ভূমধ্যসাগরের নীল জলের গভীরে যেন হঠাৎ খুলে গেছে ইতিহাসের এক হারানো দরজা। ইতালির সিসিলি দ্বীপের উপকূলে সন্ধান মিলেছে দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো একটি রোমান বাণিজ্যিক জাহাজের ধ্বংসাবশেষের। জাহাজটির ভেতর ও আশপাশে পাওয়া গেছে শত শত অক্ষত প্রাচীন মাটির পাত্র, যেগুলোতে একসময় মদ, জলপাই তেল ও শস্যের মতো পণ্য বহন করা হতো।
ইতালির সংস্কৃতিমন্ত্রী আলেসান্দ্রো জিউলি এই আবিষ্কারকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
জেলের ইঙ্গিতেই মিলল হারানো জাহাজ
সিসিলির মাজারা দেল ভাল্লোর কাছে সমুদ্রের প্রায় ৪৬ মিটার গভীরে জাহাজটির সন্ধান পাওয়া যায়। স্থানীয় জেলেদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের পর ইতালির বিশেষ প্রশিক্ষিত পুলিশ ডুবুরিরা সেখানে অভিযান চালান।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২১ মিটার এবং প্রস্থ প্রায় ৬ মিটার। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, এটি খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় অথবা প্রথম শতকের কোনো এক সময়ে সমুদ্রে ডুবে যায়।

এই আবিষ্কারের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে জেলে ও মুক্ত-ডুবুরি জিয়াকোমো দে মোলার। সমুদ্রতলের জরিপের সময় তাঁর যন্ত্রে একটি বড় পাথরের মতো কিছু ধরা পড়ে। কৌতূহল থেকে তিনি সেটির কাছে ডুব দেন। কাছে গিয়ে বুঝতে পারেন, সেটি কোনো পাথর নয়—বরং বহু শতাব্দী ধরে সমুদ্রের তলায় পড়ে থাকা একটি প্রাচীন জাহাজ।
পাথর ভেবে কাছে গিয়ে দেখলেন ইতিহাস
জিয়াকোমো দে মোলা জানিয়েছেন, জাহাজটির কাছে পৌঁছানোর পর তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে অসংখ্য প্রাচীন পাত্র। এসব পাত্রকে প্রাচীনকালে পণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা হতো।
বিশেষজ্ঞদের কাছে এসব পাত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাত্রগুলোর ধরন, নির্মাণশৈলী এবং অবস্থান বিশ্লেষণ করে জাহাজটির সময়কাল, বাণিজ্যিক পথ এবং সে সময়ের সমুদ্রবাণিজ্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
জিয়াকোমোর কাছে এটি শুধু একটি পুরোনো জাহাজের সন্ধান নয়। প্রায় দুই হাজার বছর পর সমুদ্রের নিচে সেই জায়গায় প্রথম কয়েকজন মানুষের একজন হিসেবে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে অসাধারণ।
সমুদ্রের নিচে এখনো জীবন্ত এক ইতিহাস

আবিষ্কারের ভিডিওতে দেখা গেছে, জাহাজের ধ্বংসাবশেষ ও প্রাচীন পাত্রগুলোর চারপাশে সামুদ্রিক প্রাণীর বিচরণ। সেখানে রয়েছে সামুদ্রিক ঈল, বিভিন্ন ধরনের মাছ এবং অসংখ্য ছোট-বড় জলজ প্রাণী।
শত শত বছর ধরে সমুদ্রের তলায় পড়ে থাকা জাহাজটি ধীরে ধীরে সামুদ্রিক জীবনের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। ফলে এটি একই সঙ্গে প্রত্নতাত্ত্বিক এবং প্রাকৃতিক ইতিহাসেরও এক অনন্য নিদর্শন হয়ে উঠেছে।
নিরাপত্তার আওতায় প্রাচীন জাহাজ
জাহাজটির সন্ধান পাওয়ার পর ইতালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষা বিভাগের বিশেষজ্ঞ ডুবুরিদের ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। ধ্বংসাবশেষটি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় বা অবৈধভাবে কোনো নিদর্শন সরিয়ে নেওয়া না যায়, সে জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা এখন জাহাজটির গঠন, পাত্রগুলোর ধরন এবং বহন করা পণ্যের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করবেন। এসব গবেষণার মাধ্যমে প্রাচীন রোমের বাণিজ্যিক যোগাযোগ, সমুদ্রপথ এবং ভূমধ্যসাগরীয় অর্থনীতির আরও কিছু অজানা তথ্য সামনে আসতে পারে।
ভূমধ্যসাগরের তলায় লুকিয়ে আছে আরও ইতিহাস
প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে ভূমধ্যসাগরের তলদেশ দীর্ঘদিন ধরেই এক বিশাল ইতিহাসের ভাণ্ডার। প্রাচীন যুগে এই সমুদ্র ছিল ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান পথ। ঝড়, সংঘর্ষ, নৌযান দুর্ঘটনা কিংবা অতিরিক্ত পণ্যবোঝাইয়ের কারণে বহু জাহাজ এই সমুদ্রের গভীরে হারিয়ে গেছে।
২০২৩ সালে রোমের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্রেও খ্রিস্টপূর্ব প্রথম অথবা দ্বিতীয় শতকের একটি জাহাজের সন্ধান পাওয়া যায়। সেটিও শত শত প্রাচীন মাটির পাত্রে ভর্তি ছিল।
এর আগে ২০১৮ সালে বুলগেরিয়ার উপকূলের কাছে ২ হাজার ৪০০ বছরেরও বেশি পুরোনো একটি গ্রিক বাণিজ্যিক জাহাজের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। তখন সেটিকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন অক্ষত জাহাজের ধ্বংসাবশেষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
সিসিলির উপকূলে নতুন এই আবিষ্কার তাই শুধু একটি ডুবে যাওয়া জাহাজের গল্প নয়। এটি প্রায় দুই হাজার বছর আগের মানুষের জীবন, বাণিজ্য, যাতায়াত ও সমুদ্রযাত্রার এক নীরব সাক্ষ্য। সমুদ্রের অন্ধকারে এতদিন লুকিয়ে থাকা এই জাহাজ এখন গবেষকদের হাতে তুলে দিচ্ছে হারিয়ে যাওয়া এক যুগের নতুন সূত্র।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















