যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার দক্ষিণ উপকূলে সমুদ্রের ভয়াবহ দাপটে ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি, সড়ক ও জনপ্রিয় সৈকত। সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে কোথাও তৈরি হয়েছে বিশাল গর্ত, কোথাও আবার একেবারে উধাও হয়ে গেছে বালুর সৈকত। আবহাওয়াবিদ ও উপকূল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামনে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে এ গ্রীষ্মে একের পর এক পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় ঘূর্ণিঝড় ও হারিকেনের প্রভাবে শক্তিশালী ঢেউ আছড়ে পড়েছে। এসব ঝড় সরাসরি ক্যালিফোর্নিয়ায় আঘাত না হানলেও সৃষ্ট বিশাল ঢেউ উপকূলে গিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এল নিনোর প্রভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা।
মালিবুতে হলিউড তারকা নিকোলাস কেজের বাড়ির কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে একটি বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। ডানা পয়েন্টের বিচ রোডে ঢেউয়ের আঘাতে একটি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। আরও ১৬টি বাড়ি বা স্থাপনায় বসবাস সীমিত কিংবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে, ক্যালিফোর্নিয়া কর্তৃপক্ষ চলতি সপ্তাহেই আগাম জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। এল নিনোর কারণে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় উদ্ধারকর্মী ও জরুরি সেবার প্রস্তুতি বাড়াতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সামনে আরও বড় ঢেউয়ের আশঙ্কা
এল নিনো গত জুনে শুরু হয়েছে এবং চলতি বছরের শেষ ভাগ থেকে ২০২৭ সালের শুরু পর্যন্ত এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যেতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। এর মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ পানি, অস্বাভাবিক জোয়ার, শক্তিশালী ঢেউ এবং প্রবল বৃষ্টির সম্মিলিত প্রভাব দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্তা ক্রুজ ক্যাম্পাসের সেন্টার ফর কোস্টাল ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্সের গবেষণা পরিচালক প্যাট্রিক বার্নার্ডের মতে, চলতি শীত উপকূলীয় ঝুঁকির দিক থেকে অত্যন্ত কঠিন হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত ঘটনাগুলোর প্রভাব আরও তীব্র হয়ে উঠছে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
শুক্রবার মেক্সিকোর প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের কাছে ‘পোলো’ নামের আরেকটি হারিকেন সক্রিয় ছিল। এর কারণে উত্তর দিকে আরও শক্তিশালী ঢেউ ধেয়ে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে, শ্রম দিবসের ছুটির সপ্তাহান্তে হারিকেন মেরির কারণে প্রবল ঢেউ ও বৃষ্টির পানিতে সান্তা মনিকার সমুদ্রতীরবর্তী একটি অনুষ্ঠানস্থলের বড় অংশ ক্ষয়ে যায়। ফলে চলতি সপ্তাহান্তে আয়োজনের কথা থাকা প্রথম ‘ওশান ওয়ে ফেস্টিভ্যাল’ বাতিল করা হয়েছে।
এক শতকে সমুদ্রপৃষ্ঠ বেড়েছে ৮ থেকে ১২ ইঞ্চি
দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার সমুদ্রপৃষ্ঠ গত এক শতকে প্রায় ৮ থেকে ১২ ইঞ্চি বা ২০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার বেড়েছে। শক্তিশালী এল নিনোর সময়ে সাময়িকভাবে এর সঙ্গে আরও ৬ থেকে ১২ ইঞ্চি বা ১৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার পানি যোগ হতে পারে।
এর সঙ্গে রয়েছে ‘কেলভিন ওয়েভ’-এর আশঙ্কা। সমুদ্রের নিচে সৃষ্ট এই বিশাল ঢেউ এল নিনোর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং বর্তমান এল নিনোর প্রথম বড় কেলভিন ওয়েভ অক্টোবরের শুরুতে ক্যালিফোর্নিয়ায় পৌঁছাতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সমুদ্রবিজ্ঞানী মাইকেল জ্যাকক্স জানিয়েছেন।
এর প্রভাব আবার ‘কিং টাইড’-এর সঙ্গে মিলে যেতে পারে। চাঁদের কক্ষপথের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের কারণে নির্দিষ্ট সময়ে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি উচ্চ জোয়ার দেখা যায়। এ সময় সমুদ্রপৃষ্ঠ সাময়িকভাবে আরও ওপরে উঠে উপকূলীয় ক্ষয় ও প্লাবনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এল নিনোর আরেকটি সম্ভাব্য প্রভাব হলো ‘অ্যাটমসফেরিক রিভার’—বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ জলীয়বাষ্প বহনকারী দীর্ঘ ও শক্তিশালী বৃষ্টিপ্রবাহ। এসব প্রবল বৃষ্টিতে উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি সমুদ্রতীরের খাড়া পাড় ও বালুর স্তর দ্রুত ক্ষয়ে যেতে পারে।
রাতারাতি উধাও কার্লসব্যাডের সৈকত
কার্লসব্যাড শহরটি সান দিয়েগো থেকে প্রায় ৩৫ মাইল উত্তরে। প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার মানুষের এই শহরের অর্থনীতিতে সৈকত ও পর্যটনের গুরুত্ব অনেক। শহরটির পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ১৪ শতাংশ আসে হোটেল কক্ষের কর থেকে।
কিন্তু জনপ্রিয় তামারাক সৈকতে সম্প্রতি প্রায় রাতারাতিই বালুর বড় অংশ উধাও হয়ে গেছে।

ইউসি সান দিয়েগোর স্ক্রিপস ইনস্টিটিউশন অব ওশানোগ্রাফির উপকূলীয় ভূ-প্রকৃতিবিদ অ্যাডাম ইয়াং সম্প্রতি সৈকতটি পরিদর্শন করেন। যেখানে আগে বিস্তৃত বালুর সৈকত ছিল, সেখানে এখন পাথর ও নুড়ি দেখা যাচ্ছে। সৈকতের আরও দক্ষিণে সমুদ্র এতটাই এগিয়ে এসেছে যে পুরো বালুর অংশ গিলে নিয়ে পাশের পার্কিং এলাকায় ঢুকে পড়েছে।
একসময় দর্শনার্থীরা গাড়ি পার্ক করে কয়েক পা হেঁটেই সৈকতে পৌঁছাতে পারতেন। এখন সেই জায়গায় সমুদ্রের পানি এসে পড়ছে।
তবুও সার্ফারদের ভিড় পুরোপুরি কমেনি। তবে যেখানে সাধারণত স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকদের ভিড়ে সৈকত জমজমাট থাকত, সেখানে এখন সামান্য যে বালু অবশিষ্ট আছে, তার ওপর অল্প কয়েকজন মানুষ জায়গা করে নিচ্ছেন।
সমস্যার দায় শুধু প্রকৃতির নয়
উপকূলীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রতীর ক্ষয় নতুন কোনো ঘটনা নয়। হাজার হাজার বছর ধরেই প্রাকৃতিকভাবে উপকূলের গঠন বদলেছে। কিন্তু মানুষের বসতি, বাড়িঘর ও অন্যান্য অবকাঠামো যখন ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় তৈরি করা হয়, তখন প্রাকৃতিক ক্ষয় বড় ধরনের মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হয়।
অ্যাডাম ইয়াংয়ের মতে, কোথাও উপকূলীয় স্থাপনা শক্তিশালী করা, কোথাও নতুন করে বালু যোগ করা কিংবা নুড়ি-পাথর ব্যবহার করে বালিয়াড়ির মতো প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা তৈরি করা যেতে পারে। তবে সব জায়গার জন্য একই সমাধান কার্যকর হবে না।
ক্যালিফোর্নিয়ার সামনে এখন মূল প্রশ্ন শুধু এবারের ঝড় বা এল নিনো মোকাবিলা নয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ ক্রমাগত বাড়তে থাকলে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে কীভাবে উপকূলীয় শহরগুলোকে টিকিয়ে রাখা হবে, সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ।
কার্লসব্যাডের তামারাক সৈকতে সার্ফিং করতে আসা অ্যালেক্স স্টটের কথায়, প্রকৃতি ইতোমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে কত দ্রুত একটি পুরো সৈকত হারিয়ে যেতে পারে। মানুষের নির্মাণকাজ ও বসতি যদি প্রকৃতির এই পরিবর্তনের পথ আটকে দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়তে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে তাই এবারের পরিস্থিতি শুধু একটি মৌসুমি দুর্যোগের সতর্কতা নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং মানুষের উপকূলনির্ভর জীবনযাপনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় একটি প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















