ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে ইরান স্পষ্ট করেছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সব শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীও খুলে দেওয়া হবে না।
শুক্রবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এসব কথা জানান। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রস্তাব মেনে নিলেও পরমাণু কর্মসূচির ক্ষেত্রে তেহরান তার অবস্থান থেকে সরে আসবে না।
ইরানের প্রস্তাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া। তবে এর বিনিময়ে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কয়েকটি বড় ধরনের পদক্ষেপ চায়। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের জব্দ করা অর্থ ছাড়, তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং সংঘাতের অবসান।
ইরানি কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সব শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকবে। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথটি এখন শুধু সামরিক বা নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার প্রধান দর-কষাকষির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
হরমুজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল পরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ। ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন এই জলপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তেহরান এই প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য দ্রুত এই পথ খুলে দেওয়া।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বৃহস্পতিবার জানান, তেহরান হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, সাত দিনের মধ্যে সব ফ্রন্টে, লেবাননসহ, যুদ্ধ ও সামরিক সংঘাত বন্ধ করার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ করা অর্থ ছাড় এবং তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।
পরমাণু কর্মসূচিতে তেহরানের কঠোর অবস্থান
তবে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার বিনিময়ে পরমাণু কর্মসূচিতে ছাড় দিতে রাজি নয় ইরান। তেহরানের বক্তব্য হলো, যুক্তরাষ্ট্র আগে তাদের শর্ত পূরণ করলে এরপর পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় বসা যেতে পারে।
ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকারসহ নিজেদের অধিকার থেকে তেহরান সরে যাবে না। বিশেষ করে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে দাবি রয়েছে, সেটিও ইরান মানবে না।
ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে তীব্র বিরোধ চলছে। পশ্চিমা দেশগুলো আশঙ্কা করে, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার দিকে এগোচ্ছে। তবে তেহরান বরাবরই পরমাণু অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করে আসছে।

ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, যা বেসামরিক ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি এবং পরমাণু অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় ৯০ শতাংশ মাত্রার কাছাকাছি। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালানোর সময় দেশটির কাছে ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ৪৪০ দশমিক ৯ কেজি ইউরেনিয়াম ছিল। হামলার পর এর কতটা টিকে আছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সর্বোচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে অপেক্ষাকৃত কম মাত্রায় নামিয়ে আনার বিষয়ে তেহরান রাজি হতে পারে। কিন্তু তা দেশের বাইরে পাঠানোর বিষয়ে অবস্থান কঠোর।
নভেম্বরের মার্কিন নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তিনি আশা করেন ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।
তবে বর্তমান অবস্থান দেখাচ্ছে, সম্ভাব্য সমঝোতার পথে বড় বাধা এখনো রয়ে গেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে হরমুজ প্রণালী দ্রুত খুলে দিতে এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচিতে কঠোর সীমাবদ্ধতা আনতে। অন্যদিকে তেহরান আগে অর্থনৈতিক অবরোধ ও নৌ অবরোধ প্রত্যাহারসহ নিজেদের শর্ত পূরণের নিশ্চয়তা চাচ্ছে।
ফলে হরমুজ প্রণালী এখন শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নয়; এটি হয়ে উঠেছে যুদ্ধ বন্ধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে সম্ভাব্য সমঝোতার কেন্দ্রীয় দর-কষাকষির ক্ষেত্র। দুই পক্ষের অবস্থান যতক্ষণ না কাছাকাছি আসছে, ততক্ষণ মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিতই থাকছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















