ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লেও আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের অবসান চায় তেহরান। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কোনো পক্ষেরই স্বার্থে নয়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেলকেন্দ্র খার্গ দ্বীপ ধ্বংসের দাবি করে একটি কৃত্রিমভাবে তৈরি ভিডিও প্রকাশ করেছেন। তবে ওই দ্বীপে এমন কোনো হামলা হয়েছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আলোচনার দরজা খোলা রাখতে চায় তেহরান
কিরগিজস্তানে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা বৈঠকের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে কথা বলার সময় পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান এখনো সমঝোতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, চলমান যুদ্ধ ইরান, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা মানবজাতি—কারও জন্যই কল্যাণকর নয়। বিদ্যমান সমস্যার সমাধানে সংলাপ ও সহযোগিতাকেই সবচেয়ে কার্যকর পথ হিসেবে দেখছে তেহরান। একই সঙ্গে নিরাপত্তাহীনতা ও সংঘাত যাতে আরও ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য সব ধরনের সক্ষমতা কাজে লাগানোর কথাও বলেন তিনি।
পেজেশকিয়ান আরও অভিযোগ করেন, অতীতে বিভিন্ন চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেগুলো পূরণ করেনি।

লারাক দ্বীপে হামলা, নিহত দুই
নতুন করে সংঘাত শুরুর পর রোববার ইরানের লারাক দ্বীপে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন এক কর্মকর্তা জানান, হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্র মাইন স্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়।
ইরানের স্থানীয় প্রশাসনের বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ওই হামলায় অন্তত দুজন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।
লারাক দ্বীপটি হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত এবং গুরুত্বপূর্ণ ইরানি বন্দর বান্দার আব্বাসের কাছাকাছি। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। ফলে এই এলাকায় সামরিক উত্তেজনা বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও তার দ্রুত প্রভাব পড়ে।
খার্গ দ্বীপ ধ্বংসের দাবি, কিন্তু মিলছে না প্রমাণ
এর মধ্যেই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি নাটকীয় ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওতে বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখিয়ে তিনি দাবি করেন, খার্গ দ্বীপ ধ্বংস হয়ে গেছে।
তবে ভিডিওটির সত্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে এটি কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে জানা গেছে। অন্যদিকে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাতের অভিযানে খার্গ দ্বীপকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থার প্রধান হামিদ বোভার্ড ট্রাম্পের দাবিকে উপহাস করে বলেছেন, খার্গ দ্বীপের পরিস্থিতি শান্ত এবং স্বাভাবিক রয়েছে। তাঁর দাবি, সেখানে তেল কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। বরং কর্মীরা আগের ক্ষয়ক্ষতি মেরামত ও বিভিন্ন স্থাপনা আধুনিকায়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
খার্গ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই খার্গ দ্বীপের অবকাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হতো। ফলে দ্বীপটিতে বড় ধরনের হামলা হলে ইরানের অর্থনীতি যেমন বড় ধাক্কা খেতে পারে, তেমনি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যেও ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই কারণেই খার্গ দ্বীপকে ঘিরে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ বাড়ায়। সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যেই তেলের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা হামলা
লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলার পর ইরানও পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেয়। ইরানি সংবাদমাধ্যমের দাবি, দেশটির বাহিনী জর্ডানে অবস্থিত দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। এসব ঘাঁটি লারাক দ্বীপে পরিচালিত মার্কিন অভিযানে সহায়তা করেছিল বলে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
ইরানের সেনাবাহিনী সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল মিনহাদ বিমানঘাঁটিতেও হামলার দাবি করেছিল। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

পরে আমিরাত জানিয়েছে, ইরান থেকে আসা একটি চালকবিহীন উড়োজাহাজ তাদের আঞ্চলিক জলসীমার ওপর দিয়ে আসার সময় বিমানবাহিনী সেটিকে মোকাবিলা করেছে। তবে সেটি ভূপাতিত করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
হরমুজ প্রণালিতে মাইন নিয়ে নতুন আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে রকেট ও সমুদ্র মাইন ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এ কারণে সম্ভাব্য তাৎক্ষণিক হুমকি ঠেকাতে সীমিত ও নির্ভুল হামলা চালানো হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি মার্কিন চালকবিহীন উড়োজাহাজ ভূপাতিত করেছে। সেটি উপসাগরের পানিতে গিয়ে পড়ে।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ অংশে দুটি নৌ মাইনের আঘাতে একটি বিশাল তেলবাহী জাহাজে আগুন ধরে যায় এবং জাহাজটি পুরোপুরি থেমে যায়। ইরানের দাবি, জাহাজটি অবৈধভাবে ওই জলপথ অতিক্রমের চেষ্টা করছিল।
:max_bytes(150000):strip_icc()/GettyImages-126363856-59c67c1aaad52b0011324376.jpg)
সামরিক চাপের পাশাপাশি বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ
ইরানের ওপর সামরিক চাপের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের ওপর নতুন করে আরোপযোগ্য পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা নিয়মিতভাবে আসতে পারে। এর প্রাথমিক লক্ষ্য হতে পারে দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও জানিয়েছে, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য অংশীদারদের সঙ্গে তারা কাজ করে যাবে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতের মধ্যেও ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত প্রধান লক্ষ্যগুলো এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে দেওয়া, আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দেশটির হামলার সক্ষমতা কমানো এবং ইরানের ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের পরিস্থিতি তৈরি করা—এসব লক্ষ্যই এখনো অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে।
যুদ্ধের মাঝেও কূটনীতির সম্ভাবনা
সামরিক সংঘাত আবার শুরু হলেও পেজেশকিয়ানের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, ইরান এখনো আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করতে চাইছে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তেহরানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক সামরিক স্থাপনাগুলো ঘিরে উত্তেজনা আরও বাড়ে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। যুদ্ধের বিস্তার ঠেকাতে শেষ পর্যন্ত সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে পরবর্তী পরিস্থিতি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















