টোবরের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌযুদ্ধের দৃশ্য দেখা যায়। ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজগুলো আমেরিকান প্রতিরক্ষা ভেদ করে হাডসন নদীর নিম্নাংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

ছবিতে ব্রিটিশ জাহাজগুলোকে আমেরিকান দুর্গের গোলাবর্ষণের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। চিত্রটি মূলত ব্রিটিশ সামুদ্রিক শিল্পী ডমিনিক সেরের আঁকা তিনটি ছবির ভিত্তিতে উইলিয়াম জয় তৈরি করেছিলেন।

সমুদ্রযুদ্ধে যুদ্ধজাহাজের বীরত্ব

থমাস বাটারসওয়ার্থ আমেরিকা ও ব্রিটেনের মধ্যকার ১৮১২ সালের যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ নৌসংঘর্ষগুলোকে তাঁর ছবিতে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর ‘এস্কেপ অব দ্য এইচএমএস বিলভিডেরা ফ্রম দ্য ইউএস ফ্রিগেট প্রেসিডেন্ট’ ছবিতে যুদ্ধরত দুটি শক্তিশালী জাহাজের নাটকীয় সংঘর্ষ ফুটে উঠেছে।

তাঁর ছবিগুলো পরবর্তীকালে মুদ্রিত প্রতিলিপির মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। তবে সমুদ্রে যুদ্ধরত জাহাজের শক্তি, উত্তেজনা ও নাটকীয়তা সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর তেলচিত্রগুলোতে।

ক্যানভাসে জাতীয় গৌরব

জেমস গাই ইভান্সের একটি চিত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর চারটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধজাহাজকে পূর্ণ পাল তুলে সমুদ্রে দেখা যায়। ‘ডেলাওয়্যার’, ‘নর্থ ক্যারোলাইনা’, ‘ব্র্যান্ডিওয়াইন’ ও ‘কনস্টিটিউশন’—এই জাহাজগুলো শুধু সামরিক শক্তির প্রতীক ছিল না, বরং নতুন রাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয় ও আত্মমর্যাদারও প্রতিচ্ছবি।

চিত্রটিতে যুদ্ধজাহাজগুলোকে যেন একটি নৌকুচকাওয়াজে সাজানো হয়েছে। শিল্পী জাহাজগুলোর নামের পাশাপাশি যুদ্ধকালীন বিখ্যাত আহ্বানও যুক্ত করেছিলেন, যা আমেরিকান নৌসাহসের প্রতীক হয়ে ওঠে।

হাডসন নদীর সৌন্দর্য ও বাণিজ্য

রবার্ট হ্যাভেলের আঁকা ট্যারিটাউন হাইটস থেকে হাডসন নদীর দৃশ্য আমেরিকার বাণিজ্যিক বিকাশের আরেকটি চিত্র তুলে ধরে। উনিশ শতকে হাডসন নদীর বিস্তৃত জলপথ নিউইয়র্ককে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করতে বড় ভূমিকা রাখে।

চিত্রটিতে নদীর বিস্তীর্ণ জলরাশি, পালতোলা নৌকা ও বাষ্পচালিত নৌযানের পাশাপাশি নদীর তীরের বাড়িঘরও দেখা যায়। বাণিজ্যিক ব্যস্ততার পাশাপাশি হাডসনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধনী নগরবাসীকে আকৃষ্ট করেছিল। ফলে নদীর তীরবর্তী অঞ্চল ধীরে ধীরে অবকাশযাপন ও বসবাসের জনপ্রিয় জায়গায় পরিণত হয়।

‘কনস্টিটিউশন’-এর দুঃসাহসিক পলায়ন

থমাস বার্চের আঁকা ‘এস্কেপ অব দ্য ইউএস ফ্রিগেট কনস্টিটিউশন’ ছবিতে ১৮১২ সালের যুদ্ধের একটি নাটকীয় ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।

ব্রিটিশ নৌবহরের তাড়া খেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ‘কনস্টিটিউশন’ কীভাবে পালিয়ে যায়, সেটিই ছবির মূল বিষয়। বাতাস থেমে যাওয়ার পর জাহাজটিকে দীর্ঘ নৌকা ব্যবহার করে টেনে এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে অনুকূল বাতাস ফিরে এলে জাহাজটি ব্রিটিশ অনুসরণকারীদের হাত থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

বার্চ ছবিতে জাহাজটিকে টেনে নেওয়ার সেই কৌশলও তুলে ধরেছেন। ফলে চিত্রটি শুধু যুদ্ধের দৃশ্য নয়, নাবিকদের দক্ষতা ও উপস্থিত বুদ্ধিরও দলিল হয়ে উঠেছে।

সমুদ্রভ্রমণে অবকাশের আনন্দ

উনিশ শতকের শেষভাগে সমুদ্র ও উপকূল শুধু যুদ্ধ বা বাণিজ্যের জায়গা ছিল না; এটি ধীরে ধীরে অবকাশযাপনের জনপ্রিয় ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

জুনিয়াস ব্রুটাস স্টিয়ার্নসের ‘গ্রেট সাউথ বে-তে ক্যাটবোটে মাছ ধরা’ ছবিতে সেই পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া যায়। একটি ছোট নৌকায় স্থানীয় নাবিকের সঙ্গে মাছ ধরতে বেরিয়েছে শহুরে পর্যটকেরা। তাঁদের পোশাকের পার্থক্য স্থানীয় মানুষ ও আগন্তুকদের আলাদা করে চেনায়।

ছবিতে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ এবং মাছ ধরার আনন্দময় পরিবেশ উনিশ শতকের সামুদ্রিক অবকাশসংস্কৃতির জনপ্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়।

সূর্যাস্তে নির্জন সমুদ্রতট

জন ফ্রেডেরিক কেনসেট উপকূলীয় দৃশ্যচিত্রকে আমেরিকান শিল্পকলায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসা শিল্পীদের অন্যতম। তাঁর ‘সানসেট অন দ্য কোস্ট’ ছবিতে জনমানবহীন একটি উপকূলকে অস্তগামী সূর্যের আলোয় দেখা যায়।

দূরে কয়েকটি পালতোলা নৌকা থাকলেও পুরো দৃশ্যে বিরাজ করছে গভীর নির্জনতা। সমুদ্রের জল, আকাশ ও সূর্যের আলো মিলিয়ে ছবিটি প্রকৃতির প্রশান্ত অথচ মহিমান্বিত রূপ প্রকাশ করে।

নীরব জলে পালতোলা নৌকা

ফ্রান্সিস অগাস্টা সিলভার ‘অফ সিটি আইল্যান্ড, নিউইয়র্ক’ ছবিতে বিস্তৃত আকাশ ও শান্ত জলরাশির এক মনোরম দৃশ্য দেখা যায়। জলের ওপর স্থির হয়ে থাকা পালতোলা নৌকা এবং আকাশের আলো ছবিটিকে এক ধরনের কাব্যিক আবহ দিয়েছে।

সিটি আইল্যান্ড তখন ছিল ঝিনুক সংগ্রহকারী ও জাহাজ নির্মাতাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরসমাজ। হাডসন ও নিউইয়র্ক বন্দরের পাশাপাশি এ ধরনের ছোট উপকূলীয় জনপদও আমেরিকার সামুদ্রিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

দূরদেশের সমুদ্রের রোমাঞ্চ

মরিটজ ফ্রেডেরিক হেনড্রিক ডি হাসের ‘ট্রপিক্যাল সানসেট অ্যাট সি’ ছবিতে সমুদ্রযাত্রার রোমান্টিক ও রোমাঞ্চকর দিক ফুটে উঠেছে। নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী সামুদ্রিক চিত্রকলায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে এসে স্থায়ী হন।

সূর্যাস্তের উজ্জ্বল আকাশের সামনে একটি বিশাল জাহাজের পালকে কালো অবয়বে তুলে ধরেছেন শিল্পী। দূরদেশের সমুদ্র, অজানা ভূখণ্ড এবং দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার কল্পনা ছবিটিকে দিয়েছে এক ধরনের অভিযাত্রিক আবহ।

সমুদ্রের সঙ্গে আমেরিকার শিল্প-ইতিহাস

এই শিল্পকর্মগুলো একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, আমেরিকার ইতিহাসে সমুদ্রের ভূমিকা কতটা গভীর। যুদ্ধজাহাজের সংঘর্ষ থেকে বাণিজ্যিক নৌযান, জেলেদের জীবন থেকে পর্যটকের অবকাশ, আবার নির্জন সমুদ্রতট থেকে দূরদেশের রোমাঞ্চ—সবকিছুই সামুদ্রিক শিল্পকলায় নিজস্ব ভাষা পেয়েছে।

সমুদ্র তাই এখানে শুধু প্রকৃতির একটি অংশ নয়। এটি জাতীয় পরিচয়, অর্থনৈতিক বিকাশ, সামরিক শক্তি, সামাজিক পরিবর্তন এবং মানুষের কল্পনারও প্রতীক।

প্রদর্শনীটি নিউইয়র্কের ঐতিহাসিক সমাজের সংগ্রহ থেকে তৈরি একটি ভ্রাম্যমাণ আয়োজন হিসেবে বিভিন্ন জাদুঘরে প্রদর্শিত হয়েছিল। এর সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল একটি সংকলন, যেখানে আমেরিকার সামুদ্রিক ও নৌ-শিল্পের এই দীর্ঘ ঐতিহ্যকে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা হয়।