সমুদ্রের গভীরে এমন এক প্রাণী আছে, যার তৈরি শব্দ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী স্তন্যপায়ী প্রাণীর যোগাযোগধ্বনিগুলোর একটি। বিশাল আকারের শুক্রাণু তিমি বা স্পার্ম তিমির সেই শব্দ এতটাই প্রবল যে অনুকূল সমুদ্র পরিস্থিতিতে তা প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এত জোরে শব্দ করার আসল কারণ এখনো পুরোপুরি জানতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।
নতুন এক গবেষণায় পুরুষ স্পার্ম তিমির বিশেষ ধরনের ‘ধীর ক্লিক’ শব্দ নিয়ে বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। সেশেলস, শ্রীলঙ্কা, নরওয়ে ও স্কটল্যান্ডের সমুদ্র এলাকায় এসব তিমির শব্দ রেকর্ড করেন গবেষকেরা। দেখা গেছে, তারা প্রায় প্রতি ৫ থেকে ১০ সেকেন্ড পরপর এমন এক ধরনের ছন্দময় শব্দ তৈরি করে, যা পানির নিচে প্রায় ২০০ ডেসিবেল পর্যন্ত তীব্র হতে পারে।
আকার যত বড়, শব্দের সুর তত নিচু
স্পার্ম তিমির এই অসাধারণ শব্দ তৈরির পেছনে রয়েছে তাদের বিশাল নাসিকাগহ্বর। এই অঙ্গটির ওজন পাঁচ টনেরও বেশি হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, তিমির দেহ যত বড় হয়, তার তৈরি শব্দের কম্পাঙ্কও তত নিচু হয়।
এ কারণেই বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই শক্তিশালী শব্দ হয়তো শুধু যোগাযোগের জন্য নয়; বরং পুরুষ তিমির নিজের আকার ও শক্তি জানান দেওয়ার একটি উপায়ও হতে পারে।
সহজভাবে বললে, বিষয়টি অনেকটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে কেউ দামি গাড়ির ইঞ্জিন জোরে চালিয়ে আশপাশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো। তিমিও হয়তো সমুদ্রের অন্ধকার জগতে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে এমন প্রচণ্ড শব্দ তৈরি করে।
সঙ্গী আকর্ষণ, নাকি প্রতিদ্বন্দ্বীকে ভয় দেখানো?
গবেষকদের কাছে এখনো সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—পুরুষ স্পার্ম তিমি আসলে কেন এই শব্দ তৈরি করে?
একটি সম্ভাবনা হলো, তারা স্ত্রী তিমিকে আকৃষ্ট করতে এমন শক্তিশালী শব্দ ব্যবহার করে। আরেকটি সম্ভাবনা হলো, আশপাশের অন্য পুরুষ তিমিকে নিজের শক্তি ও উপস্থিতির জানান দেওয়া।
তবে দুই কারণই একসঙ্গে কাজ করতে পারে বলেও মনে করছেন গবেষকেরা। অর্থাৎ একই শব্দ দিয়ে হয়তো সঙ্গীকে আকর্ষণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বীকে সতর্ক—দুই কাজই করা হয়।
সমুদ্রের তলদেশই কি তাদের প্রাকৃতিক তালবাদ্য?

এই শব্দের আরেকটি রহস্য হলো এর প্রায় নিয়মিত ছন্দ। তিমিগুলো কীভাবে এত দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় নির্দিষ্ট ব্যবধানে এই ক্লিক তৈরি করে, সেটিও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
গবেষকদের একটি ধারণা হলো, সমুদ্রের তলদেশ থেকে ফিরে আসা প্রতিধ্বনি তাদের জন্য এক ধরনের প্রাকৃতিক তাল রাখার ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে। অর্থাৎ নিজেদের তৈরি শব্দের প্রতিধ্বনি শুনেই তারা হয়তো পরবর্তী শব্দ তৈরির সময় ঠিক করে নেয়।
এটি সত্য হলে সমুদ্রের বিশাল গভীরতাই যেন তাদের জন্য একটি প্রাকৃতিক বাদ্যযন্ত্রের মতো কাজ করছে।
এটি কি তিমিদের ভাষার অংশ?
গবেষকেরা স্পার্ম তিমির এই শব্দকে যোগাযোগের একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করলেও এখনই এটিকে তিমিদের পূর্ণাঙ্গ ভাষার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছেন না।

কারণ, এই শব্দের মাধ্যমে তারা কী ধরনের তথ্য আদান-প্রদান করে, সে বিষয়ে এখনো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। তারা একে অপরের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট বার্তা বিনিময় করছে, নাকি শুধু নিজের উপস্থিতি, আকার কিংবা শক্তির জানান দিচ্ছে—তা এখনো রহস্য।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—সমুদ্রের নিচে স্পার্ম তিমির জগত আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি জটিল। তাদের কয়েক সেকেন্ড পরপর তৈরি করা সেই প্রচণ্ড শব্দ হয়তো শুধু শব্দ নয়; এর মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে সঙ্গী নির্বাচন, প্রতিদ্বন্দ্বিতার সতর্কবার্তা কিংবা সামাজিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
বিজ্ঞানীরা এখনো সেই রহস্যের পুরো অর্থ উদ্ধার করতে পারেননি। তাই আপাতত সমুদ্রের গভীর অন্ধকারে স্পার্ম তিমির সেই বজ্রকণ্ঠের ডাক আমাদের জন্য রয়ে গেছে এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক রহস্য হিসেবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















