চালকবিহীন গাড়ি নিয়ে নিরাপত্তার বিতর্কের মধ্যেই নতুন তথ্য প্রকাশ করেছে মার্কিন স্বয়ংক্রিয় গাড়ি নির্মাতা ওয়েমো। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের চালকবিহীন গাড়ি মানুষের চালানো গাড়ির তুলনায় অনেক কম দুর্ঘটনায় জড়াচ্ছে এবং দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
ওয়েমো জানিয়েছে, চলতি বছরের জুনের শেষ পর্যন্ত আটলান্টা, অস্টিন, ফিনিক্স, লস অ্যাঞ্জেলেস এবং সান ফ্রান্সিসকো-বেই এরিয়ায় তাদের চালকবিহীন গাড়ি মোট ২৭ কোটি ১০ লাখ মাইল চলেছে। আগের নিরাপত্তা প্রতিবেদনের তুলনায় এবার আরও ৫ কোটি মাইলের তথ্য যুক্ত হয়েছে।
ওয়েমোর হিসাবে, এই দূরত্ব মানুষের গাড়ি চালানোর প্রায় ৩০০ জীবদ্দশার সমান। তবে যুক্তরাষ্ট্রে মানুষ প্রতিবছর প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন মাইল গাড়ি চালায়। সেই তুলনায় ওয়েমোর সংগৃহীত ২৭১ মিলিয়ন মাইল এখনও খুব ছোট একটি নমুনা। ফলে মানুষের চালানো গাড়ির সঙ্গে চালকবিহীন গাড়ির নিরাপত্তা তুলনায় তথ্যের পরিমাণ ও পরিস্থিতির পার্থক্যও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
আঘাতের দুর্ঘটনা ৮২ শতাংশ কম
ওয়েমোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মানুষের চালানো গাড়ির তুলনায় তাদের চালকবিহীন গাড়িতে আঘাতজনিত দুর্ঘটনা ৮২ শতাংশ কম ঘটেছে। গুরুতর আহত বা তার চেয়েও ভয়াবহ পরিণতি তৈরি করা দুর্ঘটনা কমেছে ৯৫ শতাংশ।
পথচারীদের আহত হওয়ার মতো দুর্ঘটনা ৯৩ শতাংশ কম এবং সাইকেল আরোহীদের আহত হওয়ার দুর্ঘটনা ৮৬ শতাংশ কম হয়েছে বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। মোটরসাইকেল আরোহীদের আহত হওয়ার মতো দুর্ঘটনার হারও মানুষের গাড়ির তুলনায় ৮২ শতাংশ কম বলে জানিয়েছে ওয়েমো।
বর্তমানে পাঁচটি শহরের তথ্য এই বিশ্লেষণে থাকলেও ওয়েমো যুক্তরাষ্ট্রের ১০টির বেশি শহরে প্রায় ৪ হাজার গাড়ি পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির গাড়িগুলো সপ্তাহে প্রায় ২০ লাখ চালকবিহীন মাইল পাড়ি দিচ্ছে এবং প্রতি সপ্তাহে ৫ লাখের বেশি ভাড়া পরিশোধকারী যাত্রী পরিবহন করছে।
শুধু ওয়েমোর তথ্য নয়
চালকবিহীন গাড়ির নিরাপত্তা নিয়ে ওয়েমোর দাবিকে সমর্থন করে কিছু স্বাধীন গবেষণাও এসেছে। ইনস্যুরেন্স ইনস্টিটিউট ফর হাইওয়ে সেফটির এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি গাড়ি-মাইল ভ্রমণের হিসাবে ওয়েমোর চালকবিহীন গাড়ি মানুষের চালানো গাড়ির তুলনায় ৬৮ শতাংশ কম দুর্ঘটনায় জড়িয়েছে।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, বর্তমানে যেভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, তা বড় পরিসরে চালকবিহীন গাড়ির বিস্তার ঘটলে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্যভাবে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের জন্য যথেষ্ট নয়।
এ কারণেই চালকবিহীন গাড়ির নিরাপত্তা নিয়ে শুধু প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তথ্যের ওপর নির্ভর করা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন, পুরো শিল্পে তথ্য সংগ্রহ ও দুর্ঘটনা পরিমাপের অভিন্ন নিয়ম না থাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য সরাসরি তুলনা করা কঠিন।
উন্নত প্রযুক্তি নাকি চালকবিহীন সফটওয়্যারের সাফল্য?
সমালোচকদের আরেকটি যুক্তি হলো, ওয়েমোর গাড়ির সঙ্গে গড় মানুষের গাড়ির তুলনাটিও পুরোপুরি সমান নয়। ওয়েমোর গাড়িতে আধুনিক সেন্সর, ক্যামেরা এবং উন্নত নিরাপত্তা প্রযুক্তি রয়েছে। অন্যদিকে রাস্তায় চলা মানুষের গাড়ির বড় একটি অংশ পুরোনো এবং চালকের অসতর্কতা, মনোযোগের ঘাটতি বা ভুল সিদ্ধান্তের কারণে দুর্ঘটনায় জড়াতে পারে।
তাই এই তুলনা থেকে উন্নত জরুরি ব্রেকিং ব্যবস্থা, সেন্সর ও অন্যান্য নিরাপত্তা প্রযুক্তি কার্যকর—এটি প্রমাণিত হলেও, কেবল এসব তথ্যের ভিত্তিতে চালকবিহীন সফটওয়্যার মানুষের চেয়ে সব পরিস্থিতিতে বেশি নিরাপদ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সতর্কতা রয়েছে।
কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ফিল কুপম্যানসহ সমালোচকেরা মনে করেন, বড় আকারের নিরাপত্তা পরিসংখ্যান বাস্তব রাস্তায় ঘটে যাওয়া ছোটখাটো ঘটনা, অস্বাভাবিক পরিস্থিতি কিংবা চালকবিহীন গাড়ির কারণে তৈরি হওয়া যানজট ও অন্যান্য সমস্যার পুরো চিত্র তুলে ধরতে পারে না।
দুর্ঘটনা নিয়ে সরকারি তথ্যও আছে
ওয়েমোর নিজস্ব প্রতিবেদনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের কাছেও দুর্ঘটনার তথ্য জমা দিতে হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। ২০২১ সালের একটি স্থায়ী সরকারি নির্দেশনার আওতায় অন্য গাড়ি, মানুষ বা কোনো সম্পত্তির সঙ্গে শারীরিক সংস্পর্শ ঘটলে সেটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে রিপোর্ট করতে হয়।
এই সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন শহরে ওয়েমোর গাড়ি ৭৯৭টি দুর্ঘটনায় জড়িয়েছে।
এর মধ্যে একটি মৃত্যুর ঘটনাও রয়েছে। ডালাসে ওই ঘটনায় একজন পথচারী প্রথমে একজন মানুষের চালানো গাড়ির ধাক্কায় পড়ে যান। পরে তিনি রাস্তার ওপর ছিটকে গিয়ে ওয়েমোর একটি গাড়ির সঙ্গে আঘাত পান। ওই ঘটনাকেই ওয়েমোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রাণহানির ঘটনা হিসেবে রিপোর্ট করা হয়েছে।
নিরাপত্তার পাশাপাশি অন্য প্রশ্নও আছে
চালকবিহীন গাড়ির নিরাপত্তার পরিসংখ্যান যতই আশাব্যঞ্জক হোক, প্রযুক্তিটির বিস্তার নিয়ে সব শহর এখনও একমত নয়। নিউইয়র্ক, বোস্টন ও ওয়াশিংটন ডিসির মতো বড় শহরও ওয়েমোর সেবা চালুর ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
তাদের উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে যান চলাচলে বিঘ্ন, রাস্তায় অস্বাভাবিক পরিস্থিতি এবং চালকদের কর্মসংস্থানের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব। অর্থাৎ চালকবিহীন গাড়ির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে শুধু দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পরিসংখ্যানই নয়, নগর ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান এবং বাস্তব রাস্তায় প্রযুক্তিটির আচরণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ওয়েমো অবশ্য মনে করছে, সময়ের সঙ্গে আরও বেশি মাইল চালানোর তথ্য যদি দুর্ঘটনা ও আহত হওয়ার হার কম থাকার ধারাবাহিকতা দেখায়, তাহলে চালকবিহীন প্রযুক্তির পক্ষে জনমত ও নীতিনির্ধারকদের আস্থা বাড়ানো সম্ভব হবে।
তবে প্রযুক্তিটি যত বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে, ততই প্রয়োজন হবে অভিন্ন ও স্বাধীন তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা। কারণ চালকবিহীন গাড়ি সত্যিই মানুষের চেয়ে নিরাপদ কি না, তা নির্ভরযোগ্যভাবে বোঝার জন্য শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত পরিসংখ্যান নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
Sarakhon Report 


















