বিশ্ব রাজনীতিতে প্রায়ই এমন কিছু সময় আসে, যখন কোনো একটি দেশের নীতি নয়, বরং সেই দেশের চরিত্রই আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। আজকের যুক্তরাষ্ট্র ঠিক এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। প্রশ্নটি আর শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্প কী করছেন তা নয়; বরং প্রশ্ন হলো, ট্রাম্পের উত্থান আমেরিকা সম্পর্কে কী বলছে এবং তার নেতৃত্বে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রটি কোথায় যাচ্ছে।
অনেকেই ট্রাম্পকে ব্যতিক্রমী ব্যক্তি হিসেবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবতা সম্ভবত আরও জটিল। তিনি একদিকে একটি রাজনৈতিক অসন্তোষের ফল, অন্যদিকে সেই অসন্তোষকে আরও গভীর করে তোলা একটি শক্তি। কয়েক দশক ধরে আমেরিকার বিপুলসংখ্যক মানুষ মনে করে এসেছে যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটি তাদের জন্য কাজ করছে না। বৈশ্বিকীকরণ, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং সম্পদের কেন্দ্রীভবন এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে জাতীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হলেও বহু মানুষ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত।
এখানেই ট্রাম্পের রাজনীতির শক্তি। তিনি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্ষোভকে ভাষা দিয়েছেন। তিনি এমন একটি বার্তা দিয়েছেন, যা অনেক ভোটারের কাছে সহজ ও বোধগম্য: সমস্যা বাইরে নয়, সমস্যা ব্যবস্থার ভেতরে। কিন্তু সেই ক্ষোভকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা আর কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনা করা এক জিনিস নয়।
আমেরিকার বর্তমান সংকটের একটি বড় দিক হলো লক্ষ্য ও বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব। চীনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে দুই অর্থনীতি এতটাই জড়িত যে বিচ্ছিন্নতার ভাষা প্রায়ই আলোচনার টেবিলে এসে নরম হয়ে যায়। একইভাবে ইরানের ক্ষেত্রে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে দ্রুত সমাধান আনার যে প্রত্যাশা ছিল, সেটিও বাস্তবতার পরীক্ষায় জটিল হয়ে উঠেছে।
এখানে বড় প্রশ্নটি হলো: যুক্তরাষ্ট্র কি এখনও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়ে কাজ করছে, নাকি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে?
বিশ্বের অন্যান্য শক্তিগুলো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। কারণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আমেরিকার ভূমিকা শুধু তার সামরিক শক্তির কারণে গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ তার পূর্বানুমানযোগ্যতার জন্যও। মিত্ররা জানতে চায় ওয়াশিংটন আগামী পাঁচ বছর কোথায় থাকবে। প্রতিদ্বন্দ্বীরা জানতে চায় কোন সীমা অতিক্রম করলে প্রতিক্রিয়া আসবে। যখন নীতির ধারাবাহিকতা দুর্বল হয়, তখন শক্তির উপস্থিতি থাকলেও প্রভাব কমতে শুরু করে।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও একই ধরনের বৈপরীত্য দেখা যায়। পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতিগুলোর একটি। প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশটি এখনও নেতৃত্ব দিচ্ছে। কিন্তু নাগরিকদের বড় অংশের অনুভূতি ভিন্ন। তারা মনে করে সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে, সামাজিক গতিশীলতা কমছে এবং সফলতার দরজা আগের মতো খোলা নেই।
এই বৈপরীত্যকে শুধুমাত্র মুদ্রাস্ফীতি বা আয়ের সূচক দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ মানুষের অভিজ্ঞতা শুধু আয়ের অঙ্কে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় তুলনা, প্রত্যাশা এবং সামাজিক অবস্থানের অনুভূতি দিয়ে। ডিজিটাল যুগে সেই তুলনা আরও নির্মম। মানুষ প্রতিদিন এমন জীবনযাত্রার প্রদর্শনী দেখে, যা তাদের নাগালের বাইরে। ফলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি থাকলেও সন্তুষ্টি বাড়ে না।
এখানে প্রযুক্তির ভূমিকাও গভীর। একসময় ধারণা ছিল যে প্রযুক্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে, তথ্যপ্রবাহ বাড়াবে এবং নাগরিকদের ক্ষমতায়ন করবে। কিন্তু আজকের বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। অ্যালগরিদম-নির্ভর যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষোভ, বিভাজন এবং সন্দেহকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়। রাজনৈতিক বিতর্ক ক্রমশ তথ্যের চেয়ে আবেগনির্ভর হয়ে উঠছে।
এই পরিবর্তন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে না; এটি বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও প্রশ্ন তুলছে। উন্মুক্ত সমাজগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের শক্তি হিসেবে স্বাধীন মতপ্রকাশ ও বহুমতের সংস্কৃতিকে দেখেছে। কিন্তু যদি প্রযুক্তি সেই উন্মুক্ততাকেই দুর্বল করে, তাহলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সামনে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে।
চীনের উত্থান এই প্রেক্ষাপটকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। প্রতিযোগিতা এখন শুধু সামরিক বা বাণিজ্যিক নয়; এটি প্রযুক্তি, জ্বালানি, তথ্য ও শিল্পনীতির প্রতিযোগিতা। চীন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ভবিষ্যতের অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনও তার রাজনৈতিক বিভাজন কাটিয়ে একটি সুসংহত কৌশল তৈরি করতে সংগ্রাম করছে।
তবে এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে ঘিরে নয়। বিষয়টি আরও বড়। ট্রাম্প এক ধরনের উপসর্গ, যার পেছনে রয়েছে আমেরিকান সমাজের গভীর অসন্তোষ, ভাঙা আস্থা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। তিনি হয়তো একদিন রাজনৈতিক মঞ্চ ছেড়ে যাবেন, কিন্তু যেসব প্রশ্ন তাকে ক্ষমতায় এনেছে, সেগুলো থেকে যাবে।
তাই বিশ্বের জন্য প্রকৃত উদ্বেগের বিষয় কোনো একক নেতা নন। উদ্বেগের বিষয় হলো এমন একটি যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে শক্তি এখনও বিপুল, কিন্তু উদ্দেশ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে; যেখানে অর্থনৈতিক সাফল্য আছে, কিন্তু সামাজিক আস্থা কমছে; এবং যেখানে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি দ্রুত, কিন্তু রাজনৈতিক ঐকমত্য ক্রমশ দুর্লভ হয়ে উঠছে।
বিশ্ব আজ আমেরিকার ক্ষমতা নিয়ে কম, তার দিকনির্দেশনা নিয়ে বেশি চিন্তিত। আর সেই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দশকের আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করতে পারে।
এজরা ক্লেইন 


















