চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মিসর সফরকে ঘিরে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রায় এক দশক পর মিসরে ফিরছেন শি। এই সফরের মধ্য দিয়ে অর্থনীতি, সামরিক সহযোগিতা, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন সংকটে সমন্বিত ভূমিকার ক্ষেত্রে চীন ও মিসরের সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
শি জিনপিং চলতি সপ্তাহে মিসর সফর করবেন। এর আগে তিনি কিরগিজস্তানে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেবেন। সম্মেলনটি মঙ্গলবার শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এরপরই তাঁর কায়রো সফর শুরু হবে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে চীন-মিসর সম্পর্ককে ‘ইতিহাসের সেরা অবস্থানে’ রয়েছে বলে বর্ণনা করেছে। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শির এই সফর দুই দেশের কৌশলগত সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।
অর্থনীতি থেকে কূটনীতি—সম্পর্কের বিস্তার
চীন ও মিসরের সম্পর্ক এখন শুধু বাণিজ্য বা অবকাঠামো উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ নেই। গত কয়েক বছরে দুই দেশের সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হয়েছে। বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প, বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগও জোরদার হয়েছে।

মিসরের জন্য চীন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। অন্যদিকে আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার ক্ষেত্রে মিসর চীনের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সুয়েজ খালকে ঘিরে মিসরের ভৌগোলিক অবস্থান দেশটিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র করে তুলেছে।
ফলে কায়রোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চীনের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা
মিসর দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে আসছে। দেশটির অর্থনীতি, সামরিক সহযোগিতা ও কূটনীতিতে পশ্চিমা দেশগুলোর ভূমিকা রয়েছে। একই সময়ে কায়রো চীনের সঙ্গে সম্পর্কও দ্রুত বাড়াচ্ছে।
এই নীতিকে অনেক পর্যবেক্ষক মিসরের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে দেখছেন। কায়রো একদিকে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে চায়, অন্যদিকে চীনসহ এশিয়ার শক্তিশালী অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়ে নিজের কৌশলগত বিকল্পও বিস্তৃত করছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়তে থাকা অবস্থায় মিসরের এই ভারসাম্য রক্ষার কৌশল আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে চীন-মিসরের সমন্বয়
শির সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট। গাজা, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংকটে মিসর দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করে আসছে।

চীনও সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের কূটনৈতিক উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বেইজিং নিজেকে এমন একটি শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, যে শক্তি আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সংঘাত নিরসন ও রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে ভূমিকা রাখতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে মিসরের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বেইজিংয়ের মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
আফ্রিকায় চীনের জন্য মিসরের গুরুত্ব
মিসর শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশ নয়, আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রও। ফলে আফ্রিকায় চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রেও কায়রোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ।
চীন ইতিমধ্যে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে অবকাঠামো, জ্বালানি, পরিবহন ও শিল্প খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে। মিসরের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা সেই বৃহত্তর আফ্রিকা নীতির অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
শির সফর তাই কেবল দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়; এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথকে ঘিরে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক হিসাবও জড়িয়ে রয়েছে।
‘ইতিহাসের সেরা’ সম্পর্কের বার্তা

চীনের পক্ষ থেকে চীন-মিসর সম্পর্ককে ‘ইতিহাসের সেরা’ পর্যায়ে রয়েছে বলে যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা এই সফরের রাজনৈতিক গুরুত্ব স্পষ্ট করে।
শির মিসর সফরের মাধ্যমে দুই দেশ নিজেদের পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার বিষয়টি প্রকাশ্যে তুলে ধরতে চাইছে। একই সঙ্গে পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
মিসরের জন্য চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজের অবস্থান আরও ভারসাম্যপূর্ণ রাখার সুযোগ তৈরি করছে। আর চীনের জন্য কায়রোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
সব মিলিয়ে, প্রায় এক দশক পর শি জিনপিংয়ের মিসর সফর শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়। এটি চীন ও মিসরের ক্রমবর্ধমান অংশীদারত্ব, মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের বাড়তে থাকা ভূমিকা এবং পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য রেখে নতুন কূটনৈতিক পথ খোঁজার বৃহত্তর প্রচেষ্টার প্রতিফলন।
চলতি সফরে দুই দেশের মধ্যে অর্থনীতি, বিনিয়োগ, সামরিক সহযোগিতা ও আঞ্চলিক সংকট নিয়ে কী ধরনের নতুন সমঝোতা তৈরি হয়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অন্যতম আগ্রহের বিষয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 













