০৩:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
তারেক রহমানের দিল্লি সফরের সম্ভাবনা আপাতত বাতিল করলো ঢাকা আঞ্চলিক রাজনীতির নতুন মানচিত্র সীমান্তে ফের পুশইনের চেষ্টা, চারজনকে ঠেকিয়ে দিল বিজিবি ইউরোপের পোশাকবাজারে ধাক্কা, প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি কমল ১৬ শতাংশ স্বাধীনতার ৭৯ বছরে পাকিস্তানকে ঐক্য ও শৃঙ্খলার বার্তা সশস্ত্র বাহিনীর মাস্তাংয়ে বেলুচিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বহরে হামলা, আহত ৬ নিরাপত্তাকর্মী পাহালগাম হামলার পর মোদির প্রথম প্রশ্ন—‘কারা করেছে?’ অজিত দোভালের মুখে অপারেশন সিঁদুরের নেপথ্যকথা রাজনীতির ময়দানে ফের বিতর্ক: বিজয়ের মাকে নিয়ে নাইনর নাগেন্দ্রনের মন্তব্যে তীব্র সমালোচনা ইন্দোনেশিয়ায় আবারও শক্তিশালী ভূমিকম্প, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ৬.৯ মাত্রার কম্পনে কাঁপল উত্তর সুমাত্রা পাকিস্তানের হিন্দুরা ভারত নয়, পাকিস্তানেই থাকতে চান—জারদারির দাবি

রুয়ান্ডার গণহত্যার ক্ষত ও ক্ষমার কঠিন পথ, ‘জাকারান্ডা’য় গায়েল ফায়ের অনন্য উপন্যাস

রুয়ান্ডার ইতিহাসে ১৯৯৪ সালের গণহত্যা শুধু একটি জাতির রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের অধ্যায় নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা গভীর মানসিক ক্ষতেরও নাম। গায়েল ফায়ের পুরস্কারজয়ী উপন্যাস ‘জাকারান্ডা’ সেই ক্ষত, স্মৃতি, বিচার, ক্ষমা এবং পুনর্মিলনের জটিল সম্পর্ককে অত্যন্ত সংযত অথচ শক্তিশালী ভাষায় তুলে ধরেছে।

ফরাসি-রুয়ান্ডান লেখক গায়েল ফায়ে প্রথম উপন্যাস ‘পেতি পেই’ প্রকাশ করে ২০১৬ সালে ব্যাপক প্রশংসা পান। বুরুন্ডির গৃহযুদ্ধের সময় কৈশোরের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত সেই উপন্যাসটি প্রায় ১৫ লাখ কপি বিক্রি হয়, পরে চলচ্চিত্রেও রূপ নেয় এবং ফ্রান্সের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পাঠ্য হিসেবেও স্থান পায়। এমন সাফল্যের পর দ্বিতীয় উপন্যাস নিয়ে প্রত্যাশা ছিল স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি।

২০২৪ সালে ফ্রান্সে প্রকাশিত ‘জাকারান্ডা’ সেই প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে যায়। প্রকাশের প্রথম মাসেই বইটির প্রায় এক লাখ কপি বিক্রি হয় এবং এটি ফ্রান্সের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রেনোদো সাহিত্য পুরস্কার লাভ করে।

ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে জাতীয় ট্র্যাজেডি

উপন্যাসটির কেন্দ্রে রয়েছে মিলান নামের এক ফরাসি-রুয়ান্ডান কিশোর। ফ্রান্সের ভার্সাই শহরে বেড়ে ওঠা মিলানের কাছে রুয়ান্ডার গণহত্যার খবর প্রথমে পৌঁছায় টেলিভিশনের পর্দায়। পরে তার এক তরুণ আত্মীয় ক্লদ গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসার জন্য ফ্রান্সে এলে সেই দূরবর্তী বিপর্যয় তার ব্যক্তিগত জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।

Petit pays by Gaël Faye | Goodreads

কয়েক বছর পর মিলান রুয়ান্ডায় যাওয়ার সুযোগ পায়। সেখানে সে ক্লদের সঙ্গে আবার দেখা করে এবং তার মায়ের পুরোনো বন্ধু ইউজেবির সঙ্গে পরিচিত হয়। সেই যাত্রার মধ্য দিয়ে মিলান শুধু একটি দেশের ভূগোল আবিষ্কার করে না, আবিষ্কার করে তার পরিবারের ইতিহাস, স্মৃতি এবং দীর্ঘদিন চাপা পড়ে থাকা সত্য।

১৯৯৪ সালের মাত্র কয়েক মাসে রুয়ান্ডায় আনুমানিক পাঁচ লাখ মানুষ নিহত হয়েছিলেন, যাদের অধিকাংশই ছিলেন তুতসি জনগোষ্ঠীর সদস্য। উপন্যাসে সেই হত্যাযজ্ঞকে কেবল পরিসংখ্যান হিসেবে দেখা হয়নি। বরং ব্যক্তিগত স্মৃতি, পারিবারিক সম্পর্ক এবং মানুষের মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গণহত্যার অভিঘাতকে তুলে ধরা হয়েছে।

বিচার এলেও ক্ষত থেকে যায়

গণহত্যার পর রুয়ান্ডায় পুনর্মিলনের একটি রাষ্ট্রনির্ধারিত নীতি চালু হয়। কিন্তু একই পাড়ায় যখন একজন হত্যাকারীর পরিবার এবং নিহত মানুষের পরিবার পাশাপাশি বসবাস করে, তখন আইন দিয়ে কি অতীতের ক্ষত মুছে ফেলা সম্ভব?

এই প্রশ্নই ‘জাকারান্ডা’র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

মিলান স্থানীয় গণবিচারব্যবস্থার কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করে। ২০০২ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে এই বিশেষ আদালতগুলো গণহত্যাসংক্রান্ত অপরাধে অভিযুক্ত ১০ লাখেরও বেশি মানুষের বিচার করে। মিলান ক্লদের সঙ্গে এমন একটি বিচারেও উপস্থিত থাকে, যেখানে ক্লদ দুই গণহত্যাকারীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়।

বিচার কিছুটা ন্যায়বিচারের অনুভূতি এনে দেয়। কিন্তু ন্যায়বিচার আর মানসিক পরিসমাপ্তি যে এক জিনিস নয়, উপন্যাসটি সেই সত্যই সামনে আনে। আদালত অপরাধের বিচার করতে পারে, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ফিরিয়ে দিতে পারে না; অতীতের আতঙ্কও সহজে মুছে যায় না।

স্মৃতি যখন প্রজন্ম পেরিয়ে যায়

গণহত্যার বার্ষিক স্মরণপর্বে মিলান ইউজেবির সাক্ষ্য শুনতে থাকে। তার বক্তব্যের সময় দর্শকদের মধ্যে কেউ আতঙ্কে ভেঙে পড়ে, কেউ চিৎকার করে ওঠে, কেউ আবার এমনভাবে প্রাণভিক্ষা করতে থাকে যেন বহু বছর আগের হত্যাকারীরা এখনও তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

এই দৃশ্যের মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন, গণহত্যার অভিঘাত শুধু প্রত্যক্ষভাবে বেঁচে থাকা মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমনকি যারা হত্যাকাণ্ডের সময় জন্মায়ওনি, তারাও উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ভয়, নীরবতা ও পারিবারিক স্মৃতির ভার বহন করতে পারে।

Rwanda: “Jacaranda” by Gaël Faye – Travel Readings

ক্ষমা কি সত্যিই সম্ভব?

‘জাকারান্ডা’ মূলত রুয়ান্ডার গল্প হলেও এর প্রশ্ন সর্বজনীন। মানুষ কি অতীতের অপরাধ ক্ষমা করতে পারে? ভুলে যাওয়া কি সম্ভব? আর ক্ষমা যদি সম্ভবও হয়, তবে তা কি ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে?

উপন্যাসটি এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর দেয় না। বরং দেখায়, পুনর্মিলন একটি দীর্ঘ ও অসম্পূর্ণ প্রক্রিয়া। কখনও কখনও একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও অতীত নিয়ে ভিন্ন অনুভূতি থাকে। কেউ ক্ষমার দিকে এগিয়ে যেতে চায়, কেউ আবার ভুলে যেতে পারে না।

তবু আশার জায়গাটিও লেখক খুঁজে পান নতুন প্রজন্মের মধ্যে। উপন্যাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্যে দেখা যায়, একজন গণহত্যাকারীর ছেলেরা সেই বাড়ি পুনর্নির্মাণ করছে, যে বাড়ি ধ্বংসে তাদের বাবা ভূমিকা রেখেছিলেন। এই নির্মাণ যেন শুধু একটি বাড়ি পুনর্গঠনের ঘটনা নয়; বরং ধ্বংসের উত্তরাধিকার থেকে বেরিয়ে এসে নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রতীক।

ইতিহাসের ভার থেকে ভবিষ্যতের পথে

গায়েল ফায়ের লেখার শক্তি তার সংযমে। তিনি রক্তাক্ত ইতিহাসকে অতিরঞ্জিত নাটকীয়তায় উপস্থাপন না করে মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তার গভীরতা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। মিলানের চোখে রুয়ান্ডাকে দেখা মানে একই সঙ্গে একটি দেশের অতীত, একটি পরিবারের স্মৃতি এবং একজন তরুণ মানুষের নিজের পরিচয় খোঁজার যাত্রা দেখা।

‘জাকারান্ডা’ তাই শুধু রুয়ান্ডার গণহত্যা নিয়ে লেখা একটি উপন্যাস নয়। এটি প্রশ্ন তোলে—একটি সমাজ কতটা দূর এগোতে পারে, যখন তার বর্তমানের নিচে চাপা পড়ে থাকে অতীতের অসংখ্য অসমাপ্ত গল্প?

সম্ভবত উত্তরটি লুকিয়ে আছে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে। অতীতকে অস্বীকার না করে, অপরাধকে ভুলে না গিয়ে এবং ক্ষতকে চেপে না রেখে নতুন সম্পর্ক ও নতুন সমাজ গড়ার মধ্যেই হয়তো পুনর্মিলনের সবচেয়ে বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

তারেক রহমানের দিল্লি সফরের সম্ভাবনা আপাতত বাতিল করলো ঢাকা

রুয়ান্ডার গণহত্যার ক্ষত ও ক্ষমার কঠিন পথ, ‘জাকারান্ডা’য় গায়েল ফায়ের অনন্য উপন্যাস

০২:০১:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

রুয়ান্ডার ইতিহাসে ১৯৯৪ সালের গণহত্যা শুধু একটি জাতির রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের অধ্যায় নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা গভীর মানসিক ক্ষতেরও নাম। গায়েল ফায়ের পুরস্কারজয়ী উপন্যাস ‘জাকারান্ডা’ সেই ক্ষত, স্মৃতি, বিচার, ক্ষমা এবং পুনর্মিলনের জটিল সম্পর্ককে অত্যন্ত সংযত অথচ শক্তিশালী ভাষায় তুলে ধরেছে।

ফরাসি-রুয়ান্ডান লেখক গায়েল ফায়ে প্রথম উপন্যাস ‘পেতি পেই’ প্রকাশ করে ২০১৬ সালে ব্যাপক প্রশংসা পান। বুরুন্ডির গৃহযুদ্ধের সময় কৈশোরের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত সেই উপন্যাসটি প্রায় ১৫ লাখ কপি বিক্রি হয়, পরে চলচ্চিত্রেও রূপ নেয় এবং ফ্রান্সের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পাঠ্য হিসেবেও স্থান পায়। এমন সাফল্যের পর দ্বিতীয় উপন্যাস নিয়ে প্রত্যাশা ছিল স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি।

২০২৪ সালে ফ্রান্সে প্রকাশিত ‘জাকারান্ডা’ সেই প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে যায়। প্রকাশের প্রথম মাসেই বইটির প্রায় এক লাখ কপি বিক্রি হয় এবং এটি ফ্রান্সের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রেনোদো সাহিত্য পুরস্কার লাভ করে।

ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে জাতীয় ট্র্যাজেডি

উপন্যাসটির কেন্দ্রে রয়েছে মিলান নামের এক ফরাসি-রুয়ান্ডান কিশোর। ফ্রান্সের ভার্সাই শহরে বেড়ে ওঠা মিলানের কাছে রুয়ান্ডার গণহত্যার খবর প্রথমে পৌঁছায় টেলিভিশনের পর্দায়। পরে তার এক তরুণ আত্মীয় ক্লদ গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসার জন্য ফ্রান্সে এলে সেই দূরবর্তী বিপর্যয় তার ব্যক্তিগত জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।

Petit pays by Gaël Faye | Goodreads

কয়েক বছর পর মিলান রুয়ান্ডায় যাওয়ার সুযোগ পায়। সেখানে সে ক্লদের সঙ্গে আবার দেখা করে এবং তার মায়ের পুরোনো বন্ধু ইউজেবির সঙ্গে পরিচিত হয়। সেই যাত্রার মধ্য দিয়ে মিলান শুধু একটি দেশের ভূগোল আবিষ্কার করে না, আবিষ্কার করে তার পরিবারের ইতিহাস, স্মৃতি এবং দীর্ঘদিন চাপা পড়ে থাকা সত্য।

১৯৯৪ সালের মাত্র কয়েক মাসে রুয়ান্ডায় আনুমানিক পাঁচ লাখ মানুষ নিহত হয়েছিলেন, যাদের অধিকাংশই ছিলেন তুতসি জনগোষ্ঠীর সদস্য। উপন্যাসে সেই হত্যাযজ্ঞকে কেবল পরিসংখ্যান হিসেবে দেখা হয়নি। বরং ব্যক্তিগত স্মৃতি, পারিবারিক সম্পর্ক এবং মানুষের মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গণহত্যার অভিঘাতকে তুলে ধরা হয়েছে।

বিচার এলেও ক্ষত থেকে যায়

গণহত্যার পর রুয়ান্ডায় পুনর্মিলনের একটি রাষ্ট্রনির্ধারিত নীতি চালু হয়। কিন্তু একই পাড়ায় যখন একজন হত্যাকারীর পরিবার এবং নিহত মানুষের পরিবার পাশাপাশি বসবাস করে, তখন আইন দিয়ে কি অতীতের ক্ষত মুছে ফেলা সম্ভব?

এই প্রশ্নই ‘জাকারান্ডা’র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

মিলান স্থানীয় গণবিচারব্যবস্থার কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করে। ২০০২ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে এই বিশেষ আদালতগুলো গণহত্যাসংক্রান্ত অপরাধে অভিযুক্ত ১০ লাখেরও বেশি মানুষের বিচার করে। মিলান ক্লদের সঙ্গে এমন একটি বিচারেও উপস্থিত থাকে, যেখানে ক্লদ দুই গণহত্যাকারীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়।

বিচার কিছুটা ন্যায়বিচারের অনুভূতি এনে দেয়। কিন্তু ন্যায়বিচার আর মানসিক পরিসমাপ্তি যে এক জিনিস নয়, উপন্যাসটি সেই সত্যই সামনে আনে। আদালত অপরাধের বিচার করতে পারে, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ফিরিয়ে দিতে পারে না; অতীতের আতঙ্কও সহজে মুছে যায় না।

স্মৃতি যখন প্রজন্ম পেরিয়ে যায়

গণহত্যার বার্ষিক স্মরণপর্বে মিলান ইউজেবির সাক্ষ্য শুনতে থাকে। তার বক্তব্যের সময় দর্শকদের মধ্যে কেউ আতঙ্কে ভেঙে পড়ে, কেউ চিৎকার করে ওঠে, কেউ আবার এমনভাবে প্রাণভিক্ষা করতে থাকে যেন বহু বছর আগের হত্যাকারীরা এখনও তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

এই দৃশ্যের মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন, গণহত্যার অভিঘাত শুধু প্রত্যক্ষভাবে বেঁচে থাকা মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমনকি যারা হত্যাকাণ্ডের সময় জন্মায়ওনি, তারাও উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ভয়, নীরবতা ও পারিবারিক স্মৃতির ভার বহন করতে পারে।

Rwanda: “Jacaranda” by Gaël Faye – Travel Readings

ক্ষমা কি সত্যিই সম্ভব?

‘জাকারান্ডা’ মূলত রুয়ান্ডার গল্প হলেও এর প্রশ্ন সর্বজনীন। মানুষ কি অতীতের অপরাধ ক্ষমা করতে পারে? ভুলে যাওয়া কি সম্ভব? আর ক্ষমা যদি সম্ভবও হয়, তবে তা কি ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে?

উপন্যাসটি এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর দেয় না। বরং দেখায়, পুনর্মিলন একটি দীর্ঘ ও অসম্পূর্ণ প্রক্রিয়া। কখনও কখনও একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও অতীত নিয়ে ভিন্ন অনুভূতি থাকে। কেউ ক্ষমার দিকে এগিয়ে যেতে চায়, কেউ আবার ভুলে যেতে পারে না।

তবু আশার জায়গাটিও লেখক খুঁজে পান নতুন প্রজন্মের মধ্যে। উপন্যাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্যে দেখা যায়, একজন গণহত্যাকারীর ছেলেরা সেই বাড়ি পুনর্নির্মাণ করছে, যে বাড়ি ধ্বংসে তাদের বাবা ভূমিকা রেখেছিলেন। এই নির্মাণ যেন শুধু একটি বাড়ি পুনর্গঠনের ঘটনা নয়; বরং ধ্বংসের উত্তরাধিকার থেকে বেরিয়ে এসে নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রতীক।

ইতিহাসের ভার থেকে ভবিষ্যতের পথে

গায়েল ফায়ের লেখার শক্তি তার সংযমে। তিনি রক্তাক্ত ইতিহাসকে অতিরঞ্জিত নাটকীয়তায় উপস্থাপন না করে মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তার গভীরতা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। মিলানের চোখে রুয়ান্ডাকে দেখা মানে একই সঙ্গে একটি দেশের অতীত, একটি পরিবারের স্মৃতি এবং একজন তরুণ মানুষের নিজের পরিচয় খোঁজার যাত্রা দেখা।

‘জাকারান্ডা’ তাই শুধু রুয়ান্ডার গণহত্যা নিয়ে লেখা একটি উপন্যাস নয়। এটি প্রশ্ন তোলে—একটি সমাজ কতটা দূর এগোতে পারে, যখন তার বর্তমানের নিচে চাপা পড়ে থাকে অতীতের অসংখ্য অসমাপ্ত গল্প?

সম্ভবত উত্তরটি লুকিয়ে আছে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে। অতীতকে অস্বীকার না করে, অপরাধকে ভুলে না গিয়ে এবং ক্ষতকে চেপে না রেখে নতুন সম্পর্ক ও নতুন সমাজ গড়ার মধ্যেই হয়তো পুনর্মিলনের সবচেয়ে বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।