সাক্ষাৎকার: আহরাম অনলাইন
বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল পশ্চিমা শক্তিগুলো, আর তাদের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোই বৈশ্বিক নিয়ম নির্ধারণ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই একক প্রভাবের জায়গায় ধীরে ধীরে বহুমাত্রিক একটি কাঠামো গড়ে উঠছে। ব্রিকসের সম্প্রসারণ সেই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। তবে এই পরিবর্তনকে কেবল সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আসল প্রশ্ন হলো—ব্রিকস কি সত্যিই এমন একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, যা উন্নয়নশীল বিশ্বের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করবে?
ব্রিকসের সাম্প্রতিক সম্প্রসারণ দেখিয়েছে যে বহু দেশ প্রচলিত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে নতুন সহযোগিতার পথ খুঁজছে। এর পেছনে শুধু রাজনৈতিক কারণ নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতাও রয়েছে। ডলারনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থার ওঠানামা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, ঋণ ব্যবস্থার কঠোর শর্ত এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে অসম ক্ষমতার ভারসাম্য অনেক দেশকে বিকল্প চিন্তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ফলে ব্রিকস এখন আর পাঁচটি উদীয়মান অর্থনীতির একটি জোট নয়; এটি বৈশ্বিক দক্ষিণের বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠছে।
এই প্রেক্ষাপটে আফ্রিকার গুরুত্ব নতুনভাবে সামনে এসেছে। বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যা, বিপুল অবকাঠামোগত চাহিদা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে আফ্রিকা আগামী কয়েক দশকের বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র হতে পারে। তাই ব্রিকসের জন্য আফ্রিকা কেবল একটি সম্ভাব্য বাজার নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদার। পরিবহন, জ্বালানি, শিল্পায়ন, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক সংযোগ—এসব ক্ষেত্রেই সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তবে সহযোগিতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা পুরোনো নির্ভরতার নতুন সংস্করণে পরিণত হবে না। উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশ অতীতে বহিরাগত শক্তির সঙ্গে অসম সম্পর্কের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ফলে নতুন অংশীদারিত্বের সাফল্য নির্ভর করবে পারস্পরিক স্বার্থ, স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অংশীদার দেশের নিজস্ব উন্নয়ন অগ্রাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ওপর। যদি ব্রিকস সত্যিই নিজেকে বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তবে তাকে এই নীতিগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য ও অর্থায়ন। বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে ভোগা দেশগুলোর জন্য ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বড় ঝুঁকি তৈরি করে। স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ সেই ঝুঁকি কমাতে পারে। একই সঙ্গে আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিগুলো আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতার প্রভাবও তুলনামূলকভাবে কম অনুভব করবে। কিন্তু এটি কেবল রাজনৈতিক ঘোষণা দিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য কার্যকর পেমেন্ট ব্যবস্থা, ক্লিয়ারিং অবকাঠামো, আর্থিক বাজারের গভীরতা এবং সদস্যদেশগুলোর মধ্যে উচ্চমাত্রার আস্থার প্রয়োজন।
এখানেই বাস্তবতার সঙ্গে উচ্চাকাঙ্ক্ষার পার্থক্য স্পষ্ট হয়। বিকল্প আর্থিক অবকাঠামো গড়ে তোলা অত্যন্ত জটিল কাজ। আন্তর্জাতিক লেনদেন, বীমা, অর্থপ্রদানের নিরাপত্তা এবং আর্থিক তথ্যের সমন্বিত ব্যবস্থার অভাবে নতুন কাঠামো কার্যকর হতে সময় লাগবে। ফলে ব্রিকসের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল নতুন ধারণা দেওয়া নয়; বরং সেই ধারণাকে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব। বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা শুধু শিল্প উৎপাদন বা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করে না; বরং তথ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপরও নির্ভরশীল। যদি কয়েকটি দেশ বা কোম্পানি বৈশ্বিক প্রযুক্তি অবকাঠামোর ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে, তবে রাজনৈতিক স্বাধীনতা থাকলেও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়ে। তাই প্রযুক্তিতে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করা এখন উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য কৌশলগত অপরিহার্যতা।
তবে প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা মানে বিচ্ছিন্নতা নয়। বরং এর অর্থ হলো নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করা। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রেখেও একটি দেশ যেন তার গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো, তথ্যপ্রবাহ এবং প্রযুক্তিগত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিতে পারে—এটাই প্রকৃত সার্বভৌমত্বের ভিত্তি।

ব্রিকসের সম্প্রসারণের সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। সদস্যসংখ্যা যত বাড়বে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ তত জটিল হবে। বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং কৌশলগত স্বার্থ সবসময় এক হবে না। ফলে ঐকমত্য বজায় রাখা আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠবে। কিন্তু এটিই হয়তো জোটটির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। বৈচিত্র্যের মধ্যেও যদি কার্যকর সমন্বয় বজায় রাখা যায়, তাহলে সেটিই বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের বাস্তব উদাহরণ হবে।
একই সঙ্গে তথ্য ও অবকাঠামোগত ঘাটতির বিষয়টিও অবহেলা করার সুযোগ নেই। সরবরাহ শৃঙ্খল, পরিবহন করিডর, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ, খাদ্য নিরাপত্তা কিংবা আর্থিক ঝুঁকি সম্পর্কে সমন্বিত তথ্য ছাড়া বড় আকারের অর্থনৈতিক সহযোগিতা সফল হয় না। তাই ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু উৎপাদনে নয়; তথ্য ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণের সক্ষমতার মধ্যেও নির্ধারিত হবে।
তবে ব্রিকসকে ঘিরে অতিরিক্ত আশাবাদও বাস্তবসম্মত নয়। এটি এখনও এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিকল্প হিসেবে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যার সফলতা নির্ভর করবে সদস্যদেশগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা এবং বাস্তবায়ন ক্ষমতার ওপর। ঘোষণার রাজনীতি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়; প্রয়োজন ধারাবাহিক নীতি, বিনিয়োগ এবং আস্থা।
সবশেষে, ব্রিকসের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সদস্যসংখ্যা নয়, বিশ্বাসযোগ্যতা। উন্নয়নশীল বিশ্বের বহু দেশ এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চায়, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ হবে আরও প্রতিনিধিত্বশীল, অর্থায়ন হবে তুলনামূলকভাবে ন্যায্য এবং উন্নয়ন সহযোগিতা হবে রাজনৈতিক শর্তের পরিবর্তে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে। ব্রিকস যদি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে, তবে এটি সত্যিই বৈশ্বিক দক্ষিণের নতুন শক্তিকেন্দ্র হয়ে উঠবে। আর যদি কেবল আরেকটি ভূরাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত হয়, তাহলে এর সম্প্রসারণ ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হলেও রূপান্তরমূলক হবে না।
বিশ্ব এখন সেই উত্তরটির অপেক্ষায় রয়েছে।
( বাংলায় রূপান্তর – সারাক্ষণ মতামত ডেস্ক)
ড. ভিক্টোরিয়া পানোভা 



















