মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য সম্ভবত এটাই—আমরা বেঁচে থাকার জন্য এত ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে বেঁচে থাকাটাই আর হয়ে ওঠে না। প্রতিদিনের শুরু হয় উদ্বেগ দিয়ে, শেষ হয় ক্লান্তি দিয়ে। আয়ের হিসাব, ঋণের কিস্তি, পদোন্নতির লড়াই, বড় বাড়ি, নতুন গাড়ি, সামাজিক মর্যাদা, অন্যের চেয়ে এগিয়ে থাকার অদৃশ্য প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে জীবন যেন এক অবিরাম দৌড়। কিন্তু এই দৌড়ের শেষ কোথায়, সেই প্রশ্নটি করার অবকাশ আমরা নিজেদেরই দিই না।
আমরা ধরে নিই, সময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে। অথচ বাস্তবতা ঠিক উল্টো। সময় নয়, আমরা নিজেরাই নিরন্তর এগিয়ে যাচ্ছি এমন এক গন্তব্যের দিকে, যেখান থেকে আর ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই।
মহাকাশের যাত্রী, অথচ নিজেদের স্থায়ী বাসিন্দা ভাবি
মানুষ জমি নিয়ে বিবাদ করে, সীমান্ত টানে, মামলা করে, সম্পর্ক নষ্ট করে। যেন এই পৃথিবী চিরকাল তার দখলেই থাকবে। অথচ বিজ্ঞান আমাদের অন্য গল্প শোনায়। পৃথিবী নিজেই সূর্যকে কেন্দ্র করে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলছে। এই গ্রহে থাকা প্রত্যেক মানুষ, ধনী-গরিব, ক্ষমতাবান-ক্ষমতাহীন, বন্ধু-শত্রু—সবাই একই যাত্রার সহযাত্রী।
আমরা হয়তো অফিসে বসে আছি, কেউ হাসপাতালের বিছানায়, কেউ আবার উৎসবের আনন্দে। কিন্তু আমাদের কারও যাত্রাপথ আলাদা নয়। প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের জীবনের ভাণ্ডার থেকে কিছু সময় কমিয়ে দিচ্ছে। আমরা যতই স্থায়িত্বের স্বপ্ন দেখি না কেন, আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তিই অস্থায়িত্বের ওপর দাঁড়িয়ে।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আসে—যা এত দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তাকে ঘিরে এত অহংকার, এত লোভ, এত সংঘাতের মানে কী?
নিজের শরীরও যার নিজের নয়
মানুষ নিজের শরীরকে সবচেয়ে আপন বলে মনে করে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা সৌন্দর্য ধরে রাখতে চাই, তারুণ্যকে দীর্ঘায়িত করতে চাই। কিন্তু সময়ের কাছে এই চাওয়ার কোনো মূল্য নেই। শিশুকালের মুখ কোথায় হারিয়ে যায়, কেউ বলতে পারে না। একসময়ের শক্তিশালী দেহ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়, চুল পাকে, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়, রোগ শরীরকে গ্রাস করে।
অর্থ, প্রভাব কিংবা প্রযুক্তি—কিছুই এই পরিবর্তন থামাতে পারে না।
এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা কেবল বাইরের জগত নয়, নিজের শরীরেরও পূর্ণ মালিক নই। যেটিকে ‘আমি’ বলে এত যত্নে আগলে রাখি, সেটিও সময়ের নিয়মে একদিন আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে।
জন্মের আগে ছিল না কোনো বিভাজন
মানুষ পৃথিবীতে আসার আগে কোনো ধর্ম, জাতি, ভাষা, দল বা শ্রেণির পরিচয় নিয়ে আসে না। জন্মের পর সমাজ তাকে একের পর এক পরিচয়ের পোশাক পরিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, এই পরিচয়ই তার প্রকৃত সত্তা।
এরপর শুরু হয় বিভাজন। ‘আমি’ আর ‘অন্য’—এই রেখাটি যত গাঢ় হয়, ততই জন্ম নেয় প্রতিযোগিতা, ঈর্ষা, বিদ্বেষ এবং প্রতিশোধের মানসিকতা।
কিন্তু যদি একটু গভীরভাবে দেখা যায়, তবে বোঝা যাবে, এই পরিচয়গুলো মানুষের সৃষ্টি; প্রকৃতির নয়। মানুষ পৃথিবীতে আসে মানুষ হিসেবেই। পরে সে নিজেকে নানা গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে কল্পনা করে এবং সেই কল্পনাকেই বাস্তবতার চেয়েও বড় করে তোলে।

অহংকারের আড়ালে যে দান, তা কি সত্যিই দান?
অনেকে মনে করেন, বিপুল অর্থ ব্যয় করে বড় বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান, দাতব্য কাজ কিংবা সামাজিক উদ্যোগ নিলেই জীবনের ভুলগুলো মুছে যাবে। কিন্তু দানের ভেতরে যদি আত্মপ্রদর্শনের বাসনা লুকিয়ে থাকে, তবে তার আধ্যাত্মিক মূল্য কতটা?
সত্যিকারের মহত্ত্বের জন্য বড় সম্পদের দরকার হয় না। প্রয়োজন হয় বড় মনের।
কেউ অপমান করলে প্রতিশোধ না নেওয়া, রাগের মুহূর্তে সংযম দেখানো, পরিবারের সদস্যদের প্রতি দায়িত্ব ভালোবাসা দিয়ে পালন করা, অন্যের কষ্ট বুঝতে শেখা কিংবা ক্ষণস্থায়ী জীবনের সত্য মেনে নিয়ে অহংকার কমিয়ে আনা—এসবের জন্য অর্থ লাগে না। কিন্তু এগুলোই মানুষের চরিত্রকে সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ করে।
শান্তির শুরু বাইরে নয়, মানুষের ভেতরে।
সবাইকে বদলে দিতে চাওয়ার ক্লান্তি
মানুষের আরেকটি গভীর আসক্তি হলো অন্যদের বদলে দেওয়ার চেষ্টা। আমরা ভাবি, সমাজকে ঠিক করতে হবে, পরিবারকে নিজের মতো গড়ে তুলতে হবে, সন্তানকে নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের মাধ্যম বানাতে হবে, জীবনসঙ্গীকে নিজের মানসিক কাঠামোর মধ্যে বন্দী রাখতে হবে।
কিন্তু প্রতিটি মানুষ নিজস্ব অভিজ্ঞতা, চিন্তা ও যাত্রাপথ নিয়ে বেঁচে থাকে। কাউকে ভালোবাসা আর কাউকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা—দুইটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
ইতিহাসও দেখায়, কোনো সভ্যতা, সংস্কৃতি বা মূল্যবোধ স্থায়ী নয়। একসময় যে সাম্রাজ্য নিজেদের অপরাজেয় ভাবত, আজ তারা কেবল প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। যে নীতির জন্য মানুষ যুদ্ধ করেছে, প্রাণ দিয়েছে, সেগুলোর অনেকই সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে।
তাহলে অন্যের জীবনকে নিজের ইচ্ছামতো গড়ে তোলার জেদ কি শেষ পর্যন্ত নিজের কষ্টই বাড়ায় না?
বর্তমান মুহূর্তই একমাত্র বাস্তব
মানুষ ভবিষ্যতের জন্য এত পরিকল্পনা করে যে বর্তমানকে হারিয়ে ফেলে। সুখকে আগামী দিনের কোনো অর্জনের সঙ্গে বেঁধে রাখে। কিন্তু আগামী কখনও নিশ্চিত নয়।
জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য কোনো দূরবর্তী স্বপ্নে নয়; আছে এই মুহূর্তে। আজ যাদের পাশে থাকার সুযোগ আছে, তাদের প্রতি মমতা প্রকাশ করার মধ্যেই জীবনের অর্থ। ক্ষমা করার সুযোগ থাকলে আজই করা উচিত। ভালোবাসা প্রকাশ করার সময় থাকলে সেটিও এখনই।
কারণ মৃত্যু কখন দরজায় কড়া নাড়বে, তা কেউ জানে না।
শেষ পর্যন্ত মানুষের সঙ্গে যায় না তার ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তির দলিল, পদবি কিংবা সামাজিক মর্যাদা। থেকে যায় কেবল তার ব্যবহার, তার মানবিকতা এবং সে অন্য মানুষের জীবনে কতটা আলো ছড়াতে পেরেছিল সেই স্মৃতি।
হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরও দ্রুত দৌড়ানো নয়; বরং কিছুক্ষণের জন্য থেমে নিজের জীবনের দিকে তাকানো। কারণ জীবনকে প্রস্তুত করতে গিয়ে যদি জীবনটাই শেষ হয়ে যায়, তবে সেই প্রস্তুতির কোনো অর্থ থাকে না।
রাজাকীয়া পণ্ডিত ভিক্ষু নিলাম্বা কমলাজীব 

















