গর্ভাবস্থায় মায়ের রক্তস্বল্পতা থাকলে তার প্রভাব শুধু মায়ের শরীরেই সীমাবদ্ধ থাকে না, অনাগত শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশেও এর প্রভাব পড়তে পারে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তস্বল্পতায় ভোগা মায়েদের সন্তানদের মস্তিষ্কের মোট আয়তন তুলনামূলকভাবে ছোট হতে পারে। বিশেষ করে নড়াচড়া, শেখার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও চিন্তাশক্তির সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশে এই পার্থক্য দেখা গেছে।
গবেষকদের আশঙ্কা, শিশুর এক বছর বয়সেই শনাক্ত হওয়া এসব পার্থক্য পরবর্তী সময়ে তার শেখার ক্ষমতা ও জ্ঞানীয় বিকাশে সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
গর্ভবতী নারীদের বড় একটি অংশ রক্তস্বল্পতায় ভোগেন
বিশ্বজুড়ে গর্ভবতী নারীদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত। সাধারণত শরীরে আয়রনের ঘাটতি থেকে এই সমস্যা দেখা দেয়। এতে রক্তে লোহিত রক্তকণিকার পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যায়। ফলে ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট ও মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
আফ্রিকার সাহারা-দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণ এশিয়ায় গর্ভবতী নারীদের মধ্যে রক্তস্বল্পতার হার তুলনামূলকভাবে বেশি।

তিন শতাধিক মা ও শিশুকে পর্যবেক্ষণ
যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডন ও দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা কেপটাউনে তিন শতাধিক মা ও তাদের সন্তানকে নিয়ে গবেষণাটি পরিচালনা করেন। শিশুদের তিন মাস বয়স থেকে দুই বছর বয়স পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মস্তিষ্কের ছবি নেওয়া হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত মায়েদের সন্তানদের মস্তিষ্কের মোট আয়তন গড়ে অন্যান্য শিশুদের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ কম। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গবেষণায় অংশ নেওয়া মায়েদের রক্তস্বল্পতা গুরুতর ছিল না; তাদের ক্ষেত্রে হালকা মাত্রার রক্তস্বল্পতা শনাক্ত হয়েছিল।
মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ তিন অংশে পার্থক্য
গবেষকেরা মস্তিষ্কের তিনটি নির্দিষ্ট অংশে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পেয়েছেন। এগুলো হলো পুটামেন, কডেট নিউক্লিয়াস এবং করপাস ক্যালোসাম।
এই অংশগুলো শরীরের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ, তথ্য প্রক্রিয়াকরণের গতি, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া ও পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ মানসিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত।
গবেষণার প্রধান লেখক জেসিকা রিংশ বলেন, এসব পার্থক্য সময়ের সঙ্গে কমে যাওয়ার পরিবর্তে শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে আরও স্পষ্ট হতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে ব্যবধান আরও বেড়েছে
গবেষণার অন্যতম উদ্বেগজনক দিক হলো, শিশুদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের আয়তনের পার্থক্য আরও বেড়েছে।
যেমন, করপাস ক্যালোসামের আয়তন রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত মায়েদের সন্তানদের ক্ষেত্রে ১২ মাস বয়সে প্রায় ৪ শতাংশ কম ছিল। দুই বছর বয়সে এই ব্যবধান বেড়ে প্রায় ৬ শতাংশে পৌঁছায়।
দক্ষিণ আফ্রিকায় আগে পরিচালিত কিছু গবেষণাতেও ছোট শিশু ও স্কুলপড়ুয়া শিশুদের মস্তিষ্কের আয়তনে একই ধরনের পার্থক্যের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল।
স্কুলে গিয়ে প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে
গবেষকদের মতে, মস্তিষ্কের এই পার্থক্য শিশুর শৈশবেই অদৃশ্য হয়ে যায়—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং বয়স বাড়ার পরও এর উপস্থিতি থাকতে পারে।
ফলে শিশুরা স্কুলে যাওয়ার বয়সে পৌঁছালে শেখা, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, মনোযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা আবেগ নিয়ন্ত্রণের মতো ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
গবেষকদের ধারণা, এর মাধ্যমে মায়েদের রক্তস্বল্পতার সঙ্গে সন্তানদের বিকাশগত পরীক্ষায় তুলনামূলক কম ফল করার বিষয়টির একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যাও পাওয়া যাচ্ছে।
শুধু অপুষ্টি নয়, সংক্রমণও গুরুত্বপূর্ণ
গবেষকেরা বলছেন, রক্তস্বল্পতার কারণ সবসময় শুধু আয়রনের ঘাটতি নয়। বিভিন্ন সংক্রামক রোগও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণায় এইচআইভিতে আক্রান্ত নারীদের মধ্যে রক্তস্বল্পতার হার বেশি দেখা গেছে। তাই শুধু আয়রন সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন অনুযায়ী সংক্রমণের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনাও একই সঙ্গে নিশ্চিত করা জরুরি।
গর্ভাবস্থায় রক্তস্বল্পতা শনাক্ত করার ওপর জোর
গবেষণার ফলাফল নারীদের প্রজনন বয়স থেকেই রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় নিয়মিত রক্তস্বল্পতা ও আয়রনের ঘাটতি পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকেরা।
প্রয়োজন অনুযায়ী মুখে খাওয়ার আয়রন কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শে শিরায় আয়রন দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও রক্তস্বল্পতার হার কমানোকে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে। তবে গত দুই দশকে এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি অনেকটাই থেমে গেছে।
গবেষকদের মতে, এখন রক্তস্বল্পতা মোকাবিলাকে আরও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি, যাতে শিশুরা শুধু জন্মের পর বেঁচে থাকাই নয়, সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগও পায়।

কম খরচের মস্তিষ্ক পরীক্ষা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে
গবেষণাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এতে প্রচলিত ব্যয়বহুল মস্তিষ্কের চৌম্বকীয় ছবি তোলার যন্ত্রের পাশাপাশি নতুন ধরনের কম শক্তির ও সহজে বহনযোগ্য যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, তুলনামূলক কম শক্তির এই যন্ত্র দিয়েও রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত মায়েদের সন্তানদের মস্তিষ্কে একই ধরনের পার্থক্য শনাক্ত করা সম্ভব।
গবেষকদের মতে, প্রত্যন্ত ও সীমিত চিকিৎসাসুবিধার এলাকাতেও ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন কর্মসূচি কতটা কার্যকর হচ্ছে, তার প্রভাবও দ্রুত মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
গর্ভাবস্থায় রক্তস্বল্পতা শুধু মায়ের শারীরিক দুর্বলতার বিষয় নয়; সন্তানের মস্তিষ্কের বিকাশের সঙ্গেও এর সম্ভাব্য সম্পর্ক রয়েছে বলে নতুন এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















