০৬:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
কমলা-কমলা ঠোঁটের নতুন বানর প্রজাতির সন্ধান কঙ্গোর গভীর বনে হামসদৃশ উপসর্গে বাংলাদেশে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ৭৭৯ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণে এককালীন ছাড়, নতুন সুযোগ দিল বাংলাদেশ ব্যাংক জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশে বছরে হারাচ্ছে ৮৪ ঘণ্টা ঘুম, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি ট্রাম্পের মনোনীত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্লাঞ্চের জিজ্ঞাসাবাদে উত্তাল মার্কিন সিনেট নরসিংদীর নদীতে গোসলে নেমে তিন শিশুর মৃত্যু, নিখোঁজ আরও এক মিয়ানমারের উপকূলে রোহিঙ্গাবাহী নৌকাডুবি, পাঁচ শতাধিক মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা ৩০ বছরের বেশি মার্কিন সেনাদের জন্য বাধ্যতামূলক টেস্টোস্টেরন পরীক্ষা, নতুন সিদ্ধান্তে আলোচনা নিয়া আর্কাইভসের নতুন অ্যালবাম ঘিরে আলোচনার ঝড়, প্রেম-বিচ্ছেদের গল্পে মুগ্ধ শ্রোতারা যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে তরুণদের সংকট, বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পর নতুন করে প্রশ্ন

বাংলাদেশ–রাখাইন সীমান্তে বদলে যাওয়া বাস্তবতা: কাঁটাতার নয়, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন

  • অং মার্ম উ
  • ০৫:০৮:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
  • 13

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার ২৭০ কিলোমিটার সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরে শুধু দুই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কিংবা কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতা সেই প্রচলিত ধারণাকে দ্রুত অচল করে দিচ্ছে। ঢাকা সীমান্তজুড়ে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, সীমান্ত সড়ক, তাপচিত্র শনাক্তকারী যন্ত্র, সিসিটিভি, নাইট ভিশন প্রযুক্তি ও ড্রোন নজরদারির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এর ঘোষিত উদ্দেশ্য সীমান্ত অপরাধ, মাদক পাচার, অবৈধ অভিবাসন ও আন্তঃদেশীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা।

রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এই উদ্যোগ অস্বাভাবিক নয়। প্রতিটি দেশেরই নিজের সীমান্ত সুরক্ষিত রাখার অধিকার ও দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নে এখন একটি মৌলিক বাস্তবতা সামনে এসেছে—সীমান্তের অপর প্রান্তে আসলে ক্ষমতা কার হাতে? এই প্রশ্নের উত্তর উপেক্ষা করে কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সম্ভব কি?

সীমান্তের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে

বাংলাদেশের পুরো সীমান্ত এখন রাখাইন রাজ্যের মংডু ও বুথিডং অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত। কিন্তু এই এলাকাগুলো আর মিয়ানমারের সামরিক সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণে নেই। বাস্তবে সেখানে প্রশাসনিক ও সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে আরাকান আর্মি (এএ)।

ঢাকা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নেপিদোর সামরিক সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সীমান্তের ওপারে যে শক্তি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটি আর মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার নয়। ফলে সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা, শরণার্থী প্রত্যাবাসন, সীমান্ত বাণিজ্য কিংবা স্থানীয় স্থিতিশীলতার প্রশ্নগুলো আগের মতো শুধু দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

এখানেই বর্তমান সংকটের মূল নিহিত। কূটনৈতিক অবস্থান এক বিষয়, কিন্তু সীমান্ত পরিচালনার বাস্তবতা আরেক বিষয়। এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান যত বাড়বে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনাও তত জটিল হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত সিল, সতর্ক অবস্থানে বিজিবি

নিরাপত্তা শুধু দেয়াল তুলে নিশ্চিত হয় না

কাঁটাতারের বেড়া সীমান্ত অতিক্রমের কিছু পথ সীমিত করতে পারে। কিন্তু কোনো সীমান্তের অস্থিরতার মূল কারণ যদি রাজনৈতিক হয়, তাহলে সেই সমস্যার সমাধান কেবল শারীরিক অবকাঠামো দিয়ে সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ–রাখাইন সীমান্ত এখন সশস্ত্র সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, প্রতিদ্বন্দ্বী শাসনব্যবস্থা, শরণার্থী সংকট এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় সীমান্তের দুই পাশে যাদের হাতে কার্যকর কর্তৃত্ব রয়েছে, তাদের মধ্যে কোনো ধরনের বাস্তবসম্মত সমন্বয় না থাকলে অত্যাধুনিক নজরদারি ব্যবস্থাও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন অমীমাংসিত রেখেও বিভিন্ন সরকার বাস্তব প্রয়োজনে স্থানীয় বা কার্যকর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সীমিত সহযোগিতায় গেছে। যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা কিংবা সীমান্ত সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এমন বাস্তববাদী পদ্ধতি নতুন নয়। বাংলাদেশও এখন তেমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

রোহিঙ্গা সংকট নিরাপত্তার সমীকরণকে আরও জটিল করেছে

বাংলাদেশে এখনো ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি সীমান্ত নিরাপত্তাকে শুধু আন্তর্জাতিক নয়, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যুতেও পরিণত করেছে।

একদিকে সীমান্তে মাদক, মানবপাচার ও অস্ত্র চোরাচালানের ঝুঁকি রয়েছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রশ্নও অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য যে রাজনৈতিক পরিবেশ প্রয়োজন, তা এখনো তৈরি হয়নি।

ফলে সীমান্তে বেড়া নির্মাণ করলেও প্রত্যাবাসনের মূল বাধাগুলো অমীমাংসিতই থেকে যাবে। কারণ শরণার্থীরা কেবল একটি সীমান্ত অতিক্রম করে দেশ ছাড়েনি; তারা যুদ্ধ, নির্যাতন ও অনিরাপত্তা থেকে পালিয়ে এসেছে। সেই কারণগুলো যদি বহাল থাকে, তাহলে অবকাঠামো নির্মাণ দিয়ে সংকটের সমাধান অসম্ভব।

আকাশপথের যুদ্ধ সীমান্তের নতুন বাস্তবতা

রাখাইনের বড় অংশে সামরিক বাহিনী স্থল নিয়ন্ত্রণ হারালেও তারা বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিয়াউকতাও, বুথিডং ও মংডুসহ বিভিন্ন এলাকায় বেসামরিক জনগণের ওপর ধারাবাহিক বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে। এতে প্রাণহানি, আহত হওয়া এবং বসতবাড়ি ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে।

এ ধরনের পরিস্থিতি আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করে—কাঁটাতারের বেড়া কোনো জনগোষ্ঠীকে বিমান হামলা থেকে রক্ষা করতে পারে না। সীমান্তের অবকাঠামো যুদ্ধের মূল কারণ দূর করে না, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করে না। বরং দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন সংঘাত হ্রাস, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং নিরাপদ পরিবেশ।

রাখাইনে হচ্ছে নতুন রাষ্ট্র, সংকটে বাংলাদেশ! - Dhaka Protidin

আঞ্চলিক রাজনীতির নতুন কেন্দ্রবিন্দু

বাংলাদেশ–রাখাইন সীমান্ত এখন কেবল দুই দেশের সীমান্ত নয়; এটি ক্রমেই একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলগত অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে। সীমান্ত বাণিজ্য ধীরে ধীরে পুনরায় চালু হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো সংঘাতপ্রবণ এলাকায় প্রবেশের উপায় খুঁজছে। একই সময়ে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান বের করতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে।

অন্যদিকে সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতিও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে সীমান্তকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এখানে নিরাপত্তা, মানবিক সুরক্ষা, অর্থনীতি এবং ভূরাজনীতি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে।

কূটনীতি কি বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলাতে পারবে?

সীমান্ত রাজনীতির ইতিহাস বলছে, রাজনৈতিক মানচিত্র অনেক সময় কূটনৈতিক অবস্থানের চেয়ে দ্রুত বদলে যায়। মিয়ানমারের চলমান সংঘাত সেই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কিংবা আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; তবে কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য বাস্তব পরিস্থিতিকেও অস্বীকার করা যায় না।

বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন তাই কাঁটাতার নির্মাণ করা হবে কি না—এটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো, সীমান্তের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ যার হাতে, তাকে উপেক্ষা করে সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য, মানবিক সহায়তা এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মতো জটিল বিষয়গুলো কতটা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।

দীর্ঘমেয়াদে সীমান্তের স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক স্থায়িত্ব, কার্যকর শাসনব্যবস্থা, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার ওপর। কারণ সীমান্তে কাঁটাতার নির্মাণ করা তুলনামূলক সহজ; কিন্তু পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নীতিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে কঠিন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

জনপ্রিয় সংবাদ

কমলা-কমলা ঠোঁটের নতুন বানর প্রজাতির সন্ধান কঙ্গোর গভীর বনে

বাংলাদেশ–রাখাইন সীমান্তে বদলে যাওয়া বাস্তবতা: কাঁটাতার নয়, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন

০৫:০৮:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার ২৭০ কিলোমিটার সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরে শুধু দুই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কিংবা কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতা সেই প্রচলিত ধারণাকে দ্রুত অচল করে দিচ্ছে। ঢাকা সীমান্তজুড়ে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, সীমান্ত সড়ক, তাপচিত্র শনাক্তকারী যন্ত্র, সিসিটিভি, নাইট ভিশন প্রযুক্তি ও ড্রোন নজরদারির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এর ঘোষিত উদ্দেশ্য সীমান্ত অপরাধ, মাদক পাচার, অবৈধ অভিবাসন ও আন্তঃদেশীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা।

রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এই উদ্যোগ অস্বাভাবিক নয়। প্রতিটি দেশেরই নিজের সীমান্ত সুরক্ষিত রাখার অধিকার ও দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নে এখন একটি মৌলিক বাস্তবতা সামনে এসেছে—সীমান্তের অপর প্রান্তে আসলে ক্ষমতা কার হাতে? এই প্রশ্নের উত্তর উপেক্ষা করে কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সম্ভব কি?

সীমান্তের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে

বাংলাদেশের পুরো সীমান্ত এখন রাখাইন রাজ্যের মংডু ও বুথিডং অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত। কিন্তু এই এলাকাগুলো আর মিয়ানমারের সামরিক সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণে নেই। বাস্তবে সেখানে প্রশাসনিক ও সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে আরাকান আর্মি (এএ)।

ঢাকা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নেপিদোর সামরিক সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সীমান্তের ওপারে যে শক্তি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটি আর মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার নয়। ফলে সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা, শরণার্থী প্রত্যাবাসন, সীমান্ত বাণিজ্য কিংবা স্থানীয় স্থিতিশীলতার প্রশ্নগুলো আগের মতো শুধু দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

এখানেই বর্তমান সংকটের মূল নিহিত। কূটনৈতিক অবস্থান এক বিষয়, কিন্তু সীমান্ত পরিচালনার বাস্তবতা আরেক বিষয়। এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান যত বাড়বে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনাও তত জটিল হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত সিল, সতর্ক অবস্থানে বিজিবি

নিরাপত্তা শুধু দেয়াল তুলে নিশ্চিত হয় না

কাঁটাতারের বেড়া সীমান্ত অতিক্রমের কিছু পথ সীমিত করতে পারে। কিন্তু কোনো সীমান্তের অস্থিরতার মূল কারণ যদি রাজনৈতিক হয়, তাহলে সেই সমস্যার সমাধান কেবল শারীরিক অবকাঠামো দিয়ে সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ–রাখাইন সীমান্ত এখন সশস্ত্র সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, প্রতিদ্বন্দ্বী শাসনব্যবস্থা, শরণার্থী সংকট এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় সীমান্তের দুই পাশে যাদের হাতে কার্যকর কর্তৃত্ব রয়েছে, তাদের মধ্যে কোনো ধরনের বাস্তবসম্মত সমন্বয় না থাকলে অত্যাধুনিক নজরদারি ব্যবস্থাও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন অমীমাংসিত রেখেও বিভিন্ন সরকার বাস্তব প্রয়োজনে স্থানীয় বা কার্যকর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সীমিত সহযোগিতায় গেছে। যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা কিংবা সীমান্ত সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এমন বাস্তববাদী পদ্ধতি নতুন নয়। বাংলাদেশও এখন তেমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

রোহিঙ্গা সংকট নিরাপত্তার সমীকরণকে আরও জটিল করেছে

বাংলাদেশে এখনো ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি সীমান্ত নিরাপত্তাকে শুধু আন্তর্জাতিক নয়, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যুতেও পরিণত করেছে।

একদিকে সীমান্তে মাদক, মানবপাচার ও অস্ত্র চোরাচালানের ঝুঁকি রয়েছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রশ্নও অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য যে রাজনৈতিক পরিবেশ প্রয়োজন, তা এখনো তৈরি হয়নি।

ফলে সীমান্তে বেড়া নির্মাণ করলেও প্রত্যাবাসনের মূল বাধাগুলো অমীমাংসিতই থেকে যাবে। কারণ শরণার্থীরা কেবল একটি সীমান্ত অতিক্রম করে দেশ ছাড়েনি; তারা যুদ্ধ, নির্যাতন ও অনিরাপত্তা থেকে পালিয়ে এসেছে। সেই কারণগুলো যদি বহাল থাকে, তাহলে অবকাঠামো নির্মাণ দিয়ে সংকটের সমাধান অসম্ভব।

আকাশপথের যুদ্ধ সীমান্তের নতুন বাস্তবতা

রাখাইনের বড় অংশে সামরিক বাহিনী স্থল নিয়ন্ত্রণ হারালেও তারা বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিয়াউকতাও, বুথিডং ও মংডুসহ বিভিন্ন এলাকায় বেসামরিক জনগণের ওপর ধারাবাহিক বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে। এতে প্রাণহানি, আহত হওয়া এবং বসতবাড়ি ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে।

এ ধরনের পরিস্থিতি আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করে—কাঁটাতারের বেড়া কোনো জনগোষ্ঠীকে বিমান হামলা থেকে রক্ষা করতে পারে না। সীমান্তের অবকাঠামো যুদ্ধের মূল কারণ দূর করে না, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করে না। বরং দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন সংঘাত হ্রাস, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং নিরাপদ পরিবেশ।

রাখাইনে হচ্ছে নতুন রাষ্ট্র, সংকটে বাংলাদেশ! - Dhaka Protidin

আঞ্চলিক রাজনীতির নতুন কেন্দ্রবিন্দু

বাংলাদেশ–রাখাইন সীমান্ত এখন কেবল দুই দেশের সীমান্ত নয়; এটি ক্রমেই একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলগত অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে। সীমান্ত বাণিজ্য ধীরে ধীরে পুনরায় চালু হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো সংঘাতপ্রবণ এলাকায় প্রবেশের উপায় খুঁজছে। একই সময়ে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান বের করতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে।

অন্যদিকে সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতিও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে সীমান্তকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এখানে নিরাপত্তা, মানবিক সুরক্ষা, অর্থনীতি এবং ভূরাজনীতি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে।

কূটনীতি কি বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলাতে পারবে?

সীমান্ত রাজনীতির ইতিহাস বলছে, রাজনৈতিক মানচিত্র অনেক সময় কূটনৈতিক অবস্থানের চেয়ে দ্রুত বদলে যায়। মিয়ানমারের চলমান সংঘাত সেই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কিংবা আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; তবে কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য বাস্তব পরিস্থিতিকেও অস্বীকার করা যায় না।

বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন তাই কাঁটাতার নির্মাণ করা হবে কি না—এটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো, সীমান্তের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ যার হাতে, তাকে উপেক্ষা করে সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য, মানবিক সহায়তা এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মতো জটিল বিষয়গুলো কতটা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।

দীর্ঘমেয়াদে সীমান্তের স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক স্থায়িত্ব, কার্যকর শাসনব্যবস্থা, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার ওপর। কারণ সীমান্তে কাঁটাতার নির্মাণ করা তুলনামূলক সহজ; কিন্তু পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নীতিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে কঠিন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।