০১:২০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
ঘুম যত গভীর, তত সুস্থ শরীর ও তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক: নতুন গবেষণায় মিলল গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মেসির বাবার স্বাস্থ্য নিয়ে গুঞ্জন, আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জল্পনা থামানোর আহ্বান পরিবারের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির পরও থামেনি লেবানন যুদ্ধ, হরমুজে তেল চলাচল শুরু হলেও বাড়ছে অনিশ্চয়তা মার্কিন-ইরান চুক্তিতে বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য, উদ্বেগে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো চুয়াডাঙ্গায় ট্রেনের ধাক্কায় মোটরসাইকেল দুমড়েমুচড়ে নিহত ২, গুরুতর আহত ১ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ট্রাক-পিকআপ মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ২ স্মৃতির বোতল, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া গল্প বিশ্বকাপে ফরমেশনের লড়াই: ভিন্ন কৌশলে বাড়তি সুবিধা খুঁজছে দলগুলো যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারককে স্বাগত জানাল চীন, দ্বিতীয় দফা আলোচনায় ইতিবাচক ফলের আশা ইয়েনের রেকর্ড দুর্বলতায় হস্তক্ষেপের শঙ্কা, প্রথমবার ৭১ হাজার ছাড়াল নিক্কেই

স্মৃতির বোতল, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া গল্প

আমি যেন গন্ধগুলোর ফিসফিসানি শুনতে পাই। লবঙ্গ আর দারুচিনির পরিচিত সুবাস, যার সঙ্গে মিশে আছে গোলমরিচ ও ইউক্যালিপটাসের ঝাঁঝালো আভাস, আমাকে ডাকে, টানে। রহস্যময় তেল ও ভেষজের অস্পষ্ট গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়ায়, আর আমি পুরান ঢাকার একটি সরু পাকা গলি ধরে হাঁটি। দুই পাশের উঁচু দেয়াল পথটিকে আড়াল করে রেখেছে। কৌতূহলী চোখ আর অনুসরণ করা মানুষের ভিড়কে আমি উপেক্ষা করি। এই গন্ধের আহ্বান অপ্রতিরোধ্য। সামনে কী আছে তা না জেনেও আমি অদ্ভুতভাবে নির্ভীক বোধ করি।

এগুলো ছিল আমার শৈশবের গন্ধ—গ্রীষ্মের অলস দুপুরে দাদির আলমারির নিষিদ্ধ গভীরে গোপনে ঘুরে বেড়ানোর স্মৃতি। সেই কাঁচের আলমারিতে ওষুধ রাখা থাকত ঝকঝকে কাচের বোতলে, যেগুলোর লেবেল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উঠে যাচ্ছিল।

সরু গলিটি এসে মিশেছে একটি ছোট উঠোনে, যার তিন দিক ঘিরে রয়েছে ভবন। শুক্রবার হওয়ায় সবকিছু বন্ধ। ময়লা জমা জানালার ভেতর দিয়ে আমি দেখতে পাই বিশাল লোহার কড়াই, সোনালি আভা ছড়ানো কাঁসার বড় বড় পাত্র, বিশাল হাতা ও চিমটা। কিছু পাত্র বসানো আছে হাতে তৈরি মাটির চুলার ওপর। এক কোণে স্তূপ করে রাখা কাঠ আর কয়লার বস্তা। কাছেই শুকাতে দেওয়া হয়েছে বড় বড় কাপড়, হয়তো ওষুধ ছেঁকে নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। আধো-অন্ধকারে তাকভর্তি কাচের বোতল আলো প্রতিফলিত করে ঝিকমিক করছে।

দৃশ্যটি যেন কোনো মধ্যযুগীয় রান্নাঘরের নাট্যমঞ্চ, অথচ প্রতিদিনের ব্যবহারের চিহ্ন স্পষ্ট।

উঠোনের চতুর্থ পাশে একটি খোলা দরজা। হঠাৎ এক অদ্ভুত আকর্ষণ আমাকে সেদিকে টেনে নেয়। মনে হয়, দরজার ওপারে কী আছে আমি যেন জানি। কিন্তু কীভাবে? এমন এক শহরে, যা আমার কাছে একসময় সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল, আর যে ভূখণ্ড বিভাজনের গভীর ক্ষত বহন করে চলেছে, সেই পরিচিতির অনুভূতি কোথা থেকে এলো?

দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে চোখ তুলে তাকাতেই দেখি, সামনে একটি বৃহদাকৃতির প্রতিকৃতি। এক স্থূলদেহী ব্যক্তি আসনে পদ্মাসনে বসে আছেন। তাঁর বুকে পবিত্র উপবীত, মাথার চুল তেল মাখা ও যত্নে আঁচড়ানো, গোঁফ পাকানো, পরনে সরু পাড়ের সাদা ধুতি।

এই মুখটি আমি আগে অসংখ্যবার দেখেছি—শৈশবে দাদির ওষুধের আলমারিতে রাখা বোতলগুলোর গায়ে।

আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আমার প্রপিতামহ মথুর মোহন চক্রবর্তী—শক্তি ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুতে ঢাকা, কলকাতা, পাটনা, বারাণসী এবং রেঙ্গুনে এই আয়ুর্বেদিক প্রতিষ্ঠান ছিল সুপরিচিত। আমার পেছনের রান্নাঘরসদৃশ জায়গাটিই ছিল সেই প্রতিষ্ঠানের কারখানা, যেখানে তাঁর উদ্ভাবিত ওষুধ তৈরি হতো।

প্রতিকৃতিটি ঝুলছে সেই মন্দিরের অভ্যন্তরে, যা তিনি উৎসর্গ করেছিলেন বাংলার সাধক লোকনাথ বাবাকে। প্রচলিত কাহিনি বলে, লোকনাথ বাবা তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত শিষ্য—আমার প্রপিতামহ—এর কানে প্রথম ওষুধের গোপন ফর্মুলা ফিসফিস করে বলেছিলেন।

ঢাকায় প্রবাসী হিসেবে আসার পর থেকেই আমি শক্তি ঔষধালয়ের ঠিকানা খুঁজছিলাম। সবাই প্রতিষ্ঠানটির নাম জানত, কিন্তু কেউই তার অবস্থান বলতে পারত না। আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হতো পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে। মানুষ বিস্মিত হতো শুনে যে আমি মথুরবাবুর প্রপৌত্রী। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের অবস্থান সম্পর্কে প্রশ্ন করলে কেবল বিভ্রান্ত দৃষ্টি আর অস্পষ্ট উত্তরই পেতাম।

অনবরত খোঁজখবরের পর অবশেষে আমি পৌঁছাই পুরান ঢাকার স্বামীবাগ রোডে, যেখানে শক্তি ঔষধালয়ের উৎপাদন কেন্দ্র অবস্থিত।

১৯০১ সালে পটুয়াটুলিতে মথুরবাবু প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন। পারিবারিক কাহিনি অনুযায়ী, লোকনাথ বাবার অনুপ্রেরণাতেই তিনি বিক্রমপুরের একজন স্কুলশিক্ষক থেকে উদ্যোক্তায় রূপান্তরিত হন। বাংলা, সংস্কৃত ও ইংরেজি—তিন ভাষায় শিক্ষিত হওয়া সে সময়ে বিরল ছিল।

শুরুটা ছিল খুবই সাধারণ। বাড়ির রান্নাঘরে তৈরি হেয়ার অয়েল ও দাঁতের গুঁড়া তিনি আশপাশে বিক্রি করতেন। কিন্তু তাঁর দূরদর্শী ব্যবসায়িক বুদ্ধি দ্রুত সাফল্য এনে দেয়। কম দামে মানসম্মত আয়ুর্বেদিক ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

তিনি একটি আয়ুর্বেদিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে সংস্কৃত ভাষায় আয়ুর্বেদ ও দর্শন পড়ানো হতো। শিক্ষার্থীরা বিনা খরচে শিক্ষা, থাকা ও খাওয়ার সুবিধা পেত।

ভারতের প্রাচীন চিকিৎসাবিজ্ঞান আয়ুর্বেদের ইতিহাস নিয়ে লেখা বহু বই ও সাময়িকীতে আমার প্রপিতামহের নাম খুঁজে পেয়ে আমি বিস্মিত হই। তিনি ছিলেন প্রথম দিকের উদ্যোক্তাদের একজন, যিনি আয়ুর্বেদিক ওষুধকে বৃহৎ বাজারের জন্য উৎপাদনের পথে নিয়ে যান।

পাশ্চাত্য ওষুধ কোম্পানিগুলো যেভাবে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিত, মথুরবাবুও সেই পদ্ধতি অনুসরণ করেন। ১৯৪০ সালে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপনে স্বাধীনতা সংগ্রামী চিত্তরঞ্জন দাস, ভারতের ভাইসরয় লর্ড লিটন এবং বাংলার গভর্নর লর্ড রোনাল্ডশের প্রশংসাবাণী প্রকাশিত হয়েছিল।

Why do we forget our earliest memories?

লর্ড লিটন লিখেছিলেন, “এই অসাধারণ কারখানাটি দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। এর সাফল্য প্রতিষ্ঠাতার উদ্যম ও উৎসাহের ফল। দেশীয় ওষুধ এত বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন সত্যিই এক বিরাট অর্জন।”

১৯৩৯ সালের ৬ জুন সুভাষচন্দ্র বসুও কারখানা পরিদর্শন করেন। দর্শনার্থী খাতায় তিনি লিখেছিলেন, “শক্তি ঔষধালয়ের সাফল্য মানে সারা দেশে আয়ুর্বেদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি, আর তা মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে সহায়তা করবে।”

ঢাকায় আসার এক বছর পর যখন আমার বাবা-মা আমাদের দেখতে এলেন, আমরা আবার স্বামীবাগে ফিরে যাই। এবার আমরা সেই দোকানেও যাই, যেখানে শক্তি ঔষধালয়ের ওষুধ বিক্রি হয়।

১৯৭১ সালে পাকিস্তান সরকার প্রতিষ্ঠানটি অধিগ্রহণ করলেও পরে এটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে যায়। আজও বাংলাদেশে এর ৩৭টি শাখা রয়েছে।

দোকানের বোতলগুলোতে আর মথুরবাবুর ছবি নেই, কিন্তু ওষুধগুলোর নাম আমার মা এখনো চিনতে পারেন। আমরা দোকানে ঘুরে দেখার সময় মানুষজন তাঁকে ঘিরে ধরে এবং মথুরাবাবুর বংশধর হিসেবে স্বাগত জানায়। তাঁদেরই একজন আমাদের নিয়ে যায় মথুরাবাবুর পুরনো বাড়িতে—পুরান ঢাকার গলির ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক জরাজীর্ণ প্রাসাদে।

সেখানে পৌঁছে মনে হলো, আমি যেন দাদির গল্পের ভেতর হাঁটছি। তিনি যে সিঁড়ির কথা বলতেন, সেই সিঁড়ি। যে খিলানওয়ালা জানালার কথা বলতেন, সেটিও আছে। বিশাল বারান্দা, যেখানে তিনি তাঁর আট ভাইবোনের সঙ্গে খেলতেন।

বাড়িটির বাসিন্দারা এখন অন্য পরিবার। আমি উচ্ছ্বসিত হয়ে জিজ্ঞেস করি, “ইতালি থেকে আনা রঙিন টাইলসগুলো কোথায়?” কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর একটি ভারী আলমারি সরিয়ে সেই টাইলসগুলো দেখানো হলো। বিবর্ণ হলেও এখনো তাদের সৌন্দর্য টিকে আছে।

ধীরে ধীরে আমার উপলব্ধি হয়—দাদির আলমারির সেই নীরব ওষুধের বোতলগুলো আসলে অসংখ্য গল্প ধারণ করে রেখেছিল। তাই আমি আবার খুঁজতে শুরু করি শৈশবের সেই বোতলগুলো। হয়তো সেগুলোর গন্ধ আমাকে স্মৃতির স্তর উন্মোচন করতে সাহায্য করবে, দাদির শেকড় সম্পর্কে অজানা প্রশ্নের উত্তর দেবে।

Memory Bottles: Amazon.co.uk: Shoshan, Beth, Pamment, Katie: 9781904511625: Books

কিন্তু সেসব বোতল সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে।

আমার দাদি ১৯৩৬ সালে ঢাকা ছেড়ে কলকাতায় চলে যান। পরে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় পরিবারের বাকি সদস্যরাও রাতারাতি ঢাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। কারখানা, প্রাসাদ, সম্পদ—সবকিছু পেছনে ফেলে চলে যেতে হয়।

ভারতে নতুন করে ব্যবসা শুরু করার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু মথুরবাবুর নেতৃত্ব ছাড়া তা সফল হয়নি। ধীরে ধীরে শক্তি ঔষধালয়ের ভারতীয় কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কলকাতা, করাচি, কাবুল ও কলম্বোর দোকানগুলোও একে একে ঝাঁপ ফেলে।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অভিবাসন ও পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে আমাদের হাতে রয়ে গেছে কেবল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা স্মৃতি আর খণ্ডিত গল্প। এটাই আজ আমার উত্তরাধিকার।

স্মৃতি, যা গল্পের পুনরাবৃত্ত বর্ণনায় বেঁচে থাকে, আমাদের অতীতের সঙ্গে বর্তমানকে যুক্ত করে। দাদির বলা গল্প, পুরোনো লেবেলের ঝলক, পরিচিত সুগন্ধের ফিসফিসানি—সব মিলিয়ে তারা অতীতের একটি দরজা খুলে দেয়।

সেই গন্ধগুলো যেন এখনও আমাকে ডেকে বলে—

“আমাদের কথা শোনো। আমাদের গল্পটা বলতে দাও।”

জনপ্রিয় সংবাদ

ঘুম যত গভীর, তত সুস্থ শরীর ও তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক: নতুন গবেষণায় মিলল গুরুত্বপূর্ণ সূত্র

স্মৃতির বোতল, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া গল্প

১২:০৫:২১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

আমি যেন গন্ধগুলোর ফিসফিসানি শুনতে পাই। লবঙ্গ আর দারুচিনির পরিচিত সুবাস, যার সঙ্গে মিশে আছে গোলমরিচ ও ইউক্যালিপটাসের ঝাঁঝালো আভাস, আমাকে ডাকে, টানে। রহস্যময় তেল ও ভেষজের অস্পষ্ট গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়ায়, আর আমি পুরান ঢাকার একটি সরু পাকা গলি ধরে হাঁটি। দুই পাশের উঁচু দেয়াল পথটিকে আড়াল করে রেখেছে। কৌতূহলী চোখ আর অনুসরণ করা মানুষের ভিড়কে আমি উপেক্ষা করি। এই গন্ধের আহ্বান অপ্রতিরোধ্য। সামনে কী আছে তা না জেনেও আমি অদ্ভুতভাবে নির্ভীক বোধ করি।

এগুলো ছিল আমার শৈশবের গন্ধ—গ্রীষ্মের অলস দুপুরে দাদির আলমারির নিষিদ্ধ গভীরে গোপনে ঘুরে বেড়ানোর স্মৃতি। সেই কাঁচের আলমারিতে ওষুধ রাখা থাকত ঝকঝকে কাচের বোতলে, যেগুলোর লেবেল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উঠে যাচ্ছিল।

সরু গলিটি এসে মিশেছে একটি ছোট উঠোনে, যার তিন দিক ঘিরে রয়েছে ভবন। শুক্রবার হওয়ায় সবকিছু বন্ধ। ময়লা জমা জানালার ভেতর দিয়ে আমি দেখতে পাই বিশাল লোহার কড়াই, সোনালি আভা ছড়ানো কাঁসার বড় বড় পাত্র, বিশাল হাতা ও চিমটা। কিছু পাত্র বসানো আছে হাতে তৈরি মাটির চুলার ওপর। এক কোণে স্তূপ করে রাখা কাঠ আর কয়লার বস্তা। কাছেই শুকাতে দেওয়া হয়েছে বড় বড় কাপড়, হয়তো ওষুধ ছেঁকে নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। আধো-অন্ধকারে তাকভর্তি কাচের বোতল আলো প্রতিফলিত করে ঝিকমিক করছে।

দৃশ্যটি যেন কোনো মধ্যযুগীয় রান্নাঘরের নাট্যমঞ্চ, অথচ প্রতিদিনের ব্যবহারের চিহ্ন স্পষ্ট।

উঠোনের চতুর্থ পাশে একটি খোলা দরজা। হঠাৎ এক অদ্ভুত আকর্ষণ আমাকে সেদিকে টেনে নেয়। মনে হয়, দরজার ওপারে কী আছে আমি যেন জানি। কিন্তু কীভাবে? এমন এক শহরে, যা আমার কাছে একসময় সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল, আর যে ভূখণ্ড বিভাজনের গভীর ক্ষত বহন করে চলেছে, সেই পরিচিতির অনুভূতি কোথা থেকে এলো?

দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে চোখ তুলে তাকাতেই দেখি, সামনে একটি বৃহদাকৃতির প্রতিকৃতি। এক স্থূলদেহী ব্যক্তি আসনে পদ্মাসনে বসে আছেন। তাঁর বুকে পবিত্র উপবীত, মাথার চুল তেল মাখা ও যত্নে আঁচড়ানো, গোঁফ পাকানো, পরনে সরু পাড়ের সাদা ধুতি।

এই মুখটি আমি আগে অসংখ্যবার দেখেছি—শৈশবে দাদির ওষুধের আলমারিতে রাখা বোতলগুলোর গায়ে।

আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আমার প্রপিতামহ মথুর মোহন চক্রবর্তী—শক্তি ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুতে ঢাকা, কলকাতা, পাটনা, বারাণসী এবং রেঙ্গুনে এই আয়ুর্বেদিক প্রতিষ্ঠান ছিল সুপরিচিত। আমার পেছনের রান্নাঘরসদৃশ জায়গাটিই ছিল সেই প্রতিষ্ঠানের কারখানা, যেখানে তাঁর উদ্ভাবিত ওষুধ তৈরি হতো।

প্রতিকৃতিটি ঝুলছে সেই মন্দিরের অভ্যন্তরে, যা তিনি উৎসর্গ করেছিলেন বাংলার সাধক লোকনাথ বাবাকে। প্রচলিত কাহিনি বলে, লোকনাথ বাবা তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত শিষ্য—আমার প্রপিতামহ—এর কানে প্রথম ওষুধের গোপন ফর্মুলা ফিসফিস করে বলেছিলেন।

ঢাকায় প্রবাসী হিসেবে আসার পর থেকেই আমি শক্তি ঔষধালয়ের ঠিকানা খুঁজছিলাম। সবাই প্রতিষ্ঠানটির নাম জানত, কিন্তু কেউই তার অবস্থান বলতে পারত না। আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হতো পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে। মানুষ বিস্মিত হতো শুনে যে আমি মথুরবাবুর প্রপৌত্রী। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের অবস্থান সম্পর্কে প্রশ্ন করলে কেবল বিভ্রান্ত দৃষ্টি আর অস্পষ্ট উত্তরই পেতাম।

অনবরত খোঁজখবরের পর অবশেষে আমি পৌঁছাই পুরান ঢাকার স্বামীবাগ রোডে, যেখানে শক্তি ঔষধালয়ের উৎপাদন কেন্দ্র অবস্থিত।

১৯০১ সালে পটুয়াটুলিতে মথুরবাবু প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন। পারিবারিক কাহিনি অনুযায়ী, লোকনাথ বাবার অনুপ্রেরণাতেই তিনি বিক্রমপুরের একজন স্কুলশিক্ষক থেকে উদ্যোক্তায় রূপান্তরিত হন। বাংলা, সংস্কৃত ও ইংরেজি—তিন ভাষায় শিক্ষিত হওয়া সে সময়ে বিরল ছিল।

শুরুটা ছিল খুবই সাধারণ। বাড়ির রান্নাঘরে তৈরি হেয়ার অয়েল ও দাঁতের গুঁড়া তিনি আশপাশে বিক্রি করতেন। কিন্তু তাঁর দূরদর্শী ব্যবসায়িক বুদ্ধি দ্রুত সাফল্য এনে দেয়। কম দামে মানসম্মত আয়ুর্বেদিক ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

তিনি একটি আয়ুর্বেদিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে সংস্কৃত ভাষায় আয়ুর্বেদ ও দর্শন পড়ানো হতো। শিক্ষার্থীরা বিনা খরচে শিক্ষা, থাকা ও খাওয়ার সুবিধা পেত।

ভারতের প্রাচীন চিকিৎসাবিজ্ঞান আয়ুর্বেদের ইতিহাস নিয়ে লেখা বহু বই ও সাময়িকীতে আমার প্রপিতামহের নাম খুঁজে পেয়ে আমি বিস্মিত হই। তিনি ছিলেন প্রথম দিকের উদ্যোক্তাদের একজন, যিনি আয়ুর্বেদিক ওষুধকে বৃহৎ বাজারের জন্য উৎপাদনের পথে নিয়ে যান।

পাশ্চাত্য ওষুধ কোম্পানিগুলো যেভাবে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিত, মথুরবাবুও সেই পদ্ধতি অনুসরণ করেন। ১৯৪০ সালে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপনে স্বাধীনতা সংগ্রামী চিত্তরঞ্জন দাস, ভারতের ভাইসরয় লর্ড লিটন এবং বাংলার গভর্নর লর্ড রোনাল্ডশের প্রশংসাবাণী প্রকাশিত হয়েছিল।

Why do we forget our earliest memories?

লর্ড লিটন লিখেছিলেন, “এই অসাধারণ কারখানাটি দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। এর সাফল্য প্রতিষ্ঠাতার উদ্যম ও উৎসাহের ফল। দেশীয় ওষুধ এত বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন সত্যিই এক বিরাট অর্জন।”

১৯৩৯ সালের ৬ জুন সুভাষচন্দ্র বসুও কারখানা পরিদর্শন করেন। দর্শনার্থী খাতায় তিনি লিখেছিলেন, “শক্তি ঔষধালয়ের সাফল্য মানে সারা দেশে আয়ুর্বেদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি, আর তা মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে সহায়তা করবে।”

ঢাকায় আসার এক বছর পর যখন আমার বাবা-মা আমাদের দেখতে এলেন, আমরা আবার স্বামীবাগে ফিরে যাই। এবার আমরা সেই দোকানেও যাই, যেখানে শক্তি ঔষধালয়ের ওষুধ বিক্রি হয়।

১৯৭১ সালে পাকিস্তান সরকার প্রতিষ্ঠানটি অধিগ্রহণ করলেও পরে এটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে যায়। আজও বাংলাদেশে এর ৩৭টি শাখা রয়েছে।

দোকানের বোতলগুলোতে আর মথুরবাবুর ছবি নেই, কিন্তু ওষুধগুলোর নাম আমার মা এখনো চিনতে পারেন। আমরা দোকানে ঘুরে দেখার সময় মানুষজন তাঁকে ঘিরে ধরে এবং মথুরাবাবুর বংশধর হিসেবে স্বাগত জানায়। তাঁদেরই একজন আমাদের নিয়ে যায় মথুরাবাবুর পুরনো বাড়িতে—পুরান ঢাকার গলির ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক জরাজীর্ণ প্রাসাদে।

সেখানে পৌঁছে মনে হলো, আমি যেন দাদির গল্পের ভেতর হাঁটছি। তিনি যে সিঁড়ির কথা বলতেন, সেই সিঁড়ি। যে খিলানওয়ালা জানালার কথা বলতেন, সেটিও আছে। বিশাল বারান্দা, যেখানে তিনি তাঁর আট ভাইবোনের সঙ্গে খেলতেন।

বাড়িটির বাসিন্দারা এখন অন্য পরিবার। আমি উচ্ছ্বসিত হয়ে জিজ্ঞেস করি, “ইতালি থেকে আনা রঙিন টাইলসগুলো কোথায়?” কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর একটি ভারী আলমারি সরিয়ে সেই টাইলসগুলো দেখানো হলো। বিবর্ণ হলেও এখনো তাদের সৌন্দর্য টিকে আছে।

ধীরে ধীরে আমার উপলব্ধি হয়—দাদির আলমারির সেই নীরব ওষুধের বোতলগুলো আসলে অসংখ্য গল্প ধারণ করে রেখেছিল। তাই আমি আবার খুঁজতে শুরু করি শৈশবের সেই বোতলগুলো। হয়তো সেগুলোর গন্ধ আমাকে স্মৃতির স্তর উন্মোচন করতে সাহায্য করবে, দাদির শেকড় সম্পর্কে অজানা প্রশ্নের উত্তর দেবে।

Memory Bottles: Amazon.co.uk: Shoshan, Beth, Pamment, Katie: 9781904511625: Books

কিন্তু সেসব বোতল সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে।

আমার দাদি ১৯৩৬ সালে ঢাকা ছেড়ে কলকাতায় চলে যান। পরে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় পরিবারের বাকি সদস্যরাও রাতারাতি ঢাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। কারখানা, প্রাসাদ, সম্পদ—সবকিছু পেছনে ফেলে চলে যেতে হয়।

ভারতে নতুন করে ব্যবসা শুরু করার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু মথুরবাবুর নেতৃত্ব ছাড়া তা সফল হয়নি। ধীরে ধীরে শক্তি ঔষধালয়ের ভারতীয় কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কলকাতা, করাচি, কাবুল ও কলম্বোর দোকানগুলোও একে একে ঝাঁপ ফেলে।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অভিবাসন ও পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে আমাদের হাতে রয়ে গেছে কেবল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা স্মৃতি আর খণ্ডিত গল্প। এটাই আজ আমার উত্তরাধিকার।

স্মৃতি, যা গল্পের পুনরাবৃত্ত বর্ণনায় বেঁচে থাকে, আমাদের অতীতের সঙ্গে বর্তমানকে যুক্ত করে। দাদির বলা গল্প, পুরোনো লেবেলের ঝলক, পরিচিত সুগন্ধের ফিসফিসানি—সব মিলিয়ে তারা অতীতের একটি দরজা খুলে দেয়।

সেই গন্ধগুলো যেন এখনও আমাকে ডেকে বলে—

“আমাদের কথা শোনো। আমাদের গল্পটা বলতে দাও।”