যুদ্ধ থামলেই মধ্যপ্রাচ্য আগের জায়গায় ফিরবে—এমন ধারণা এখন আর বাস্তবসম্মত নয়। ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক যুদ্ধ, তার সামরিক বিস্তার, ভৌগোলিক পরিধি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর অভিঘাত নিঃসন্দেহে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলোর একটি। কিন্তু যুদ্ধের দৃশ্যমান সংঘাতের বাইরে যে পরিবর্তনগুলো গত দেড় দশকে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে, সেগুলোর গুরুত্ব কোনোভাবেই কম নয়। বরং এসব পরিবর্তনই যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক কাঠামো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখতে পারে।
কারণ, বর্তমান সংকটের অনেকগুলো উপাদান যুদ্ধ শুরুর আগেই মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় ছিল। যুদ্ধ সেগুলোকে কোথাও ত্বরান্বিত করেছে, কোথাও নতুন রূপ দিয়েছে, আবার কোথাও পুরোনো সম্পর্কের ভেতরের দ্বন্দ্বকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। ফলে যুদ্ধ শেষ হলেও এই প্রক্রিয়াগুলো থেমে যাবে না। বরং নিজেদের স্বতন্ত্র গতিপথ তৈরি করে এগুলো নতুন বাস্তবতায় মানিয়ে নিতে থাকবে।
আঞ্চলিক রাজনীতির নতুন মানচিত্র
আরব বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্কের পরিবর্তন এই নতুন বাস্তবতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। একসময় যেসব রাষ্ট্র পরস্পরের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল, তাদের কেউ কেউ এখন প্রতিযোগী। আবার দীর্ঘদিনের বিরোধিতার পর কিছু দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সমঝোতার পথও তৈরি হয়েছে। আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে তাদের প্রতিবেশী অ-আরব শক্তিগুলোর সম্পর্কেও একই ধরনের পুনর্বিন্যাস দেখা যাচ্ছে।
মিসরের সঙ্গে তুরস্ক ও ইরানের সম্পর্কের বরফ গলার প্রক্রিয়া, সৌদি আরব ও কাতারের মধ্যে পুনর্মিলন, আবার ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলকে ঘিরে রিয়াদ ও আবুধাবির স্বার্থের সংঘাত—সবকিছু মিলিয়ে বোঝা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের জোটরাজনীতি আর আগের মতো সরল নয়। এখানে স্থায়ী মিত্রতার পাশাপাশি স্বার্থভিত্তিক সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা এবং সীমিত সমঝোতা একই সঙ্গে কাজ করছে।
এ পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিসর সম্প্রসারণ। আফ্রিকার হর্ন, পূর্ব আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ার মতো অঞ্চলে তাদের বিনিয়োগ যেমন বেড়েছে, তেমনি আরব বিশ্বের বাইরেও কিছু উপসাগরীয় রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে। সৌদি-ইরান উত্তেজনা প্রশমনে চীনের মধ্যস্থতাও দেখিয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তির পাশাপাশি নতুন শক্তিগুলোর ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে।
পুরোনো সংঘাত, নতুন সমীকরণ
২০১০ সালের শেষ দিকে শুরু হওয়া আরব বসন্তের অভিঘাতও এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। দেড় দশক ধরে বিভিন্ন আরব দেশে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, আঞ্চলিক হস্তক্ষেপ এবং বৈশ্বিক শক্তির সম্পৃক্ততা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌমত্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এর একটি বড় ফল হলো—আরব শক্তিগুলোর তুলনায় অ-আরব আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে বেড়ে যাওয়া।
সিরিয়ায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আকস্মিক ক্ষমতার পরিবর্তন এই পরিবর্তনশীল ভারসাম্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একইভাবে আব্রাহাম চুক্তি, গাজা যুদ্ধ, ব্রিকসে কয়েকটি আরব দেশের অন্তর্ভুক্তি এবং সৌদি আরবের জি২০ ভূমিকা মধ্যপ্রাচ্যকে শুধু আঞ্চলিক রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডরের মতো উদ্যোগও দেখিয়েছে, এই অঞ্চল এখন বৈশ্বিক বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বৃহত্তর কাঠামোর অংশ।
বিশেষ করে গাজা যুদ্ধের পর নতুন কিছু আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরির উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। এগুলোর কোনটি স্থায়ী হবে, কোনটি পরিবর্তিত হবে—তা এখনই নিশ্চিত নয়। কিন্তু এগুলো যে যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতার ওপর প্রভাব ফেলবে, সে সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
যুদ্ধের বিস্তার অর্থনীতিরও পুনর্বিন্যাস ঘটাচ্ছে
ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকট আরও বিস্তৃত হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো ও জর্ডানের ওপর ইরানি হামলা নিয়ে তীব্র বিরোধ দেখা দিয়েছে। তেহরান এসব হামলাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণের প্রতিশোধ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও সংশ্লিষ্ট আরব দেশগুলো বলেছে, হামলায় তাদের নিজস্ব জাতীয় লক্ষ্য ও স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচল ব্যাহত হওয়া শুধু উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নয়, বৃহত্তর আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে। জ্বালানি ও বাণিজ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে হরমুজের ওপর যে বিপুল অর্থনৈতিক নির্ভরতা রয়েছে, যুদ্ধের প্রতিটি পর্যায়ে তার মূল্য নতুন করে স্পষ্ট হয়েছে।
ইয়েমেনের হুথিদের মাধ্যমে সংঘাতের নতুন ফ্রন্ট তৈরি এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও একই ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরব বহুজাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উদ্যোগ নেয় এবং ১৪ দেশের অংশগ্রহণে একটি যৌথ সামুদ্রিক সামরিক কাঠামো তৈরির আলোচনা সামনে আসে। তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মক্কা চুক্তিও এই পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিবেশের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
কূটনীতি এখন আগের চেয়ে বহুমাত্রিক
যুদ্ধের মধ্যেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে কূটনৈতিক তৎপরতায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত প্রশমনের প্রচেষ্টায় পাকিস্তান, ওমান, মিসর, সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতারের মতো দেশগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এর অর্থ হলো, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট মোকাবিলায় শুধু বাইরের কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরতার বদলে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোও নিজেদের ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ আঞ্চলিক শক্তিগুলো এখন বুঝতে পারছে, এক দেশের নিরাপত্তা অন্য দেশের নিরাপত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। জ্বালানি, সমুদ্রপথ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সীমান্ত এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিস্তার—সবকিছুই একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ক্রমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরে গিয়ে বহুপক্ষীয় কাঠামোর দিকে এগোতে পারে।
যুদ্ধের পরও পুরোনো বাস্তবতা ফিরে আসবে না
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব পরিবর্তনকে কেবল চলমান যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ফল হিসেবে দেখা ভুল হবে। যুদ্ধ হয়তো কিছু প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে, কিছু নতুন সংকট তৈরি করেছে, আবার কিছু পুরোনো সম্পর্ককে পুনর্গঠন করেছে। কিন্তু এরই মধ্যে এসব পরিবর্তনের নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা তৈরি হয়েছে। ফলে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও সেগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী রূপ বদলাবে, নতুন সমীকরণ তৈরি করবে এবং টিকে থাকার পথ খুঁজবে।

এখানেই আরব বিশ্বের সামনে সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রশ্নটি দাঁড়ায়। মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও উপসাগরীয় অঞ্চল আগের অবস্থায় ফিরবে না। পুরোনো কিছু উদ্যোগের লক্ষ্য পরিবর্তিত হতে পারে, কিছু সমঝোতা পুনর্বিবেচিত হতে পারে, এমনকি কিছু জোটও দুর্বল হতে পারে। কিন্তু যে নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা আর মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
বরং সামনে আরও বড় ভৌগোলিক সংযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া, পূর্ব আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া ও ককেশাসের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে। একই সঙ্গে যেসব বৈশ্বিক শক্তি এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চায় কিংবা পুরোনো অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে চায়, তারাও নতুন সুযোগ খুঁজবে।
আরব বিশ্বের জন্য তাই মূল চ্যালেঞ্জ কেবল যুদ্ধের ক্ষতি সামাল দেওয়া নয়; বরং যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে নিজেদের অবস্থান নতুন করে নির্ধারণ করা। কোন সম্পর্ককে সহযোগিতায় রূপ দেওয়া যাবে, কোথায় প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন, কোন অর্থনৈতিক সুযোগ দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগানো সম্ভব এবং কোন নিরাপত্তা ঝুঁকি আগেভাগেই মোকাবিলা করা দরকার—এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে আগামী দিনের আঞ্চলিক ভারসাম্য।
মধ্যপ্রাচ্যের সামনে এখন একাধিক সম্ভাব্য পথ খোলা। এর কিছু নতুন সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করবে, কিছু নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ডেকে আনবে, আবার কিছু পুরোনো সংকটকে নতুন আকারে ফিরিয়ে আনতে পারে। তাই আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো পরিবর্তনকে অস্বীকার না করে তা বোঝা, সম্ভাব্য ঝুঁকি আগে থেকে শনাক্ত করা এবং নিজেদের সম্মিলিত স্বার্থকে কেন্দ্র করে কৌশল নির্ধারণ করা।
কারণ আগামী দিনের মধ্যপ্রাচ্য শুধু যুদ্ধের ফলাফল দিয়ে নির্ধারিত হবে না। নির্ধারিত হবে যুদ্ধের আগে ও পরে তৈরি হওয়া সেই সব নতুন সম্পর্ক, জোট, অর্থনৈতিক করিডর, নিরাপত্তা কাঠামো এবং কূটনৈতিক সমীকরণ দিয়ে—যেগুলো ইতিমধ্যে নিজেদের মতো করে একটি নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতার ভিত্তি তৈরি করেছে।
ওয়ালিদ এম. আবদেলনাসের 


















