০৩:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
তারেক রহমানের দিল্লি সফরের সম্ভাবনা আপাতত বাতিল করলো ঢাকা আঞ্চলিক রাজনীতির নতুন মানচিত্র সীমান্তে ফের পুশইনের চেষ্টা, চারজনকে ঠেকিয়ে দিল বিজিবি ইউরোপের পোশাকবাজারে ধাক্কা, প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি কমল ১৬ শতাংশ স্বাধীনতার ৭৯ বছরে পাকিস্তানকে ঐক্য ও শৃঙ্খলার বার্তা সশস্ত্র বাহিনীর মাস্তাংয়ে বেলুচিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বহরে হামলা, আহত ৬ নিরাপত্তাকর্মী পাহালগাম হামলার পর মোদির প্রথম প্রশ্ন—‘কারা করেছে?’ অজিত দোভালের মুখে অপারেশন সিঁদুরের নেপথ্যকথা রাজনীতির ময়দানে ফের বিতর্ক: বিজয়ের মাকে নিয়ে নাইনর নাগেন্দ্রনের মন্তব্যে তীব্র সমালোচনা ইন্দোনেশিয়ায় আবারও শক্তিশালী ভূমিকম্প, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ৬.৯ মাত্রার কম্পনে কাঁপল উত্তর সুমাত্রা পাকিস্তানের হিন্দুরা ভারত নয়, পাকিস্তানেই থাকতে চান—জারদারির দাবি

পাহাড়জয়ী নির্মল পুরজা: অসম্ভবকে সম্ভব করার এক দুরন্ত জীবনের শেষ অধ্যায়

নির্মল পুরজা ছিলেন এমন এক পর্বতারোহী, যিনি পাহাড়ে ওঠাকে শুধু ক্রীড়া হিসেবে দেখেননি; তিনি এটিকে মানুষের সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর এক অবিশ্বাস্য অভিযানে পরিণত করেছিলেন। নেপালের গুর্খা এই পর্বতারোহী ৩০ জুলাই তুষারধসে প্রাণ হারিয়েছেন। বয়স হয়েছিল ৪৩ বছর। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হলো আধুনিক পর্বতারোহণের সবচেয়ে আলোচিত, দ্রুততম ও দুঃসাহসী অধ্যায়গুলোর একটি।

পর্বতারোহণের জগতে নির্মল পুরজার উত্থান ছিল তুলনামূলকভাবে দেরিতে। মাত্র ৩০ বছর বয়সে তিনি বিশ্বের সপ্তম সর্বোচ্চ পর্বত ধবলগিরিতে উঠতে গিয়ে নিজের অসাধারণ সক্ষমতার পরিচয় দেন। ধবলগিরির পাদদেশের একটি গ্রামে তাঁর জন্ম। ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে নেপালের সমতল দক্ষিণাঞ্চলে চলে যাওয়ায় বিশাল পর্বতটির সঙ্গে তাঁর শৈশবের সরাসরি পরিচয় খুব বেশি ছিল না। কিন্তু পরবর্তীকালে সেই পর্বতই তাঁকে বুঝিয়ে দেয়, উচ্চতার সঙ্গে লড়াইয়ে তাঁর শরীর ও মন অন্যদের চেয়ে কতটা আলাদা।

তুষারের গভীরে হাঁটু পর্যন্ত ডুবে পথ তৈরি করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, উচ্চতা তাঁকে যেন অন্যদের মতো দুর্বল করছে না। প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল শক্তি ও গতি। দলের অন্যরা যখন অনেক নিচে পড়ে থাকতেন, তিনি তখন সামনে এগিয়ে পথ তৈরি করছিলেন। ধবলগিরিতে অভিযানের প্রায় ৭০ শতাংশ পথ নিজেই তৈরি করেছিলেন তিনি।

এই অভিজ্ঞতার পর তাঁর কাছে পাহাড়ে ওঠা আর সাধারণ কোনো অভিযান থাকেনি। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন, অন্যরা যে কাজকে অসম্ভব মনে করে, সেটিই তাঁকে করতে হবে—আর করতে হবে দ্রুত।

Climber who captured viral image of Mount Everest traffic is on a quest to  conquer the world's 14 highest peaks in record-breaking time · Global Voices

ছয় মাস ছয় দিনে ১৪টি আট-হাজারি পর্বত

নির্মল পুরজাকে বিশ্বজোড়া পরিচিতি এনে দেয় ২০১৯ সালের তাঁর ঐতিহাসিক অভিযান। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর গুর্খা সদস্য ও বিশেষ বাহিনীর সৈনিকের চাকরি ছেড়ে তিনি বিশ্বের ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার ১৪টি পর্বত জয় করার লক্ষ্য নেন।

এই উচ্চতাকে পর্বতারোহণের ভাষায় মৃত্যুঝুঁকির অঞ্চল বলা হয়। সেখানে অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে মানুষের শরীর দ্রুত দুর্বল হতে শুরু করে এবং দীর্ঘ সময় অবস্থান করা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

কিন্তু পুরজার অভিযান ছিল অবিশ্বাস্য দ্রুতগতির। মাত্র ছয় মাস ছয় দিনে তিনি ১৪টি পর্বত জয় করেন। এর আগে এই রেকর্ড সম্পন্ন করতে একজন পর্বতারোহীর সাত বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল।

তাঁর এই অভিযানের নাম ছিল ‘প্রজেক্ট পসিবল’। অর্থাৎ, অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রকল্প। অর্থের অভাবে অভিযানটি শুরু করাও সহজ ছিল না। পরে এটি প্রামাণ্যচিত্রে রূপ নেয় এবং তাঁর লেখা বইয়ের মাধ্যমেও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর গল্প। নিউইয়র্কের মতো শহরে তাঁর ছবি সম্বলিত বিশাল বিজ্ঞাপন দেখা যায়। বিমানবন্দরে ভক্তরা তাঁকে ঘিরে ধরতেন, আর নেপালে তিনি জাতীয় নায়কের মর্যাদা পান।

গতি ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র

নির্মল পুরজার পর্বতারোহণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল গতি। তিনি একই অভিযানে একাধিক পর্বত দ্রুত জয় করতেন। অনেক সময় এক পর্বত থেকে নেমে বিশ্রাম না নিয়েই আরেকটির দিকে রওনা দিতেন।

বিশ্বের পঞ্চম সর্বোচ্চ পর্বত মাকালু তিনি এভারেস্ট জয়ের মাত্র চার দিন পর আরোহণ করেন। পুরো অভিযানে সময় লাগে মাত্র ১৮ ঘণ্টা। তারও একটি বড় অংশ কেটেছিল উদ্‌যাপনে, ঘুমে নয়।

Who was Nirmal Purja? Mountaineering legend dies after Broad Peak avalanche

বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বত কাঞ্চনজঙ্ঘাও তিনি মাত্র ২১ ঘণ্টায় জয় করেন। এর মাত্র তিন দিন আগে ধবলগিরির চূড়ায় ওঠার পরও তিনি প্রচণ্ড শারীরিক ক্লান্তি নিয়ে সেই অভিযান সম্পন্ন করেছিলেন।

তিনি সাধারণত খুব কম সরঞ্জাম নিয়ে যাত্রা করতেন। কখনো খাবার বা ঘুমানোর ব্যাগও সঙ্গে রাখতেন না। বরফ গলিয়ে পান করার জন্য থাকত গরম পানির পাত্র। চূড়ায় পৌঁছে সূর্যোদয়ের অপূর্ব কমলা-গোলাপি আলো ও মেঘের দৃশ্য দেখার সময়টুকুও যেন তাঁর কাছে খুব অল্প—তারপরই শুরু হতো নিচে নামার প্রস্তুতি।

এভারেস্ট নয়, শীতের কে-টু ছিল বড় চ্যালেঞ্জ

এভারেস্টের প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ ছিল না। ২০১৬ সালে প্রথমবার তিনি খুব দ্রুত এককভাবে এভারেস্টে ওঠার চেষ্টা করেছিলেন। সেই অভিযানে উচ্চতাজনিত অসুস্থতা এতটাই তীব্র হয়েছিল যে শ্বাসকষ্টে তাঁকে ফিরে আসতে হয়।

পরে তিনি বহুবার সহজেই এভারেস্ট জয় করেন। কিন্তু মানুষের ভিড় ও পর্বতের ওপর জমে থাকা আবর্জনা তাঁর অপছন্দ ছিল।

তাঁর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত কে-টু। বিশেষ করে শীতকালে কে-টু জয় করা তখনও অসম্ভব বলে বিবেচিত হতো। শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি নেপালি একটি দলের সঙ্গে তিনি সেই অসম্ভব কাজটিও করে দেখান। চূড়ায় পৌঁছে দলের সদস্যরা নেপালের জাতীয় সংগীত গেয়ে উদ্‌যাপন করেন।

সমালোচনাও ছিল তাঁর সঙ্গী

পুরজার সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর পর্বতারোহণের পদ্ধতি নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক ছিল। তিনি বোতলজাত অক্সিজেন ব্যবহার করতেন, স্থায়ীভাবে স্থাপন করা দড়ি ব্যবহার করতেন এবং কখনো এক পর্বতের শিবির থেকে অন্য শিবিরে হেলিকপ্টারে যাতায়াত করতেন।

How Nirmal Purja Summited the World's 14 Tallest Mountains - InsideHook

পর্বতারোহণের রক্ষণশীল অংশের অনেকে মনে করতেন, এভাবে দ্রুত চূড়ায় পৌঁছানোর চেয়ে নতুন পথ আবিষ্কারে মন দেওয়া উচিত। কিন্তু পুরজা এসব সমালোচনায় খুব একটা বিচলিত হননি।

বিশেষ করে অক্সিজেন ব্যবহারের সমালোচনার জবাবে তাঁর যুক্তি ছিল বাস্তবধর্মী। অভিযানে তিনি অনেক পর্বতারোহীকে বিপদে পড়তে দেখেছেন, যাদের অক্সিজেন শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাঁর নিজের কাছে অতিরিক্ত অক্সিজেন থাকলে বিপদে পড়া মানুষকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

আবার কখনো কখনো সমালোচকদের জবাব দিতেই তিনি বোতলজাত অক্সিজেন ছাড়াই আট-হাজারি পর্বতে আরোহণ করতেন। তাঁর কাছে পর্বতারোহণের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের সামনে একটি বার্তা তুলে ধরা—মনস্থির করে এগোলে প্রত্যেক মানুষ নিজের জীবনের ‘পাহাড়’ জয় করতে পারে।

ছোটবেলা থেকেই ছিল লড়াইয়ের প্রস্তুতি

নির্মল পুরজার অসাধারণ শারীরিক সক্ষমতা হঠাৎ তৈরি হয়নি। ইংরেজি মাধ্যমের আবাসিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তিনি কঠোর প্রশিক্ষণ শুরু করেন। তাঁর বাবা ও ভাইয়েরাও গুর্খা বাহিনীতে ছিলেন। তাই তিনিও সেই বাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।

রাতে দৌড়ানোর অভ্যাস ছিল তাঁর। পরে সেনাজীবনে প্রতিদিনের কঠোর প্রশিক্ষণ তাঁর শরীরকে আরও শক্ত করে তোলে। অবসরে কাজের পর তিনি দীর্ঘ সময় সাঁতার কাটতেন।

ক্যাটেরিক সেনাঘাঁটিতে থাকার সময় ব্রিটিশ সেনাদের কেউ কেউ তাঁর উচ্চারণ ও গায়ের রং নিয়ে তাঁকে উপহাস করতেন। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও জেদি করে তোলে। তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, যোগ্যতা থাকলে যে কোনো কঠিন বাহিনীর সদস্য হওয়া সম্ভব।

একবার ওয়েলসের পাহাড়ি এলাকায় প্রশিক্ষণের সময় প্রায় ৩৪ কেজি ওজনের ভার পিঠে নিয়ে হাঁটছিলেন। প্রশিক্ষক তাঁর বোঝার সঙ্গে আরও একটি পাথর যোগ করে দেন। তখনও তিনি থামেননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, হাল ছেড়ে দেওয়া তাঁর স্বভাবের অংশ নয়।

Nirmal “Nims” Purja: Climbing earth's 14 highest mountains in world-record  time

মৃত্যুর মুখ থেকে একাধিকবার ফিরে এসেছিলেন

পর্বতারোহণের পাশাপাশি তাঁর সামরিক জীবনেও মৃত্যু খুব কাছ থেকে তাঁকে ছুঁয়েছে। বিশেষ বাহিনীতে দায়িত্ব পালনের সময় এক স্নাইপারের গুলি তাঁকে একটি ছাদ থেকে ছিটকে ফেলে দেয়। তাঁর অস্ত্রের বাঁট ভেঙে যায় এবং গুলি চোয়াল কেটে বেরিয়ে যায়।

আরেকবার নাঙ্গা পর্বতে দড়ি ছেড়ে দিয়ে তিনি প্রায় মৃত্যুর মুখে পড়ে গিয়েছিলেন। বরফে বরফকুঠার ঠিকমতো আটকে না যাওয়ায় তিনি দ্রুত নিচে পড়ে যাচ্ছিলেন। তখন শেষ মুহূর্তে নিচের দড়ির একটি অংশ ধরে ফেলতে সক্ষম হন।

মৃত্যুকে তিনি কখনো অতিরিক্ত ভয় পেতেন না। তাঁর দর্শন ছিল, একদিন সবাইকেই মরতে হবে। তাই পাহাড়ে ওঠার সময় তিনি ভয়কে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে দিতেন না।

তবে শেরপা পর্বতারোহীদের ঐতিহ্যগত আচার-অনুষ্ঠানকে তিনি খুব একটা অনুসরণ করতেন না। তাঁর পদ্ধতি ছিল অনেক বেশি সামরিক—সম্পূর্ণ আক্রমণাত্মক, দ্রুত এবং দৃঢ়।

তারপরও পাহাড়ে ওঠার আগে তাঁর একটি ব্যক্তিগত রীতি ছিল। তিনি একা পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে যেন কথোপকথন করতেন। বরফ ও পাথরের বিশাল দেয়ালের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, ‘আমি কি যেতে পারি?’

শেষবারও পাহাড়ের কাছে অনুমতি চেয়েছিলেন

Nirmal 'Nims' Purja Scales Nanga Parbat To Complete His Seventh 8000Er |  Mountain Planet

জীবনের শুরুতে অন্নপূর্ণা যেন তাঁকে অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু সেই পাহাড়ই পরে ভয়াবহ তুষারধস নামিয়ে তাঁর দলকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। তবু পাহাড়ের সঙ্গে সেই নীরব কথোপকথনের অভ্যাস তিনি ছাড়েননি।

জীবনের শেষ অভিযানেও তিনি একই প্রশ্ন করেছিলেন ব্রড পিককে। সাম্প্রতিক তুষারপাতের কারণে অনেক পর্বতারোহী সেখানে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চাননি। কিন্তু পুরজা এগিয়ে যান।

৩০ জুলাই আরেকটি তুষারধস তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

তখন তিনি বিশ্বের ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার ১৪টি পর্বত প্রায় তৃতীয়বারের মতো জয় করার পথে ছিলেন। এর মধ্যে দ্বিতীয়বারের অভিযানটি তিনি বোতলজাত অক্সিজেন ছাড়াই সম্পন্ন করছিলেন।

শেষ পর্যন্ত যে পাহাড়কে তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়েছিলেন, সেই পাহাড়ই তাঁর জীবনের শেষ সিদ্ধান্তটি নিয়ে নিল।

নির্মল পুরজার গল্প তাই শুধু একজন পর্বতারোহীর গল্প নয়। এটি গতি, সাহস, জেদ, আত্মবিশ্বাস এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার এক বিরল মানসিকতার গল্প। তিনি পাহাড় জয় করেছেন অসংখ্যবার, কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় জয় হয়তো ছিল মানুষের ধারণার সীমা বদলে দেওয়া—যে সীমা অন্যরা অতিক্রম করতে ভয় পেত, তিনি সেখানেই নিজের পথ তৈরি করেছিলেন।

 

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

তারেক রহমানের দিল্লি সফরের সম্ভাবনা আপাতত বাতিল করলো ঢাকা

পাহাড়জয়ী নির্মল পুরজা: অসম্ভবকে সম্ভব করার এক দুরন্ত জীবনের শেষ অধ্যায়

০২:২৫:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

নির্মল পুরজা ছিলেন এমন এক পর্বতারোহী, যিনি পাহাড়ে ওঠাকে শুধু ক্রীড়া হিসেবে দেখেননি; তিনি এটিকে মানুষের সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর এক অবিশ্বাস্য অভিযানে পরিণত করেছিলেন। নেপালের গুর্খা এই পর্বতারোহী ৩০ জুলাই তুষারধসে প্রাণ হারিয়েছেন। বয়স হয়েছিল ৪৩ বছর। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হলো আধুনিক পর্বতারোহণের সবচেয়ে আলোচিত, দ্রুততম ও দুঃসাহসী অধ্যায়গুলোর একটি।

পর্বতারোহণের জগতে নির্মল পুরজার উত্থান ছিল তুলনামূলকভাবে দেরিতে। মাত্র ৩০ বছর বয়সে তিনি বিশ্বের সপ্তম সর্বোচ্চ পর্বত ধবলগিরিতে উঠতে গিয়ে নিজের অসাধারণ সক্ষমতার পরিচয় দেন। ধবলগিরির পাদদেশের একটি গ্রামে তাঁর জন্ম। ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে নেপালের সমতল দক্ষিণাঞ্চলে চলে যাওয়ায় বিশাল পর্বতটির সঙ্গে তাঁর শৈশবের সরাসরি পরিচয় খুব বেশি ছিল না। কিন্তু পরবর্তীকালে সেই পর্বতই তাঁকে বুঝিয়ে দেয়, উচ্চতার সঙ্গে লড়াইয়ে তাঁর শরীর ও মন অন্যদের চেয়ে কতটা আলাদা।

তুষারের গভীরে হাঁটু পর্যন্ত ডুবে পথ তৈরি করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, উচ্চতা তাঁকে যেন অন্যদের মতো দুর্বল করছে না। প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল শক্তি ও গতি। দলের অন্যরা যখন অনেক নিচে পড়ে থাকতেন, তিনি তখন সামনে এগিয়ে পথ তৈরি করছিলেন। ধবলগিরিতে অভিযানের প্রায় ৭০ শতাংশ পথ নিজেই তৈরি করেছিলেন তিনি।

এই অভিজ্ঞতার পর তাঁর কাছে পাহাড়ে ওঠা আর সাধারণ কোনো অভিযান থাকেনি। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন, অন্যরা যে কাজকে অসম্ভব মনে করে, সেটিই তাঁকে করতে হবে—আর করতে হবে দ্রুত।

Climber who captured viral image of Mount Everest traffic is on a quest to  conquer the world's 14 highest peaks in record-breaking time · Global Voices

ছয় মাস ছয় দিনে ১৪টি আট-হাজারি পর্বত

নির্মল পুরজাকে বিশ্বজোড়া পরিচিতি এনে দেয় ২০১৯ সালের তাঁর ঐতিহাসিক অভিযান। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর গুর্খা সদস্য ও বিশেষ বাহিনীর সৈনিকের চাকরি ছেড়ে তিনি বিশ্বের ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার ১৪টি পর্বত জয় করার লক্ষ্য নেন।

এই উচ্চতাকে পর্বতারোহণের ভাষায় মৃত্যুঝুঁকির অঞ্চল বলা হয়। সেখানে অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে মানুষের শরীর দ্রুত দুর্বল হতে শুরু করে এবং দীর্ঘ সময় অবস্থান করা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

কিন্তু পুরজার অভিযান ছিল অবিশ্বাস্য দ্রুতগতির। মাত্র ছয় মাস ছয় দিনে তিনি ১৪টি পর্বত জয় করেন। এর আগে এই রেকর্ড সম্পন্ন করতে একজন পর্বতারোহীর সাত বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল।

তাঁর এই অভিযানের নাম ছিল ‘প্রজেক্ট পসিবল’। অর্থাৎ, অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রকল্প। অর্থের অভাবে অভিযানটি শুরু করাও সহজ ছিল না। পরে এটি প্রামাণ্যচিত্রে রূপ নেয় এবং তাঁর লেখা বইয়ের মাধ্যমেও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর গল্প। নিউইয়র্কের মতো শহরে তাঁর ছবি সম্বলিত বিশাল বিজ্ঞাপন দেখা যায়। বিমানবন্দরে ভক্তরা তাঁকে ঘিরে ধরতেন, আর নেপালে তিনি জাতীয় নায়কের মর্যাদা পান।

গতি ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র

নির্মল পুরজার পর্বতারোহণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল গতি। তিনি একই অভিযানে একাধিক পর্বত দ্রুত জয় করতেন। অনেক সময় এক পর্বত থেকে নেমে বিশ্রাম না নিয়েই আরেকটির দিকে রওনা দিতেন।

বিশ্বের পঞ্চম সর্বোচ্চ পর্বত মাকালু তিনি এভারেস্ট জয়ের মাত্র চার দিন পর আরোহণ করেন। পুরো অভিযানে সময় লাগে মাত্র ১৮ ঘণ্টা। তারও একটি বড় অংশ কেটেছিল উদ্‌যাপনে, ঘুমে নয়।

Who was Nirmal Purja? Mountaineering legend dies after Broad Peak avalanche

বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বত কাঞ্চনজঙ্ঘাও তিনি মাত্র ২১ ঘণ্টায় জয় করেন। এর মাত্র তিন দিন আগে ধবলগিরির চূড়ায় ওঠার পরও তিনি প্রচণ্ড শারীরিক ক্লান্তি নিয়ে সেই অভিযান সম্পন্ন করেছিলেন।

তিনি সাধারণত খুব কম সরঞ্জাম নিয়ে যাত্রা করতেন। কখনো খাবার বা ঘুমানোর ব্যাগও সঙ্গে রাখতেন না। বরফ গলিয়ে পান করার জন্য থাকত গরম পানির পাত্র। চূড়ায় পৌঁছে সূর্যোদয়ের অপূর্ব কমলা-গোলাপি আলো ও মেঘের দৃশ্য দেখার সময়টুকুও যেন তাঁর কাছে খুব অল্প—তারপরই শুরু হতো নিচে নামার প্রস্তুতি।

এভারেস্ট নয়, শীতের কে-টু ছিল বড় চ্যালেঞ্জ

এভারেস্টের প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ ছিল না। ২০১৬ সালে প্রথমবার তিনি খুব দ্রুত এককভাবে এভারেস্টে ওঠার চেষ্টা করেছিলেন। সেই অভিযানে উচ্চতাজনিত অসুস্থতা এতটাই তীব্র হয়েছিল যে শ্বাসকষ্টে তাঁকে ফিরে আসতে হয়।

পরে তিনি বহুবার সহজেই এভারেস্ট জয় করেন। কিন্তু মানুষের ভিড় ও পর্বতের ওপর জমে থাকা আবর্জনা তাঁর অপছন্দ ছিল।

তাঁর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত কে-টু। বিশেষ করে শীতকালে কে-টু জয় করা তখনও অসম্ভব বলে বিবেচিত হতো। শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি নেপালি একটি দলের সঙ্গে তিনি সেই অসম্ভব কাজটিও করে দেখান। চূড়ায় পৌঁছে দলের সদস্যরা নেপালের জাতীয় সংগীত গেয়ে উদ্‌যাপন করেন।

সমালোচনাও ছিল তাঁর সঙ্গী

পুরজার সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর পর্বতারোহণের পদ্ধতি নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক ছিল। তিনি বোতলজাত অক্সিজেন ব্যবহার করতেন, স্থায়ীভাবে স্থাপন করা দড়ি ব্যবহার করতেন এবং কখনো এক পর্বতের শিবির থেকে অন্য শিবিরে হেলিকপ্টারে যাতায়াত করতেন।

How Nirmal Purja Summited the World's 14 Tallest Mountains - InsideHook

পর্বতারোহণের রক্ষণশীল অংশের অনেকে মনে করতেন, এভাবে দ্রুত চূড়ায় পৌঁছানোর চেয়ে নতুন পথ আবিষ্কারে মন দেওয়া উচিত। কিন্তু পুরজা এসব সমালোচনায় খুব একটা বিচলিত হননি।

বিশেষ করে অক্সিজেন ব্যবহারের সমালোচনার জবাবে তাঁর যুক্তি ছিল বাস্তবধর্মী। অভিযানে তিনি অনেক পর্বতারোহীকে বিপদে পড়তে দেখেছেন, যাদের অক্সিজেন শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাঁর নিজের কাছে অতিরিক্ত অক্সিজেন থাকলে বিপদে পড়া মানুষকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

আবার কখনো কখনো সমালোচকদের জবাব দিতেই তিনি বোতলজাত অক্সিজেন ছাড়াই আট-হাজারি পর্বতে আরোহণ করতেন। তাঁর কাছে পর্বতারোহণের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের সামনে একটি বার্তা তুলে ধরা—মনস্থির করে এগোলে প্রত্যেক মানুষ নিজের জীবনের ‘পাহাড়’ জয় করতে পারে।

ছোটবেলা থেকেই ছিল লড়াইয়ের প্রস্তুতি

নির্মল পুরজার অসাধারণ শারীরিক সক্ষমতা হঠাৎ তৈরি হয়নি। ইংরেজি মাধ্যমের আবাসিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তিনি কঠোর প্রশিক্ষণ শুরু করেন। তাঁর বাবা ও ভাইয়েরাও গুর্খা বাহিনীতে ছিলেন। তাই তিনিও সেই বাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।

রাতে দৌড়ানোর অভ্যাস ছিল তাঁর। পরে সেনাজীবনে প্রতিদিনের কঠোর প্রশিক্ষণ তাঁর শরীরকে আরও শক্ত করে তোলে। অবসরে কাজের পর তিনি দীর্ঘ সময় সাঁতার কাটতেন।

ক্যাটেরিক সেনাঘাঁটিতে থাকার সময় ব্রিটিশ সেনাদের কেউ কেউ তাঁর উচ্চারণ ও গায়ের রং নিয়ে তাঁকে উপহাস করতেন। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও জেদি করে তোলে। তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, যোগ্যতা থাকলে যে কোনো কঠিন বাহিনীর সদস্য হওয়া সম্ভব।

একবার ওয়েলসের পাহাড়ি এলাকায় প্রশিক্ষণের সময় প্রায় ৩৪ কেজি ওজনের ভার পিঠে নিয়ে হাঁটছিলেন। প্রশিক্ষক তাঁর বোঝার সঙ্গে আরও একটি পাথর যোগ করে দেন। তখনও তিনি থামেননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, হাল ছেড়ে দেওয়া তাঁর স্বভাবের অংশ নয়।

Nirmal “Nims” Purja: Climbing earth's 14 highest mountains in world-record  time

মৃত্যুর মুখ থেকে একাধিকবার ফিরে এসেছিলেন

পর্বতারোহণের পাশাপাশি তাঁর সামরিক জীবনেও মৃত্যু খুব কাছ থেকে তাঁকে ছুঁয়েছে। বিশেষ বাহিনীতে দায়িত্ব পালনের সময় এক স্নাইপারের গুলি তাঁকে একটি ছাদ থেকে ছিটকে ফেলে দেয়। তাঁর অস্ত্রের বাঁট ভেঙে যায় এবং গুলি চোয়াল কেটে বেরিয়ে যায়।

আরেকবার নাঙ্গা পর্বতে দড়ি ছেড়ে দিয়ে তিনি প্রায় মৃত্যুর মুখে পড়ে গিয়েছিলেন। বরফে বরফকুঠার ঠিকমতো আটকে না যাওয়ায় তিনি দ্রুত নিচে পড়ে যাচ্ছিলেন। তখন শেষ মুহূর্তে নিচের দড়ির একটি অংশ ধরে ফেলতে সক্ষম হন।

মৃত্যুকে তিনি কখনো অতিরিক্ত ভয় পেতেন না। তাঁর দর্শন ছিল, একদিন সবাইকেই মরতে হবে। তাই পাহাড়ে ওঠার সময় তিনি ভয়কে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে দিতেন না।

তবে শেরপা পর্বতারোহীদের ঐতিহ্যগত আচার-অনুষ্ঠানকে তিনি খুব একটা অনুসরণ করতেন না। তাঁর পদ্ধতি ছিল অনেক বেশি সামরিক—সম্পূর্ণ আক্রমণাত্মক, দ্রুত এবং দৃঢ়।

তারপরও পাহাড়ে ওঠার আগে তাঁর একটি ব্যক্তিগত রীতি ছিল। তিনি একা পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে যেন কথোপকথন করতেন। বরফ ও পাথরের বিশাল দেয়ালের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, ‘আমি কি যেতে পারি?’

শেষবারও পাহাড়ের কাছে অনুমতি চেয়েছিলেন

Nirmal 'Nims' Purja Scales Nanga Parbat To Complete His Seventh 8000Er |  Mountain Planet

জীবনের শুরুতে অন্নপূর্ণা যেন তাঁকে অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু সেই পাহাড়ই পরে ভয়াবহ তুষারধস নামিয়ে তাঁর দলকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। তবু পাহাড়ের সঙ্গে সেই নীরব কথোপকথনের অভ্যাস তিনি ছাড়েননি।

জীবনের শেষ অভিযানেও তিনি একই প্রশ্ন করেছিলেন ব্রড পিককে। সাম্প্রতিক তুষারপাতের কারণে অনেক পর্বতারোহী সেখানে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চাননি। কিন্তু পুরজা এগিয়ে যান।

৩০ জুলাই আরেকটি তুষারধস তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

তখন তিনি বিশ্বের ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার ১৪টি পর্বত প্রায় তৃতীয়বারের মতো জয় করার পথে ছিলেন। এর মধ্যে দ্বিতীয়বারের অভিযানটি তিনি বোতলজাত অক্সিজেন ছাড়াই সম্পন্ন করছিলেন।

শেষ পর্যন্ত যে পাহাড়কে তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়েছিলেন, সেই পাহাড়ই তাঁর জীবনের শেষ সিদ্ধান্তটি নিয়ে নিল।

নির্মল পুরজার গল্প তাই শুধু একজন পর্বতারোহীর গল্প নয়। এটি গতি, সাহস, জেদ, আত্মবিশ্বাস এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার এক বিরল মানসিকতার গল্প। তিনি পাহাড় জয় করেছেন অসংখ্যবার, কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় জয় হয়তো ছিল মানুষের ধারণার সীমা বদলে দেওয়া—যে সীমা অন্যরা অতিক্রম করতে ভয় পেত, তিনি সেখানেই নিজের পথ তৈরি করেছিলেন।