রাসুয়ার ধুনচেতে ভয়াবহ হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার (GLOF) পরের চারটি দিন একজন প্রত্যক্ষদর্শীর কাছে শুধু ধ্বংস আর মানুষের অসহায়তার স্মৃতি হয়ে থাকার কথা। কিন্তু সেই বিপর্যয়ের মধ্যেই নেপালি সেনাবাহিনীর যে তৎপরতা চোখে পড়েছে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—দেশ যখন সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়ে, তখন যারা সবার আগে দায়িত্ব নেয়, রাষ্ট্র কি তাদের যথেষ্ট স্বীকৃতি, সরঞ্জাম ও সহায়তা দেয়?
সোফিয়া উপ্রেতির পর্যবেক্ষণে, ধুনচে তখন অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমের অন্যতম কেন্দ্র। দুর্গম ভূপ্রকৃতি, অনিশ্চিত আবহাওয়া এবং একের পর এক মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেও সেনাবাহিনীর সদস্যরা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে গেছেন। অনেকের নিজের পরিবারও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বা নিখোঁজ ছিল। তবু দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সুযোগ তাদের ছিল না।
আকাশপথে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উদ্ধার, ত্রাণ ও জরুরি সরবরাহ পরিবহনে ব্যস্ত ছিল। স্থলভাগের সদস্যদের দায়িত্বও কম কঠিন ছিল না। জীবিতদের উদ্ধারের পাশাপাশি তাদের এমন কাজ করতে হয়েছে, যেখানে মানুষের মরদেহ উদ্ধারের নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সেনা কর্মকর্তাদের কেউ কেউ এসব অভিযানে সরাসরি অংশ নিয়েছেন।
রাজধানী কাঠমান্ডুর বিমানবন্দরেও চলেছে ত্রাণ কার্যক্রমের সমন্বয়। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনীর ঘাঁটি ও সদর দপ্তর থেকে পরিচালিত হয়েছে পরিকল্পনা, নির্দেশনা এবং সমন্বয়ের বিশাল কর্মযজ্ঞ।
সীমিত সামর্থ্যে বড় দায়িত্ব

এই অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে—নেপালি সেনাবাহিনীর সক্ষমতা কেবল যুদ্ধ বা প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ নয়। দুর্যোগ মোকাবিলা, উদ্ধারকাজ এবং জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সংগঠিত হওয়ার ক্ষমতাও তাদের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
দুই শতাধিক বছরের ঐতিহ্য বহনকারী নেপালি সেনাবাহিনী এশিয়ার পুরোনো সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। দীর্ঘ সময় ধরে সাহস, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে তাদের পরিচয় গড়ে উঠেছে। দেশের সীমানার ভেতরের দায়িত্বের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তারা নিজেদের ভূমিকা প্রতিষ্ঠা করেছে।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে নেপালি সেনারা বহু বছর ধরে বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করছেন। কঠিন পরিস্থিতিতে কাজ করার এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নেপালের আন্তর্জাতিক পরিচয়েরও অংশ হয়ে উঠেছে। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দেশের অবদান একদিকে যেমন নেপালের সামরিক সক্ষমতার প্রতিফলন, অন্যদিকে তেমনি আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশটির সফট পাওয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
সংকটে বারবার সামনে এসেছে সেনাবাহিনী
দেশের ভেতরেও বড় সংকটের সময় নেপালি সেনাবাহিনীকে সামনে দেখা গেছে। ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প থেকে শুরু করে কোভিড-১৯ মহামারি—বিভিন্ন জাতীয় দুর্যোগে তারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে।
সাম্প্রতিক সময়েও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। ২০২৫ সালের জেন-জি আন্দোলন, চলতি বছরের জুলাইয়ের মধেশ অঞ্চলের অস্থিরতা কিংবা বর্তমান হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত দুর্যোগ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই কঠিন ও জরুরি দায়িত্ব পালনে সেনাবাহিনী এগিয়ে এসেছে।
সম্ভবত এ কারণেই জনমত জরিপগুলোতে প্রতিষ্ঠানটি বারবার দেশের সবচেয়ে আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে উঠে এসেছে। রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তুলনায় সেনাবাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা অনেক ক্ষেত্রেই বেশি।
এই আস্থার পেছনে কী কাজ করে? সামরিক প্রশিক্ষণ, দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম কিংবা বিপদের সময় অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা—সম্ভবত সবকিছুরই ভূমিকা আছে। তবে কারণ যাই হোক, বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, এই দায়িত্ব পালনের জন্য যারা প্রস্তুত থাকেন, তাদেরও যথাযথভাবে প্রস্তুত ও সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

সম্মান শুধু কথায় নয়, ব্যবস্থাতেও
সেনাসদস্যদের জন্য উন্নত পারিশ্রমিক এবং প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জাম নিশ্চিত করা তাই বিলাসিতা নয়; এটি দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার প্রশ্ন। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বের জন্য অর্থবহ ভাতা চালু করা হলে তা কেবল আর্থিক সুবিধা হবে না, বরং রাষ্ট্র তাদের দায়িত্ব ও ঝুঁকিকে স্বীকৃতি দিচ্ছে—এই বার্তাও দেবে।
একই সঙ্গে সামরিক পেশাকে তরুণ প্রজন্মের জন্য আরও আকর্ষণীয় করে তোলা জরুরি। মেধাবী ও শিক্ষিত তরুণদের এই পেশায় ধরে রাখতে হলে শুধু দেশসেবার আবেগ যথেষ্ট নয়। সম্মানজনক ক্যারিয়ার, পেশাগত উন্নতির সুযোগ এবং দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাত্রার নিশ্চয়তাও প্রয়োজন।
কারণ দক্ষ সেনাবাহিনী তৈরি হয় শুধু অস্ত্র বা অবকাঠামো দিয়ে নয়। দক্ষ মানুষকে আকৃষ্ট করা, প্রশিক্ষিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখাও তার অপরিহার্য অংশ।
সমালোচনা থাকবে, তবে প্রতিষ্ঠান ভেঙে দেওয়া নয়
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো প্রতিষ্ঠানই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। সেনাবাহিনীও নয়। বেসামরিক কর্তৃত্বের অধীনে থাকা একটি সামরিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা, সমালোচনা ও জবাবদিহি থাকা স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়।
কিন্তু সমালোচনা ও ভিত্তিহীন সন্দেহ এক বিষয় নয়। রাজনৈতিক উত্তেজনা বা জাতীয় সংকটের মুহূর্তে সেনাবাহিনীর আচরণ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, বিশেষ করে ২০২৫ সালের জেন-জি আন্দোলনের সময় তাদের ভূমিকা নিয়ে হয়েছে। কিন্তু কঠিন পরিস্থিতিতেও অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা না বাড়িয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার সক্ষমতাকেও মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত।
গণতন্ত্রের জন্য জবাবদিহি যেমন অপরিহার্য, তেমনি দায়িত্ব পালনকারী প্রতিষ্ঠানের মনোবলও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন তোলা এবং অবিশ্বাস ছড়িয়ে দেওয়া এক জিনিস নয়। একটি প্রতিষ্ঠানকে উন্নত করতে হলে তার ভুলের সমালোচনা করতে হবে, আবার তার কার্যকর অবদানকেও স্বীকার করতে হবে।
নীরবতার মধ্যেই যে প্রস্তুতি

নেপালি সেনাবাহিনীর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তারা সাধারণত নিজেদের কাজের প্রচারে খুব বেশি আগ্রহী নয়। প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা, প্রস্তুতি কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের সাফল্য নিয়ে প্রচারের চেয়ে দায়িত্ব পালনই তাদের কাছে মুখ্য।
সম্ভবত এ কারণেই বিপদের মুহূর্তে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক আস্থা তাদের দিকে যায়। সংকটের সময় নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্ব তখনই সবচেয়ে বেশি বোঝা যায়, যখন চারপাশে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
ধুনচের বিপর্যয়ের মতো পরিস্থিতি সেই সত্যকে আরও স্পষ্ট করে। সেখানে মানুষের শোক, আতঙ্ক এবং অসহায়তার পাশাপাশি দেখা গেছে এমন এক বাহিনীকে, যারা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষা না করে কাজ শুরু করেছে।
তাই সেনাবাহিনীর প্রতি সম্মান মানে অন্ধ সমর্থন নয়। বরং তাদের দায়িত্বের গুরুত্ব বোঝা, প্রয়োজনীয় সম্পদ দেওয়া, পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির কাঠামো অটুট রাখা।
দুর্যোগের পর ধুনচে থেকে ফিরে আসা যে কারও মনে একসঙ্গে শোক ও গর্বের অনুভূতি তৈরি হতে পারে। মানুষের ক্ষয়ক্ষতি এবং দুর্ভোগের সামনে কোনো গর্বই শোককে মুছে দিতে পারে না। কিন্তু সেই দুর্যোগের মধ্যেও যারা নিরলসভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।
নেপালি সেনাবাহিনীকে তাই শুধু পরবর্তী বিপর্যয়ের সময় মনে করলে চলবে না। যে প্রতিষ্ঠান সংকটে দেশের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত থাকে, তাকে প্রস্তুত রাখার দায়িত্বও দেশের। তাদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, ন্যায্য সুবিধা, পেশাগত মর্যাদা এবং প্রাপ্য স্বীকৃতি নিশ্চিত করা সেই দায়িত্বেরই অংশ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল—যারা মানুষের বিপদের মুহূর্তে এগিয়ে আসার জন্য নিজেদের প্রস্তুত রাখেন, তাদের মূল্য আমরা যদি সংকটের সময়ও স্বীকার না করি, তাহলে আর কখন করব?
সোফিয়া উপ্রেতি 



















