ভবিষ্যতের যুদ্ধের জন্য মার্কিন সেনাবাহিনীকে আমূল বদলে দেওয়ার যে উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা এখন বড় ধরনের নেতৃত্ব সংকটে পড়েছে। সেনাবাহিনীর রূপান্তরের অন্যতম প্রধান দুই মুখ—সেনাবাহিনীর সচিব ড্যান ড্রিসকল এবং সাবেক চিফ অব স্টাফ জেনারেল র্যান্ডি জর্জ—দুজনই এখন দায়িত্বে নেই।
ড্যান ড্রিসকল সোমবার পদত্যাগ করেছেন। এর আগে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সেনাবাহিনীর তৎকালীন প্রধান জেনারেল র্যান্ডি জর্জকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন। ফলে আধুনিকায়ন ও ভবিষ্যৎ যুদ্ধের উপযোগী করে সেনাবাহিনীকে পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলো এখন কতটা এগোবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
শীতল যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ
গত বছরের শুরুতে হেগসেথ সেনাবাহিনীতে ব্যাপক পরিবর্তনের নির্দেশ দেন। এটিকে শীতল যুদ্ধের পর সেনাবাহিনীর কাঠামো ও অগ্রাধিকারে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়েছিল।
পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতের যুদ্ধে সেনাদের আরও কার্যকর ও প্রাণঘাতী করে তোলা। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন ডিভিশনে বিপুলসংখ্যক চালকবিহীন আকাশযান যুক্ত করা, পুরোনো সামরিক সরঞ্জাম বাদ দেওয়া এবং অস্ত্র সংগ্রহ ও উন্নয়নের পদ্ধতিতে সংস্কার আনার কথা ছিল।
আগামী পাঁচ বছরে এই রূপান্তর কর্মসূচির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ড্রিসকল ও জর্জ এই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান দুই নেতৃত্বে পরিণত হয়েছিলেন। ড্রিসকল সেনাবাহিনীর সঙ্গে বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাজের ধরন বদলানোর ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে চালকবিহীন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দ্রুত নতুন প্রযুক্তি সেনাবাহিনীতে যুক্ত করার পক্ষে অবস্থান নেন।
তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ভবিষ্যৎ যুদ্ধে সেনাদের সক্ষমতাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত।
ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ
ড্রিসকলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তৈরি অস্ত্র ও সামরিক ব্যবস্থার মধ্যে প্রযুক্তিগত সমন্বয় তৈরি করা। এর লক্ষ্য ছিল আলাদা আলাদা অস্ত্র ও সেন্সরকে এমনভাবে যুক্ত করা, যাতে যুদ্ধক্ষেত্রে সেনারা সহজে বিভিন্ন ব্যবস্থা একসঙ্গে ব্যবহার করতে পারেন।
ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে চালকবিহীন আকাশযান, সেন্সর ও অস্ত্রকে একটি সমন্বিত যুদ্ধ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সাফল্য দেখে এই উদ্যোগের ধারণা আরও জোরালো হয়।
অন্যদিকে জেনারেল জর্জ সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের বেশ কয়েকটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এর মধ্যে নতুন ধরনের ডিজিটাল কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরির পরীক্ষাও ছিল।
চালকবিহীন আকাশযানের বিশেষ ইউনিট ভেঙে দেওয়া
জর্জের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল একটি পরীক্ষামূলক চালকবিহীন আক্রমণ ব্যাটালিয়ন গঠন। ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকে পাওয়া চালকবিহীন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো এবং তা সেনাবাহিনীর অন্যান্য ইউনিটে ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল এই ইউনিটের প্রধান উদ্দেশ্য।
কিন্তু গত মাসে জর্জের ভারপ্রাপ্ত উত্তরসূরি জেনারেল ক্রিস্টোফার লানিভে ইউনিটটি ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইউনিটটি চলতি মাসে শেষ হতে যাওয়া একটি সামরিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। মহড়া শেষে সেখানে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও গত এক বছরের পর্যবেক্ষণ সেনাবাহিনীর কাছে তুলে দেওয়া হবে। এরপর ইউনিটটি আবার প্রচলিত আকাশপথে মোতায়েনযোগ্য পদাতিক বাহিনী হিসেবে কাজ করবে।
এই সিদ্ধান্ত সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বিস্ময় তৈরি করেছে।
কারণ একই সময়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা কাঠামোতে চালকবিহীন যুদ্ধব্যবস্থাকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগ চলছে এবং এই খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চালকবিহীন যুদ্ধের ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে অভিজ্ঞ দেশগুলোর একটি ইউক্রেনের কাছ থেকে সরাসরি শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ সীমিত করে দেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নেতৃত্বের পরিবর্তনে অনিশ্চয়তায় রূপান্তর পরিকল্পনা
মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং চালকবিহীন ব্যবস্থার ব্যবহার এখনো অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জেনারেল লানিভেও বলেছেন, পরিবর্তনের কাজ অব্যাহত থাকবে। তবে একই সঙ্গে তিনি যুদ্ধের মৌলিক সক্ষমতা এবং সেনাদের প্রস্তুতিকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে সেনাবাহিনীর বৃহত্তর রূপান্তর কর্মসূচি এখন অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মার্কিন সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে অবস্থান থাকলেও ড্রিসকল ও জর্জের সময়ে শুরু হওয়া নির্দিষ্ট উদ্যোগগুলো কতটা টিকে থাকবে, তা স্পষ্ট নয়।
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তনগুলো যদি অব্যাহতও থাকে, সেগুলোকে সামনে থেকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















