০৫:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশ–রাখাইন সীমান্তে বদলে যাওয়া বাস্তবতা: কাঁটাতার নয়, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এপস্টিন নথি বিতর্কে ক্ষমা চাইলেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ আইনজীবী টড ব্লাঞ্চ জিয়া কিয়ানকিয়ানের পতন: সাহিত্য জগতে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগে কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রীষ্মের নতুন ফ্যাশন ট্রেন্ড স্ক্যান্ডি বব চুল কাটায় বদলে যাচ্ছে তারকাদের স্টাইল গাজীপুরে কারখানার গুদামে ভয়াবহ আগুন, দুই ঘণ্টার চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে পাবনায় মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স-বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২ ব্রিকসের নতুন বাস্তবতা: বৈশ্বিক দক্ষিণ কি সত্যিই নতুন শক্তির কেন্দ্র হয়ে উঠছে? হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মুসলিম লীগকে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও বাংলাদেশ সৃষ্টির ভিত্তি তৈরি করেন ছয় মাসে ১৭৩ জনকে পুশ-ইন, বিএসএফের হাতে নিহত ৯: এইচআরএসএস এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি হয় কীভাবে?

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মুসলিম লীগকে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও বাংলাদেশ সৃষ্টির ভিত্তি তৈরি করেন

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সর্বভারতীয় নেতা ছিলেন। ইতিহাসে তাঁকে আমরা মোটা দাগে জানি গ্রেটার বেঙ্গলের প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস যারা চর্চা করেনবাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যারা বিশ্বাস করেন তাদের কাছে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অনেক বড় অধ্যায়।

সর্বভারতীয় রাজনীতিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর শুরুটা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের (সি আর দাশ) হাত ধরে। তাঁর শুরুটা যেমন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা হিসেবে তেমনি দেশবন্ধুর স্বরাজ পার্টির মাধ্যমে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর আগেই মহাত্মা গান্ধী নেতা হিসেবে ব্যর্থ হয়ে গেছেন। ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদারের মতে১৯২২ সালে চৌরা চৌরির ঘটনার পরে গান্ধী একক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যেমন অসহযোগ আন্দোলনের মৃত্যু ঘটে তেমনি গান্ধীর নেতৃত্বেরও মৃত্যু ঘটে। যে কারণেই চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে স্বরাজ পার্টি ১৯২৩ সালে। কিন্তু সি আর দাশের অকালমৃত্যুর ফলে শুধু বেঙ্গলের ঐক্যের রাজনীতিবেঙ্গল প্যাক্ট নয়সর্বভারতীয় ঐক্যের রাজনীতিও শেষ হয়ে যায়। তারপরে ভারতের রাজনীতিতে আর সঠিক স্থানে সঠিক মানুষটি যেতে পারেনি। জিন্নাহসোহরাওয়ার্দীর মতো ব্যক্তিজীবনে শতভাগ আধুনিক মানুষকে মুসলিম লীগের নেতা হতে হয়েছিল। যাহোক সে ইতিহাস ভিন্ন। শুধুমাত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনীতির জীবনের শুরুটা নতুন প্রজন্মের কাছে জানানোর জন্যই এ অংশটুকু লেখা।

তারপরে নেতৃত্বহীন ভারতবর্ষে যা হবার তাই হলোপশ্চিমা শক্তি ভবিষ্যৎ অর্থনীতির স্বার্থে ও নৌপথের স্বার্থে রাজনীতির বদলে হিন্দুমুসলিমের নামে ভারত ভাগ করে দিয়ে গেল। আর এ সুযোগ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পশ্চিমা শক্তি অর্থাৎ ব্রিটেন ও আমেরিকা পেয়েছিল কারণ, ততদিনে ব্রিটেনের জায়গায় চালকের আসনে বসে গেছে আমেরিকা।  অন্যদিকে ওই সময়ে ভারতের রাজনৈতিক শক্তি ছিল নেতৃত্বহীন। তাই রাজনীতির বদলে তাদের সামনে সাম্প্রদায়িকতার মাংসের টুকরো ছুড়ে দিয়ে তারা শুধু নৌপথের রুট হিসেবে করে ভারত ভাগ করতে শুধু সমর্থ হয়নিযে ব্রিটিশ নাগরিকরা দুইশো বছর ভারত শোষণ করেছিলতাদের সকলকে নিরাপদে ব্রিটেনে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়। স্বাধীনতার পূর্বমুহূর্তে যেখানে ভারতবর্ষের প্রতিটি রাস্তায় পড়ে থাকার কথা ছিল অত্যাচারী ব্রিটিশদের মৃতদেহতার বদলে ভারতবাসীদের ভাইয়ে ভাইয়ে ধর্মের নামে একে অপরকে হত্যা করাতে সমর্থ হলো ব্রিটিশ। অর্থাৎ ভারতের রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকল ভারতবাসীর মৃতদেহঅথচ মূঢ় ভারতীয়রা সে মৃতদেহগুলোকে ভারতবাসীর মৃতদেহ না বলে বলল হিন্দু ও মুসলমানের মৃতদেহ।

আর ওই মৃতদেহের ওপর ভর করে ভারতকে ভাগ করে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটো অবাস্তব রাষ্ট্র হলো। অবাস্তব এ কারণেই যে আধুনিক কোনো সাংবিধানিক রাষ্ট্র ধর্মের নামে হতে পারে না। সে কাজে কংগ্রেসের ভেতরের ধর্মীয়পন্থীরা যেমন রাষ্ট্রনীতির বদলে ধর্মের নামে অবাস্তব কনসেপ্টকে জোর দিলঅন্যদিকে মুসলিম লীগ তো ওই অবাস্তব কনসেপ্টেরই ধারক।

আইনজীবী হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীর জীবনী, Biography of Huseyn Shaheed Suhrawardy in Bengali

ধর্মের নামে দেশকে দ্বিখণ্ডিত করার পরে প্রকৃত রাজনীতিকরা দ্রুতই কোণঠাসা হয়ে পড়েন। মুসলিম লীগও সে সময়ে উদ্ভট রাজনীতিকদের হাতে চলে যায়। এবং এ সময়ে আবারও প্রমাণিত হয় চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পরে নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় বিভিন্ন নেতাকে নানাভাবে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগে স্থান নিতে হয়েছিলমুসলিম লীগও ধর্মীয় রাজনীতির আবহাওয়ায় তাদের ব্যবহার করতে সমর্থ হয়েছিলকিন্তু মুসলিম লীগ ক্ষমতা পেতেই তাঁরা বাদ পড়ে যান। বেঙ্গলে সব থেকে বড় দুই মুসলিম ধর্মাবলম্বী প্রগতিশীল নেতাএকজন শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকঅপরজন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে মুসলিম লীগ নেতারা আর তাদের ক্ষমতার ধারে-কাছে ঘেঁষতে দেননি। কারণতারা জানতেনএ দুজন তাদের লোক নয়। শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক যদিও পাকিস্তানে ফিরে গ্রেটার বেঙ্গলের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী থেকে পূর্ববাংলার অ্যাটর্নি জেনারেল হতে পেরেছিলেনসোহরাওয়ার্দীকে প্রথমে মুসলিম লীগ নেতারা ফিরতেই দেয়নি। বরং পাকিস্তানে ফিরলে তাঁর মাথা কুচাল” দেবার অর্থাৎ মাথা কুপিয়ে কুচি কুচি করে ফেলার ঘোষণা দেয়। যে কারণে ১৯৪৮ সালের জুন মাসে পূর্ববাংলায় ফিরলেও তাঁকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আবার চলে যেতে হয়।

কিন্তু চিত্তরঞ্জন দাশের ছায়ায় বেড়ে ওঠা রাজনীতিক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন চিত্তরঞ্জন দাশের রাজনৈতিক সংগ্রামের মূলমন্ত্র অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষতাই সে অরাজনৈতিক ও ক্ষমতা দখলকারী শক্তি হোকতাদের বিরুদ্ধে যেখানে যতটুকু রাজনৈতিক স্পেস পাওয়া যায়অতটুকু স্পেসেই রাজনীতির মাধ্যমে তাদের মোকাবিলার কাজ করতে হবে। এবং রাজনৈতিকভাবেই অরাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে হবে।

এই রাজনৈতিক লক্ষ্য বা আদর্শকে সামনে রেখে সোহরাওয়ার্দী মুসলিম লীগের ভেতর গড়ে ওঠা প্রগ্রেসিভ তরুণ অংশযারা পূর্বের থেকে তাঁর রাজনীতির অনুসারী ছিলেনতাদের দিয়ে এবং আসাম থেকে পূর্ববাংলায় আসা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর মাধ্যমে ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করাতে সমর্থ হন। এই আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের মাধ্যমেই কিন্তু সোহরাওয়ার্দী মুসলিম লীগের মেরুদণ্ডে প্রথম আঘাত করতে সমর্থ হন। কারণ মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা ও নেতারা ছিলেন মূলত ব্রিটিশের মতো একটি শোষক ও সাধারণ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি অরাজনৈতিক শক্তি। রাজনীতিতে তাদের শক্তি ছিল দুটিএকটি ধর্মব্যবসাঅন্যটি হিন্দুদেরকে প্রতিপক্ষ করা। এই ধর্মব্যবসা ও হিন্দুদের প্রতিপক্ষ করে তারা তৎকালীন বাংলার সাধারণ মুসলিম সমাজকে বিভ্রান্ত করেছিলেন।

সোহরাওয়ার্দী নেপথ্যে থেকে চিত্তরঞ্জন দাশ (সি আর দাশ) যেমন গান্ধীর ব্রিটিশ-অনুগত কংগ্রেসের প্রগতিশীল নেতাদের এবং বিশেষ করে সোহরাওয়ার্দীসুভাষচন্দ্র বসুর মতো যুব নেতাঅন্যদিকে মতিলাল নেহরুর মতো সিনিয়র নেতাদের নিয়ে স্বরাজ পার্টি গড়েছিলেনতেমনি মুসলিম লীগের ভেতরে থাকা সিনিয়রতরুণ ও যুব প্রগতিশীলদের নিয়ে রাজনীতিহীন প্রাসাদ-ষড়যন্ত্রের মুসলিম লীগের বিপরীতে তিনি প্রথমে আওয়ামী মুসলিম লীগ গড়েন। পাকিস্তান সৃষ্টি হবার দেড় বছরের মধ্যে ওই সময়ের বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলটির নামের মধ্যে মুসলিম” শব্দটি রাখা ছিল একটি বাস্তবতা। আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগ অর্থাৎ সাধারণ জনগণের দল তাঁর আমলেই রূপান্তরিত হয়েছিল।

তাই যারা ধারাবাহিকভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িততারা যখন যে প্রজন্মের হোক না কেনতারা জানে আওয়ামী লীগের মূল প্রতিষ্ঠাতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। যে কারণে অনেক সময় বাংলাদেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজ আওয়ামী লীগের দিকে আঙুল তোলেআওয়ামী লীগ তাদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানীর জন্ম-মৃত্যুর দিনের থেকে সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্ম-মৃত্যুদিন অনেক বেশি আড়ম্বরের সঙ্গে পালন করে। দেশের বাইরের অনেকের মতো বাংলাদেশের এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কে এবং আওয়ামী মুসলিম লীগ পরে সেটাকে আওয়ামী লীগে রূপান্তরিত করে তিনি সমগ্র ভারতবর্ষের ও বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে কী কাজটি করে গেছেনসেটা কখনও গভীরভাবে ভেবে দেখেননি?

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কিন্তু আওয়ামী মুসলিম লীগ তৈরি করে তার পরের দিনই এ আজাদী ঝুটা হ্যায়লাখো ইনসান ভূখা হ্যায়” এ ধরনের কোনো হটকারী রাজনীতিতে যাননি। তিনি তাঁর রাজনীতির দীক্ষাগুরু সি আর দাশের পথ ধরে নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক পথেই অরাজনৈতিক শক্তি মুসলিম লীগকে যেমন পরাজিত করার পথে হাঁটেনআবার রাজনীতিতে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তৈরি অন্যতম বড় কাজযেমন সি আর দাশ তৈরি করেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুকেসোহরাওয়ার্দীও সে পথে হেঁটেছিলেন।

আজ শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের মৃত্যুবার্ষিকী

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ সৃষ্টি করে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রায় পাঁচ বছর অপেক্ষা করেছেন মুসলিম লীগকে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করার জন্য। ১৯৫৪ সালে যখন পাকিস্তানে নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচনের সময় এলোতখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যেমন পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলেনতেমনি পশ্চিম পাকিস্তানেও মুসলিম লীগের বিপরীতে অন্যান্য দলগুলোকে এক হবার কাজ করেন।

১৯৫৪-এর নির্বাচনে নিজের দল আওয়ামী লীগের বিজয় তাঁর কাছে মুখ্য বা তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম লীগকে রাজনৈতিকভাবে চিরকালের জন্য পরাজিত করা। কারণ তিনি জানতেনযাদের কোনো রাজনীতি নেইশুধু কয়েকটি বিশেষ বিষয়কে বিরোধিতা করাই বা শত্রু হিসেবে উপস্থিত করাই যাদের রাজনৈতিক পুঁজিতাদের একবার রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করতে পারলে আর তারা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। ওই সময়ে মুসলিম লীগকে পরাজিত করার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি বিশাল ঐক্য। আর সেই ঐক্য সোহরাওয়ার্দীর মতো শিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে দূরদর্শী নেতার কারণেই সম্ভব হয়েছিল। যেমন পাকিস্তানে ১৯৫৪-এর সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করলেই শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক অ্যাটর্নি জেনারেলের চাকরি ছেড়ে নির্বাচন লড়ার ঘোষণা দেন। শেরে বাংলার ঘোষণা পরপরই সোহরাওয়ার্দী তাঁর কাছে শেখ মুজিবুর রহমানকে পাঠান যুক্তফ্রন্ট তৈরি করা ও তাতে যোগ দেওয়ার জন্য। এ বিষয়টি যেমন কিছু কিছু বইয়ে আছেতেমনি ওই সময়ে সোহরাওয়ার্দীর বেশ কয়েকজন প্রাইভেট সেক্রেটারির একজন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উজ্জ্বল ছাত্র ও পরবর্তীকালে কবি ও গল্পকার সাইয়ীদ আতিকুল্লাহ। তাঁর মুখেও বিষয়টি সবিস্তারে জেনেছি। তিনি বলেনএই কাজে সোহরাওয়ার্দী শেখ মুজিব ছাড়া অন্য কাউকে যেমন যোগ্য মনে করেননিতেমনি বিশ্বাসও করেননি।

বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বঙ্গবন্ধুর অবদান | The Business Standard

শেরে বাংলা যুক্তফ্রন্টে যোগ দেবেনএমন একটা ঘোষণা দিতেই সাংবাদিকরাবিশেষ করে মুসলিম লীগ-ঘেঁষা সাংবাদিকরাএকটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে সোহরাওয়ার্দীকে প্রশ্ন করেনশেরে বাংলা যুক্তফ্রন্টে যোগ দিলে আপনার জোট জিতলে পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী কে হবেনসোহরাওয়ার্দী সহাস্যে উত্তর দেনযেখানে হক সাহেব যোগ দিয়েছেন সেখানে এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকার সুযোগ নেই। বিষয়টি ওই সময়ের সব পত্রিকায় আছে।

রাজনীতিতে শেরে বাংলাশেরে বাংলাই। তারপরেও মুসলিম লীগ ও পাকিস্তানের প্রশাসন যুক্তফ্রন্ট যাতে না হতে পারেএ কারণে শেরে বাংলার সঙ্গে এক পর্যায়ে যুক্তফ্রন্টের একটা দ্বন্দ্ব তৈরি করার চেষ্টা করেন। এটা জানতে পেরেই সোহরাওয়ার্দী ওই রাতেই শেরে বাংলাকে তাঁর বাসা থেকে যুক্তফ্রন্টের অফিসে আনার ব্যবস্থা করেন।

শেরে বাংলাকে তাঁর হাটখোলা বাসা থেকে নিয়ে আসা হয়। আর এই নিয়ে আসার কাজের নেতৃত্ব দেন সেদিন পাকিস্তান সৃষ্টি হবার পরে পূর্ববাংলায় প্রথম যে অসাম্প্রদায়িক দল যুবলীগ” তৈরি হয়তার নেতা ইমাদুল্লাহ। সেদিনের সেই মেধাবী তরুণ নেতা ইমাদুল্লাহ সেদিন সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশ পেয়েই মোগলটুলির যুক্তফ্রন্ট ক্যাম্প থেকে তাঁর সহকর্মী ও জুনিয়র কর্মীদের নিয়ে গিয়ে শেরেবাংলাকে বাসা থেকে একপ্রকার কাঁধে করে নিয়ে আসেন যুক্তফ্রন্ট ক্যাম্পে। সেদিন ইমাদুল্লাহর নেতৃত্বে যারা গিয়েছিলেনতাদের মধ্যে একজন ছিলেন যুবলীগের সদস্য৫২-এর ভাষা আন্দোলনের নেতা গাজীউল হক এবং ইমাদুল্লাহর বামপন্থী আদর্শের কর্মীচট্টগ্রামের বিশিষ্ট বামপন্থী কর্মীপরবর্তীতে সোভিয়েত দূতাবাসে জনসংযোগ বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন আহমদ। গাজীউল হক ও শামসুদ্দিন আহমদ উভয়ের কাছে শুনেছি সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশে তাঁরা এ কাজ করেছিলেন।

সোহরাওয়ার্দী শুধু যে শেরে বাংলার দল ও প্রগতিশীলদের যুক্তফ্রন্টকে এক করেছিলেন তা নয়তিনি ধর্মব্যবসায়ী নয় কিন্তু ধর্মবিশ্বাস ও রাজনৈতিক উদারতা নিয়ে যে গোষ্ঠী রাজনীতি করেনতাদেরকেও যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে এক করেছিলেন।

এ ছাড়া ওই সময়ে যেহেতু সাইয়ীদ আতিকুল্লাহকে সার্বক্ষণিকভাবে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে থাকতে হতোতাঁর কাছে শুনেছি যুক্তফ্রন্টকে নির্বাচনে বিজয়ী করার জন্য কীভাবে রাতদিন সোহরাওয়ার্দী পরিশ্রম করতেন। পত্রপত্রিকায় পাওয়া যায়নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হবার পর থেকে নির্বাচনের শেষ দিন অবধি তিনি সারাদেশে নির্বাচনী প্রচারের মাঝে যখন ঢাকা ফিরতেনতখনও যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী অফিসে থাকতেন। ওই অফিসের বেঞ্চেই তিনি খুব অল্প সময়ের জন্য ঘুমাতেন। সাইয়ীদ আতিকুল্লাহর কাছে জেনেছিআর রাতের বাকি সময় নির্বাচনী প্রচার যে যে এলাকায় করে এসেছেনসেগুলো নিয়ে তিনি কাগজ-কলমে বিশ্লেষণ করতেন। ৫৪-এর নির্বাচনে তাঁর দল আওয়ামী মুসলিম লীগসহ যুক্তফ্রন্টের প্রায় সকল মনোনয়ন তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পরীক্ষা করতেন। প্রয়োজনে শেরে বাংলার সঙ্গেমওলানা ভাসানীর সঙ্গেএমনকি তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পরামর্শ করতেন।

৭১-এর আদিবাসী নারী মুক্তিযোদ্ধা : Bangladesher Khabor | Latest News, Breaking News, Sports, Entertainment, Politics, Business, Videos & Photos

সাইয়ীদ আতিকুল্লাহশামসুদ্দিন আহমদগাজীউল হকযারা সারাক্ষণ যুক্তফ্রন্ট অফিসে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহকারী হিসেবে লেখালেখির কাজ করতেনসকলের কাছেই শুনেছি পত্রপত্রিকায় যা পাওয়া যায় তার থেকেও বেশিবার যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। কারণপাকিস্তানি প্রশাসন সে কাজ করছিল। সোহরাওয়ার্দীর ওই লেখালেখির সহকারী ওই সময়ের উজ্জ্বল ছাত্রপরবর্তী কালের বিখ্যাত ওই ব্যক্তিগণ সকলেই একবাক্যে বলেছেনশুধুমাত্র সোহরাওয়ার্দীর বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতার কারণেই সেদিন যুক্তফ্রন্ট রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল। এবং যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী বিজয় ও মুসলিম লীগের রাজনীতি পাকিস্তানের মাটিতে কবর দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।

অর্থাৎ যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ব্রিটিশকে ভারত ভাগ করতেহিন্দুমুসলিম দাঙ্গা করাতে সহযোগিতা করেছিলএবং যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিই এ উপমহাদেশের সব থেকে বড় বিষফোড়াতার একটি অংশ মুসলিম লীগকে ৫৪-এর নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে চিরতরে ধ্বংস করে দেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ভিত্তি রচনা করেন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির।

যে কারণে ৫৪-এর পর থেকে পাকিস্তানে সামরিক শাসকের ও বিদেশি সহযোগিতা ছাড়া মুসলিম লীগ আর রাজনীতিতে রাজনৈতিকভাবে নিজ মেরুদণ্ডের ওপর দাঁড়াতে পারে না। আর বাংলাদেশে তো মুসলিম লীগ নামেও তারা দাঁড়াতে পারে নাসামরিক শাসকের সেনাছাউনির দলগুলোর মধ্যে এবং জঙ্গিবাদের সহযোগী হিসেবে তাদের আশ্রয় নিতে হয়েছে।

article

সর্বশেষ আজকের বাংলাদেশ সৃষ্টিতে রয়েছে হোসেন সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সৃষ্টির এক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ভূমিকা। কমরেড তোয়াহার আত্মজীবনীতে আছেশেরে বাংলা তরুণদের মধ্য থেকে তোয়াহাকে মন্ত্রী হিসেবে লিস্টে নাম দিয়েছিলেন। কিন্তু সাইয়ীদ আতিকুল্লাহর কাছে জেনেছি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সেদিন ওই নামটি কেটে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম দেন। ৩৪ বছর বয়সের তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন অশীতিপর নেতা শেরে বাংলার কেবিনেটে স্থান পান। আবার তার মাত্র আড়াই বছর পরে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে যখন প্রশ্ন আসে দলের সেক্রেটারি ও মন্ত্রী একই ব্যক্তি থাকতে পারবেন নাতখন শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করেন। শুধু দলের সেক্রেটারি থাকেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তের প্রতি ছিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পূর্ণ সমর্থন। যার ভেতর দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় ভবিষ্যৎ আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব। ততদিনে আওয়ামী লীগ থেকে মুসলিম শব্দ বাদ গেছে। এবং আওয়ামী লীগ একটি আধুনিক গঠনতান্ত্রিক ভিত্তিক দল হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। এবং সেই আধুনিক দলটিই বাংলাদেশ সৃষ্টি করেযার গঠনতন্ত্রের মূলটি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর করা। সময়ের প্রয়োজনে সেই ভিত্তির ওপর পরিবর্তনপরিমার্জন হয়েছে এবং হবেই। কিন্তু ভিত্তিটি রচনা সোহরাওয়ার্দীর।

আজ যখন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ডঙ্কা বাজছেএ সময়ে রাজনৈতিকভাবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে মোকাবিলা করার জন্য শুধু জন্ম-মৃত্যুর দিনে নয়প্রতি মুহূর্তে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনীতিকে চর্চার প্রয়োজন পড়ছে।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিকসম্পাদকসারাক্ষণ, The Present World

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশ–রাখাইন সীমান্তে বদলে যাওয়া বাস্তবতা: কাঁটাতার নয়, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মুসলিম লীগকে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও বাংলাদেশ সৃষ্টির ভিত্তি তৈরি করেন

০৩:৩২:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সর্বভারতীয় নেতা ছিলেন। ইতিহাসে তাঁকে আমরা মোটা দাগে জানি গ্রেটার বেঙ্গলের প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস যারা চর্চা করেনবাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যারা বিশ্বাস করেন তাদের কাছে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অনেক বড় অধ্যায়।

সর্বভারতীয় রাজনীতিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর শুরুটা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের (সি আর দাশ) হাত ধরে। তাঁর শুরুটা যেমন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা হিসেবে তেমনি দেশবন্ধুর স্বরাজ পার্টির মাধ্যমে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর আগেই মহাত্মা গান্ধী নেতা হিসেবে ব্যর্থ হয়ে গেছেন। ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদারের মতে১৯২২ সালে চৌরা চৌরির ঘটনার পরে গান্ধী একক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যেমন অসহযোগ আন্দোলনের মৃত্যু ঘটে তেমনি গান্ধীর নেতৃত্বেরও মৃত্যু ঘটে। যে কারণেই চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে স্বরাজ পার্টি ১৯২৩ সালে। কিন্তু সি আর দাশের অকালমৃত্যুর ফলে শুধু বেঙ্গলের ঐক্যের রাজনীতিবেঙ্গল প্যাক্ট নয়সর্বভারতীয় ঐক্যের রাজনীতিও শেষ হয়ে যায়। তারপরে ভারতের রাজনীতিতে আর সঠিক স্থানে সঠিক মানুষটি যেতে পারেনি। জিন্নাহসোহরাওয়ার্দীর মতো ব্যক্তিজীবনে শতভাগ আধুনিক মানুষকে মুসলিম লীগের নেতা হতে হয়েছিল। যাহোক সে ইতিহাস ভিন্ন। শুধুমাত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনীতির জীবনের শুরুটা নতুন প্রজন্মের কাছে জানানোর জন্যই এ অংশটুকু লেখা।

তারপরে নেতৃত্বহীন ভারতবর্ষে যা হবার তাই হলোপশ্চিমা শক্তি ভবিষ্যৎ অর্থনীতির স্বার্থে ও নৌপথের স্বার্থে রাজনীতির বদলে হিন্দুমুসলিমের নামে ভারত ভাগ করে দিয়ে গেল। আর এ সুযোগ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পশ্চিমা শক্তি অর্থাৎ ব্রিটেন ও আমেরিকা পেয়েছিল কারণ, ততদিনে ব্রিটেনের জায়গায় চালকের আসনে বসে গেছে আমেরিকা।  অন্যদিকে ওই সময়ে ভারতের রাজনৈতিক শক্তি ছিল নেতৃত্বহীন। তাই রাজনীতির বদলে তাদের সামনে সাম্প্রদায়িকতার মাংসের টুকরো ছুড়ে দিয়ে তারা শুধু নৌপথের রুট হিসেবে করে ভারত ভাগ করতে শুধু সমর্থ হয়নিযে ব্রিটিশ নাগরিকরা দুইশো বছর ভারত শোষণ করেছিলতাদের সকলকে নিরাপদে ব্রিটেনে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়। স্বাধীনতার পূর্বমুহূর্তে যেখানে ভারতবর্ষের প্রতিটি রাস্তায় পড়ে থাকার কথা ছিল অত্যাচারী ব্রিটিশদের মৃতদেহতার বদলে ভারতবাসীদের ভাইয়ে ভাইয়ে ধর্মের নামে একে অপরকে হত্যা করাতে সমর্থ হলো ব্রিটিশ। অর্থাৎ ভারতের রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকল ভারতবাসীর মৃতদেহঅথচ মূঢ় ভারতীয়রা সে মৃতদেহগুলোকে ভারতবাসীর মৃতদেহ না বলে বলল হিন্দু ও মুসলমানের মৃতদেহ।

আর ওই মৃতদেহের ওপর ভর করে ভারতকে ভাগ করে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটো অবাস্তব রাষ্ট্র হলো। অবাস্তব এ কারণেই যে আধুনিক কোনো সাংবিধানিক রাষ্ট্র ধর্মের নামে হতে পারে না। সে কাজে কংগ্রেসের ভেতরের ধর্মীয়পন্থীরা যেমন রাষ্ট্রনীতির বদলে ধর্মের নামে অবাস্তব কনসেপ্টকে জোর দিলঅন্যদিকে মুসলিম লীগ তো ওই অবাস্তব কনসেপ্টেরই ধারক।

আইনজীবী হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীর জীবনী, Biography of Huseyn Shaheed Suhrawardy in Bengali

ধর্মের নামে দেশকে দ্বিখণ্ডিত করার পরে প্রকৃত রাজনীতিকরা দ্রুতই কোণঠাসা হয়ে পড়েন। মুসলিম লীগও সে সময়ে উদ্ভট রাজনীতিকদের হাতে চলে যায়। এবং এ সময়ে আবারও প্রমাণিত হয় চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পরে নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় বিভিন্ন নেতাকে নানাভাবে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগে স্থান নিতে হয়েছিলমুসলিম লীগও ধর্মীয় রাজনীতির আবহাওয়ায় তাদের ব্যবহার করতে সমর্থ হয়েছিলকিন্তু মুসলিম লীগ ক্ষমতা পেতেই তাঁরা বাদ পড়ে যান। বেঙ্গলে সব থেকে বড় দুই মুসলিম ধর্মাবলম্বী প্রগতিশীল নেতাএকজন শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকঅপরজন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে মুসলিম লীগ নেতারা আর তাদের ক্ষমতার ধারে-কাছে ঘেঁষতে দেননি। কারণতারা জানতেনএ দুজন তাদের লোক নয়। শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক যদিও পাকিস্তানে ফিরে গ্রেটার বেঙ্গলের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী থেকে পূর্ববাংলার অ্যাটর্নি জেনারেল হতে পেরেছিলেনসোহরাওয়ার্দীকে প্রথমে মুসলিম লীগ নেতারা ফিরতেই দেয়নি। বরং পাকিস্তানে ফিরলে তাঁর মাথা কুচাল” দেবার অর্থাৎ মাথা কুপিয়ে কুচি কুচি করে ফেলার ঘোষণা দেয়। যে কারণে ১৯৪৮ সালের জুন মাসে পূর্ববাংলায় ফিরলেও তাঁকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আবার চলে যেতে হয়।

কিন্তু চিত্তরঞ্জন দাশের ছায়ায় বেড়ে ওঠা রাজনীতিক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন চিত্তরঞ্জন দাশের রাজনৈতিক সংগ্রামের মূলমন্ত্র অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষতাই সে অরাজনৈতিক ও ক্ষমতা দখলকারী শক্তি হোকতাদের বিরুদ্ধে যেখানে যতটুকু রাজনৈতিক স্পেস পাওয়া যায়অতটুকু স্পেসেই রাজনীতির মাধ্যমে তাদের মোকাবিলার কাজ করতে হবে। এবং রাজনৈতিকভাবেই অরাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে হবে।

এই রাজনৈতিক লক্ষ্য বা আদর্শকে সামনে রেখে সোহরাওয়ার্দী মুসলিম লীগের ভেতর গড়ে ওঠা প্রগ্রেসিভ তরুণ অংশযারা পূর্বের থেকে তাঁর রাজনীতির অনুসারী ছিলেনতাদের দিয়ে এবং আসাম থেকে পূর্ববাংলায় আসা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর মাধ্যমে ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করাতে সমর্থ হন। এই আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের মাধ্যমেই কিন্তু সোহরাওয়ার্দী মুসলিম লীগের মেরুদণ্ডে প্রথম আঘাত করতে সমর্থ হন। কারণ মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা ও নেতারা ছিলেন মূলত ব্রিটিশের মতো একটি শোষক ও সাধারণ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি অরাজনৈতিক শক্তি। রাজনীতিতে তাদের শক্তি ছিল দুটিএকটি ধর্মব্যবসাঅন্যটি হিন্দুদেরকে প্রতিপক্ষ করা। এই ধর্মব্যবসা ও হিন্দুদের প্রতিপক্ষ করে তারা তৎকালীন বাংলার সাধারণ মুসলিম সমাজকে বিভ্রান্ত করেছিলেন।

সোহরাওয়ার্দী নেপথ্যে থেকে চিত্তরঞ্জন দাশ (সি আর দাশ) যেমন গান্ধীর ব্রিটিশ-অনুগত কংগ্রেসের প্রগতিশীল নেতাদের এবং বিশেষ করে সোহরাওয়ার্দীসুভাষচন্দ্র বসুর মতো যুব নেতাঅন্যদিকে মতিলাল নেহরুর মতো সিনিয়র নেতাদের নিয়ে স্বরাজ পার্টি গড়েছিলেনতেমনি মুসলিম লীগের ভেতরে থাকা সিনিয়রতরুণ ও যুব প্রগতিশীলদের নিয়ে রাজনীতিহীন প্রাসাদ-ষড়যন্ত্রের মুসলিম লীগের বিপরীতে তিনি প্রথমে আওয়ামী মুসলিম লীগ গড়েন। পাকিস্তান সৃষ্টি হবার দেড় বছরের মধ্যে ওই সময়ের বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলটির নামের মধ্যে মুসলিম” শব্দটি রাখা ছিল একটি বাস্তবতা। আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগ অর্থাৎ সাধারণ জনগণের দল তাঁর আমলেই রূপান্তরিত হয়েছিল।

তাই যারা ধারাবাহিকভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িততারা যখন যে প্রজন্মের হোক না কেনতারা জানে আওয়ামী লীগের মূল প্রতিষ্ঠাতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। যে কারণে অনেক সময় বাংলাদেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজ আওয়ামী লীগের দিকে আঙুল তোলেআওয়ামী লীগ তাদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানীর জন্ম-মৃত্যুর দিনের থেকে সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্ম-মৃত্যুদিন অনেক বেশি আড়ম্বরের সঙ্গে পালন করে। দেশের বাইরের অনেকের মতো বাংলাদেশের এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কে এবং আওয়ামী মুসলিম লীগ পরে সেটাকে আওয়ামী লীগে রূপান্তরিত করে তিনি সমগ্র ভারতবর্ষের ও বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে কী কাজটি করে গেছেনসেটা কখনও গভীরভাবে ভেবে দেখেননি?

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কিন্তু আওয়ামী মুসলিম লীগ তৈরি করে তার পরের দিনই এ আজাদী ঝুটা হ্যায়লাখো ইনসান ভূখা হ্যায়” এ ধরনের কোনো হটকারী রাজনীতিতে যাননি। তিনি তাঁর রাজনীতির দীক্ষাগুরু সি আর দাশের পথ ধরে নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক পথেই অরাজনৈতিক শক্তি মুসলিম লীগকে যেমন পরাজিত করার পথে হাঁটেনআবার রাজনীতিতে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তৈরি অন্যতম বড় কাজযেমন সি আর দাশ তৈরি করেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুকেসোহরাওয়ার্দীও সে পথে হেঁটেছিলেন।

আজ শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের মৃত্যুবার্ষিকী

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ সৃষ্টি করে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রায় পাঁচ বছর অপেক্ষা করেছেন মুসলিম লীগকে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করার জন্য। ১৯৫৪ সালে যখন পাকিস্তানে নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচনের সময় এলোতখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যেমন পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলেনতেমনি পশ্চিম পাকিস্তানেও মুসলিম লীগের বিপরীতে অন্যান্য দলগুলোকে এক হবার কাজ করেন।

১৯৫৪-এর নির্বাচনে নিজের দল আওয়ামী লীগের বিজয় তাঁর কাছে মুখ্য বা তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম লীগকে রাজনৈতিকভাবে চিরকালের জন্য পরাজিত করা। কারণ তিনি জানতেনযাদের কোনো রাজনীতি নেইশুধু কয়েকটি বিশেষ বিষয়কে বিরোধিতা করাই বা শত্রু হিসেবে উপস্থিত করাই যাদের রাজনৈতিক পুঁজিতাদের একবার রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করতে পারলে আর তারা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। ওই সময়ে মুসলিম লীগকে পরাজিত করার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি বিশাল ঐক্য। আর সেই ঐক্য সোহরাওয়ার্দীর মতো শিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে দূরদর্শী নেতার কারণেই সম্ভব হয়েছিল। যেমন পাকিস্তানে ১৯৫৪-এর সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করলেই শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক অ্যাটর্নি জেনারেলের চাকরি ছেড়ে নির্বাচন লড়ার ঘোষণা দেন। শেরে বাংলার ঘোষণা পরপরই সোহরাওয়ার্দী তাঁর কাছে শেখ মুজিবুর রহমানকে পাঠান যুক্তফ্রন্ট তৈরি করা ও তাতে যোগ দেওয়ার জন্য। এ বিষয়টি যেমন কিছু কিছু বইয়ে আছেতেমনি ওই সময়ে সোহরাওয়ার্দীর বেশ কয়েকজন প্রাইভেট সেক্রেটারির একজন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উজ্জ্বল ছাত্র ও পরবর্তীকালে কবি ও গল্পকার সাইয়ীদ আতিকুল্লাহ। তাঁর মুখেও বিষয়টি সবিস্তারে জেনেছি। তিনি বলেনএই কাজে সোহরাওয়ার্দী শেখ মুজিব ছাড়া অন্য কাউকে যেমন যোগ্য মনে করেননিতেমনি বিশ্বাসও করেননি।

বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বঙ্গবন্ধুর অবদান | The Business Standard

শেরে বাংলা যুক্তফ্রন্টে যোগ দেবেনএমন একটা ঘোষণা দিতেই সাংবাদিকরাবিশেষ করে মুসলিম লীগ-ঘেঁষা সাংবাদিকরাএকটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে সোহরাওয়ার্দীকে প্রশ্ন করেনশেরে বাংলা যুক্তফ্রন্টে যোগ দিলে আপনার জোট জিতলে পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী কে হবেনসোহরাওয়ার্দী সহাস্যে উত্তর দেনযেখানে হক সাহেব যোগ দিয়েছেন সেখানে এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকার সুযোগ নেই। বিষয়টি ওই সময়ের সব পত্রিকায় আছে।

রাজনীতিতে শেরে বাংলাশেরে বাংলাই। তারপরেও মুসলিম লীগ ও পাকিস্তানের প্রশাসন যুক্তফ্রন্ট যাতে না হতে পারেএ কারণে শেরে বাংলার সঙ্গে এক পর্যায়ে যুক্তফ্রন্টের একটা দ্বন্দ্ব তৈরি করার চেষ্টা করেন। এটা জানতে পেরেই সোহরাওয়ার্দী ওই রাতেই শেরে বাংলাকে তাঁর বাসা থেকে যুক্তফ্রন্টের অফিসে আনার ব্যবস্থা করেন।

শেরে বাংলাকে তাঁর হাটখোলা বাসা থেকে নিয়ে আসা হয়। আর এই নিয়ে আসার কাজের নেতৃত্ব দেন সেদিন পাকিস্তান সৃষ্টি হবার পরে পূর্ববাংলায় প্রথম যে অসাম্প্রদায়িক দল যুবলীগ” তৈরি হয়তার নেতা ইমাদুল্লাহ। সেদিনের সেই মেধাবী তরুণ নেতা ইমাদুল্লাহ সেদিন সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশ পেয়েই মোগলটুলির যুক্তফ্রন্ট ক্যাম্প থেকে তাঁর সহকর্মী ও জুনিয়র কর্মীদের নিয়ে গিয়ে শেরেবাংলাকে বাসা থেকে একপ্রকার কাঁধে করে নিয়ে আসেন যুক্তফ্রন্ট ক্যাম্পে। সেদিন ইমাদুল্লাহর নেতৃত্বে যারা গিয়েছিলেনতাদের মধ্যে একজন ছিলেন যুবলীগের সদস্য৫২-এর ভাষা আন্দোলনের নেতা গাজীউল হক এবং ইমাদুল্লাহর বামপন্থী আদর্শের কর্মীচট্টগ্রামের বিশিষ্ট বামপন্থী কর্মীপরবর্তীতে সোভিয়েত দূতাবাসে জনসংযোগ বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন আহমদ। গাজীউল হক ও শামসুদ্দিন আহমদ উভয়ের কাছে শুনেছি সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশে তাঁরা এ কাজ করেছিলেন।

সোহরাওয়ার্দী শুধু যে শেরে বাংলার দল ও প্রগতিশীলদের যুক্তফ্রন্টকে এক করেছিলেন তা নয়তিনি ধর্মব্যবসায়ী নয় কিন্তু ধর্মবিশ্বাস ও রাজনৈতিক উদারতা নিয়ে যে গোষ্ঠী রাজনীতি করেনতাদেরকেও যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে এক করেছিলেন।

এ ছাড়া ওই সময়ে যেহেতু সাইয়ীদ আতিকুল্লাহকে সার্বক্ষণিকভাবে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে থাকতে হতোতাঁর কাছে শুনেছি যুক্তফ্রন্টকে নির্বাচনে বিজয়ী করার জন্য কীভাবে রাতদিন সোহরাওয়ার্দী পরিশ্রম করতেন। পত্রপত্রিকায় পাওয়া যায়নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হবার পর থেকে নির্বাচনের শেষ দিন অবধি তিনি সারাদেশে নির্বাচনী প্রচারের মাঝে যখন ঢাকা ফিরতেনতখনও যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী অফিসে থাকতেন। ওই অফিসের বেঞ্চেই তিনি খুব অল্প সময়ের জন্য ঘুমাতেন। সাইয়ীদ আতিকুল্লাহর কাছে জেনেছিআর রাতের বাকি সময় নির্বাচনী প্রচার যে যে এলাকায় করে এসেছেনসেগুলো নিয়ে তিনি কাগজ-কলমে বিশ্লেষণ করতেন। ৫৪-এর নির্বাচনে তাঁর দল আওয়ামী মুসলিম লীগসহ যুক্তফ্রন্টের প্রায় সকল মনোনয়ন তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পরীক্ষা করতেন। প্রয়োজনে শেরে বাংলার সঙ্গেমওলানা ভাসানীর সঙ্গেএমনকি তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পরামর্শ করতেন।

৭১-এর আদিবাসী নারী মুক্তিযোদ্ধা : Bangladesher Khabor | Latest News, Breaking News, Sports, Entertainment, Politics, Business, Videos & Photos

সাইয়ীদ আতিকুল্লাহশামসুদ্দিন আহমদগাজীউল হকযারা সারাক্ষণ যুক্তফ্রন্ট অফিসে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহকারী হিসেবে লেখালেখির কাজ করতেনসকলের কাছেই শুনেছি পত্রপত্রিকায় যা পাওয়া যায় তার থেকেও বেশিবার যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। কারণপাকিস্তানি প্রশাসন সে কাজ করছিল। সোহরাওয়ার্দীর ওই লেখালেখির সহকারী ওই সময়ের উজ্জ্বল ছাত্রপরবর্তী কালের বিখ্যাত ওই ব্যক্তিগণ সকলেই একবাক্যে বলেছেনশুধুমাত্র সোহরাওয়ার্দীর বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতার কারণেই সেদিন যুক্তফ্রন্ট রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল। এবং যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী বিজয় ও মুসলিম লীগের রাজনীতি পাকিস্তানের মাটিতে কবর দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।

অর্থাৎ যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ব্রিটিশকে ভারত ভাগ করতেহিন্দুমুসলিম দাঙ্গা করাতে সহযোগিতা করেছিলএবং যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিই এ উপমহাদেশের সব থেকে বড় বিষফোড়াতার একটি অংশ মুসলিম লীগকে ৫৪-এর নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে চিরতরে ধ্বংস করে দেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ভিত্তি রচনা করেন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির।

যে কারণে ৫৪-এর পর থেকে পাকিস্তানে সামরিক শাসকের ও বিদেশি সহযোগিতা ছাড়া মুসলিম লীগ আর রাজনীতিতে রাজনৈতিকভাবে নিজ মেরুদণ্ডের ওপর দাঁড়াতে পারে না। আর বাংলাদেশে তো মুসলিম লীগ নামেও তারা দাঁড়াতে পারে নাসামরিক শাসকের সেনাছাউনির দলগুলোর মধ্যে এবং জঙ্গিবাদের সহযোগী হিসেবে তাদের আশ্রয় নিতে হয়েছে।

article

সর্বশেষ আজকের বাংলাদেশ সৃষ্টিতে রয়েছে হোসেন সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সৃষ্টির এক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ভূমিকা। কমরেড তোয়াহার আত্মজীবনীতে আছেশেরে বাংলা তরুণদের মধ্য থেকে তোয়াহাকে মন্ত্রী হিসেবে লিস্টে নাম দিয়েছিলেন। কিন্তু সাইয়ীদ আতিকুল্লাহর কাছে জেনেছি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সেদিন ওই নামটি কেটে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম দেন। ৩৪ বছর বয়সের তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন অশীতিপর নেতা শেরে বাংলার কেবিনেটে স্থান পান। আবার তার মাত্র আড়াই বছর পরে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে যখন প্রশ্ন আসে দলের সেক্রেটারি ও মন্ত্রী একই ব্যক্তি থাকতে পারবেন নাতখন শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করেন। শুধু দলের সেক্রেটারি থাকেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তের প্রতি ছিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পূর্ণ সমর্থন। যার ভেতর দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় ভবিষ্যৎ আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব। ততদিনে আওয়ামী লীগ থেকে মুসলিম শব্দ বাদ গেছে। এবং আওয়ামী লীগ একটি আধুনিক গঠনতান্ত্রিক ভিত্তিক দল হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। এবং সেই আধুনিক দলটিই বাংলাদেশ সৃষ্টি করেযার গঠনতন্ত্রের মূলটি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর করা। সময়ের প্রয়োজনে সেই ভিত্তির ওপর পরিবর্তনপরিমার্জন হয়েছে এবং হবেই। কিন্তু ভিত্তিটি রচনা সোহরাওয়ার্দীর।

আজ যখন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ডঙ্কা বাজছেএ সময়ে রাজনৈতিকভাবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে মোকাবিলা করার জন্য শুধু জন্ম-মৃত্যুর দিনে নয়প্রতি মুহূর্তে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনীতিকে চর্চার প্রয়োজন পড়ছে।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিকসম্পাদকসারাক্ষণ, The Present World