চীনের সম্ভাব্য আগ্রাসন কিংবা অবরোধ মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুতি যাচাই করতে টানা ১০ দিনের ব্যাপক সামরিক ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা মহড়া শেষ করেছে তাইওয়ান। এবারের মহড়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও বাস্তবসম্মত করে তোলার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো ইচ্ছাকৃতভাবে মুঠোফোনের ইন্টারনেট যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটানোর পরীক্ষাও চালানো হয়েছে।
তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো মনে করছে, ভবিষ্যৎ সংঘাত কেবল সরাসরি সামরিক হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। যোগাযোগব্যবস্থা অচল করা, তথ্যপ্রবাহ ব্যাহত করা এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার মতো বহুমাত্রিক কৌশলও এর অংশ হতে পারে। তাই এবার মহড়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, যাতে যুদ্ধের সময় দ্বীপটির সামরিক ও বেসামরিক ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর থাকে, তা আরও বাস্তবভাবে যাচাই করা যায়।
যুদ্ধের বাস্তব পরিস্থিতির কাছাকাছি মহড়া
তাইওয়ানের বার্ষিক ‘হান কুয়াং’ সামরিক মহড়ার এবারের পর্বে সৈন্যদের পাশাপাশি বেসামরিক জনগণের প্রস্তুতিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য আক্রমণ, সমুদ্র অবরোধ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়, তা যাচাই করা হয়েছে বিভিন্ন অনুশীলনের মাধ্যমে।
মহড়ার পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, আগের তুলনায় এবার প্রশিক্ষণের ধরন অনেক বেশি বাস্তবধর্মী। সামরিক বাহিনীকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি করা হয়েছে, যেখানে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে, সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে এবং স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এর ফলে শুধু অস্ত্র ও সেনাসদস্যের সক্ষমতা নয়, সংকটের সময় পুরো সমাজ কতটা দ্রুত সংগঠিত হতে পারে, সেটিও পরীক্ষার আওতায় এসেছে।
প্রথমবার ইন্টারনেট যোগাযোগে ইচ্ছাকৃত বিঘ্ন
এবারের মহড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মুঠোফোনের ইন্টারনেট যোগাযোগে ইচ্ছাকৃতভাবে বিঘ্ন ঘটানোর পরীক্ষা। যুদ্ধ বা অবরোধের সময় শত্রুপক্ষ যোগাযোগব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করলে সাধারণ মানুষের তথ্য পাওয়া, জরুরি সেবা পরিচালনা এবং সরকারি নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তাইওয়ান সেই ঝুঁকিকে বাস্তব মহড়ার অংশ করে দেখেছে। ইন্টারনেট যোগাযোগ দুর্বল বা অচল হয়ে গেলে সামরিক বাহিনী, সরকারি সংস্থা এবং সাধারণ মানুষ কীভাবে বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় রাখবে, তা যাচাই করাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পরীক্ষা তাইওয়ানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সম্ভাব্য সংঘাতে প্রচলিত যুদ্ধের পাশাপাশি তথ্য ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
‘ধূসর অঞ্চলের’ হুমকিও বড় উদ্বেগ
তাইওয়ানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু সরাসরি সামরিক হামলা নয়। যুদ্ধের আগেই চাপ সৃষ্টি, সাইবার আক্রমণ, ভুয়া তথ্য ছড়ানো, যোগাযোগব্যবস্থা অচল করা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত করার মতো কৌশল ব্যবহার করা হতে পারে।
এ ধরনের সমন্বিত চাপকে অনেক সময় ‘ধূসর অঞ্চলের’ হুমকি বলা হয়। এর লক্ষ্য হতে পারে সরাসরি যুদ্ধ শুরু না করেও একটি দেশের প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়া।
তাইওয়ানের সাম্প্রতিক মহড়া থেকে বোঝা যাচ্ছে, দেশটি এখন সামরিক সংঘাতকে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে না। বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, পরিবহন, তথ্যপ্রবাহ এবং সাধারণ মানুষের প্রস্তুতিকেও প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
চীনের চাপের মধ্যেই প্রস্তুতি
চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং দ্বীপটির স্বাধীনতার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে। অন্যদিকে তাইওয়ান নিজেদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও স্বশাসন বজায় রেখেছে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘদিন ধরেই অব্যাহত।
এই পরিস্থিতিতে তাইওয়ানের সামরিক মহড়াগুলো ক্রমেই আরও বাস্তবধর্মী হয়ে উঠছে। সম্ভাব্য অবরোধ, আকস্মিক হামলা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মতো পরিস্থিতিতে দেশটির প্রতিরক্ষা কাঠামো কতটা টেকসই হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এবারের মহড়া তাইওয়ানের সক্ষমতার কিছু অগ্রগতি দেখালেও একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ হুমকির জটিলতাও স্পষ্ট করেছে। বিশেষ করে যোগাযোগব্যবস্থা ও তথ্যপ্রবাহের ওপর চাপ মোকাবিলায় আরও প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে।
শুধু সেনাবাহিনী নয়, পুরো সমাজের প্রস্তুতি
তাইওয়ানের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো—সম্ভাব্য যুদ্ধকে এখন আর শুধু সেনাবাহিনীর বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে না। জরুরি চিকিৎসা, খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা—সবকিছুকেই প্রতিরোধক্ষমতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দশ দিনের এই মহড়া শেষ হওয়ার পর তাইওয়ানের সামনে এখন মূল কাজ হবে অনুশীলন থেকে পাওয়া দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করা। কারণ বাস্তব সংঘাত শুরু হলে প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে না।
বিশ্লেষকদের চোখে, এবারের মহড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—তাইওয়ান সম্ভাব্য সংঘাতকে আগের চেয়ে আরও বাস্তব ও বহুমাত্রিকভাবে বিবেচনা করছে। আর সেই প্রস্তুতিতে অস্ত্রের পাশাপাশি যোগাযোগ, তথ্য ও বেসামরিক প্রতিরোধক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















