১৯৭৫ সালের পনের আগস্টে কর্নেল হামিদের (ফুটবলার কায়সার হামিদের পিতা) ওপর সেনা হেড কোয়ার্টার থেকে দায়িত্ব পড়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মরদেহ দেখভাল করা। কোন ধর্মীয় নীতি না মেনে যে পোশাক পরিহিত অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হয়েছিলেন, ওই অবস্থাতেই তার মরদেহ কফিনে ঢুকিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় পাঠিয়ে দেন কর্ণেল হামিদ।
টুঙ্গিপাড়ায় পাঠানোর নির্দেশ কার ছিল, ঢাকায় জানাজা হতে না দেবার বাধা কে কে দিয়েছিল- তার কোন সঠিক ও সত্য গবেষণা আজও হয়নি। তবে কর্নেল হামিদের তত্ত্বাবধায়নে ধর্মীয় নীতি না মেনে অমন অবহেলায় পাঠানো হয়েছিল দেশস্রষ্টা, বাঙালি মুসলিমের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ নেতাকে। আর যার তত্ত্বাবধায়নে পাঠানো হয়েছিল, তিনি একজন বাঙালি মুসলিম।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধু মুজিবের যে প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে ইয়াহিয়া খান ফাঁসি দেবার চেষ্টা করেছিলেন; সেখানে যদি তার ফাঁসি হতো, নিশ্চিত বলা যায় কোন পাকিস্তানি সৈন্য এভাবে তার মরদেহ কফিনে ঢুকাতেন না। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের আচরণই সেটা প্রমাণ করে।তাই তাদের থেকেও নিকৃষ্ট চরিত্রের প্রমাণ বাঙালিই রেখেছে বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে।
শেষ অবধি সকলে জানেন, বঙ্গবন্ধুর গোসল, কফিন ও জানাজা হয়েছিল শুধুমাত্র টুঙ্গিপাড়ার তাঁর বাড়ির মসজিদের ইমামের শক্ত অবস্থানের কারণে। এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এতই ভাগ্যবান ব্যক্তি, তিনি আজীবন গরিব বাঙালি মুসলমানের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছিলেন, তাদের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য যে দেশ সৃষ্টি করেন, তাদের রিলিফ দেবার জন্যে সারা পৃথিবী থেকে তিনি ভিক্ষা করে যে রিলিফের কাপড় এনেছিলেন, তাই দিয়ে তাঁর কাফনের কাপড় তৈরি হয়। বাংলাদেশে তৈরি কাপড় পরিষ্কার করা ‘৫৭০’ নামে একটি দরিদ্র মানুষের সাবান দিয়ে তাঁর গোসল করানো হয়। দরিদ্রকে যে নেতা দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেবার জন্য গোটা যৌবন উৎসর্গ করেছিলেন- এর থেকে বড় সৌভাগ্য সে নেতার আর কী হতে পারে? তাছাড়া জানাজার ঘটনা তো সকলেই জানেন, আর্মি পুলিশ সেখানে আর কোন মানুষকে আসতে দেয়নি।
মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অবর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের ভারপ্রাপ্ত সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তার অধীনেই তিন বাহিনীর প্রধান জেনারেল ওসমানী সহ সকল সেক্টর কমান্ডাররা ছিলেন।
পৃথিবীর ইতিহাসে সব থেকে ঘৃণ্য জেল হত্যাকাণ্ডগুলোর অন্যতম হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশে ৩ নভেম্বর, ১৯৭৫ এর জেলহত্যাকাণ্ড। কার নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড হয় তা আজও সত্য অর্থে উদ্ঘাটিত হয়নি। আর এই হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ভারপ্রাপ্ত সর্বাধিনায়ক, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ সহ আরও দুই জাতীয় নেতা মুনসুর আলী ও কামারুজ্জামানকে হত্যা করা হয়।
এই জাতীয় চার নেতার জানাজার জন্য জনগণ সে সময় বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে প্রস্তুতি নেয় জনগন। এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কার্জনহল প্রান্তে জাতীয় তিন নেতার কবরের পাশে সেদিন জাতীয় এই চার নেতার কবরও খোঁড়া হচ্ছিল। পুলিশ, আর্মি সে কবর খোঁড়া বন্ধ করে দেয়। বন্ধ করে দেয় বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে জানাজার প্রস্তুতিও।
জাতীয় চার নেতার মরদেহ তাদের নিজ নিজ বাসায়ও নেয়া হয়েছিল। তাজউদ্দিন আহমদের মরদেহ যখন তাঁর বাড়িতে নেয়া হয় তার কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে মহিলা পরিষদ নেত্রী মালেকা বেগম পৌঁছে যান। তাঁর মুখেও শুনেছি শোকগ্রস্ত পরিবার কীভাবে জেলখানা থেকে পাঠানো তাঁর মরদেহের কাফন খুলে নতুন করে গোসল সহ অন্যান্য সব কিছু করার প্রস্তুতির চিন্তা করছিল।
এর ভেতর তৎকালীন পুলিশের ডি আই জি ই-এ চৌধুরি যিনি কট্টর স্বাধীনতা বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু তাকে ওই পদে বসিয়েছিলেন। তার নির্দেশে হঠাৎ অনেক বেশি পুলিশ এসে মরদেহ নিয়ে যায় আর পরিবারকে অনেকটা অবরুদ্ধ করে রাখে।
ই-এ চৌধুরির নির্দেশে ঠিক একইভাবে ছিনিয়ে নিয়ে আসা হয় মুক্তিযুদ্ধের ভারপ্রাপ্ত সর্বাধিনায়ক সৈয়দ নজরুল ইসলামের মরদেহ ও অপর দুই জাতীয় নেতা মুনসুর আলী ও কামারুজ্জামানের মরদেহ।
১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ স্বাধীনতার অন্যতম সংগঠক শেখ ফজলুল হক মণিকে হত্যা চেষ্টার সময় তিনি আহত হন। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে যান যুবলীগ নেতা মোস্তফা মহসিন মন্টু। ঢাকা মেডিকেল কলেজেই শেখ ফজলুল হক মণি মারা যান। সেখান থেকেও তার মরদেহ ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ই-এ চৌধুরির নির্দেশে।
কামারুজ্জামানের মরদেহ নিজ গ্রামের বাড়িতে পাঠালেও বাদবাকি সকলের বনানীতে যে কীভাবে কবর দেয়া হয়েছিল তা আজও অজানা। পরিবারগুলো কবর খুঁজে পেয়েছে শুধু সাধারণ মানুষের ভালোবাসার কারণে।
পুলিশের তৎকালীন ডিআইজি ই-এ চৌধুরি কার নির্দেশে এ কাজ করেছিলেন সে তথ্য অজানা। আর এগুলো জানার কোন উপায় এ দেশে থাকে না। যেমন বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়ি যারা ভেঙেছে তাদেরকে সবাই চেনে। কিন্তু কার নির্দেশে এ কাজ হয়েছে সে তথ্য অজানা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের শুরু ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ প্রমুখ শুরু থেকে এই আন্দোলনের ভেতর দিয়েই এগিয়ে এসেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছয় দফা দেবার পরে বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের মূল নেতা হিসেবে ধীরে ধীরে আবির্ভূত হন। আর সে পথেই আসে আগরতলা মামলা। যে মামলা পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র চালাতে পারলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ফাঁসি দিতে পারত। বন্ধ করতে সমর্থ হতো বাংলাদেশ সৃষ্টি।
১৯৬৮ সালে যখন এই মামলা শেষ পর্যায়ে, ফাঁসির রজ্জু যখন এগিয়ে আসছে বঙ্গবন্ধুর দিকে- এর ভেতর অনেক বড় বড় ছাত্র নেতা সৃষ্টি হয়েছেন। তাঁরাও সবাই স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক। কিন্তু ১৯৬৮ থেকে যখনই ইতিহাস বাঁক নিয়ে ১৯৬৯-এ প্রবেশ করে, সেটা কোন মেটিকুলাস ডিজাইন নয়, কোন নরহত্যার ফন্দি নয়, জনগণের শক্তিতে সেদিন প্রকৃত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শুধু সরকারের পতন নয়, শেখ মুজিবুর রহমান সহ সকল জাতীয় নেতা জেলখানা থেকে বীরের বেশে বের হয়ে আসেন। সে ইতিহাস সকলের জানা।
আর এ সত্যও সকলের জানা ওই গণ-অভ্যুত্থানের নায়ক ছিলেন সেদিন তোফায়েল আহমেদ। এবং ওই আন্দোলনের সফল নেতৃত্ব দেওয়ার ভেতর দিয়ে তিনিও চলে আসেন ইতিহাসের মহানায়কদের কাতারে। সম্মিলিত নেতৃত্ব হলেও তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্ব সেদিন কীভাবে আন্দোলনকে বেগবান করেছিল- সে সব ঘটনার পেছনের কিছু সত্য ঘটনা ভবিষ্যৎ যদি সুযোগ দেয়, তাহলে যতটুকু জানি হয়তো কোন এক সময়ে লিখব।
তবে ১ জুন রাষ্ট্রীয়ভাবে তোফায়েল আহমেদের জানাজা করতে না দিয়ে বর্তমানের এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা সত্যিই তোফায়েল আহমেদকে সম্মানিত করেছে। মৃত্যুর ভেতর দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন, তিনি স্বাধীনতার মহানায়কদের কাতারের একজন। যেমন যে মেটিকুলাস ডিজাইনের পথ বেয়ে আজকের এই সরকার- তার স্রষ্টা ইউনূসের আমলে বাঙালি মুসলিমের বিরল সংগ্রামী নেত্রী, এদেশের ইতিহাসের একমাত্র অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরি, যিনিও স্বাধীনতা সংগ্রামের এক মহাননেত্রী- তিনিও রাষ্ট্রীয় জানাজা শুধু নন, কবরের মাটিও পাননি তাদের স্বাধীন করা দেশে।
কবি ত্রিদিব দস্তিদার ১৯৯০ সালেই লিখেছিলেন,
তুমি যাই বলো বাংলাদেশ
তোমাকে বিশ্বাস করা যায় না-
তোমার শরীরে পিতৃহন্তার রক্ত।
ত্রিদিব ঘরছাড়া দেশপ্রেমিক এক বাউল মনের কবি ছিল। আর ছিল বড় বেশি অভিমানী। তাই নিজের দেশ মাতার ওপর আপন জন্মদাতা মায়ের মতোই অভিমান করে সে এমন কথা বলেছিল। ওর কলমের শক্তিকে অস্বীকার করার শক্তি না-ই বা খুঁজি।
তবে একজন সাধারণ সাংবাদিক হিসেবে এটুকু শুধু মনে হয়, ইতিহাস বড়ই পাকা জহুরী। সে সব সময়ই বধূ এবং বারবধূকে আলাদা করে রাখে।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।
স্বদেশ রায় 



















