০৫:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬
ইতিহাসের বরপুত্র তোফায়েল আহমেদের দ্বিতীয় জানাজা ভোলায় অনুষ্ঠিত, মানুষের ঢলে শেষ শ্রদ্ধা তোফায়েল আহমদের মৃত্যুতে জিএম কাদেরের শোক, জাতির এক সংগ্রামী নেতার বিদায় ট্রাম্প নাকি আমেরিকা? বিশ্ব এখন আসলে কাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন চট্টগ্রামে শাহ আমানত সেতুতে পিকআপের ধাক্কায় প্রাণ গেল বাবা-ছেলের গরম, কম বৃষ্টি আর নতুন বাস্তবতা: বাংলাদেশের সামনে জলবায়ুর সতর্কবার্তা নেত্রকোনায় ঘরে ঢুকে নারীকে কুপিয়ে হত্যা, স্বামী-ছেলে গুরুতর আহত মানুষের কাছে ফেরার সময় কি এখনও আসেনি? শহরের তাপ বাড়ছে, বিপদে আধুনিক স্থাপত্যের ঐতিহ্য: নতুন প্রযুক্তির সমন্বয়েই টিকবে ষাট বছরের পুরোনো ভবন পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলে ভাঙনের দাবি, রিজু দত্তের সঙ্গে ‘৫০ বিধায়ক’ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হামলা বন্ধে সম্মত হিজবুল্লাহ, বৈরুত নিয়ে নতুন সমঝোতা

মানুষের কাছে ফেরার সময় কি এখনও আসেনি?

পাকিস্তানের রাজনীতি নিয়ে প্রায়ই একটি মন্তব্য শোনা যায়—দেশে যেন আর রাজনীতি নেই। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। রাজনীতি হারিয়ে যায় না; বরং কখনও কখনও তাকে এমনভাবে চেপে রাখা হয় যে সেটি দৃশ্যমান থাকে না। তারপর কোনো এক মুহূর্তে, অন্য সব আলোচনার আড়াল সরতেই, সেই চাপা বাস্তবতা আবার সামনে চলে আসে।

সাম্প্রতিক সময়েও একই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আঞ্চলিক সংঘাত কিংবা বিদেশনীতি নিয়ে সাফল্যের গল্প যতই বলা হোক না কেন, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করা প্রশ্নগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়নি। মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিদ্যুৎ ব্যয়ের চাপ এবং জীবিকার সংকট মানুষের উদ্বেগের কেন্দ্রেই রয়েছে। রাষ্ট্রীয় বক্তব্য এবং জনমনের বাস্তবতার মধ্যে এই ব্যবধান যত বাড়ছে, রাজনৈতিক অস্বস্তিও তত স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এ কারণেই স্থানীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচনগুলো শুধু ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ নয়; এগুলো জনমতের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি দীর্ঘদিন ধরে আনুগত্যের ধারণা ছিল, সেখানেও এখন প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। ভোটাররা কেবল কে জিতবে তা নিয়ে ভাবছেন না; তারা জানতে চাইছেন, তাদের ভোট কতটা স্বাধীনভাবে প্রকাশিত হতে পারবে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর আস্থার সংকট নিজেই একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা।

Gendering the vote: Political manifestos through a woman's lens - Pakistan - DAWN.COM

সমস্যার মূল অবশ্য কোনো একক রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি বৃহত্তর প্রবণতা এখানে কাজ করছে। রাষ্ট্র এবং ক্ষমতার কাঠামো বহু ক্ষেত্রে নাগরিকদের জন্য রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত করে ফেলেছে। মানুষ যখন মনে করে তাদের কথা শোনা হচ্ছে না, তখন তারা বিকল্প পথ খোঁজে। কখনও সেটি নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, কখনও আন্দোলনে, কখনও আবার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষোভ হিসেবে সমাজের ভেতরে জমতে থাকে।

আজাদ কাশ্মীর থেকে শুরু করে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের অভিজ্ঞতা দেখায় যে মানুষের অসন্তোষ হঠাৎ করে তৈরি হয় না। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অভিযোগ, প্রতিনিধিত্বের সংকট এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের অভাব শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরণের রূপ নেয়। অনেক সময় সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। কিন্তু যখন সেই পদ্ধতি কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না, তখন আলোচনার পথ খোলা হয়। ফলে সংলাপকে সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ হিসেবে নয়, বরং শেষ অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

এই দৃষ্টিভঙ্গিই সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। কারণ আলোচনার সংস্কৃতি যদি শুরু থেকেই শক্তিশালী হতো, তাহলে বহু সংকট হয়তো সংঘাতে রূপ নিত না। নাগরিকদের দাবি মানেই রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়। বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দাবি, প্রশ্ন এবং সমালোচনাই রাজনৈতিক সুস্থতার লক্ষণ। এসবকে নিরাপত্তা-সংকট হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হয় না; বরং আস্থার ঘাটতি আরও বাড়ে।

Pakistan 2024 General Elections: women's underrepresentation in politics continue | International Knowledge Network of Women in Politics

একইভাবে অর্থনীতির ক্ষেত্রেও মানুষের প্রত্যাশা স্পষ্ট। তারা শুধু পরিসংখ্যানগত উন্নতির কথা শুনতে চায় না; তারা নিজেদের জীবনে সেই উন্নতির প্রভাব দেখতে চায়। যখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্যের গল্প বলা হয় কিন্তু বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমে না, তখন সাধারণ মানুষের কাছে সেই সাফল্যের অর্থ সীমিত হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে জনঅসন্তোষও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে অস্থিরতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, সেগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একই বৃহত্তর বাস্তবতার বিভিন্ন প্রকাশ। কোথাও ক্ষোভ প্রকাশ্য, কোথাও নীরব; কোথাও আন্দোলন হচ্ছে, কোথাও হতাশা জমছে। কিন্তু মূল বার্তাটি এক—মানুষ পরিবর্তন চায়। তারা অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন চায়, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন চায় এবং সবচেয়ে বেশি চায় তাদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়া হোক।

ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলোর জন্য এই বার্তাকে উপেক্ষা করা হয়তো সহজ। কিন্তু ইতিহাস বলে, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ কখনও স্থায়ীভাবে চাপা থাকে না। কোনো না কোনো জায়গা থেকে তা আবার প্রকাশ পায়। তাই প্রশ্নটি এখন আর শুধু রাজনৈতিক নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের প্রশ্ন।

শেষ পর্যন্ত টেকসই স্থিতিশীলতা আসে না নিয়ন্ত্রণ থেকে, আসে অংশগ্রহণ থেকে। যে রাষ্ট্র মানুষের কথা শুনতে শেখে, সে রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হয়। আর যে ব্যবস্থা নাগরিকদের জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসর সংকুচিত করে, সেখানে সংকট বারবার ফিরে আসে। তাই হয়তো সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো আবার মানুষের কাছে ফিরে যাওয়া—ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে নয়, জনজীবনের বাস্তবতা থেকে রাজনীতিকে নতুন করে দেখা।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইতিহাসের বরপুত্র তোফায়েল আহমেদের দ্বিতীয় জানাজা ভোলায় অনুষ্ঠিত, মানুষের ঢলে শেষ শ্রদ্ধা

মানুষের কাছে ফেরার সময় কি এখনও আসেনি?

০৩:৩২:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬

পাকিস্তানের রাজনীতি নিয়ে প্রায়ই একটি মন্তব্য শোনা যায়—দেশে যেন আর রাজনীতি নেই। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। রাজনীতি হারিয়ে যায় না; বরং কখনও কখনও তাকে এমনভাবে চেপে রাখা হয় যে সেটি দৃশ্যমান থাকে না। তারপর কোনো এক মুহূর্তে, অন্য সব আলোচনার আড়াল সরতেই, সেই চাপা বাস্তবতা আবার সামনে চলে আসে।

সাম্প্রতিক সময়েও একই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আঞ্চলিক সংঘাত কিংবা বিদেশনীতি নিয়ে সাফল্যের গল্প যতই বলা হোক না কেন, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করা প্রশ্নগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়নি। মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিদ্যুৎ ব্যয়ের চাপ এবং জীবিকার সংকট মানুষের উদ্বেগের কেন্দ্রেই রয়েছে। রাষ্ট্রীয় বক্তব্য এবং জনমনের বাস্তবতার মধ্যে এই ব্যবধান যত বাড়ছে, রাজনৈতিক অস্বস্তিও তত স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এ কারণেই স্থানীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচনগুলো শুধু ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ নয়; এগুলো জনমতের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি দীর্ঘদিন ধরে আনুগত্যের ধারণা ছিল, সেখানেও এখন প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। ভোটাররা কেবল কে জিতবে তা নিয়ে ভাবছেন না; তারা জানতে চাইছেন, তাদের ভোট কতটা স্বাধীনভাবে প্রকাশিত হতে পারবে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর আস্থার সংকট নিজেই একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা।

Gendering the vote: Political manifestos through a woman's lens - Pakistan - DAWN.COM

সমস্যার মূল অবশ্য কোনো একক রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি বৃহত্তর প্রবণতা এখানে কাজ করছে। রাষ্ট্র এবং ক্ষমতার কাঠামো বহু ক্ষেত্রে নাগরিকদের জন্য রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত করে ফেলেছে। মানুষ যখন মনে করে তাদের কথা শোনা হচ্ছে না, তখন তারা বিকল্প পথ খোঁজে। কখনও সেটি নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, কখনও আন্দোলনে, কখনও আবার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষোভ হিসেবে সমাজের ভেতরে জমতে থাকে।

আজাদ কাশ্মীর থেকে শুরু করে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের অভিজ্ঞতা দেখায় যে মানুষের অসন্তোষ হঠাৎ করে তৈরি হয় না। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অভিযোগ, প্রতিনিধিত্বের সংকট এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের অভাব শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরণের রূপ নেয়। অনেক সময় সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। কিন্তু যখন সেই পদ্ধতি কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না, তখন আলোচনার পথ খোলা হয়। ফলে সংলাপকে সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ হিসেবে নয়, বরং শেষ অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

এই দৃষ্টিভঙ্গিই সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। কারণ আলোচনার সংস্কৃতি যদি শুরু থেকেই শক্তিশালী হতো, তাহলে বহু সংকট হয়তো সংঘাতে রূপ নিত না। নাগরিকদের দাবি মানেই রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়। বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দাবি, প্রশ্ন এবং সমালোচনাই রাজনৈতিক সুস্থতার লক্ষণ। এসবকে নিরাপত্তা-সংকট হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হয় না; বরং আস্থার ঘাটতি আরও বাড়ে।

Pakistan 2024 General Elections: women's underrepresentation in politics continue | International Knowledge Network of Women in Politics

একইভাবে অর্থনীতির ক্ষেত্রেও মানুষের প্রত্যাশা স্পষ্ট। তারা শুধু পরিসংখ্যানগত উন্নতির কথা শুনতে চায় না; তারা নিজেদের জীবনে সেই উন্নতির প্রভাব দেখতে চায়। যখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্যের গল্প বলা হয় কিন্তু বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমে না, তখন সাধারণ মানুষের কাছে সেই সাফল্যের অর্থ সীমিত হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে জনঅসন্তোষও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে অস্থিরতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, সেগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একই বৃহত্তর বাস্তবতার বিভিন্ন প্রকাশ। কোথাও ক্ষোভ প্রকাশ্য, কোথাও নীরব; কোথাও আন্দোলন হচ্ছে, কোথাও হতাশা জমছে। কিন্তু মূল বার্তাটি এক—মানুষ পরিবর্তন চায়। তারা অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন চায়, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন চায় এবং সবচেয়ে বেশি চায় তাদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়া হোক।

ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলোর জন্য এই বার্তাকে উপেক্ষা করা হয়তো সহজ। কিন্তু ইতিহাস বলে, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ কখনও স্থায়ীভাবে চাপা থাকে না। কোনো না কোনো জায়গা থেকে তা আবার প্রকাশ পায়। তাই প্রশ্নটি এখন আর শুধু রাজনৈতিক নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের প্রশ্ন।

শেষ পর্যন্ত টেকসই স্থিতিশীলতা আসে না নিয়ন্ত্রণ থেকে, আসে অংশগ্রহণ থেকে। যে রাষ্ট্র মানুষের কথা শুনতে শেখে, সে রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হয়। আর যে ব্যবস্থা নাগরিকদের জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসর সংকুচিত করে, সেখানে সংকট বারবার ফিরে আসে। তাই হয়তো সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো আবার মানুষের কাছে ফিরে যাওয়া—ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে নয়, জনজীবনের বাস্তবতা থেকে রাজনীতিকে নতুন করে দেখা।