গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো কল্যাণ কর্মসূচি অকার্যকর বা ব্যয়বহুল প্রমাণিত হলেই যে সরকার সেটি সহজে বদলে ফেলতে পারে, বাস্তবতা তেমন নয়। গবেষণা একটি নীতির দুর্বলতা তুলে ধরতে পারে, বিকল্প ব্যবস্থার কার্যকারিতাও প্রমাণ করতে পারে। কিন্তু কোনো কর্মসূচি যখন লাখো মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তখন সেটি কেবল একটি সরকারি প্রকল্প থাকে না; রাজনৈতিক প্রত্যাশা, সামাজিক অধিকার এবং সরকারের জনকল্যাণের প্রতীক হয়ে ওঠে।
ইন্দোনেশিয়ার গত দুই দশকের বেশি সময়ের খাদ্য সহায়তা ব্যবস্থার ইতিহাস এই বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দেশটির অভিজ্ঞতা দেখায়, সংস্কারের জন্য গবেষণা ও প্রমাণ অপরিহার্য হলেও পরিবর্তন বাস্তবে ঘটাতে অনেক সময় রাজনৈতিক পরিস্থিতিই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।
জরুরি কর্মসূচি থেকে দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা
১৯৯৮ সালে ইন্দোনেশিয়া যখন অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন মাত্র নয় সপ্তাহের মধ্যে দরিদ্র মানুষের জন্য চাল বিতরণের একটি জরুরি কর্মসূচি চালু করা হয়। পরিকল্পনাটি ছিল সাময়িক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেটিই রূপ নেয় ‘রাসকিন’ নামে পরিচিত একটি দীর্ঘস্থায়ী ভর্তুকি কর্মসূচিতে।
রাসকিনের লক্ষ্য ছিল সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশ পরিবারের কাছে কম দামে চাল পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু কর্মসূচিটির বাস্তবায়নে নানা দুর্বলতা দেখা দেয়। গবেষণায় বারবার উঠে আসে, অনেক পরিবার তাদের নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম চাল পেয়েছে, কিছু সুবিধা প্রকৃতভাবে যোগ্য নয় এমন পরিবারের মধ্যেও ভাগ হয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিয়ম ছিল।
তাহলে এত সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও কর্মসূচিটি এত বছর টিকে থাকল কেন?
এর উত্তর অর্থনীতির চেয়ে রাজনীতিতে বেশি নিহিত।

লাখো পরিবার যখন একটি কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন কোনো সরকারই সহজে সেই সহায়তা প্রত্যাহারের ঝুঁকি নিতে চায় না। রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী অভিযোগ হতে পারে—সরকার দরিদ্র মানুষের মুখের খাবার কেড়ে নিচ্ছে। ফলে কোনো কর্মসূচির প্রযুক্তিগত দুর্বলতা তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে অটোমেটিকভাবে দুর্বল করে না।
রাসকিনও ধীরে ধীরে এমন একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছিল, যা নিম্নআয়ের মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বের দৃশ্যমান প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হতো।
তাই বছরের পর বছর গবেষণায় দুর্বলতা চিহ্নিত হলেও সংস্কারের জন্য শুধু আরও প্রমাণ যথেষ্ট ছিল না।
দরকার ছিল রাজনৈতিক সুযোগের।
সংস্কারের আগে প্রস্তুতির দীর্ঘ পথ
২০১৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সেই রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করে। তখন ভর্তুকি দিয়ে চাল দেওয়ার পুরোনো ব্যবস্থার পরিবর্তে ডিজিটাল নগদ সহায়তা বা ‘নন-ক্যাশ ফুড অ্যাসিস্ট্যান্স’ বা বিপিএনটি চালুর পথ তৈরি হয়।
তবে এই পরিবর্তন হঠাৎ করে আসেনি। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ সময়ের গবেষণা, পরীক্ষামূলক উদ্যোগ এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি।
দারিদ্র্য হ্রাস ত্বরান্বিত করার জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও নীতি সংস্কারকরা বহু বছর ধরে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি, পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবং মূল্যায়নের কাজ করেছিলেন। তাঁদের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য ও গবেষণালব্ধ প্রমাণ ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সমর্থনের অভাব ছিল বড় বাধা।
সংস্কারের ভিত্তি তৈরিতে আগের কয়েকটি উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৩ সালে সামাজিক সুরক্ষা কার্ড চালুর মাধ্যমে উপকারভোগীদের শনাক্তকরণ ও লক্ষ্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া উন্নত করা হয়। পাশাপাশি উপকারভোগীদের তথ্যভাণ্ডার শক্তিশালী করা, ডিজিটাল মাধ্যমে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পদ্ধতি পরীক্ষা এবং বিকল্প নীতির কার্যকারিতা যাচাই করা হয়।
ফলে যখন রাজনৈতিক পরিবেশ পরিবর্তিত হলো, তখন সংস্কারকদের শূন্য থেকে শুরু করতে হয়নি। প্রয়োজনীয় বিকল্প ইতিমধ্যেই প্রস্তুত ছিল।
এখানেই ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতার বড় শিক্ষা: রাজনৈতিক সুযোগ আসার পর সংস্কারের পরিকল্পনা করলে অনেক দেরি হয়ে যায়। প্রস্তুতি নিতে হয় তার বহু আগে।
প্রতিশ্রুতি বদলায়নি, বদলেছে পদ্ধতি
রাসকিন থেকে বিপিএনটিতে পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—সরকার মানুষের প্রতি মূল প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করেনি।
সহায়তার ধরন বদলেছে, কিন্তু খাদ্য সহায়তার মূল ধারণা বজায় রাখা হয়েছে। ডিজিটাল সুবিধার মাধ্যমে উপকারভোগীরা চালসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কিনতে পেরেছেন।
এই কৌশল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
সংস্কারের বিরোধিতায় সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হতে পারত—সরকার দরিদ্র মানুষের পাশে থাকা বন্ধ করে দিচ্ছে। কিন্তু মূল সামাজিক প্রতিশ্রুতি অক্ষুণ্ন রেখে যখন সহায়তা পৌঁছানোর পদ্ধতি বদলানো হলো, তখন সেই সমালোচনার শক্তি অনেকটাই কমে গেল।
অর্থাৎ, সরকার মানুষের জন্য কী করছে—এই প্রশ্নের উত্তর একই রেখে কীভাবে করছে—সেটি পরিবর্তন করা হয়েছিল।
এর ফলে একই ধরনের পরিবারকে আরও দক্ষতার সঙ্গে সহায়তা দেওয়া, অপচয় ও অনিয়ম কমানো এবং উপকারভোগীদের পছন্দের সুযোগ বাড়ানো সম্ভব হয়। রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য থেকেও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় উন্নতি আনা যায়।
এটাই হয়তো গণতান্ত্রিক সংস্কারের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথগুলোর একটি।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একই সংকট
ইন্দোনেশিয়ার এই অভিজ্ঞতা একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জ্বালানি ভর্তুকি, কৃষি সহায়তা এবং সামাজিক সুরক্ষার নানা কর্মসূচি বছরের পর বছর টিকে আছে, যদিও গবেষণায় সেগুলোর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে।
কারণ সরকারগুলো শুধু অর্থনৈতিক দক্ষতার হিসাব করে সিদ্ধান্ত নেয় না। তাদের বিবেচনায় থাকে ভোটারদের প্রত্যাশা, সুবিধাভোগীদের প্রতিক্রিয়া এবং বিরোধীদের রাজনৈতিক প্রচারণার ঝুঁকি।
একটি কর্মসূচি যত দীর্ঘ সময় ধরে চলে, তার সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশাও তত গভীর হয়। ফলে সংস্কার যত জরুরি হয়ে ওঠে, রাজনৈতিকভাবে তা তত কঠিন হতে পারে।
এ কারণে নীতি সংস্কারকদের একই সঙ্গে দুটি কাজ করতে হয়। রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল সময়ে তাদের গবেষণা করতে হবে, বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং সম্ভাব্য অংশীদারদের সঙ্গে সমর্থনের ভিত্তি তৈরি করতে হবে।
তারপর যখন নির্বাচন, নেতৃত্ব পরিবর্তন বা অন্য কোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি সংস্কারের সুযোগ তৈরি করবে, তখন দ্রুত সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।
অর্থাৎ, সংস্কারের বিষয়বস্তুর মতো তার সময়ও গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন পরীক্ষার মুখে ইন্দোনেশিয়া
ইন্দোনেশিয়ার খাদ্য সহায়তা ব্যবস্থা পরবর্তী সময়ে আরও পরিবর্তিত হয়েছে। বিপিএনটি থেকে ‘প্রোগ্রাম সেমবাকো’তে রূপান্তরের মাধ্যমে উপকারভোগীদের জন্য খাদ্যপণ্যের পরিধি বাড়ানো হয়েছে এবং পুষ্টির বিষয়টিও আরও গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে এসব পরিবর্তন দেখিয়েছে, কোনো সংস্কার একবার করলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না। বাস্তবায়নের সমস্যা থেকে যেতে পারে এবং নীতিকে সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হয়।
এই অভিজ্ঞতা এখন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইন্দোনেশিয়া আরেকটি বড় সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে—বিনামূল্যের পুষ্টিকর খাবার কর্মসূচি। বর্তমান সরকার ২০২৫ সালে এটি চালু করে।

এই কর্মসূচির রাজনৈতিক আবেদন শক্তিশালী। কিন্তু দ্রুত বড় পরিসরে বাস্তবায়নের পাশাপাশি এর মূল্যায়ন ব্যবস্থা এখনও বিকশিত হচ্ছে এবং বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিয়ে বিতর্কও রয়েছে।
এখানেই পুরোনো অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন।
কোনো জনপ্রিয় কর্মসূচি দ্রুত বড় আকারে চালু করার পর যদি তার ফলাফল পরিমাপ, জবাবদিহি এবং ভুল সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি না হয়, তাহলে পরে সেই কর্মসূচি পরিবর্তন করা আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে। কারণ তখন কর্মসূচিটি শুধু একটি নীতি নয়, রাজনৈতিক অঙ্গীকারে পরিণত হয়।
গণতন্ত্র কি সংস্কারের বাধা, নাকি সুযোগ?
গণতন্ত্র ও উন্নয়নকে অনেক সময় পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখা হয়। যুক্তিটি হলো, নির্বাচিত সরকার তাৎক্ষণিক জনসমর্থন পাওয়ার মতো সুবিধা দিতে বেশি আগ্রহী হবে, অথচ দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের সুফল পেতে সময় লাগে।
ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা এই ধারণাকে পুরোপুরি সমর্থন করে না।
গণতান্ত্রিক রাজনীতি অবশ্যই কিছু অকার্যকর কর্মসূচিকে টিকিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু একই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া আবার সংস্কারের সুযোগও তৈরি করতে পারে। নির্বাচন বা নেতৃত্বের পরিবর্তন পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণ ভেঙে দিতে পারে, নতুন জোট তৈরি করতে পারে এবং বহু বছর ধরে প্রস্তুত করা নীতিকে বাস্তবে প্রয়োগের সুযোগ এনে দিতে পারে।
প্রশ্ন হলো, সেই মুহূর্তে সংস্কারকরা প্রস্তুত কি না।
গবেষণা ছাড়া টেকসই সংস্কার সম্ভব নয়। কিন্তু রাজনৈতিক সমর্থন ছাড়া গবেষণাও অনেক সময় নীতির কাগজেই আটকে থাকে। তাই সাফল্যের জন্য প্রয়োজন দুটির সমন্বয়—প্রমাণভিত্তিক নীতি এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যদি একই সঙ্গে অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক সুরক্ষা এবং জবাবদিহিমূলক শাসন নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে শুধু ভালো নীতি তৈরিই যথেষ্ট নয়। সেই নীতি বাস্তবায়নের প্রশাসনিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক জোট এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিও আগে থেকেই তৈরি করতে হবে।
কারণ রাজনীতিতে সংস্কারের সুযোগ সব সময় আসে না। আর যখন আসে, তখন প্রস্তুতিহীন সরকার বা নীতি সংস্কারকরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন না।
ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা তাই একটি সরল বার্তা দেয়: ভালো নীতি তৈরি করা যেমন জরুরি, তেমনি কখন সেটি বাস্তবায়নের রাজনৈতিক মুহূর্ত এসেছে—তা চিনতে পারাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















