১০:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
স্বাধীনতার ঘোষণায় সুকর্ণ: ‘একবার মুক্ত, চিরকাল মুক্ত’ আদালতের অনুমতি ছাড়া দেশ ছাড়তে পারবেন না সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক থানা পোড়ানোর বক্তব্য ভাইরাল: হবিগঞ্জে সমন্বয়ক মাহাদীসহ আটক ৩ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ফেসবুক পোস্ট, শোকজ ছাড়াই রাজশাহীতে কলেজশিক্ষক বরখাস্ত নিবন্ধনের আওতায় আসছে হকাররা, ডিএসসিসিকে দিতে হবে মাসে ৩ হাজার টাকা নিমরা খানের সঙ্গে বিচ্ছেদ নিশ্চিত করলেন জেইন হামিদ, ফিজা আলীর ক্ষোভ ওড়িশার গ্রামীণ হাসপাতালে মার্কিন পর্যটকের বিনামূল্যে চিকিৎসা, বিস্মিত হয়ে প্রশংসা ভারতের স্বাস্থ্যসেবার ইমরান খানের দৃষ্টিশক্তি প্রায় স্বাভাবিক, চিকিৎসা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি কাল বিজেপিতে বড় রদবদল: স্মৃতি ইরানি সাধারণ সম্পাদক, রাম মাধব সহসভাপতি ফিলিপাইনের ঐতিহ্যের স্বাদ: মামন ও এনসাইমাদায় তিন বেকশপের গল্প

স্বাধীনতার ঘোষণায় সুকর্ণ: ‘একবার মুক্ত, চিরকাল মুক্ত’

  •  সুকিদি
  • ১০:০০:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
  • 1

ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু একটি উপনিবেশের অবসানের কাহিনি নয়; এটি রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বকে একটি জাতির আত্মপরিচয় ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রথম শর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠার গল্প। ১৯৪৫ সালের ১৭ আগস্ট সুকর্ণ ও মোহাম্মদ হাত্তা যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার প্রভাব ইন্দোনেশিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনেও ছড়িয়ে পড়ে।

প্রায় সাড়ে তিন শতাব্দী ডাচ ঔপনিবেশিক শাসন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি দখলের পর সেই আগস্টের সকালে জাকার্তায় সুকর্ণের বাড়ির বারান্দায় যে ঘোষণা উচ্চারিত হয়েছিল, তার ভাষা ছিল সংক্ষিপ্ত। কিন্তু তার রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল বিপুল। ইন্দোনেশিয়ার জনগণ নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করল এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের কাজ দ্রুত ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার অঙ্গীকার করল।

স্বাধীনতার মুহূর্তটি ছিল সাদামাটা, কিন্তু তার আবেগ ছিল অসাধারণ। সুকর্ণের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে—অনুষ্ঠানে জাঁকজমক ছিল না, ছিল ভবিষ্যতের প্রতি অগাধ আশা। জাপানি রেডিও স্টেশন থেকে সংগ্রহ করা মাইক্রোফোনে তিনি ঘোষণা পাঠ করেন। এরপর উত্তোলন করা হয় লাল-সাদা পতাকা, যা তাঁর স্ত্রী ফাতমাওয়াতি হাতে সেলাই করেছিলেন। পতাকা ওঠার পর গাওয়া হয় ‘ইন্দোনেশিয়া রায়া’।

এই দৃশ্যের মধ্যে একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মের পাশাপাশি ছিল গভীর অনিশ্চয়তাও। সুকর্ণ বুঝেছিলেন, স্বাধীনতা ঘোষণা করা আর স্বাধীনতাকে রক্ষা করা এক বিষয় নয়। তাই তাঁর কাছে স্বাধীনতার অর্থ ছিল শুধু বিদেশি শাসনের অবসান নয়; ছিল এমন এক রাজনৈতিক অবস্থান, যেখানে একটি জাতি নিজের রাষ্ট্র, ভূখণ্ড ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিজেই সিদ্ধান্ত নেবে।

The Indonesian Declaration of Independence, 17 August 1945 |  spiceislandsblog

স্বাধীনতা আগে, পরিপূর্ণতা পরে

সুকর্ণের রাজনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল স্বাধীনতার প্রশ্নে তাঁর বাস্তববাদ। তিনি মনে করতেন, একটি জাতি রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হওয়ার আগে তার প্রতিটি মানুষকে শিক্ষিত, সমৃদ্ধ কিংবা সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে তোলার অপেক্ষা করলে স্বাধীনতা কখনোই আসবে না।

১৯৩৩ সালের তাঁর ‘মের্দেকা ইন্দোনেশিয়া অর্জন’ বিষয়ক রাজনৈতিক ভাবনায় স্বাধীনতাকে তিনি একটি ‘সোনালি সেতু’ হিসেবে দেখেছিলেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিজেই চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; বরং সেটি এমন একটি পথ, যার ওপর দিয়ে একটি জাতি পরে নিজের সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রকে আরও উন্নত করে তুলতে পারে।

এই ধারণা ১৯৪৫ সালের ১ জুন তাঁর ‘প্যানচাসিলার জন্ম’ ভাষণেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর যুক্তি ছিল, স্বাধীনতার জন্য জনগণকে আগে থেকেই আদর্শ অবস্থায় পৌঁছাতে হবে—এমন শর্ত আরোপ করা বাস্তবসম্মত নয়। একটি জনগোষ্ঠী, একটি ভূখণ্ড এবং একটি সরকার যদি রাষ্ট্র হিসেবে বিদ্যমান থাকে এবং সেই জনগণ নিজের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকে, তাহলে স্বাধীনতার দাবি রাজনৈতিকভাবে পরিপক্ব।

এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ঔপনিবেশিক যুক্তির সরাসরি প্রত্যাখ্যান। উপনিবেশবাদীরা প্রায়ই দাবি করত, শাসিত জনগণ নিজেদের শাসন করার মতো প্রস্তুত নয়। সুকর্ণ সেই ধারণার ভিত্তিটিই প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন। তাঁর কাছে স্বাধীনতা কোনো ঔপনিবেশিক শক্তির অনুমোদনসাপেক্ষ পুরস্কার নয়; বরং একটি জাতির নিজস্ব রাজনৈতিক অধিকার।

ইন্দোনেশিয়ার বিপ্লব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার সংগ্রাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে উপনিবেশমুক্তির ধারণাকে নতুন মাত্রা দেয়। ইতিহাসবিদ মেরি মার্গারেট স্টিডলি দেখিয়েছেন, ইন্দোনেশিয়ার বিপ্লব এশিয়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সফল জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।

এর বিশেষত্ব ছিল স্বাধীনতার গতি ও ব্যাপ্তিতে। এটি ছিল না কয়েক দশক ধরে ধীরে ধীরে স্বায়ত্তশাসন অর্জনের প্রকল্প। লক্ষ্য ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব—একটি ভূখণ্ড, একটি জনগণ এবং একটি রাষ্ট্রের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব।

The Indonesian Declaration of Independence, 17 August 1945 |  spiceislandsblog

ইতিহাসবিদ ডেভিড ভ্যান রেইব্রুকও ইন্দোনেশিয়ার বিপ্লবের এই বৈশ্বিক তাৎপর্যের ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর বিশ্লেষণে, ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা পরবর্তী উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনগুলোর সামনে একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছিল: স্বাধীনতা হতে পারে দ্রুত, সর্বব্যাপী এবং সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের ফল।

এই কারণেই ১৯৪৫ সালের ১৭ আগস্ট শুধু ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় ইতিহাসের একটি তারিখ নয়। এটি ছিল এমন একটি মুহূর্ত, যখন একটি উপনিবেশিত জনগণ নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার নিজের হাতে তুলে নেয়।

সুকর্ণের উত্তরাধিকার

সুকর্ণের স্বাধীনতার ধারণার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল এর রাজনৈতিক স্পষ্টতা। তিনি স্বাধীনতাকে কেবল পতাকা, জাতীয় সংগীত কিংবা রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর কাছে স্বাধীনতার প্রথম শর্ত ছিল সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা।

অবশ্য রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পরই একটি জাতির প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয়। রাষ্ট্রকে তখন অর্থনীতি গড়তে হয়, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে হয়, জনগণের অধিকার নিশ্চিত করতে হয় এবং স্বাধীনতার অর্থকে দৈনন্দিন জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। কিন্তু সুকর্ণের যুক্তির শক্তি এখানেই—এই দীর্ঘ নির্মাণকাজ শুরু করার জন্য আগে প্রয়োজন স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তি।

The Indonesian Declaration of Independence, 17 August 1945 |  spiceislandsblog

আজকের বিশ্বে উপনিবেশবাদের পুরোনো রূপ অনেকটাই বিলীন হলেও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি। রাষ্ট্রের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত কতটা নিজের হাতে, জনগণ নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে কতটা সক্ষম এবং জাতীয় স্বাধীনতা কতটা বাস্তব—এসব প্রশ্ন এখনও গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৪৫ সালের সেই বারান্দায় সুকর্ণ যে বার্তা দিয়েছিলেন, তার সারকথা তাই সময়ের সীমা অতিক্রম করে। স্বাধীনতা একবার অর্জিত হলেই তার মূল্য শেষ হয় না; বরং তাকে প্রতিদিন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, জনগণের অধিকার এবং জাতীয় মর্যাদার মাধ্যমে রক্ষা করতে হয়।

ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণার ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই—সুকর্ণ, হাত্তা এবং তাঁদের জনগণ শুধু একটি নতুন রাষ্ট্রের ঘোষণা দেননি। তাঁরা উপনিবেশিত বিশ্বের সামনে দেখিয়েছিলেন, স্বাধীনতার দাবি করার জন্য কোনো সাম্রাজ্যের অনুমতির প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন একটি জনগণের রাজনৈতিক ইচ্ছা, নিজেদের ভূখণ্ডের ওপর অধিকার এবং সেই স্বাধীনতা রক্ষার অঙ্গীকার।

জনপ্রিয় সংবাদ

স্বাধীনতার ঘোষণায় সুকর্ণ: ‘একবার মুক্ত, চিরকাল মুক্ত’

স্বাধীনতার ঘোষণায় সুকর্ণ: ‘একবার মুক্ত, চিরকাল মুক্ত’

১০:০০:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু একটি উপনিবেশের অবসানের কাহিনি নয়; এটি রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বকে একটি জাতির আত্মপরিচয় ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রথম শর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠার গল্প। ১৯৪৫ সালের ১৭ আগস্ট সুকর্ণ ও মোহাম্মদ হাত্তা যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার প্রভাব ইন্দোনেশিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনেও ছড়িয়ে পড়ে।

প্রায় সাড়ে তিন শতাব্দী ডাচ ঔপনিবেশিক শাসন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি দখলের পর সেই আগস্টের সকালে জাকার্তায় সুকর্ণের বাড়ির বারান্দায় যে ঘোষণা উচ্চারিত হয়েছিল, তার ভাষা ছিল সংক্ষিপ্ত। কিন্তু তার রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল বিপুল। ইন্দোনেশিয়ার জনগণ নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করল এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের কাজ দ্রুত ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার অঙ্গীকার করল।

স্বাধীনতার মুহূর্তটি ছিল সাদামাটা, কিন্তু তার আবেগ ছিল অসাধারণ। সুকর্ণের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে—অনুষ্ঠানে জাঁকজমক ছিল না, ছিল ভবিষ্যতের প্রতি অগাধ আশা। জাপানি রেডিও স্টেশন থেকে সংগ্রহ করা মাইক্রোফোনে তিনি ঘোষণা পাঠ করেন। এরপর উত্তোলন করা হয় লাল-সাদা পতাকা, যা তাঁর স্ত্রী ফাতমাওয়াতি হাতে সেলাই করেছিলেন। পতাকা ওঠার পর গাওয়া হয় ‘ইন্দোনেশিয়া রায়া’।

এই দৃশ্যের মধ্যে একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মের পাশাপাশি ছিল গভীর অনিশ্চয়তাও। সুকর্ণ বুঝেছিলেন, স্বাধীনতা ঘোষণা করা আর স্বাধীনতাকে রক্ষা করা এক বিষয় নয়। তাই তাঁর কাছে স্বাধীনতার অর্থ ছিল শুধু বিদেশি শাসনের অবসান নয়; ছিল এমন এক রাজনৈতিক অবস্থান, যেখানে একটি জাতি নিজের রাষ্ট্র, ভূখণ্ড ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিজেই সিদ্ধান্ত নেবে।

The Indonesian Declaration of Independence, 17 August 1945 |  spiceislandsblog

স্বাধীনতা আগে, পরিপূর্ণতা পরে

সুকর্ণের রাজনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল স্বাধীনতার প্রশ্নে তাঁর বাস্তববাদ। তিনি মনে করতেন, একটি জাতি রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হওয়ার আগে তার প্রতিটি মানুষকে শিক্ষিত, সমৃদ্ধ কিংবা সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে তোলার অপেক্ষা করলে স্বাধীনতা কখনোই আসবে না।

১৯৩৩ সালের তাঁর ‘মের্দেকা ইন্দোনেশিয়া অর্জন’ বিষয়ক রাজনৈতিক ভাবনায় স্বাধীনতাকে তিনি একটি ‘সোনালি সেতু’ হিসেবে দেখেছিলেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিজেই চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; বরং সেটি এমন একটি পথ, যার ওপর দিয়ে একটি জাতি পরে নিজের সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রকে আরও উন্নত করে তুলতে পারে।

এই ধারণা ১৯৪৫ সালের ১ জুন তাঁর ‘প্যানচাসিলার জন্ম’ ভাষণেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর যুক্তি ছিল, স্বাধীনতার জন্য জনগণকে আগে থেকেই আদর্শ অবস্থায় পৌঁছাতে হবে—এমন শর্ত আরোপ করা বাস্তবসম্মত নয়। একটি জনগোষ্ঠী, একটি ভূখণ্ড এবং একটি সরকার যদি রাষ্ট্র হিসেবে বিদ্যমান থাকে এবং সেই জনগণ নিজের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকে, তাহলে স্বাধীনতার দাবি রাজনৈতিকভাবে পরিপক্ব।

এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ঔপনিবেশিক যুক্তির সরাসরি প্রত্যাখ্যান। উপনিবেশবাদীরা প্রায়ই দাবি করত, শাসিত জনগণ নিজেদের শাসন করার মতো প্রস্তুত নয়। সুকর্ণ সেই ধারণার ভিত্তিটিই প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন। তাঁর কাছে স্বাধীনতা কোনো ঔপনিবেশিক শক্তির অনুমোদনসাপেক্ষ পুরস্কার নয়; বরং একটি জাতির নিজস্ব রাজনৈতিক অধিকার।

ইন্দোনেশিয়ার বিপ্লব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার সংগ্রাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে উপনিবেশমুক্তির ধারণাকে নতুন মাত্রা দেয়। ইতিহাসবিদ মেরি মার্গারেট স্টিডলি দেখিয়েছেন, ইন্দোনেশিয়ার বিপ্লব এশিয়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সফল জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।

এর বিশেষত্ব ছিল স্বাধীনতার গতি ও ব্যাপ্তিতে। এটি ছিল না কয়েক দশক ধরে ধীরে ধীরে স্বায়ত্তশাসন অর্জনের প্রকল্প। লক্ষ্য ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব—একটি ভূখণ্ড, একটি জনগণ এবং একটি রাষ্ট্রের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব।

The Indonesian Declaration of Independence, 17 August 1945 |  spiceislandsblog

ইতিহাসবিদ ডেভিড ভ্যান রেইব্রুকও ইন্দোনেশিয়ার বিপ্লবের এই বৈশ্বিক তাৎপর্যের ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর বিশ্লেষণে, ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা পরবর্তী উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনগুলোর সামনে একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছিল: স্বাধীনতা হতে পারে দ্রুত, সর্বব্যাপী এবং সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের ফল।

এই কারণেই ১৯৪৫ সালের ১৭ আগস্ট শুধু ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় ইতিহাসের একটি তারিখ নয়। এটি ছিল এমন একটি মুহূর্ত, যখন একটি উপনিবেশিত জনগণ নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার নিজের হাতে তুলে নেয়।

সুকর্ণের উত্তরাধিকার

সুকর্ণের স্বাধীনতার ধারণার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল এর রাজনৈতিক স্পষ্টতা। তিনি স্বাধীনতাকে কেবল পতাকা, জাতীয় সংগীত কিংবা রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর কাছে স্বাধীনতার প্রথম শর্ত ছিল সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা।

অবশ্য রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পরই একটি জাতির প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয়। রাষ্ট্রকে তখন অর্থনীতি গড়তে হয়, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে হয়, জনগণের অধিকার নিশ্চিত করতে হয় এবং স্বাধীনতার অর্থকে দৈনন্দিন জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। কিন্তু সুকর্ণের যুক্তির শক্তি এখানেই—এই দীর্ঘ নির্মাণকাজ শুরু করার জন্য আগে প্রয়োজন স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তি।

The Indonesian Declaration of Independence, 17 August 1945 |  spiceislandsblog

আজকের বিশ্বে উপনিবেশবাদের পুরোনো রূপ অনেকটাই বিলীন হলেও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি। রাষ্ট্রের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত কতটা নিজের হাতে, জনগণ নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে কতটা সক্ষম এবং জাতীয় স্বাধীনতা কতটা বাস্তব—এসব প্রশ্ন এখনও গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৪৫ সালের সেই বারান্দায় সুকর্ণ যে বার্তা দিয়েছিলেন, তার সারকথা তাই সময়ের সীমা অতিক্রম করে। স্বাধীনতা একবার অর্জিত হলেই তার মূল্য শেষ হয় না; বরং তাকে প্রতিদিন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, জনগণের অধিকার এবং জাতীয় মর্যাদার মাধ্যমে রক্ষা করতে হয়।

ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণার ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই—সুকর্ণ, হাত্তা এবং তাঁদের জনগণ শুধু একটি নতুন রাষ্ট্রের ঘোষণা দেননি। তাঁরা উপনিবেশিত বিশ্বের সামনে দেখিয়েছিলেন, স্বাধীনতার দাবি করার জন্য কোনো সাম্রাজ্যের অনুমতির প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন একটি জনগণের রাজনৈতিক ইচ্ছা, নিজেদের ভূখণ্ডের ওপর অধিকার এবং সেই স্বাধীনতা রক্ষার অঙ্গীকার।