একসময় ধারণা করা হয়েছিল, ঘরে বসে মোবাইল ফোনে ছোট পর্দায় বিনোদন দেখার অভ্যাস সিনেমা হলের দিন শেষ করে দেবে। কিন্তু বাস্তবতা যেন উল্টো পথে হাঁটছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণ প্রজন্ম আবারও সিনেমা হলে ফিরছে। বড় পর্দায় সিনেমা দেখা তাদের কাছে শুধু একটি চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা নয়, বরং বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, সামাজিক যোগাযোগ তৈরি এবং একটি বিশেষ সন্ধ্যাকে উপভোগ করার উপলক্ষ হয়ে উঠছে।
চলতি বছর বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনে ইতোমধ্যেই একাধিক বড় সাফল্য এসেছে। পাঁচটি চলচ্চিত্র বিশ্বব্যাপী একশ কোটি ডলারের বেশি আয় করেছে এবং আরও তিনটি চলচ্চিত্র পঞ্চাশ কোটি ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। সামনে রয়েছে আরও কয়েকটি বহুল প্রতীক্ষিত বড় বাজেটের চলচ্চিত্র। ফলে চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, চলতি বছর বিশ্বব্যাপী সিনেমার টিকিট বিক্রি থেকে আয় প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি।
তরুণরাই হয়ে উঠছে সিনেমার নতুন শক্তি
করোনাভাইরাস মহামারির পর সিনেমা হলের দর্শকসংখ্যা আগের অবস্থায় পুরোপুরি ফিরে না এলেও তরুণদের উপস্থিতি নতুন আশাবাদ তৈরি করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৫ সালে প্রায় ৯০ শতাংশ তরুণ সিনেমা হলে গিয়েছিল। এই প্রজন্মের একজন দর্শক গড়ে বছরে সাতবার সিনেমা হলে গেছেন। একই সময়ে তুলনামূলক বয়স্ক প্রজন্মের সিনেমা হলে যাওয়ার হার ছিল কম।

তরুণদের এই আগ্রহ সরাসরি চলচ্চিত্রের ব্যবসায়িক সাফল্যে প্রভাব ফেলছে। সুপারহিরো চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে বিজ্ঞানভিত্তিক কাহিনি, ভৌতিক ছবি, প্রেমের গল্প কিংবা পুরোনো সাহিত্যকর্মের নতুন রূপ—বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্রেই তরুণ দর্শকদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ উত্তর আমেরিকায় মুক্তির প্রথম সপ্তাহান্তেই প্রায় ৩৬ কোটি ডলার আয় করে নতুন রেকর্ড গড়েছে। এর দর্শকদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের বয়স ছিল ১৮ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে। বিশ্বজুড়ে ছবিটির আয় ইতোমধ্যেই ১৭০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।
তবে তরুণদের আগ্রহ শুধু জনপ্রিয় নায়ক বা সুপারহিরোকে ঘিরে নয়। ঐতিহাসিক ও সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্র, অন্ধকার রোমান্টিক কাহিনি, বিজ্ঞানভিত্তিক অভিযান এবং ভৌতিক ছবিও তরুণ দর্শকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। মাত্র ২৬ বছর বয়সী এক নির্মাতার তৈরি একটি ভৌতিক চলচ্চিত্রও বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪৯ কোটি ডলার আয় করেছে, যা নির্মাণ ব্যয়ের তুলনায় ছিল অবিশ্বাস্য রকম বেশি।
এ প্রবণতা শুধু পশ্চিমা বিশ্বে নয়
তরুণদের সিনেমামুখী হওয়ার প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভারতেও ত্রিশ বছরের কম বয়সী দর্শক হিন্দি চলচ্চিত্রের মোট দর্শকের অর্ধেকের বেশি। সৌদি আরবে সিনেমা দর্শকদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের বয়স ৩৪ বছরের নিচে। ভিয়েতনামে এই হার প্রায় ৯০ শতাংশ।
জাপানেও তরুণদের সিনেমাপ্রেম নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত গ্রীষ্মে জনপ্রিয় জাপানি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র ‘ডেমন স্লেয়ার: ইনফিনিটি ক্যাসল’ দেখতে তরুণদের ব্যাপক ভিড় হয়েছিল। ছবিটি দেশটির ইতিহাসে মুক্তির প্রথম সপ্তাহান্তে সর্বোচ্চ আয়ের রেকর্ড তৈরি করে।
সিনেমার পুনর্জাগরণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, যে প্রযুক্তিকে একসময় সিনেমা হলের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হয়েছিল, সেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই এখন সিনেমা ব্যবসাকে নতুন করে শক্তি দিচ্ছে।
তরুণেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করছে, দৃশ্য ভাগাভাগি করছে, নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে এবং বন্ধুদের সিনেমা দেখতে উৎসাহিত করছে। ইউরোপের প্রায় অর্ধেক তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছোট ভিডিও দেখে নতুন চলচ্চিত্রের সন্ধান পায়।

কোনো একটি চলচ্চিত্রকে ঘিরে অনলাইনে হঠাৎ তৈরি হওয়া উন্মাদনাও সিনেমা হলে দর্শক টেনে আনছে। কয়েক বছর আগে একটি জনপ্রিয় অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র মুক্তির সময় একদল তরুণ একই ধরনের পোশাক পরে দলবেঁধে সিনেমা হলে হাজির হয়েছিল। আবার একটি জনপ্রিয় খেলার জগতভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সময় দর্শকদের চিৎকার, লাফালাফি ও উচ্ছ্বাসও সিনেমা দেখাকে এক ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত করেছিল।
‘বাদ পড়ে যাওয়ার ভয়’ও টানছে দর্শকদের
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি প্রভাব হলো, কোনো জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নিয়ে অন্যরা যখন ব্যাপক আলোচনা করে, তখন সেটি না দেখলে যেন কিছু একটা মিস হয়ে যাচ্ছে—তরুণদের মধ্যে এমন অনুভূতি তৈরি হয়।
চলচ্চিত্র নিয়ে মতামত লেখা ও দেখা যায় এমন একটি জনপ্রিয় অনলাইন চলচ্চিত্র-ভিত্তিক মঞ্চের ব্যবহারকারী সংখ্যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেড়ে এখন তিন কোটিতে পৌঁছেছে। সবচেয়ে সক্রিয় ব্যবহারকারীদের বড় অংশের বয়স ১৮ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে।
ফলে চলচ্চিত্রকে ঘিরে যে সংস্কৃতি একসময় মূলত তরুণদের হাতেই ছিল, সেটি আবারও তরুণ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
সিনেমা দেখা এখন একটি পূর্ণাঙ্গ আয়োজন
তরুণদের কাছে সিনেমা হলে যাওয়ার অর্থ শুধু টিকিট কেটে নির্দিষ্ট আসনে বসে পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা নয়। বন্ধুবান্ধব মিলে সিনেমা দেখা, এরপর একসঙ্গে খাবার খাওয়া কিংবা আড্ডা দেওয়া—সব মিলিয়ে এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক আয়োজন।
সিনেমা হলগুলোও এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে। দর্শকদের আকৃষ্ট করতে আরামদায়ক আসন, বিশেষ ধরনের খাবারের পাত্র এবং নানা অতিরিক্ত সুবিধা যুক্ত করা হচ্ছে। ফলে দর্শকপ্রতি আয়ও বেড়েছে।
একটি বড় মার্কিন সিনেমা হল প্রতিষ্ঠান ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রতি দর্শকের কাছ থেকে ২০১৯ সালের একই সময়ের তুলনায় ৪৪ শতাংশ বেশি আয় করেছে। মূল্যস্ফীতির হিসাব বাদ দিলেও এই বৃদ্ধি প্রায় ১১ শতাংশ।
ছোট পর্দার যুগেও বড় পর্দার আকর্ষণ
তরুণ প্রজন্মের জীবন এখন মোবাইল ফোন, ছোট ভিডিও এবং ধারাবাহিক অনলাইন বিনোদনে ভরা। সারাক্ষণ আঙুলের স্পর্শে নতুন নতুন ছবি ও ভিডিও সামনে হাজির হচ্ছে। তারপরও সিনেমা হলের অন্ধকার কক্ষে অচেনা মানুষের সঙ্গে পাশাপাশি বসে বিশাল পর্দায় একটি গল্প দেখার অভিজ্ঞতা তাদের কাছে আলাদা আবেদন তৈরি করছে।
এর মধ্যে রয়েছে এক ধরনের নস্টালজিয়াও। পুরোনো দিনের কিছু অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের কাছে আবার আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। ছোট পর্দায় অবিরাম স্ক্রল করার ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে বড় পর্দার সামনে কয়েক ঘণ্টা স্থির হয়ে বসে থাকা যেন এক ধরনের স্বস্তি।
চলচ্চিত্রের এই নতুন জোয়ার তাই শুধু ব্যবসার হিসাব নয়। এটি প্রমাণ করছে, প্রযুক্তি যতই বিনোদনের ধরন বদলে দিক, মানুষের একসঙ্গে বসে গল্প দেখার আকাঙ্ক্ষা এত সহজে হারিয়ে যায় না। বরং নতুন প্রজন্ম সেই পুরোনো অভিজ্ঞতাকেই নতুন সামাজিক সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে আবার আবিষ্কার করছে। সিনেমা হল হয়তো আগের মতো নেই, কিন্তু তরুণদের হাত ধরে তার জাদু যে আবারও ফিরছে, চলতি বছরের দর্শকসমাগম তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















