বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যগুলো যখন একে একে ভেঙে পড়ছিল, তখন স্বাধীনতা যেন ইতিহাসের অনিবার্য গন্তব্যে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষণা আর একটি কার্যকর, স্থিতিশীল রাষ্ট্র গড়ে তোলার সক্ষমতা এক বিষয় নয়। বহু অঞ্চলে স্বাধীনতার সময়সূচি নির্ধারিত হয়েছে স্থানীয় জনগণের প্রস্তুতি, রাজনৈতিক বাস্তবতা বা প্রশাসনিক সক্ষমতার ভিত্তিতে নয়; বরং লন্ডন, ওয়াশিংটন কিংবা অন্যান্য ক্ষমতাকেন্দ্রের কৌশলগত হিসাব-নিকাশের ওপর।
বোর্নিও অঞ্চলের ইতিহাস সেই বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। উত্তর বোর্নিও ও সারাওয়াককে যে গতিতে মালয়ার সঙ্গে যুক্ত করে নতুন ফেডারেশন গঠন করা হয়েছিল, তার পেছনে স্থানীয় সমাজের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের তুলনায় ব্রিটিশ বৈদেশিক নীতি, ঠান্ডা যুদ্ধের কৌশল এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতাই বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিল। ফলে স্বাধীনতার প্রকল্পটি অনেকের কাছে মুক্তির পরিবর্তে একটি অসম রাজনৈতিক বন্দোবস্তে পরিণত হয়।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড ম্যাকমিলান। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন চিন্তাশীল, মিতভাষী এবং রক্ষণশীল দলের মধ্যেও তুলনামূলক উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা তাঁকে এমন এক নেতা হিসেবে গড়ে তোলে, যিনি সংকটময় সময়ে ব্রিটেনের অবস্থান পুনর্গঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সুয়েজ সংকটের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মর্যাদা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। একই সময়ে অর্থনৈতিক চাপও দ্রুত বাড়ছিল। ম্যাকমিলান উপলব্ধি করেন যে পুরোনো ধরনের সাম্রাজ্য ধরে রাখা আর সম্ভব নয়। তাই তাঁর সরকার প্রথমেই উপনিবেশগুলোর আর্থিক ব্যয়, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ লাভ-ক্ষতির হিসাব করতে শুরু করে। এই মূল্যায়ন ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কারণ এর মাধ্যমে উপনিবেশগুলোকে আর কেবল সাম্রাজ্যের গৌরবের অংশ হিসেবে দেখা হয়নি; বরং অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা শুরু হয়।
এই অবস্থান ব্রিটিশ রক্ষণশীল রাজনীতির ঐতিহ্যগত ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন, ম্যাকমিলান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে রক্ষণশীল দর্শনের বহু পুরোনো অবস্থান থেকে সরে আসছেন। তাঁর সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, তিনি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত অঙ্গীকারের চেয়ে পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়াকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
তবে ম্যাকমিলানের দৃষ্টিতে পরিস্থিতি ছিল আরও জটিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ব্রিটেন আর এককভাবে বৈশ্বিক শক্তি নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা, সোভিয়েত প্রভাব মোকাবিলা করা এবং ইউরোপীয় অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়া—এই তিনটি লক্ষ্য একই সঙ্গে অর্জন করতে হচ্ছিল। সেই কারণে ঔপনিবেশিক নীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
১৯৬০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে ম্যাকমিলান তাঁর ঐতিহাসিক “উইন্ড অব চেঞ্জ” ভাষণে আফ্রিকার জাতীয়তাবাদের উত্থানকে ইতিহাসের অপ্রতিরোধ্য বাস্তবতা হিসেবে স্বীকার করেন। সেই বক্তব্যকে সাধারণত ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোর স্বাধীনতার সূচনাবিন্দু হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে এই নীতির প্রয়োগ সব অঞ্চলে সমান ছিল না। কোথাও স্বাধীনতা ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রস্তুতির ফল, আবার কোথাও তা ছিল দ্রুত বাস্তবায়িত একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত।
বোর্নিওর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় চিত্রটিই বেশি স্পষ্ট।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তখন ঠান্ডা যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করেছে। সিঙ্গাপুরে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটির ভবিষ্যৎ, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ এবং কমিউনিজম ঠেকানোর প্রশ্ন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। ব্রিটেন চাইছিল এমন একটি নতুন রাজনৈতিক কাঠামো, যা পশ্চিমা নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করবে। সেই প্রেক্ষাপটে মালয়া, সিঙ্গাপুর এবং বোর্নিও অঞ্চলকে নিয়ে নতুন ফেডারেশন গঠনের পরিকল্পনা দ্রুত অগ্রসর হয়।
কিন্তু প্রশাসনিক পর্যায়ে সবাই এই পরিকল্পনার পক্ষে ছিলেন না।
বহু অভিজ্ঞ ঔপনিবেশিক কর্মকর্তা মনে করতেন, উত্তর বোর্নিও ও সারাওয়াক তখনও রাজনৈতিকভাবে পূর্ণাঙ্গ স্বশাসনের জন্য প্রস্তুত নয়। তার থেকেও বড় উদ্বেগ ছিল, মালয়ার সঙ্গে একীভূত হলে নতুন রাষ্ট্রে অংশীদারিত্ব সমতার ভিত্তিতে হবে না।
তাদের আশঙ্কার পেছনে বাস্তব কারণও ছিল। ১৯৫৭ সালের মালয়া ফেডারেশনের সংবিধানে মালয় জনগোষ্ঠীর বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়েছিল। বোর্নিওর বহু স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের উদ্বেগ ছিল, নতুন কাঠামোয় তাদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বার্থ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়বে।
সারাওয়াকের গভর্নর স্যার আলেকজান্ডার ওয়াডেল এবং উত্তর বোর্নিওর গভর্নর স্যার উইলিয়াম গুড—উভয়েই লন্ডনে পাঠানো প্রতিবেদনে সতর্ক করেছিলেন যে দ্রুত একীভূতকরণ ভবিষ্যতে জাতিগত উত্তেজনা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এমনকি বিদ্রোহের ঝুঁকিও সৃষ্টি করতে পারে। তাঁদের মতে, বোর্নিওর উন্নয়ন তখনও চলমান ছিল; আরও সময় নিয়ে ধাপে ধাপে স্বশাসনের পথে এগোনোই অধিক যুক্তিযুক্ত হতো।
কিন্তু এসব সতর্কবার্তা শেষ পর্যন্ত নীতিনির্ধারণে প্রাধান্য পায়নি।
ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার ভেতরেও ধীরে স্বাধীনতার পক্ষে থাকা ঔপনিবেশিক দপ্তরের অবস্থান ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। পরিবর্তে কূটনৈতিক ও কৌশলগত অগ্রাধিকার সামনে চলে আসে। আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয় স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর প্রাধান্য লাভ করে।
এই পরিবর্তনের প্রতীক ছিলেন ডানকান স্যান্ডিস। তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা, দ্রুত সিদ্ধান্তে বিশ্বাসী এবং সাম্রাজ্য-উত্তর রূপান্তর বাস্তবায়নে ম্যাকমিলানের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সহযোগী। বোর্নিও ও মালয়ার একীভূতকরণ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁর দৃষ্টিতে সময়ক্ষেপণের সুযোগ ছিল না; আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছিল এবং ব্রিটেনকে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হতো।
ফলে প্রশ্নটি কেবল স্বাধীনতার ছিল না; প্রশ্ন ছিল স্বাধীনতার ধরন, গতি এবং কাঠামো।
বোর্নিওর অভিজ্ঞতা দেখায়, একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বাইরের শক্তির কৌশলগত প্রয়োজন যখন স্থানীয় জনগণের রাজনৈতিক প্রস্তুতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়, তখন স্বাধীনতার ঘোষণাও দীর্ঘমেয়াদে নতুন অসন্তোষের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। ইতিহাসে অনেক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে আলোচনার মাধ্যমে, আবার অনেক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে সময়ের চাপ ও ভূরাজনৈতিক সমঝোতার ফল হিসেবে। এই দুই প্রক্রিয়ার ফলাফল সবসময় এক হয় না।
স্বাধীনতা তাই কেবল ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান নয়; এটি একটি রাজনৈতিক চুক্তি, যার সফলতা নির্ভর করে অংশীদারদের মধ্যে আস্থা, সমতা এবং প্রস্তুতির ওপর। বোর্নিওর ঘটনাপ্রবাহ সেই সত্যটিই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।
ম্যাকমিলানের “পরিবর্তনের হাওয়া” নিঃসন্দেহে বিশ্ব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু সেই হাওয়া সব অঞ্চলে সমানভাবে মুক্তির বার্তা বয়ে আনেনি। কোথাও এটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে, আবার কোথাও অসম রাজনৈতিক সমীকরণের সূচনা করেছে। বোর্নিওর ইতিহাস আমাদের শেখায়, রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়ায় তাড়াহুড়ো, ভূরাজনৈতিক সমঝোতা এবং স্থানীয় বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার মূল্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করতে হতে পারে।
ড. জন লাউ চিয়াং কং 



















