০৮:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬
যেখানে পাহাড়ই শিল্পশালা: লাদাখের আকাশছোঁয়া প্রান্তরে শিল্পের নতুন ভাষা পুরুষের চোখে নারীর প্রতিচ্ছবি: গভীর বিশ্লেষণের শক্তি, সময়ের সঙ্গে সংলাপের অপূর্ণতা স্ক্রিনের ক্লান্তি ছেড়ে আবার চিঠির টানে তরুণেরা: হাতে লেখা খামে ফিরছে হারিয়ে যাওয়া অনুভূতি শুল্ক কমতেই চীনে ফিরছে মার্কিন কোম্পানিগুলোর উৎপাদন পরিকল্পনা ভারতের কলেজে ভর্তির স্বপ্ন এখন ব্যয়বহুল, বাড়ছে পরিবারের আর্থিক চাপ টানা ধাক্কায় অনোয়ারের জোট, নেগেরি সেম্বিলানে ক্ষমতা হারিয়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে মালয়েশিয়া প্রতিবাদের ময়দানে এক সাংবাদিকের যাত্রা: কৌতূহল, সংশয় ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন নগরায়ণের চাপে হারিয়ে যাচ্ছে বেঙ্গালুরুর ঐতিহ্যবাহী ফলের ঝুড়ি, সংকটে দেশি ফল ও সবজির চাষ যক্ষ্মার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বড় বাধা: চিকিৎসা চলছে, কিন্তু সরকারি সহায়তা পৌঁছাচ্ছে না পুলিশের নিরাপত্তা সতর্কতা ছিল রুটিন নির্দেশনা, হামলার নির্দিষ্ট তথ্য নেই: ডিবি প্রধান

পাঞ্জাবের হারানো রাজকন্যাদের নীরব বিদ্রোহ: ইতিহাসের চাপা অধ্যায় ফিরিয়ে আনল কেনসিংটন প্রাসাদের প্রদর্শনী

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বিজয়, ক্ষমতা ও উপনিবেশের গল্প বহুবার বলা হয়েছে। কিন্তু সেই ইতিহাসের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে এমন কিছু মানুষের জীবন, যাদের ভাগ্যে জুটেছিল নির্বাসন, পরিচয়ের সংকট এবং নীরব প্রতিরোধ। লন্ডনের কেনসিংটন প্রাসাদে আয়োজিত ‘দ্য লাস্ট প্রিন্সেসেস অব পাঞ্জাব’ প্রদর্শনী সেই বিস্মৃত ইতিহাসকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

এই প্রদর্শনীতে যুদ্ধ কিংবা রাজনৈতিক ঘোষণার বদলে তুলে ধরা হয়েছে তিন রাজকন্যা—সোফিয়া, ক্যাথরিন ও বাম্বার ব্যক্তিগত জীবন। রেশমি পোশাক, হাতে লেখা চিঠি, পুরোনো আলোকচিত্র, অলংকার এবং ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রীর মাধ্যমে ফুটে উঠেছে তাঁদের নির্বাসিত জীবনের বেদনাময় বাস্তবতা। এতে দেখা যায়, কীভাবে তাঁরা হারানো মাতৃভূমি পাঞ্জাবের স্মৃতি এবং ব্রিটিশ সমাজের বাস্তবতার মাঝখানে নিজেদের নতুন পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন।

হারানো রাজ্যের উত্তরাধিকার

এই তিন রাজকন্যা ছিলেন পাঞ্জাবের শেষ শিখ শাসক মহারাজা দুলীপ সিংয়ের কন্যা। অল্প বয়সেই দুলীপ সিং ব্রিটিশদের কাছে নিজের রাজ্য ও বিখ্যাত কোহিনূর হীরা হারাতে বাধ্য হন। পরে তাঁকে ইংল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয় এবং রানি ভিক্টোরিয়ার তত্ত্বাবধানে বড় করা হয়।

রাজপরিবারের সদস্য হলেও তাঁদের জীবন ছিল এক ধরনের নির্বাসনের গল্প। জন্মসূত্রে তাঁরা ভারতীয়, কিন্তু বেড়ে উঠেছেন ব্রিটেনে। এই দ্বৈত পরিচয়ই তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হয়ে ওঠে।

Sisterhood of defiance: 'The Last Princesses of Punjab' exhibition at  Kensington Palace - The Hindu

অলংকারেও লুকিয়ে ছিল পরিচয়ের সংগ্রাম

প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ রাজকন্যা ক্যাথরিনের একটি প্রতিকৃতি। প্রথম দেখায় সেটি রাজকীয় ঐশ্বর্যের প্রতীক মনে হলেও, কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায় তাঁর কানের দুলটি কানে ছিদ্র করে পরা নয়; সূক্ষ্ম সুতো দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

এই ছোট্ট বিষয়টি আসলে বড় এক সামাজিক বাস্তবতার প্রতীক। একদিকে নিজের ভারতীয় পরিচয় ধরে রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে ভিক্টোরিয়ান সমাজের কঠোর নিয়ম—দুইয়ের মধ্যে সমঝোতার এক নীরব ভাষা ছিল এই অলংকার।

কেনসিংটন প্রাসাদে ইতিহাসের বিদ্রূপ

প্রদর্শনীর স্থানটিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যে কেনসিংটন প্রাসাদ থেকে একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নীতিনির্ধারণ হতো এবং যার শাসনেই দুলীপ সিং তাঁর রাজ্য হারিয়েছিলেন, সেই প্রাসাদেই আজ তাঁর কন্যাদের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরা হচ্ছে।

এই ঘটনাকে অনেকেই ইতিহাসের এক গভীর বিদ্রূপ হিসেবে দেখছেন। একই প্রাসাদ আজ সাম্রাজ্যের জয়ের নয়, বরং সেই সাম্রাজ্যের কারণে নির্বাসিত হওয়া নারীদের গল্প বলছে।

Sisterhood of defiance: 'The Last Princesses of Punjab' exhibition at  Kensington Palace - The Hindu

বীর নারী জিন্দ কৌরের উত্তরাধিকার

প্রদর্শনীতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছেন রাজকন্যাদের দাদি মহারানি জিন্দ কৌর। তিনি ছিলেন পাঞ্জাবের অন্যতম সাহসী নারী শাসক, যিনি একসময় সেনাবাহিনী পরিচালনা করেছিলেন।

প্রথমবারের মতো তাঁর প্রতিকৃতির সঙ্গে প্রদর্শিত হয়েছে ব্যক্তিগত অলংকারও। একটি তথ্য বিশেষভাবে হৃদয়স্পর্শী—তাঁর শত শত গয়না তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হলেও শর্ত ছিল, তিনি আর কখনও ভারতে ফিরতে পারবেন না।

এটি শুধু ব্যক্তিগত বেদনার নয়, বরং একটি জাতির রাজনৈতিক অপমানেরও প্রতীক।

সোফিয়ার প্রকাশ্য প্রতিরোধ

তিন বোনের মধ্যে রাজকন্যা সোফিয়া সবচেয়ে বেশি পরিচিত নারী ভোটাধিকারের আন্দোলনের কর্মী হিসেবে।

তিনি প্রাসাদের বিলাসী জীবন ছেড়ে নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। আন্দোলনের সংবাদপত্র বিক্রি করেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সেবাকর্মী হিসেবেও কাজ করেছেন।

প্রদর্শনীতে তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিসপত্রও রাখা হয়েছে। এসব সামগ্রী তাঁর ব্যক্তিত্বের মানবিক ও ব্যক্তিগত দিককে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে।

Sisterhood of defiance: 'The Last Princesses of Punjab' exhibition at  Kensington Palace - The Hindu

ক্যাথরিনের নীরব মানবতা

রাজকন্যা ক্যাথরিনের সংগ্রাম ছিল ভিন্ন ধরনের।

নিজের জার্মান শিক্ষিকা লিনা শ্যাফারের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক সেই সময়ের সামাজিক রীতিনীতির বাইরে ছিল। প্রদর্শনীতে এই সম্পর্ককে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার এক সাহসী প্রকাশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

এছাড়া নাৎসি জার্মানি থেকে পালিয়ে আসা অন্তত দশজন ইহুদি শরণার্থীকে নিরাপদ আশ্রয় পেতে সহায়তা করার তথ্যও প্রদর্শনীতে গুরুত্ব পেয়েছে।

বাম্বার ফিরে যাওয়ার গল্প

অন্য দুই বোনের তুলনায় বাম্বা একসময় লাহোরে ফিরে যান।

তবে সেটি ছিল না হারানো রাজ্যে বিজয়ী প্রত্যাবর্তন। বরং স্মৃতি, ইতিহাস ও বাস্তবতার সংঘাতে নিজের শিকড়কে নতুনভাবে খুঁজে পাওয়ার এক দীর্ঘ যাত্রা।

তাঁর পোশাক ও ব্যক্তিগত সংগ্রহে ভারতীয় ও ইউরোপীয় নকশার মিশ্রণ সেই পরিচয়ের জটিলতাকেই প্রকাশ করে।

পোশাকই হয়ে উঠেছে ইতিহাসের ভাষা

প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত বেনারসি রেশমের ওড়না, সূচিকর্ম করা শাল, গয়না এবং বিশেষভাবে তৈরি পোশাক শুধু শিল্পকর্ম নয়; এগুলো ইতিহাসের দলিল।

বিশেষ করে বাম্বার পোশাকে ভারতীয় কাপড়ের সঙ্গে ইউরোপীয় নকশার সংমিশ্রণ দেখায়, কীভাবে নির্বাসিত মানুষ নিজের পরিচয়কে নতুনভাবে নির্মাণ করে।

Sisterhood of defiance: 'The Last Princesses of Punjab' exhibition at  Kensington Palace - The Hindu

প্রবাসী শিখ সম্প্রদায়ের কণ্ঠও উঠে এসেছে

প্রদর্শনী শুধু অতীতের স্মৃতিচারণ নয়। আজকের ব্রিটিশ শিখ সম্প্রদায়ের শিল্পী ও সৃজনশীল নারীদের মতামতও এতে যুক্ত করা হয়েছে।

তাঁরা মনে করেন, তিন রাজকন্যার পারস্পরিক সংহতি ও প্রতিরোধ তাঁদের অনুপ্রাণিত করে। সম্প্রদায়, সৃজনশীলতা এবং আত্মপরিচয়ের শক্তিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই এই প্রদর্শনীর অন্যতম সাফল্য।

ইতিহাসের নতুন পাঠ

‘দ্য লাস্ট প্রিন্সেসেস অব পাঞ্জাব’ রাজপরিবারের বিলাসিতার গল্প নয়। এটি উপনিবেশ, নির্বাসন, নারী-স্বাধীনতা, মানবতা এবং পরিচয়ের জটিল ইতিহাসকে নতুনভাবে দেখার একটি প্রচেষ্টা।

এই তিন নারী নিজেদের ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। কেউ আন্দোলনের মাধ্যমে, কেউ মানবিক কাজের মাধ্যমে, আবার কেউ শিকড়ে ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে নিজেদের ইতিহাস নতুনভাবে লিখেছেন।

তাঁদের জীবনের গল্প মনে করিয়ে দেয়—বাসস্থান হারানো যায়, ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া যায়, কিন্তু আত্মপরিচয় ও প্রতিরোধের শক্তি কখনও পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না।

জনপ্রিয় সংবাদ

যেখানে পাহাড়ই শিল্পশালা: লাদাখের আকাশছোঁয়া প্রান্তরে শিল্পের নতুন ভাষা

পাঞ্জাবের হারানো রাজকন্যাদের নীরব বিদ্রোহ: ইতিহাসের চাপা অধ্যায় ফিরিয়ে আনল কেনসিংটন প্রাসাদের প্রদর্শনী

০৭:১০:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বিজয়, ক্ষমতা ও উপনিবেশের গল্প বহুবার বলা হয়েছে। কিন্তু সেই ইতিহাসের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে এমন কিছু মানুষের জীবন, যাদের ভাগ্যে জুটেছিল নির্বাসন, পরিচয়ের সংকট এবং নীরব প্রতিরোধ। লন্ডনের কেনসিংটন প্রাসাদে আয়োজিত ‘দ্য লাস্ট প্রিন্সেসেস অব পাঞ্জাব’ প্রদর্শনী সেই বিস্মৃত ইতিহাসকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

এই প্রদর্শনীতে যুদ্ধ কিংবা রাজনৈতিক ঘোষণার বদলে তুলে ধরা হয়েছে তিন রাজকন্যা—সোফিয়া, ক্যাথরিন ও বাম্বার ব্যক্তিগত জীবন। রেশমি পোশাক, হাতে লেখা চিঠি, পুরোনো আলোকচিত্র, অলংকার এবং ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রীর মাধ্যমে ফুটে উঠেছে তাঁদের নির্বাসিত জীবনের বেদনাময় বাস্তবতা। এতে দেখা যায়, কীভাবে তাঁরা হারানো মাতৃভূমি পাঞ্জাবের স্মৃতি এবং ব্রিটিশ সমাজের বাস্তবতার মাঝখানে নিজেদের নতুন পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন।

হারানো রাজ্যের উত্তরাধিকার

এই তিন রাজকন্যা ছিলেন পাঞ্জাবের শেষ শিখ শাসক মহারাজা দুলীপ সিংয়ের কন্যা। অল্প বয়সেই দুলীপ সিং ব্রিটিশদের কাছে নিজের রাজ্য ও বিখ্যাত কোহিনূর হীরা হারাতে বাধ্য হন। পরে তাঁকে ইংল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয় এবং রানি ভিক্টোরিয়ার তত্ত্বাবধানে বড় করা হয়।

রাজপরিবারের সদস্য হলেও তাঁদের জীবন ছিল এক ধরনের নির্বাসনের গল্প। জন্মসূত্রে তাঁরা ভারতীয়, কিন্তু বেড়ে উঠেছেন ব্রিটেনে। এই দ্বৈত পরিচয়ই তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হয়ে ওঠে।

Sisterhood of defiance: 'The Last Princesses of Punjab' exhibition at  Kensington Palace - The Hindu

অলংকারেও লুকিয়ে ছিল পরিচয়ের সংগ্রাম

প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ রাজকন্যা ক্যাথরিনের একটি প্রতিকৃতি। প্রথম দেখায় সেটি রাজকীয় ঐশ্বর্যের প্রতীক মনে হলেও, কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায় তাঁর কানের দুলটি কানে ছিদ্র করে পরা নয়; সূক্ষ্ম সুতো দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

এই ছোট্ট বিষয়টি আসলে বড় এক সামাজিক বাস্তবতার প্রতীক। একদিকে নিজের ভারতীয় পরিচয় ধরে রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে ভিক্টোরিয়ান সমাজের কঠোর নিয়ম—দুইয়ের মধ্যে সমঝোতার এক নীরব ভাষা ছিল এই অলংকার।

কেনসিংটন প্রাসাদে ইতিহাসের বিদ্রূপ

প্রদর্শনীর স্থানটিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যে কেনসিংটন প্রাসাদ থেকে একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নীতিনির্ধারণ হতো এবং যার শাসনেই দুলীপ সিং তাঁর রাজ্য হারিয়েছিলেন, সেই প্রাসাদেই আজ তাঁর কন্যাদের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরা হচ্ছে।

এই ঘটনাকে অনেকেই ইতিহাসের এক গভীর বিদ্রূপ হিসেবে দেখছেন। একই প্রাসাদ আজ সাম্রাজ্যের জয়ের নয়, বরং সেই সাম্রাজ্যের কারণে নির্বাসিত হওয়া নারীদের গল্প বলছে।

Sisterhood of defiance: 'The Last Princesses of Punjab' exhibition at  Kensington Palace - The Hindu

বীর নারী জিন্দ কৌরের উত্তরাধিকার

প্রদর্শনীতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছেন রাজকন্যাদের দাদি মহারানি জিন্দ কৌর। তিনি ছিলেন পাঞ্জাবের অন্যতম সাহসী নারী শাসক, যিনি একসময় সেনাবাহিনী পরিচালনা করেছিলেন।

প্রথমবারের মতো তাঁর প্রতিকৃতির সঙ্গে প্রদর্শিত হয়েছে ব্যক্তিগত অলংকারও। একটি তথ্য বিশেষভাবে হৃদয়স্পর্শী—তাঁর শত শত গয়না তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হলেও শর্ত ছিল, তিনি আর কখনও ভারতে ফিরতে পারবেন না।

এটি শুধু ব্যক্তিগত বেদনার নয়, বরং একটি জাতির রাজনৈতিক অপমানেরও প্রতীক।

সোফিয়ার প্রকাশ্য প্রতিরোধ

তিন বোনের মধ্যে রাজকন্যা সোফিয়া সবচেয়ে বেশি পরিচিত নারী ভোটাধিকারের আন্দোলনের কর্মী হিসেবে।

তিনি প্রাসাদের বিলাসী জীবন ছেড়ে নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। আন্দোলনের সংবাদপত্র বিক্রি করেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সেবাকর্মী হিসেবেও কাজ করেছেন।

প্রদর্শনীতে তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিসপত্রও রাখা হয়েছে। এসব সামগ্রী তাঁর ব্যক্তিত্বের মানবিক ও ব্যক্তিগত দিককে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে।

Sisterhood of defiance: 'The Last Princesses of Punjab' exhibition at  Kensington Palace - The Hindu

ক্যাথরিনের নীরব মানবতা

রাজকন্যা ক্যাথরিনের সংগ্রাম ছিল ভিন্ন ধরনের।

নিজের জার্মান শিক্ষিকা লিনা শ্যাফারের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক সেই সময়ের সামাজিক রীতিনীতির বাইরে ছিল। প্রদর্শনীতে এই সম্পর্ককে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার এক সাহসী প্রকাশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

এছাড়া নাৎসি জার্মানি থেকে পালিয়ে আসা অন্তত দশজন ইহুদি শরণার্থীকে নিরাপদ আশ্রয় পেতে সহায়তা করার তথ্যও প্রদর্শনীতে গুরুত্ব পেয়েছে।

বাম্বার ফিরে যাওয়ার গল্প

অন্য দুই বোনের তুলনায় বাম্বা একসময় লাহোরে ফিরে যান।

তবে সেটি ছিল না হারানো রাজ্যে বিজয়ী প্রত্যাবর্তন। বরং স্মৃতি, ইতিহাস ও বাস্তবতার সংঘাতে নিজের শিকড়কে নতুনভাবে খুঁজে পাওয়ার এক দীর্ঘ যাত্রা।

তাঁর পোশাক ও ব্যক্তিগত সংগ্রহে ভারতীয় ও ইউরোপীয় নকশার মিশ্রণ সেই পরিচয়ের জটিলতাকেই প্রকাশ করে।

পোশাকই হয়ে উঠেছে ইতিহাসের ভাষা

প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত বেনারসি রেশমের ওড়না, সূচিকর্ম করা শাল, গয়না এবং বিশেষভাবে তৈরি পোশাক শুধু শিল্পকর্ম নয়; এগুলো ইতিহাসের দলিল।

বিশেষ করে বাম্বার পোশাকে ভারতীয় কাপড়ের সঙ্গে ইউরোপীয় নকশার সংমিশ্রণ দেখায়, কীভাবে নির্বাসিত মানুষ নিজের পরিচয়কে নতুনভাবে নির্মাণ করে।

Sisterhood of defiance: 'The Last Princesses of Punjab' exhibition at  Kensington Palace - The Hindu

প্রবাসী শিখ সম্প্রদায়ের কণ্ঠও উঠে এসেছে

প্রদর্শনী শুধু অতীতের স্মৃতিচারণ নয়। আজকের ব্রিটিশ শিখ সম্প্রদায়ের শিল্পী ও সৃজনশীল নারীদের মতামতও এতে যুক্ত করা হয়েছে।

তাঁরা মনে করেন, তিন রাজকন্যার পারস্পরিক সংহতি ও প্রতিরোধ তাঁদের অনুপ্রাণিত করে। সম্প্রদায়, সৃজনশীলতা এবং আত্মপরিচয়ের শক্তিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই এই প্রদর্শনীর অন্যতম সাফল্য।

ইতিহাসের নতুন পাঠ

‘দ্য লাস্ট প্রিন্সেসেস অব পাঞ্জাব’ রাজপরিবারের বিলাসিতার গল্প নয়। এটি উপনিবেশ, নির্বাসন, নারী-স্বাধীনতা, মানবতা এবং পরিচয়ের জটিল ইতিহাসকে নতুনভাবে দেখার একটি প্রচেষ্টা।

এই তিন নারী নিজেদের ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। কেউ আন্দোলনের মাধ্যমে, কেউ মানবিক কাজের মাধ্যমে, আবার কেউ শিকড়ে ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে নিজেদের ইতিহাস নতুনভাবে লিখেছেন।

তাঁদের জীবনের গল্প মনে করিয়ে দেয়—বাসস্থান হারানো যায়, ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া যায়, কিন্তু আত্মপরিচয় ও প্রতিরোধের শক্তি কখনও পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না।