পাকিস্তানে শিশুদের অপুষ্টি ও শারীরিক বৃদ্ধিতে বাধাগ্রস্ত হওয়ার সংকট দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। দেশটির পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৪০ শতাংশেরও বেশি খর্বাকৃতির হয়ে বেড়ে উঠছে। একই সঙ্গে অপুষ্টির কারণে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে।
ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে ‘অ্যাক্ট ফর নিউট্রিশন: দ্য এমার্জেন্সি উই ক্যান নো লঙ্গার ইগনোর’ শীর্ষক দুই দিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এসব উদ্বেগ উঠে এসেছে। সম্মেলনে নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, পুষ্টিবিদ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা পাকিস্তানের পুষ্টি সংকট মোকাবিলায় জরুরি ও সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
খর্বাকৃতির শিশুদের বড় অংশ মধ্যম আয়ের দেশে
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পুষ্টিবিষয়ক উপদেষ্টা নোরা হবস জানিয়েছেন, বিশ্বের খর্বাকৃতির শিশুদের ৮০ শতাংশের বেশি মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বসবাস করে।
তিনি বলেন, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে খর্বাকৃতির শিশুর হার তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় সেখানে আক্রান্ত শিশুর মোট সংখ্যাও বেশি।
তার মতে, এই বাস্তবতা দেখিয়ে দেয় যে খর্বাকৃতির সমস্যা শুধু দারিদ্র্যের ফল নয়; বরং একটি দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যমান বৈষম্যের সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

অপুষ্টি আর শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়
পাকিস্তানে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী পার্নিল ইরনসাইড বলেন, অপুষ্টি এমন একটি জরুরি সংকট, যাকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, পুষ্টি শুধু একটি শিশু কী খাচ্ছে তার বিষয় নয়। এর সঙ্গে শিশুর পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন, দেশের মানবসম্পদ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সুযোগের সমতা সরাসরি যুক্ত।
দরিদ্র ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জলবায়ু দুর্যোগ, অর্থনৈতিক ধাক্কা ও বাস্তুচ্যুতির কারণে বহু বছরের উন্নয়ন কার্যক্রমও দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সংকট দেখা দেওয়ার পর পুষ্টি কার্যক্রম শুরু না করে আগে থেকেই প্রস্তুতি ও ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থার মধ্যে পুষ্টিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
২৬০ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে পারে না
রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক জিয়াকোমো জানেল্লো জানান, বিশ্বে প্রায় ২৬০ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যকর খাদ্য কিনতে সক্ষম নয়।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আঘাত, সংঘাত, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যসেবার ওপর বাড়তি চাপ একসঙ্গে খাদ্য ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
তার মতে, অপুষ্টি মোকাবিলায় খাদ্যব্যবস্থা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সামাজিক সুরক্ষাকে আলাদা করে দেখলে চলবে না। সংকটের সময় সমন্বিত ব্যবস্থা হঠাৎ তৈরি করা সম্ভব নয়; এর প্রস্তুতি আগে থেকেই নিতে হবে।
সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর আহ্বান
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির কর্মকর্তা নোরা হবস বলেন, সামাজিক সুরক্ষা শুধু দারিদ্র্য কমানোর উপায় বা বিপদের সময় নিরাপত্তাবলয় হিসেবে বিবেচনা করলে এর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে না।
তার মতে, সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি মানুষের খাদ্যাভ্যাস উন্নত করা এবং অপুষ্টি কমাতেও কার্যকর হতে পারে। কারণ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর কাছেই এসব কর্মসূচি সাধারণত পৌঁছে থাকে।
পুষ্টি সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন
আগা খান ফাউন্ডেশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিষয়ক বৈশ্বিক প্রধান আমিনাহ জাহাঙ্গীর বলেন, পুষ্টি কোনো একক ব্যবস্থার ফল নয়। স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্যব্যবস্থা, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার সমন্বয় প্রয়োজন।
তিনি বলেন, জলবায়ুও ইতোমধ্যে শিশুদের বেড়ে ওঠার পরিবেশকে প্রভাবিত করছে। একই পরিবারের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্যব্যবস্থা ও স্থানীয় সামাজিক প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করলে ফলাফল অনেক ভালো হয়।
পুষ্টি উন্নয়ন আন্দোলনের এশিয়া অঞ্চলের প্রতিনিধি শ্রীকান্ত এদারা জানান, বিশ্বব্যাপী পুষ্টি উন্নয়নের অগ্রগতি হলেও তা ধীর এবং অসম। অর্থায়ন কমে গেলে এ পর্যন্ত অর্জিত অগ্রগতি উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
শিশুর প্রথম পাঁচ বছর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল বলেন, একটি শিশুর জীবনের প্রথম পাঁচ বছর তার ভবিষ্যৎ বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, পাঁচ বছর বয়সের মধ্যেই শিশুর মস্তিষ্কের প্রায় ৯০ শতাংশ বিকাশ ঘটে।
তার ভাষায়, জীবনের শুরুতেই প্রয়োজনীয় মানবিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলে পরবর্তী সময়ে শিক্ষা, অর্থনীতি ও অবকাঠামোয় যত বিনিয়োগই করা হোক, তার কার্যকারিতা দুর্বল হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, পুষ্টিতে বিনিয়োগ কোনো দান নয়; এটি অর্থনৈতিক নীতির অংশ। কারণ সুস্থ ও সক্ষম মানুষ ছাড়া জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি কিংবা উৎপাদনশীলতার বড় পরিবর্তন সম্ভব নয়।
পাকিস্তানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানম গেব্রেয়েসুস এক ভিডিও বার্তায় বলেন, অপুষ্টি স্বাস্থ্য, উন্নয়ন ও মানুষের সুযোগের পথে অন্যতম বড় বাধা। শুধু খাবারের অভাবই এর কারণ নয়; নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যের সুযোগ এবং শক্তিশালী খাদ্যব্যবস্থাও প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংকের পুষ্টিবিষয়ক প্রধান বিশেষজ্ঞ অ্যাবিগেইল পেরি বলেন, জীবনের শুরুতে একটি শিশুর বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব সারা জীবন থাকতে পারে। তাই পাকিস্তানের সামনে এখন মূল প্রশ্ন হলো—কীভাবে প্রয়োজনীয় মাত্রা, গতি ও মান বজায় রেখে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
সম্মেলনের আয়োজক পক্ষের বক্তব্যেও উঠে এসেছে, পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে পুষ্টি সংকটের চেহারা এক নয়। ফলে সব অঞ্চলের জন্য একই ধরনের সমাধান কার্যকর হবে না। মায়েদের ও শিশুদের পুষ্টি, কৃষি, পানি, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা এবং অর্থনীতিকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু শিশুস্বাস্থ্যের সংকট নয়; এটি দেশটির মানবসম্পদ, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















