স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক বার্তা এসেছে। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর অনুরোধকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনার সুপারিশ করেছে। এর ফলে ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত প্রস্তুতির সময় পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সিডিপির চেয়ারম্যান অধ্যাপক হোসে আন্তোনিও ওকাম্পো বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছেন যে বর্তমান বৈশ্বিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধি যৌক্তিক হতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি অতিরিক্ত সময়কে অর্থনৈতিক সংস্কার ও কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার কাজে ব্যবহার করার ওপর জোর দিয়েছেন।
উত্তরণের সময় বাড়ানোর পেছনের কারণ
বাংলাদেশের মূল পরিকল্পনা ছিল ২০২৬ সালের নভেম্বরে এলডিসি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরণ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মতো নানা বৈশ্বিক সংকট অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর জন্য জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানায়। সরকারের যুক্তি ছিল, অতিরিক্ত সময় পাওয়া গেলে এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অর্থনীতি ও বাণিজ্য কাঠামোকে আরও শক্তিশালীভাবে প্রস্তুত করা সম্ভব হবে।
উত্তরণের যোগ্যতায় দৃঢ় অবস্থান
সিডিপির মূল্যায়নে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক বিষয় হলো, দেশটি এলডিসি উত্তরণের তিনটি প্রধান সূচকেই নির্ধারিত সীমার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশের অর্জনকে স্থিতিশীল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

কমিটির মতে, নিকট বা মধ্যমেয়াদে এসব সূচকে বড় ধরনের অবনমনের ঝুঁকি খুবই কম। ফলে বাংলাদেশের উত্তরণের সক্ষমতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই; আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন প্রস্তুতির সময় ও রূপান্তর প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করা।
যেসব ঝুঁকি সামনে রয়েছে
ইতিবাচক মূল্যায়নের পাশাপাশি সিডিপি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা, নতুন বাণিজ্য বাধা এবং বিশ্ব অর্থনীতির ধীরগতি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও তৈরি পোশাক রফতানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হতে পারে।
প্রস্তুতির অতিরিক্ত সময় কতটা গুরুত্বপূর্ণ
এলডিসি থেকে বের হওয়ার পর বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা, সহজ শর্তে ঋণ এবং বিশেষ সহায়তার সুযোগ হারাবে। বিশেষ করে রফতানি খাতকে নতুন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে।
এই বাস্তবতায় সিডিপি বাংলাদেশের স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজির প্রশংসা করেছে। তাদের মতে, অতিরিক্ত প্রস্তুতিকাল দেশের জন্য নীতি সহায়তা জোরদার, শিল্প বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার সুযোগ তৈরি করবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং রফতানি বৈচিত্র্য আনয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সম্ভাব্য তিন বছর শুধু সময় বৃদ্ধির সুযোগ নয়; বরং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং এলডিসি-পরবর্তী প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতির জানালা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















