একসময় যে জমিতে ছয় প্রজন্ম ধরে একই পরিবারের মানুষ ধান, ভুট্টা ও সয়াবিন ফলিয়েছেন, আজ সেখানে কৃষিযন্ত্রের শব্দ নেই। নেই আগের ব্যস্ততা। নেই সেই নিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রত্যাশাও। আরকানসাসের একটি পারিবারিক খামারের এই নীরবতা এখন যেন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতির গভীর সংকটের প্রতীক।
হ্যালি শফনার সেই পরিবারেরই ষষ্ঠ প্রজন্মের সদস্য। এক দশক আগে বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়াতে চাকরি ছেড়ে তিনি পারিবারিক খামারে ফিরে এসেছিলেন। কৃষিকাজকে তিনি শুধু পেশা হিসেবে দেখেননি; এটি ছিল তার পরিবারের ইতিহাস, পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ।
কিন্তু ক্রমাগত বাড়তে থাকা উৎপাদন ব্যয়, ঋণের বোঝা, উচ্চ সুদ, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং কৃষিপণ্যের বাজারে অনিশ্চয়তা শেষ পর্যন্ত তাকে খামার গুটিয়ে নিতে বাধ্য করেছে।
এখন সেই খামার হারানোর অভিজ্ঞতাই তাকে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির কেন্দ্রে। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে তিনি আসন্ন সিনেট নির্বাচনে দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান সিনেটর টম কটনের বিরুদ্ধে লড়ছেন।
তার নির্বাচনী বার্তা খুব সরল—কৃষককে বাঁচাতে না পারলে গ্রামীণ আমেরিকাকেও বাঁচানো যাবে না।
যে খামার ছিল পরিবারের পরিচয়
শফনারের পারিবারিক খামারের ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। ১৯০১ সালে তার পরিবারের একজন পূর্বপুরুষ যে বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন, সেটিই বহু বছর ধরে পরিবারের কেন্দ্র ছিল।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেখানে কৃষিকাজ হয়েছে। সময় বদলেছে, কৃষিপদ্ধতি বদলেছে, যন্ত্রপাতি এসেছে, উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু জমির সঙ্গে পরিবারের সম্পর্ক বদলায়নি।
শফনার ছোটবেলা থেকেই সেই কৃষিজীবনের মধ্যে বড় হয়েছেন। তার বাবা ছিলেন কৃষক। মা একই জমিতে বীজের জাত পরীক্ষা ও উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত একটি গবেষণাভিত্তিক ব্যবসা গড়ে তুলেছিলেন।
উচ্চশিক্ষা শেষ করে শফনার নিজেও কিছু সময় শহুরে পেশাজীবনে ছিলেন। তিনি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ও বিপণন খাতে কাজ করেছেন। কিন্তু ২০১৫ সালে বাবার স্মৃতিভ্রংশজনিত অসুস্থতা ধরা পড়ার পর জীবনের গতিপথ বদলে যায়।
চাকরি ছেড়ে তিনি ফিরে আসেন বাড়িতে।
বাবা-মায়ের সঙ্গে মাঠে হাঁটতেন, ফসল পর্যবেক্ষণ করতেন, আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখতেন। ২০১৭ সালের মধ্যে কার্যত তিনিই খামারের পরিচালনার দায়িত্ব নেন।
সেই সময় কৃষিকাজ ছিল তার কাছে কঠিন হলেও আনন্দের।
ধান, ভুট্টা ও সয়াবিন উৎপাদন করতেন তিনি। নিজের ভাষায়, খামারের প্রায় সবকিছুই তিনি ভালোবাসতেন।
কিন্তু সেই ভালোবাসা একসময় হিসাবের খাতায় আটকে যায়।
যখন কৃষিকাজ আর লাভজনক থাকল না
২০২৪ সালের মাঝামাঝি এসে শফনারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দাঁড়ায়—কীভাবে খামারটি টিকিয়ে রাখা যায়?
তিনি বসে বসে বিভিন্ন হিসাব করেন। কত জমিতে কোন ফসল চাষ করলে ক্ষতি কম হবে, কত ঋণ নিতে হবে, সুদের বোঝা কত হবে—সবকিছু হিসাব করে দেখেন।
শেষ পর্যন্ত একটি পরিকল্পনা তার সামনে আসে। খামারের আকার অনেক কমিয়ে প্রায় ৫০০ একর জমিতে ধান চাষ করতে হবে।
কিন্তু এই পরিকল্পনাও ছিল বিপজ্জনক।
অপারেটিং খরচ চালাতে প্রায় ১০ লাখ ডলারের ঋণ নিতে হতো। সেই ঋণের বিপরীতে পরিবারের জমি এবং বাবা-মায়ের সঞ্চয়কে জামানত হিসেবে রাখতে হতো।
একজন কৃষকের জন্য এটি শুধু আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি ছিল প্রজন্মের সম্পদকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা।
শফনার ঝুঁকি নেননি।
তিনি বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর নিলামকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
২০২৫ সালের মার্চে দুই সপ্তাহ ধরে খামারের ট্রাক্টর, টায়ার, কৃষিযন্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম বিক্রি করা হয়। একটি ট্রাক্টর বিক্রি হয় ১ লাখ ৩০ হাজার ৫০০ ডলারে। শেষ পর্যন্ত সবকিছু মিলিয়ে পাওয়া যায় ১০ লাখ ডলারের সামান্য বেশি।
কিন্তু যন্ত্রপাতি বিক্রি করলেই দায় শেষ হয়নি।
খামার বিক্রি বা গুটিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত কর ও অন্যান্য হিসাব এখনো পরিবারটির জন্য অনিশ্চয়তার বিষয়।
একটি প্রজন্মের কৃষি ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলেও তার আর্থিক ছাপ রয়ে গেছে।
শফনারের গল্প আসলে কতটা আলাদা?
শফনারের অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া বৃহত্তর সমস্যার একটি উদাহরণ মাত্র।
কৃষকদের ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি খাতে মোট ঋণ প্রায় ৬২৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির প্রভাব বাদ দিয়েও এই পরিমাণ গত বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। ২০১৯ সালের তুলনায় ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ।
কৃষকের ঋণের বিষয়টি অন্য ব্যবসার ঋণের তুলনায় আলাদা। একজন দোকানদার সংকটে পড়লে দোকান ছোট করতে পারেন। কোনো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে পারে। অনেক ব্যবসা অনলাইনে চলে যেতে পারে।
কৃষকের সামনে সেই সুযোগ খুব সীমিত।
ফসল ফলাতে জমি প্রয়োজন। জমিতে কাজ করতে যন্ত্রপাতি প্রয়োজন। বীজ, সার, কীটনাশক ও জ্বালানি কিনতে হয়। সবকিছুই মৌসুম শুরুর আগেই অর্থ দাবি করে।

ফসল ঘরে ওঠার আগেই কৃষককে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হয়।
ফলে উৎপাদনের খরচ মেটাতে কৃষককে ঋণ নিতেই হয়।
সমস্যা দেখা দেয় যখন বাজারদর কমে যায় কিংবা ফসল নষ্ট হয়।
তখন ঋণ থাকে, সুদ থাকে, কিন্তু প্রত্যাশিত আয় থাকে না।
চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের ধাক্কা
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকদের বর্তমান সংকটের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে।
২০১৮ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য সংঘাত কৃষিপণ্যের বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করলে চীনও পাল্টা মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক বসায়। এর প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যে।
চীন ছিল মার্কিন কৃষিপণ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার। ফলে বাণিজ্য উত্তেজনা কৃষকদের আয়কে চাপের মধ্যে ফেলে।
এরপর আসে করোনাভাইরাস মহামারি।
বিশ্বজুড়ে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়। পরিবহন ব্যয় বাড়ে। এরপর ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বৈশ্বিক খাদ্য ও জ্বালানি বাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি করে।
বীজ, সার, কীটনাশক ও জ্বালানির দাম বেড়ে যায়।
তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বাড়ায় কৃষিঋণের খরচও বেড়ে যায়।
একজন কৃষক একই সঙ্গে তিনটি চাপের মুখে পড়েন—উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, ঋণের খরচ বাড়ছে এবং বাজারদর নিয়ে নিশ্চয়তা কমছে।
সরকারি সহায়তা কি সংকট থামাতে পারছে?
কৃষকদের ক্ষতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিপুল অর্থ সহায়তা দিয়েছে।
কিন্তু সরকারি অর্থ সহায়তা অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতি সাময়িকভাবে সামাল দিলেও কৃষি ব্যবসার মূল কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করছে না।
ফলে কৃষকদের মধ্যে প্রশ্ন বাড়ছে—আর কতদিন সহায়তার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা সম্ভব?
কৃষি অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, ঋণের চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে আরও অনেক কৃষককে জমি বা যন্ত্রপাতি বিক্রি করতে হতে পারে।
১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিতে ব্যাপক ঋণসংকট ও দেউলিয়াত্বের যে ঢেউ দেখা গিয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিকে কেউ কেউ সেই সময়ের সঙ্গে তুলনা করছেন।
আরকানসাসে কৃষি সংকটের রাজনৈতিক রূপ

আরকানসাস যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপ্রধান রাজ্যগুলোর একটি। বিশেষ করে ধান উৎপাদনে রাজ্যটি দেশের শীর্ষে।
কৃষির ওপর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বড় অংশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নির্ভরতা রয়েছে।
কোনো কৃষক যখন খামার বন্ধ করেন, তার প্রভাব শুধু সেই পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না।
কৃষিযন্ত্র বিক্রেতা, বীজ ও সার সরবরাহকারী, পরিবহন ব্যবসা, স্থানীয় দোকান, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান—সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ কারণেই শফনারের রাজনৈতিক বক্তব্য কৃষকের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ী ও গ্রামীণ পরিবারের কাছেও গুরুত্ব পাচ্ছে।
তার বক্তব্য, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শুধু কাঁচা কৃষিপণ্য উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে রাখলে চলবে না।
স্থানীয়ভাবে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করার কারখানা তৈরি করতে হবে। নতুন শিল্প আনতে হবে। নতুন ফসলের সম্ভাবনা তৈরি করতে হবে।
তার মতে, কৃষিপণ্য অন্যত্র পাঠিয়ে সেখানে মূল্য সংযোজন করার বদলে স্থানীয় পর্যায়ে সেই সুযোগ তৈরি করা গেলে কৃষক ও স্থানীয় অর্থনীতি উভয়ই লাভবান হবে।
ধর্মীয় মূল্যবোধের রাজ্যে অর্থনীতির নতুন প্রশ্ন
আরকানসাস ঐতিহ্যগতভাবে ডেমোক্র্যাটদের জন্য কঠিন রাজ্য।
দীর্ঘদিন ধরে এখানকার ভোটারদের বড় অংশ সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল। সময়ের সঙ্গে রাজ্যটির রাজনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে রিপাবলিকানদের দিকে গেছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প এখানে ৩০ শতাংশের বেশি ব্যবধানে জয় পান।
তাই শফনার জানেন, শুধু কৃষি সংকটের কথা বললেই রাজনৈতিক সমীকরণ রাতারাতি বদলে যাবে না।
তিনি নিজেও তা দাবি করছেন না।
বরং তার কৌশল হলো—দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথা বলা।
তার বক্তব্য, কৃষক রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট যাই হোন না কেন, উৎপাদন খরচ বাড়লে সমস্যাটি সবার।
ঋণের সুদ বাড়লে দল দেখে ঋণ বাড়ে না।
সারের দাম বাড়লে কৃষকের রাজনৈতিক পরিচয় দেখে দাম কমে না।
ফসলের বাজারদর কমলে দলীয় আনুগত্য কৃষকের আয় পূরণ করে না।
এই অর্থনৈতিক যুক্তিকেই নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে চাইছেন তিনি।
প্রতিদ্বন্দ্বী টম কটনের শক্তি কোথায়?
শফনারের বিপরীতে রয়েছেন দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান সিনেটর টম কটন।
২০১৩ সাল থেকে কংগ্রেসে থাকা কটনের রাজনৈতিক ভিত্তি শক্ত। তার প্রচার তহবিলও শফনারের তুলনায় অনেক বড়।

নির্বাচনী হিসাব অনুযায়ী, কটনের হাতে প্রায় ১ কোটি ডলার নগদ অর্থ রয়েছে। শফনারের হাতে রয়েছে ৯ লাখ ডলারের সামান্য কম।
এ ব্যবধান নির্বাচনী প্রচারে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
রিপাবলিকান শিবিরও শফনারকে আক্রমণ করছে। তাকে মধ্যপন্থী কৃষক হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টাকে তারা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
পুরোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক অবস্থান সামনে এনে তাকে রক্ষণশীল আরকানসাসের ভোটারদের কাছে অগ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা চলছে।
কিন্তু শফনারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কৃষকদের অর্থনৈতিক অসন্তোষ তার প্রচারে এমন ভোটারদেরও আগ্রহী করছে, যারা হয়তো ঐতিহ্যগতভাবে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেন না।
রিপাবলিকান ভোটারও পাশে?
শফনারের চাচাতো ভাই জ্যাক কেন্ট নিজে রিপাবলিকান এবং ট্রাম্পের ভোটার। তিনিও কৃষক।
তার নিজের চোখে কৃষি খাতে ঋণের পরিমাণ ও পরিচালন ব্যয়ের এমন চাপ আগে দেখেননি।
তিনি একসময় শফনারকে রিপাবলিকান হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়ানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন।
শফনার শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাট হয়েই লড়ছেন।
কিন্তু কেন্ট তার পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন।
এখানেই শফনারের প্রচারের সম্ভাব্য শক্তি।
যদি কৃষি সংকট দলীয় বিভাজনের বাইরে গিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করে, তাহলে প্রচলিত রাজনৈতিক হিসাব কিছুটা বদলাতে পারে।
আরও কৃষক রাজনীতিতে আসছেন
শফনারের মতো কৃষিপেশার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত প্রার্থীর সংখ্যা শুধু আরকানসাসেই সীমাবদ্ধ নয়।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অন্তত ৩০ জন কৃষক, পশুপালক বা কৃষিভিত্তিক পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবার ফেডারেল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তাদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আগে কোনো ফেডারেল নির্বাচিত পদে ছিলেন না।
প্রায় অর্ধেক ডেমোক্র্যাট বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রিপাবলিকানদের আসন চ্যালেঞ্জ করছেন।
এটি হয়তো এখনই আমেরিকার গ্রামীণ রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের প্রমাণ নয়।
কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
গ্রামীণ অর্থনীতি নিয়ে অসন্তোষ রাজনীতিতে প্রবেশ করছে।

লুইজিয়ানাতেও একই চিত্র
লুইজিয়ানায় সবজি চাষি কনরাড কেবলও কৃষকদের সমস্যা সামনে রেখে নির্বাচনে লড়ছেন।
তার অভিযোগ, শুল্কনীতি ও সরকারি ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি ও স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে রিপাবলিকান শিবির বলছে, কৃষি ও গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় তাদের সরকার ও কংগ্রেসের উদ্যোগ রয়েছে।
অর্থাৎ কৃষি সংকট এখন শুধু অর্থনৈতিক বিতর্ক নয়—এটি দুই দলের রাজনৈতিক লড়াইয়েরও অংশ হয়ে উঠছে।
শহরের রাজনীতি বনাম গ্রামের বাস্তবতা
শফনারের সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি হলো, রাজনীতিকেরা নির্বাচনের সময় কৃষকের পোশাক পরেন, গ্রামে যান, কৃষকের সঙ্গে ছবি তোলেন, কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর গ্রামীণ সমস্যাগুলো ভুলে যান।
তিনি চান, কৃষককে রাজনৈতিক প্রচারের প্রতীক নয়, অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হোক।
তার বক্তব্যের মধ্যে তাই শুধু নিজের খামার হারানোর কষ্ট নেই; রয়েছে একটি বৃহত্তর গ্রামীণ অর্থনৈতিক কাঠামোর পুনর্গঠনের দাবি।
তিনি চান কৃষিপণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্প, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হোক।
‘অলৌকিক কিছু আসবে না’
সম্প্রতি পারাগোল্ড এলাকায় কৃষকদের এক ধর্মীয় সমাবেশে শফনারের সঙ্গে অনেক কৃষক নিজেদের দুর্দশার কথা ভাগ করে নেন।
কেউ কেউ বলছিলেন, তারা কৃষি খাতের জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছেন।
শফনার তাদের সঙ্গে সহমর্মিতা প্রকাশ করলেও বললেন, তিনি কোনো অলৌকিক পরিবর্তনের অপেক্ষায় নেই।
তার বিশ্বাস, কৃষি খাতকে বাঁচাতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
নতুন নীতি প্রয়োজন।
নতুন ফসল প্রয়োজন।
নতুন শিল্প প্রয়োজন।
আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন গ্রামীণ অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
কৃষকের সংকট কি ভোটের বাক্সে পৌঁছাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।
কারণ অর্থনৈতিক অসন্তোষ থাকলেও ভোটারদের সিদ্ধান্তে দলীয় পরিচয়, সামাজিক মূল্যবোধ, অভিবাসন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সংস্কৃতিগত বিষয়ও বড় ভূমিকা রাখে।
আরকানসাসে রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের আধিপত্য ভাঙা তাই অত্যন্ত কঠিন।
তার ওপর কটনের বিশাল প্রচার তহবিল এবং শক্ত রাজনৈতিক সংগঠন রয়েছে।
তবে শফনারের প্রচার দেখাচ্ছে, কৃষি সংকটকে ঘিরে গ্রামীণ আমেরিকায় নতুন ধরনের রাজনৈতিক ভাষা তৈরি হচ্ছে।
এই ভাষায় ডেমোক্র্যাট বনাম রিপাবলিকান বিতর্কের চেয়ে কৃষকের আয়, ঋণ, সার, জ্বালানি, শ্রমিক এবং স্থানীয় শিল্প বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একটি খামারের গল্প থেকে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন
শফনার হয়তো নির্বাচনে জিতবেন, হয়তো হারবেন।
কিন্তু তার রাজনৈতিক যাত্রা ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—যে গ্রামীণ আমেরিকা বহু বছর ধরে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, সেই এলাকার অর্থনৈতিক বাস্তবতা কি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক আনুগত্যকে নাড়া দিতে পারে?
যদি কৃষকের ঋণ আরও বাড়ে, খামার বন্ধ হতে থাকে এবং ছোট শহরগুলোর ব্যবসা দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে কৃষি সংকট শুধু কৃষকদের সমস্যা থাকবে না।
এটি হয়ে উঠতে পারে কর্মসংস্থান, খাদ্যব্যবস্থা, স্থানীয় অর্থনীতি এবং জাতীয় রাজনীতির সমস্যা।
শফনারের নিজের খামার আর নেই।
কিন্তু সেই হারানো খামারই তাকে একটি বড় রাজনৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
কৃষককে বাঁচানোর অর্থ শুধু একটি পরিবারকে বাঁচানো নয়—গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত একটি সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীকে টিকিয়ে রাখা।
আর সেই উপলব্ধিই হয়তো আগামী দিনের আমেরিকান রাজনীতিতে কৃষকদের নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে।



সারাক্ষণ রিপোর্ট 













